- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবন
মধ্যযুগে বাংলার সমাজব্যবস্থায় বাংলা ভাষা-ভাষীসহ আরো কিছু ভাষা অনুসারী মানুষের অস্তিত্ব ছিল। একই সঙ্গে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধসহ অন্যান্য লোকধর্মানুসারী মানুষেরা বসবাস করতেন। মূলত ইসলাম ও সনাতন ধর্মকে কেন্দ্র করেই মধ্যযুগে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতি-নীতি গড়ে উঠেছিল।
মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান শাসনকালে সুলতান ছিলেন সমাজজীবনে সর্বোচ্চ আসনের অধিকারী। সুলতানকে কতকগুলো বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হতো। তাঁকে সমাজের নেতা হিসেবে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে হতো। সুলতানগণ নিজ নিজ রাজ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ ইত্যাদি নির্মাণ এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদেরও পৃষ্ঠপোষকতা করতেন।
মুসলমান শাসকরা অভিজাত সম্প্রদায়ভুক্ত এবং জমকালো প্রাসাদে বাস করতেন। তাঁদের রাজধানীও নানারকম মনোমুগ্ধকর অট্টালিকায় সুসজ্জিত থাকত। ঐশ্বর্য ও আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও রাজদরবারের বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জ্ঞানী ও গুণী ব্যক্তিদের সমাবেশ। শাসকগণ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিল্প-সংস্কৃতির উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।
মধ্যযুগে বাংলায় মুসলমান সমাজব্যবস্থায় উচ্চ, মধ্যম ও নিম্ন-এই তিনটি পৃথক শ্রেণির অস্তিত্ব ছিল। সৈয়দ, উলামা প্রমুখ শ্রেণি সমাজে যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল। শিক্ষিত জনগণের প্রতি শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে ভাতা এবং জমি বরাদ্দ করা হতো।
উলামাগণের মধ্য থেকে কাজি, ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং ধর্মবিষয়ক অন্যান্য কর্মচারী নিয়োগ করা হতো। শেখগণ ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিষয়ে জনগণকে শিক্ষা দিতেন।
১৩-১৮ শতকের বাংলার মুসলমান সমাজে একটি অভিজাত সম্প্রদায় গড়ে উঠেছিল। যোগ্যতা, প্রতিভা ও জ্ঞানের দ্বারা তারা নিজেদের সাধারণ মানুষের তুলনায় একটি আলাদা শ্রেণি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। যেকোনো ব্যক্তি তার যোগ্যতা ও প্রতিভা দ্বারা রাষ্ট্রের মর্যাদাপূর্ণ পদে বসতে পারতেন। এক্ষেত্রে সুলতান গিয়াসউদ্দিন ইওজ খলজি ও সুবাদার মুর্শিদ কুলি খানের দৃষ্টান্ত উল্লেখযোগ্য। অবশ্য পরবর্তী সময়ে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটে। উত্তরাধিকার সূত্রে মর্যাদাপূর্ণ সরকারি পদ লাভের নীতি প্রচলিত হয়। এ যুগে সামরিক ও বিচার বিভাগের উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের নিয়ে সরকারি অভিজাত শ্রেণি গড়ে উঠেছিল। নিম্ন শ্রেণির সরকারি কর্মচারীদের নিয়ে মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হয়। কৃষক, তাঁতি এবং অন্যান্য শ্রমিক শ্রেণি নিয়ে তৃতীয় শ্রেণি গঠিত ছিল।
ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষের মধ্যে বহুমুখী সামাজিক উৎসব পালন করা হতো। ঈদ, নববর্ষ, আকিকা ইত্যাদি উৎসবে সমাজের সকল মানুষ স্বতস্ফূর্তভাবে শরিক হতো। বিশেষ করে ঈদের সময় শহরগুলোতে জাঁকজমকপূর্ণ আনন্দ মিছিল বের হতো। সুবাদার ইসলাম খাঁন ঈদের দিন ঢাকায় ঘোড়া, হাতি সহযোগে আনন্দ শোভাযাত্রা প্রচলন করেন। 'আকিকা' নামক বিশেষ অনুষ্ঠান মুসলমান সমাজের একটি অতি পরিচিত সামাজিক প্রথা ছিল। বিয়ে ছিল উৎসবমুখর অনুষ্ঠান। মুসলমানরা মৃতদেহকে কবর দিত এবং তার আত্মার শান্তির জন্য দোয়া করে এবং অন্যান্য ধর্মীয় আচারাদি পালন করে। মুসলমান সমাজে সুফি ও দরবেশ নামে পরিচিত পির বা ফকির সম্প্রদায়ের যথেষ্ট প্রভাব ছিল। বিভিন্ন সমস্যা থেকে মুক্তি লাভের জন্য সেকালে সাধারণ মানুষ তাদের দেওয়া তাবিজ-কবজ ব্যবহার করতো।
বাংলা অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষের অনেকে ধীরে ধীরে ইসলামের দিকে ঝুঁকে পড়তে শুরু করেন। হিন্দু, বৌদ্ধ কিংবা লোকধর্ম চর্চাকারী অনেকেই ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে থাকেন। ১৩-১৯ শতকের মধ্যে বাংলা অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে মুসলমানদের সংখ্যা ৩০-৪০ শতাংশ হয়। ধর্মান্তরিত ব্যক্তিরা তাদের পূর্ববর্তী ধর্মের কোনো কোনো বিশ্বাস ও সংস্কার দৈনন্দিন জীবনে পালন করা অব্যাহত রাখেন। এভাবে ইসলামে সংমিশ্রণ ও সমন্বয়বাদী ধারা চালু হয়। পিরের দরগায় সন্ধ্যায় আলো জ্বালানো এবং শিরনি প্রদানসহ অসংখ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য মুসলমান সমাজেও অতীতের মতোই বহাল থাকে।
অভিজাত মুসলমানরা ছিল ভোজনবিলাসী। তাদের খাদ্য তালিকায় বিভিন্ন মাছ-মাংসের সঙ্গে আচারের নামও পাওয়া যায়। এসব খাবারের পাশাপাশি কাবাব, রেজালা, কোর্মা আর ঘিয়ে রান্না করা যাবতীয় মুখরোচক খাবার জায়গা করে নেয়। ভাত, মাছ, শাক-সবজি বাঙালি মুসলমানদের প্রতিদিনের খাদ্য ছিল। খাদ্য হিসেবে রুটির ব্যবহারের কথাও জানা যায়। খিচুড়ি তখনকার সমাজে একটি প্রিয় খাদ্য ছিল।
অভিজাত মুসলমানরা পায়জামা ও গোল গলাবন্ধসহ জামা পরতো। তাদের মাথায় থাকতো পাগড়ি, পায়ে থাকতো রেশম ও সোনার সুতার কাজ করা চামড়ার জুতা। তারা তাদের আঙুলে অনেক মণি-মুক্তা বসানো আংটি ব্যবহার করতো। মাওলানা ও মৌলবিরা পায়জামা, জামা এবং টুপি ব্যবহার করতো। গরিব বা নিম্ন শ্রেণির মুসলমানরা লুঙ্গি ও টুপি পরতো। অভিজাত মহিলারা কামিজ ও সালোয়ার ব্যবহার করতো। তারা প্রসাধনী ব্যবহারে অভ্যস্ত ছিল। তারা বাহু ও কব্জিতে সোনার অলংকার এবং আঙুলে সোনার আংটি পরতো।
