- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
স্থাপত্য ও চিত্রকলা
মধ্যযুগের শাসকগণ স্থাপত্য ও চিত্রকলায় নিজেদের শাসনকালকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলার বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন সময়ে অনেক প্রাসাদ, মসজিদ, কবর, দরগাহ, মন্দির, প্যাগোডা ইত্যাদি নির্মাণ করেছিলেন। সুলতানি আমলের স্থাপত্যের ধ্বংসাবশেষের মধ্যে এখনও অনেক স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে।
মধ্যযুগে বাংলার সুলতানদের রাজধানী প্রথমে ছিল গৌড়, পরে পাণ্ডুয়া এবং এরপর আবার গৌড়। কাজেই এদুই শহরেই মুসলিম ঐতিহ্যের স্থাপত্য নিদর্শন গড়ে উঠেছিল। ১৩৬৯ সালে সুলতান সিকান্দার শাহ 'আদিনা মসজিদ' নির্মাণ করেন। এ মসজিদের উত্তর পাশে সিকান্দার শাহের কবর নির্মিত হয়েছিল।
বর্তমান ঢাকা থেকে ১৫ মাইল পূর্বে সোনারগাঁয়ে গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের একটি কবর আছে। এ কবরের অতি নিকটে পাঁচটি দরগাহ ও পাঁচটি মসজিদ আছে। এগুলো 'পাঁচ পীরের দরগাহ' নামে পরিচিত। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের সমাধি স্থাপত্যকলার একটি সুন্দর নিদর্শন।
সুলতান জালালউদ্দিনের শাসনকালের উল্লেখযোগ্য কীর্তি পাণ্ডুয়ার 'এক লাখি মসজিদ'। এর নির্মাণকাল ১৪১৮-১৪২৩ সাল। প্রবাদ আছে যে, তখনকার দিনে এক লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করা হয়েছিল। তাই এটি 'এক লাখি মসজিদ' নামে পরিচিত হয়েছে। এ মসজিদ আসলে একটি কবর। এ সমাধিসৌধে সুলতান এবং তাঁর স্ত্রী-পুত্রদের সমাহিত করা হয়।
বড় সোনা মসজিদের আর এক নাম 'বারোদুয়ারী মসজিদ'। এতে বৃহৎ বারোটি দরজা ছিল। এ মসজিদে সোনালি রঙের গিলটি করা কারুকার্য ছিল। সম্ভবত এজন্যই এটি সোনা মসজিদ নামে অভিহিত হতো। এ মসজিদটি গৌড়ের বৃহত্তম মসজিদ। আসাম বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখার জন্য হুসেন শাহ এ মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। ১৫২৭ সালে নুসরত শাহ এর নির্মাণ কাজ শেষ করেন।
গৌড় শহরের দক্ষিণ প্রান্তে বর্তমান ফিরোজাবাদ গ্রামে 'ছোট সোনামসজিদ' নির্মিত হয়েছিল। এ মসজিদটি ছিল আকারে ছোট। তবে এ মসজিদেও সোনালি রঙের গিলটির কারুকার্য ছিল। সম্ভবত এ কারণেই এটি ছোট সোনা মসজিদ নামে পরিচিত। আলাউদ্দিন হুসেন শাহের আমলে জনৈক ওয়ালি মুহাম্মদ এটির নির্মাতা ছিলেন।
বাগেরহাট জেলায় খান জাহান আলীর মাজার নির্মিত হয়েছে। কিংবদন্তি অনুসারে খান জাহান আলী নামক জনৈক পির ঐ স্থানে বসতি স্থাপন করেন। ১৪৫৯ সালে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয়। তিনি সুলতান নাসিরউদ্দিন ইলিয়াসের সমসাময়িক ছিলেন।
বাগেরহাট জেলার 'ষাট গম্বুজ মসজিদ' বাংলার মুসলমান শাসনকালের গৌরব বৃদ্ধি করেছে। খান জাহান আলীর মাজার থেকে তিন মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ষাটগম্বুজ মসজিদ অবস্থিত। অবশ্য এর গম্বুজ ষাটটি নয়, সাতাত্তরটি। পনেরো শতকের মাঝামাঝি সময়ে এটি নির্মিত হয়েছিল। তুর্কি সেনাপতি ও ইসলামের একনিষ্ঠ সাধক উলুখ খান জাহান এ মসজিদ নির্মাণ করেন। এই স্থাপত্য কর্মটি জাতিসংঘের ইউনেস্কো কর্তৃক বিশ্বসভ্যতার নিদর্শন 'ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ' সাইট হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে।
কদম রসুল' গৌড়ে অবস্থিত। মহানবি (স)-এর পদচিহ্নের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের জন্য এ ভবনটি নির্মিত হয়। নুসরত শাহ এটি নির্মাণ করেছিলেন (১৫৩১ সাল)। এ ভবনের এক কক্ষে একটি কালো কারুকার্যখচিত মর্মর বেদির উপরে হযরত মুহাম্মদ (স)-এর পদচিহ্ন সংবলিত একখণ্ড প্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।
