- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
যুক্তফ্রন্ট গঠনের পটভূমি এবং ২১ দফা কর্মসূচি
১৯৫৪ সালের নির্বাচনে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মুসলিম লীগ ছিল পুরাতন ও বড় দল। এছাড়া পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকার পরিচালনা করত মুসলিম লীগ। ফলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলো মুসলিম লীগকে পরাজিত করার কৌশল হিসেবে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার পরিকল্পনা নেয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বয়ে 'যুক্তফ্রন্ট' গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। যুক্তফ্রন্ট মূলত পাঁচটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত হয়।
১. মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ,
২. শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক-শ্রমিক পার্টি,
৩. মওলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি,
৪. হাজী দানেশের বামপন্থি গণতন্ত্রী দল ও
৫. খিলাফত-ই-রাব্বানি। নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের প্রতীক ছিল 'নৌকা'।
আওয়ামী মুসলিম লীগের নির্বাচনি কর্মসূচির ৪২ দফার প্রধান প্রধান দাবি নিয়ে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করা হয়। পূর্ব বাংলার গণমানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে প্রণীত এই ২১ দফা কর্মসূচির মুখ্য রচয়িতা ছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। প্রধান দফাগুলো সংক্ষেপে বর্ণিত হলো:
বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা;
- বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত ও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে উদ্বৃত্ত জমি বিতরণ করা;
- পাটশিল্পকে জাতীয়করণ করা;
- কৃষির উন্নতির জন্য সমবায় কৃষিব্যবস্থা প্রবর্তন করা;
- অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা;
- মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান;
- '৫২-এর ভাষা আন্দোলনের বীর শহিদদের স্মরণে শহিদ মিনার নির্মাণ;
- ২১শে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস হিসেবে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করা;
- ১৯৪০-এর লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী পূর্ব বাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান;
- আইন পরিষদের মেয়াদ কোনোভাবেই বৃদ্ধি না করা;
- আইন পরিষদের আসন শূন্য হলে তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচন দিয়ে তা পূরণ করা।
নির্বাচনের ফলাফল
১৯৫৪ সালের নির্বাচন ছিল পূর্ব বাংলায় প্রথম অবাধ ও সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে সাধারণ নির্বাচন। নির্বাচনে শতকরা ৩৭.১৯ ভাগ ভোটার ভোট দেয়। ২রা এপ্রিল সরকারিভাবে নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়। মোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলিম আসন ছিলো ২৩৭টি। যার মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে বিজয় লাভকরে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন। এ নির্বাচনের মাধ্যমে মুসলিম লীগ ও অবাঙালি নেতৃত্বের প্রতি বাঙালির ব্যাপক অনাস্থা প্রকাশ পায়। তারা বুঝতে পারে পশ্চিম পাকিস্তানি ও তাদের এ দেশীয় সহযোগীদের দ্বারা বাঙালির প্রকৃত মুক্তি সম্ভব নয়। ফলে বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের আদর্শের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাবাসী স্বায়ত্তশাসনের প্রতি তাদের পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে।
নির্বাচন-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ
শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠন করে। যুক্তফ্রন্টের নিরঙ্কুশ জয় শুরু থেকেই মুসলিম লীগ সুনজরে দেখেনি। তারা যুক্তফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরম্ভ করে। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ২১শে ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটি ও বর্ধমান হাউসকে বাংলা ভাষার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঘোষণা দিলে কেন্দ্রীয় সরকার ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। কেন্দ্রীয় সরকার সুযোগ খুঁজতে থাকে যেকোনো অজুহাতে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করতে। এমতাবস্থায় মে মাসে কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে কারা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় জনগণের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ এবং আদমজী জুট মিলে বাঙালি ও বিহারি শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক গোলযোগ হয়। ফলে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা করতে ব্যর্থ বলে দায়ী করতে থাকে। একই সময় 'নিউইয়র্ক টাইমস'-এ ফজলুল হকের এক সাক্ষাৎকার বিকৃত করে প্রকাশিত হয় যে, তিনি পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা চান।
এতে মুসলিম লীগ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী বলে ঘোষণা দেয়। অবশেষে কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের ৯২ (ক) ধারা বলে ১৯৫৪ সালের ৩০শে মে যুক্তফ্রন্ট সরকার বাতিল করে পূর্ব বাংলায় গভর্নরের শাসন জারি করে। এ শাসন ১৯৫৫ সালের ২রা জুন পর্যন্ত বহাল থাকে। মাত্র ৫৬ দিনের শাসনের পর যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার অবসান হয়। মূলত মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্র এবং যুক্তফ্রন্টের শরিক দলের মধ্যে কোন্দলের কারণে ঘন ঘন সরকার বদল হতে থাকে। মাত্র চার বছরে সাত মন্ত্রিসভার পতন হয়। কেন্দ্রীয় সরকার তিনবার গভর্নরের শাসন জারি করে। যুক্তফ্রন্টের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ও কেন্দ্রীয় সরকারের চক্রান্তের ফলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারেনি।
একক কাজ: ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনের ফলাফলের চিত্র বর্ণনা করো।
ভাষা আন্দোলন ও পরবর্তী রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