এ যুগের প্রথম দিকে পারস্য, তুরস্ক থেকে আগত শাসক মুসলমানরা অভিজাত সংস্কৃতি চালু করে। কিন্তু তারা বাংলা অঞ্চলে ধর্মীয় আচরণের ক্ষেত্রে কঠোর ও নৈতিক মান বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়। সংমিশ্রণ ও সমন্বয়ের ফলে মুসলমান সমাজে নতুন নতুন রীতি-নীতির আবির্ভাব ঘটেছিল। সামাজিক জীবনে বিদ্যমান বৈচিত্র্যময় এবং বাস্তববাদী রীতি-নীতি ও প্রথা-পদ্ধতি শাসনব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করেছিল। বাংলার নবাবি শাসনের অবসানের পেছনে শাসকবর্গের অভিজাততন্ত্র ও অন্যান্য দুর্বলতা যথেষ্ট দায়ী ছিল।
হিন্দু সমাজ ও সংস্কৃতি
মধ্যযুগে বাংলার মানুষের দৈনন্দিন জীবনধারার রীতি-নীতি ও প্রথা-পদ্ধতি ছিল সংমিশ্রণ ও সমন্বয়ধর্মী। ১৩-১৯ শতকের দিকে হিন্দু-বৌদ্ধ ও লোকজ ধর্মাবলম্বীগণ সংখ্যায় ছিলেন বেশি। এই বৈচিত্র্যময় সমাজের মূল নীতিগুলো এবং সাধারণ সমাজ ব্যবস্থায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এ যুগেও সমাজে হিন্দুদের মধ্যে জাতিভেদ প্রথা প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন পেশাকে ভিত্তি করেই এ প্রথার সৃষ্টি। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র- সমাজে চারটি উল্লেখযোগ্য বর্ণ ছিল। এ চার বর্ণের মানুষের মধ্যে সামাজিক মেলামেশা ছিল না বললেই চলে। বর্ণপ্রথা কঠোরভাবে পালিত হতো নগরকেন্দ্রিক জীবনে। গ্রামীণ সাধারণ মানুষেরা মিলে মিশে থাকতেন। এক বর্ণের সঙ্গে অন্য বর্ণের বিয়ে বা আদান-প্রদান হতো না বললেই চলে। ধর্মকর্মের ক্ষেত্রে নগরে ব্রাহ্মণদের কর্তৃত্ব ছিল।
মধ্যযুগের বাংলায় জন্ম, বিয়ে ও মৃত্যু উপলক্ষ্যে বহু বিচিত্র সামাজিক রীতি-নীতি পালন করা হতো। তখনকার যুগের প্রচলিত অনুষ্ঠানগুলো বর্তমানকালেও লক্ষ্য করা যায়। সন্তান জন্মের পর ষষ্ঠ দিনে, এক মাস পর এবং ছয় মাসের সময় নানা প্রকার আয়োজন করা হতো। সমাজে নিয়মিত উপবাস ও একাদশী পালনের রেওয়াজ ছিল।
বিয়ে ছিল একটি উল্লেখযোগ্য সামাজিক অনুষ্ঠান। বাংলায় হিন্দু সমাজে একান্নবর্তী পরিবারই ছিল অধিক। পিতার মৃত্যুর পর জ্যেষ্ঠ পুত্রই সংসারের দায়িত্ব গ্রহণ করতো। স্বামীভক্তি হিন্দু সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল।
এ সময়ে বাংলার সমাজে নারীদের তেমন কোনো অধিকার ছিল না। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বহুসংখ্যক পুরুষ স্ত্রীকে তার সম্পত্তি হিসেবে গণ্য করতো। কন্যা মাতা-পিতার ওপর, স্ত্রী স্বামীর ওপর, বিধবারা সন্তানদের ওপর নির্ভরশীল ছিল। হিন্দু সমাজে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্পত্তির ওপর স্ত্রীদের কোনো অধিকার ছিল না। সমাজে সতীদাহ প্রথা প্রচলিত ছিল। তথাপি এ যুগে অনেক নারী নিজ যোগ্যতা ও বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নিজেদের স্বাধীন সত্তাকে বিকশিত করতে সমর্থ হয়েছিল। সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও এ যুগের নারীদের কৃতিত্ব কম ছিল না। বিত্তশালী পরিবারে নিয়মিত শিল্প ও সংস্কৃতির চর্চা হতো। বীণা, তানপুরা ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্রে এ যুগের নারীরা পারদর্শী ছিল।
