- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- বাংলাদেশের পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণ
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
বাংলাদেশে গ্রাম ও শহরের পরিবারের ভূমিকা
বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরে পরিবারের ধরন ও ভূমিকায় পার্থক্য রয়েছে। একসময়ে গ্রামীণ সমাজে যৌথ পরিবারের সংখ্যাই বেশি ছিল। কিন্তু বর্তমানে শিল্পায়ন, নগরায়ণ, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দরিদ্রতা, ভোগবাদী মানসিকতাসহ নানা কারণে যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ের সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার ক্ষুদ্র ঋণদান কর্মসূচির বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণও পরিবারের এ পরিবর্তনে ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে গ্রাম ও শহরে একক পরিবারের সংখ্যাই বেশি। গ্রামে বর্ধিত পরিবার দেখা গেলেও শহরে এ ধরনের পরিবার নেই বললেই চলে। পিতৃপ্রধান ও পিতৃবাস পরিবার ব্যবস্থা শহর, গ্রামে উভয় স্থানেই দেখা যায়। তবে নয়াবাস পরিবার শহরে সর্বাধিক। একসময়ে এদেশের মুসলিম সমাজে বহুপত্নী পরিবারের সংখ্যা ছিল অধিক। এখন এ ধরনের পরিবারের সংখ্যা কমে গিয়েছে। গ্রাম ও শহর উভয়েই এখন একপত্নী পরিবারের সংখ্যাই বেশি। আমাদের দেশের গ্রামীণ ও শহুরে সমাজে পরিবারের ধরনের পরিবর্তনের সাথে সাথে এর ভূমিকারও পরিবর্তন ঘটেছে, যেমন-আমাদের দেশের শহরাঞ্চলে শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় গ্রামের সাধারণ নারী-পুরুষ কৃষি পেশা ছেড়ে শিল্প শ্রমিকে পরিণত হয়েছে। পরিবারের কর্মক্ষম ব্যক্তি শহরে চলে যাওয়ায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা আর্থিক নিরাপত্তাহীনতাসহ নানা সমস্যায় পতিত হচ্ছে। গ্রাম প্রধান আমাদের এদেশে এক সময়ে যৌথ কিংবা বর্ধিত পরিবারেই শিশু বড় হতো। তখন অল্প বয়স থেকেই পারিবারিক পেশার সাথে এসব শিশু জড়িত হতো। পরিবার এক্ষেত্রে শিশুর পেশা বেছে নেওয়ায় ভূমিকা রাখত। পরিবারের এ ভূমিকার পরিবর্তন হয়েছে। গ্রাম বা শহর সবখানেই শিশুর সুন্দর জীবন গঠন ও তাদের অধিকার বিষয়ে পিতা-মাতা এখন অনেক সচেতন। শিশুশ্রম যে নিষিদ্ধ একথা অনেক অভিভাবকই জানেন।
পরিবার শিশুর আনুষ্ঠানিক এবং নৈতিক শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষালয়। শিশুর নৈতিক শিক্ষার জন্য পিতামাতাকেই অধিক সচেতন হতে হয়। নৈতিকতার বীজ পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেই শিশুর আচরণে বিকশিত হয়। আবার পিতা-মাতার মাধ্যমেই শিশু শিক্ষা জগতে প্রবেশ করে থাকে। কিন্তু শিশুশিক্ষার ক্ষেত্রে পরিবারের এ ভূমিকা বর্তমানে প্রাক প্রাথমিক কিন্ডারগার্টেন কিংবা নার্সারি স্কুলগুলো গ্রহণ করছে। শহরে এ সুযোগ তুলনামূলকভাবে বেশি।
সন্তান জন্মদান ক্ষেত্রে গ্রামের চেয়ে শহরের পিতা-মাতা অধিক সচেতন। শহরের পিতা-মাতা দুইয়ের অধিক সন্তান নিতে চান না। গর্ভবতী মাকে সন্তান প্রসবে অদক্ষ দাইয়ের পরিবর্তে হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকে প্রেরণের ওপর গুরুত্ব দেন। পরিবারের ভূমিকার এ চিত্র গ্রাম ও শহরভেদে প্রায় একই। চিকিৎসা ক্ষেত্রে একসময় গ্রামের পরিবারগুলো কবিরাজ কিংবা হোমিও চিকিৎসকের ওপর নির্ভরশীল ছিল। এখন এসব পরিবার সরকারি হাসপাতাল কিংবা ক্লিনিকের চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করছে। চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে শহরের সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে আমরা প্রায় সকলেই জানি। পরিবারই ছিল একসময়ে ধর্ম শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সম্পর্কে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি ও অন্যান্য সদস্য বিভিন্নভাবে শিশুকে অবহিত করেন।