ঢাকা জেলার রামপালে 'বাবা আদমের মসজিদ' অবস্থিত। ১৪৮৩ সালে মালিক কাফুর ফতেহ শাহের রাজত্বকালে এটি নির্মিত হয়। এগুলোর বাইরেও বাংলার নানা স্থানে বহু মসজিদ ও সমাধিসৌধ আছে।
মসজিদ ও মাজার ছাড়াও এ যুগের নির্মিত বিভিন্ন তোরণ-কক্ষ ও মিনার মুসলমান বাংলার স্থাপত্যশিল্পের উৎকৃষ্ট নিদর্শন। এদের মধ্যে রুকনউদ্দিন বরবক শাহ নির্মিত গৌড়ের 'দাখিল দরওয়াজা' ও আলাউদ্দিন হুসেন শাহের সমাধি-তোরণ বিশেষ উল্লেখযোগ্য। গৌড়ের 'ফিরোজ মিনার' স্থাপত্য শিল্পের আর একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন। অনেকে মনে করেন যে, হাবসি সুলতান সাইফউদ্দিন ফিরোজ শাহ এটি নির্মাণ করেছিলেন।
মুঘল আমলে বাংলার শাসকগণ শিল্পকলার ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর অবদান রেখে গেছেন। আজও বাংলার বহু স্থানে মুঘল শাসকগণের শিল্পপ্রীতির নিদর্শন বিদ্যমান রয়েছে। তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতায় বহু মসজিদ, সমাধি ভবন, স্মৃতিসৌধ, মাজার, দুর্গ, স্তম্ভ ও তোরণ নির্মিত হয়েছিল। স্থাপত্যশিল্পের বিকাশের জন্য এ যুগকে বাংলায় মুঘলদের 'স্বর্ণযুগ' হিসেবে অভিহিত করা হয়। মুঘল যুগে 'কাটরা' নামে বেশ কটি দালান তৈরি করা হয়েছিল। এগুলো ছিল অতিথিশালা। ঢাকার 'বড় কাটরা' নির্মাণ করেন শাহ সুজা। এটি চকবাজারের দক্ষিণ দিকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত।
নারায়ণগঞ্জ জেলায় শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত হাজিগঞ্জ দুর্গ (বর্তমানে খিজিরপুর দুর্গ নামে পরিচিত)। সম্ভবত সুবাদার মির জুমলা (১৬৬০-১৬৬৩ সাল) এটি নির্মাণ করেন। মগ ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এ দুর্গ তৈরি করা হয়েছিল।
সুবাদার শাহজাদা আজম বেশ কিছু ইমারত তৈরি করেছিলেন। বুড়িগঙ্গার তীর ঘেষে তিনি এক বিশাল কাটরা তৈরি করেছিলেন। তাঁর আমলেই 'লালবাগের শাহি মসজিদ' তৈরি হয়।
বাংলায় মুঘল শিল্পকলার বিস্তারের ক্ষেত্রে শায়েস্তা খানের নাম সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৬৬৩ সালে শায়েস্তা খান ছোট কাটরা নির্মাণ করেন। এটি বড় কাটরা থেকে ২০০ গজ দূরে অবস্থিত। লালবাগের কেল্লা আজও শায়েস্তা খানের শাসনকালকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাঁর শাসনকালের পূর্বেই এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। তিনি এটি শেষ করার পদক্ষেপ নেন। ১৬৯০ সালে ইব্রাহিম খানের শাসনকালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়। লালবাগ দুর্গের ভেতর রয়েছে শায়েস্তা খানের কন্যা পরিবিবির মাজার। মার্বেল পাথরে নির্মিত এ সমাধি ভবনটি এখন পর্যন্ত এদেশে সর্বাধিক সুন্দর মুসলিম স্মৃতিসৌধ হিসেবে গণ্য করা হয়। ১৬৭৬ সালে শায়েস্তা খান হোসেনী দালান নির্মাণ করেন। চকবাজারের মসজিদ, বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত শায়েস্তা খানের মসজিদ ও সাতগম্বুজ মসজিদের সাথে শায়েস্তা খানের নাম জড়িয়ে আছে।
বাংলার নবাবদের সময়েও বহু ইমারত নির্মিত হয় পুরান ঢাকায়। জিনজিরা প্রাসাদ তাঁদেরই কীর্তি। মুর্শিদ কুলি খানের আমলে বেগম বাজার মসজিদ নির্মিত হয়। মুর্শিদাবাদে তিনি একটি কাটরা ও মসজিদ নির্মাণ করেন। চেহেল 'সেতুন' নামে একটি প্রাসাদও তাঁর সময়ে তৈরি। এটি ছিল একটি প্রকাণ্ড দরবার ভবন। এ সমস্ত স্থাপনা ছাড়াও মুঘল আমলে অনেক দুর্গ, ঈদগাহ, হাম্মামখানা, চিল্লাখানা ও সেতু নির্মাণ করা হয়। মুঘল যুগের এ সকল শিল্পকীর্তি বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব বিস্তার করেছিল।
দলীয় কাজ
ছকে এলোমেলোভাবে প্রদত্ত স্থাপত্য কীর্তিগুলো কোথায় অবস্থিত তা সঠিকভাবে পাশে উল্লেখ করে তালিকা প্রস্তুত করো।
মধ্যযুগের বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

