- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
অর্থনৈতিক অবস্থা ও ব্যবসা-বাণিজ্য
নদীমাতৃক বাংলার ভূমি চিরদিনই উর্বর। মধ্যযুগে এখানকার উৎপন্ন ফসলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ধান, গম, তুলা, ইক্ষু, পাট, আদা, জোয়ার, তিল, শিম, সরিষা ও ডাল। কৃষিজাত দ্রব্যের মধ্যে পিঁয়াজ, রসুন, হলুদ, শশা প্রভৃতি ছিল উল্লেখযোগ্য। আম, কাঁঠাল, কলা, মোসাব্বর, খেজুর ইত্যাদি ফলমূলের ফলনও ছিল প্রচুর। পান, সুপারি, নারকেলও প্রচুর পরিমাণে উৎপন্ন হতো। গালা বা দ্রাক্ষাও উৎপন্ন হতো প্রচুর। মুসলমান শাসনের সময় থেকেই বাংলায় পাট ও রেশমের চাষ শুরু হয়।
বাংলার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মূল উৎস ছিল কৃষি। কৃষি ফলনের প্রাচুর্য থাকলেও এ সময়ের চাষাবাদ পদ্ধতি ছিল অনুন্নত। আধুনিক সময়ের মতো পানি সেচব্যবস্থা সে যুগে ছিল না। কৃষককে অধিকাংশ সময়েই সেচের জন্য বৃষ্টির ওপর নির্ভর করতে হতো।
কৃষিপ্রধান দেশ বলে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলার অধিবাসীর বৃহত্তর অংশ ছিল কৃষক। বাংলার মাটিতে কৃষিজাত দ্রব্যের প্রাচুর্য ছিল। ফলে উদ্বৃত্ত বিভিন্ন পণ্য বিদেশে রপ্তানি করা হতো। এ ব্যবসায়িক তৎপরতা কালক্রমে শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রসারিত হয়। মুসলমান শাসনকালে বঙ্গে বস্ত্র শিল্প, চিনি শিল্প, নৌকা নির্মাণ কারখানা ইত্যাদি গড়ে উঠেছিল।
বস্ত্র শিল্পে বাংলার অগ্রগতি ছিল সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। এখানকার নির্মিত বস্ত্রগুলো গুণ ও মানের বিচারে যথেষ্ট উন্নত ছিল। তাই বিদেশে এগুলোর প্রচুর চাহিদা ছিল। নিজেদের ব্যবহারের জন্য রঙিন কাপড় এবং বিদেশে রপ্তানি করার জন্য সাদা কাপড় এখানে তৈরি করা হতো। ঢাকা ছিল মসলিন নামক বিশ্বখ্যাত সূক্ষ্ম বস্ত্র শিল্পের প্রধান প্রাণকেন্দ্র। ইউরোপে এর প্রচুর চাহিদা ছিল। এ বস্ত্র এত সূক্ষ্ম ছিল যে, ২০ গজ মসলিন একটি দিয়াশলাইয়ের বাকসোতে ভরে রাখা যেত। পাট ও রেশমের তৈরি বস্ত্রেও বাংলার কৃতিত্ব ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলায় চিনি ও গুড় তৈরি এবং জাহাজ নির্মাণ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে।
বাংলার ক্ষুদ্রশিল্প
মধ্যযুগে বাংলার রকমারি ক্ষুদ্রশিল্পের কথা জানা যায়। এ প্রসঙ্গে ধাতব শিল্পের কথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তখন লৌহ নির্মিত দ্রব্যাদির ব্যাপক প্রচলন ছিল। কর্মকারগণ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রপাতি নির্মাণ করত। এছাড়া দু'ধারী তরবারি, ছুরি, কাঁচি, কোদাল ইত্যাদি নিত্যব্যবহার্য ধাতব দ্রব্য তৈরি হতো। কলকাতা ও কাশিম বাজারে এদেশের লোকেরা কামান তৈরি করত। কাগজ, গালিচা, ইস্পাত প্রভৃতি শিল্পের কথাও জানা যায়। বাংলার অন্যতম শিল্প হিসেবে লবণের কথাও জানা যায়। দেশে স্বর্ণকার সম্প্রদায় ছিল। বাঙালি কারিগরেরা স্বর্ণ, রৌপ্য, ব্রোঞ্জ, কাঠ, পাথর, গজদন্ত ইত্যাদির কাজ বিশেষ নিপুণতার সঙ্গে সম্পাদন করত। শঙ্খ শিল্পের জন্য ঢাকার প্রচুর সুখ্যাতি ছিল। ঢাকার শাঁখারীপট্টি আজও সেকথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
রপ্তানিদ্রব্য
বাংলার কৃষি ও শিল্প পণ্যের প্রাচুর্য এবং বিদেশে এগুলোর ব্যাপক চাহিদার ফলে বিদেশের সঙ্গে বাংলার বাণিজ্যিক তৎপরতা মধ্যযুগে অভূতপূর্ব প্রসার লাভ করেছিল। বাংলার রপ্তানি পণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল সুতি কাপড়, মসলিন, রেশমি বস্ত্র, চাল, চিনি, গুড়, আদা, লঙ্কা ইত্যাদি। কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে চাল, তামাক, সুপারি, পাট, ফল ইত্যাদি রপ্তানি হতো। বিবিধ কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্য ছাড়াও বাংলা থেকে লবণ, গালা, আফিম, নানা প্রকার মসলা, ঔষধ ইত্যাদি ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানে এবং বিভিন্ন দেশে পাঠানো হতো।
আমদানিদ্রব্য
ব্যবসা-বাণিজ্যের সিংহভাগই ছিল রপ্তানিনির্ভর। খুব অল্প পরিমাণ দ্রব্য আমদানি করা হতো। বাংলার কাপড়ের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি করা হতো। বাঙালি বণিকেরা গুজরাট থেকে আমদানি করত তুলা, চীন থেকে রেশম, ইরান থেকে শৌখিন দ্রব্য। এছাড়া বাংলায় আমদানি করা হতো স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান পাথর।
বন্দর
মধ্যযুগে বাংলায় বেশ কিছু সমুদ্রবন্দর ও নদীবন্দর গড়ে উঠেছিল। চট্টগ্রাম ছিল তখনকার বিখ্যাত বাণিজ্যবন্দর। উড়িষ্যা, সোনারগাঁ, গৌড়, বাকলা (বরিশাল), মুর্শিদাবাদ, কাশিমবাজার, হুগলি, বিহারের পাটনা ও উড়িষ্যার পিপলী উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যবন্দর ছিল।
ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে দ্রব্য ও টাকা-পয়সার লেনদেন এবং হিসাব-নিকাশ বৃদ্ধি পায়। মধ্যযুগে বাংলায় দ্রব্যসামগ্রী সহজলভ্য ও সস্তা ছিল। চৌদ্দ শতকে বিখ্যাত ভ্রমণকারী ইবনে বতুতা লিখেছেন যে, সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে বাংলাতেই সবচেয়ে সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যেত।
বাংলার শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমাজের অভিজাত শ্রেণির সঙ্গে সাধারণ মানুষের বৈষম্য ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কোনো কর্তৃত্ব ছিল না। এদেশের বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করত আরব ও পারস্য বা ইরানের বণিকেরা। নৌ-বাণিজ্যের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ছিল তাদেরই। পরবর্তীকালে পর্তুগিজ ও অন্যান্য ইউরোপীয় বণিকরা ব্যবসার ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে।
একক কাজ: মধ্যযুগে বাংলায় উৎপাদিত কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের তালিকা প্রস্তুত করো।
মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