একসময়ে আমাদের দেশে আয়োজিত বিবাহ (settled or arranged marriage) প্রথার প্রচলন ছিল। বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের মতের প্রাধান্য দেওয়া হতো। বর্তমানে এ প্রথার অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। বিবাহ অনুষ্ঠানেও অনেক পরিবর্তন এসেছে। বিবাহের ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকার এ পরিবর্তন গ্রাম ও শহরভেদে পার্থক্য বিদ্যমান। বাল্যবিবাহ ও যৌতুক গ্রহণকে ঘৃণ্য প্রথা হিসেবে জানা সত্ত্বেও গ্রাম ও শহরে এ প্রথার প্রচলন এখনও লক্ষ করা যায়। তবে গ্রাম ও শহরের সচেতন পরিবারগুলো এখন বাল্যবিবাহ ও যৌতুক প্রথাকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করতে শিখেছে। এ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কেও সচেতন হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে গ্রামীণ ও শহর উভয়েরই পরিবার কাঠামোতে নারী অধিকারের প্রতি পুরুষের সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে। নারীরাও আজ নিজ অধিকার প্রতিষ্ঠায় অনেক সচেতন। তবে শিশু লালন পালন নারীর কাজ বলে মনে করা হয়। কিন্তু শিশু লালন পালনে পিতার অংশগ্রহণ বাড়ছে, নারী পরিবারের বাইরের কাজেও অংশ নিতে পারছে। বর্তমানে গ্রাম ও শহরে নয়াবাস পরিবার বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিবারের মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে এসব পরিবারে বৃদ্ধ পিতা-মাতা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
একসময় আমাদের দেশে গ্রাম কিংবা শহরে জন্মগ্রহণকারী বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, যেমন- বৃদ্ধি প্রতিবন্ধী, শ্রবণ প্রতিবন্ধী, দৃষ্টি প্রতিবন্ধী, শারীরিক প্রতিবন্ধী, বহুমুখী প্রতিবন্ধী এবং অটিস্টিক শিশুদের পরিবারের বোঝা ভাবা হতো। বর্তমানে পরিবারের এ মনোভাবে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। উপরের চিত্রটির দিকে লক্ষ কর, এসব শিশুর জন্য গড়ে ওঠা বিদ্যালয়ে তারা পড়ালেখা করছে এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে তারা গান, নাচ ও খেলাধুলা করছে। আবার কোনো কোনো শিশু কারিগরি বিদ্যা ও হাতের কাজে পারদর্শিতা অর্জন করছে। যার কারণে আমাদের দেশের অটিস্টিক শিশুরা আজ শিশু অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে শারীরিক ও মানসিক যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে সক্ষম হয়েছে। এসব শিশুর অধিকার বিষয়ে পরিবারের সদস্যগণ অধিক সচেতন। আমরাও বিশেষ চাহিদার ধরন ও মাত্রার ওপর নির্ভর করে বিদ্যালয়, পারিবারিক এবং সামাজিক পরিবেশ পরিবর্তন ও উপযোগী করে তুলব। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু যাতে যথাসম্ভব স্বাধীন ও নিরাপদভাবে নিজের কাজ নিজে করার সুযোগ পায় এমন পরিবেশের ব্যবস্থা করব।
বাংলাদেশের পরিবার কাঠামো ও সামাজিকীকরণ - অনন্যা প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