পোশাক ও অলংকার হিসেবে হিন্দু মেয়েরা পাট ও তুলার কাপড়, আংটি, হার, নাকপাশা, দুল, সোনার ব্রেসলেট, সোনার শাঁখা, কানবালা, নথ, অনন্ত, বাজু প্রভৃতি ব্যবহার করতো। বিত্তবান নারীরা অলঙ্কার ব্যবহার করতো। এ সকল অলংকার সোনা, রুপা, হাতির দাঁত দ্বারা নির্মিত হতো এবং মণিমাণিক্য খচিত থাকতো। অনেকে পায়ে নূপুর পরতো। কেবল বিশেষ অনুষ্ঠানে এ সকল অলংকার ও প্রসাধনী ব্যবহার করা হতো। সাধারণ মেয়েরা নিজেদের গৃহে সাধারণ বেশভূষায় সজ্জিত থাকতো। সালোয়ার কামিজ, শাড়ি তাদের নিত্যদিনের পোশাক ছিল। পুরুষদের সাধারণ পোশাক ছিল পায়জামা, ধুতি। অভিজাত এবং শিক্ষিত ব্যক্তিরা চাদর ও পাগড়ি ব্যবহার করতো। ধনী ব্যক্তিরা বিশেষত ব্যবসায়ীরা গলায় হার, কানে দুল এবং আঙুলে আংটি পরতো।
হিন্দুসমাজে কৌলীন্য প্রথা প্রচলিত ছিল। ফলে সেখানে নানা বৈষম্য অনুপ্রবেশ করেছিল। ব্রাহ্মণ, বৈদ্য ও কায়স্থদের মধ্যে এ প্রথার ব্যাপক প্রচলন ছিল। কৌলীন্য প্রথার ফলে সমাজে বহুবিবাহ প্রথা প্রচলিত হয়। মধ্যযুগে বাংলায় হিন্দু ও মুসলমান সমাজজীবনে কতকগুলো সামাজিক বিশ্বাস জন্মলাভ করেছিল। জ্যোতিষী পাঁজি-পুঁথি ঘেঁটে শুভক্ষণ নির্ধারণ করত। এ সময় জনগণ ইন্দ্রজাল এবং জাদুবিদ্যায় বিশ্বাস করতো।
খাদ্যাভ্যাস
মধ্যযুগের খাদ্যের সঙ্গে বর্তমান সমাজের খাদ্যের তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। ভাত ছিল প্রধান খাদ্য। এছাড়া খাদ্য তালিকায় ছিল মাছ, মাংস, শাক-সবজি, দুধ, দধি, ঘৃত, ক্ষীর ইত্যাদি। পোলাও, কোরমাসহ অভিজাত খাবার ধনী মুসলিমদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। চাল থেকে প্রস্তুত নানা প্রকার পিঠাও জনপ্রিয় মুখরোচক খাবার ছিল। বাঙালি ব্রাহ্মণরা আমিষ খেত। তখন সকল প্রকার মাছ পাওয়া যেত। পূর্ববঙ্গে ইলিশ ও শুঁটকি মাছ খুব প্রিয় খাবার ছিল। তরকারির মধ্যে বেগুন, লাউ, কুমড়া, ঝিঙ্গা, কাঁকরোল, কচু উৎপন্ন হতো। ফলের মধ্যে আম, কাঁঠাল, কলা, তাল, পেঁপে, নারকেল, ইক্ষু পাওয়া যেত। উল্লেখ্য, তখনকার সময়ে হিন্দু-মুসলমানদের খাদ্য তালিকার মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।
একক কাজ
১. মধ্যযুগের বাংলায় সামাজিক উৎসব ও সমন্বয়ধর্মী রীতি-নীতি উল্লেখ করো।
২. মধ্যযুগে বাংলার মানুষের পোশাক-পরিচ্ছদ কেমন ছিলো?
৩. মধ্যযুগে বাংলার মানুষের বৈচিত্র্যময় খাদ্য সম্পর্কে ধারণা দাও।
মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

