- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- প্রাক ইসলামি আরব
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
প্রাচীন সভ্যতা
কোনো দেশ বা অঞ্চলে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর বহমান মন-মানসিকতা, চিন্তা-চেতনা, শিক্ষা-সংস্কৃতি, রীতি-নীতি জীবনবোধ, ভাবনা-বিলাস ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রার বহিঃপ্রকাশ সভ্যতার মাধ্যমে ঘটে থাকে। পরিবর্তনীয় মানব ইতিহাসে ধাপে ধাপে যে কৃষ্টি দানা বেঁধে উঠেছে তা-ই সভ্যতা নামে পরিচিত। আরনল্ড টয়েনবির ধারণা, মানব ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরে বিভিন্ন অঞ্চলে যে বিশেষ কৃষ্টির উদ্ভব ঘটেছিল সেটিই সভ্যতা। বস্তুত দীর্ঘকালের প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই আধুনিক সভ্যতার বিকাশ ঘটে।
মানবসভ্যতার ক্রমযাত্রা নিঃসন্দেহে মানুষ সৃষ্টির সেরা। বুদ্ধিবৃত্তিক জীব হিসেবে টিকে থাকার জন্য তাদের প্রয়াস ও প্রচেষ্টার সমন্বিত ফল সভ্যতা। তাই মানব সৃষ্টির সূচনা পর্ব থেকেই মানব সভ্যতার বিকাশ শুরু হয়। ঐতিহাসিকরা মানব সভ্যতার বিকাশের ধারাকে প্রাগৈতিহাসিক যুগ ও ঐতিহাসিক যুগে ভাগ করেছেন।
প্রাগৈতিহাসিক যুগ: আজ থেকে লাখ লাখ বছর আগে পৃথিবীতে মানুষের আবির্ভাব হয়েছিল। তখন মানুষ বাস করত এক আদিম সমাজে। মানুষের উদ্ভব থেকে সভ্যতা গড়ে উঠার পূর্ব পর্যন্ত দীর্ঘ এ সময়কে প্রাগৈতিহাসিক যুগ বলা হয়। এ যুগে মানুষ পাথরের তৈরি হাতিয়ার ব্যবহার করত বলে এটি প্রস্তর যুগ নামেও পরিচিত। প্রাগৈতিহাসিক যুগে লিপির অস্তিত্ব ছিল না; ছিল না যন্ত্র কলাকৌশলের ব্যবহার। সে কারণে ফসিল বা জীবাশ্ম এবং ব্যবহৃত জিনিসপত্রের উপর নির্ভর করে আমরা তাদের সম্পর্কে জানতে পাই। হাতিয়ারের ধরন, জীবিকা, জীবনধারা ইত্যাদি বিবেচনা করে প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানব সমাজকে পুরোপলীয় ও নবোপলীয় এ দু'ভাগে ভাগ করা হয়।
ঐতিহাসিক যুগ: কৃষি আবিষ্কারের পর মানুষ স্থায়ী বসতি স্থাপন করে এবং পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে তোলে সভ্যতা। সভ্যতার অপরূপ উপহার হচ্ছে লিখন কৌশল। ফলে এ সময় থেকে মানুষের ইতিহাস সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা যায়। মেসোপটেমিয়া, মিশরীয়, গ্রিক, রোমান ইত্যাদি সভ্যতায় মানুষ লিখতে জানত এবং লিখিত তথ্য সংরক্ষণ করার কৌশল আয়ত্ত করেছিল। ঐতিহাসিকদের মতে, খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে ঐতিহাসিক যুগের সূচনা হয় লিখন কৌশল pictogram বা চিত্রলিখনকে অবলম্বন করে। সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশের সাথে সাথে মানুষের ধ্যানধারণার পরিবর্তন আসে, কৃষিকাজ, বাগ-বাগিচা রচনা, জলসেচ, মৃৎপাত্র, যানবাহন, স্থাপত্যকলা, ভাস্কর্য, চিত্রশিল্প, শিক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চা হতে থাকে। পৃথিবীর প্রাচীনতম সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া যায় নীলনদ, দজলা-ফোরাত নদীর অববাহিকায়। নদীর তীরগুলোতেই প্রথম সভ্যতার বিকাশ হয়েছিল। এসব সভ্যতার মাঝে রয়েছে মিশরীয়, সুমেরীয়, হিব্রু, গ্রিক, রোমীয় ইত্যাদি সভ্যতা।
প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা (The Ancient Egyptian Civilization)
প্রায় চার হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশরে প্রথম সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয়। একটি উত্তর মিশর, অপরটি দক্ষিণ মিশরে। ৩৪০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে দুটি সাম্রাজ্য একত্রিত হয়। অতঃপর ৫২৫ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মিশরে বহুসাম্রাজ্যের উথানপতন ঘটে। উক্ত বৎসরে মিশর পারস্য কর্তৃক বিজিত হয়। এর পূর্বেও মিশর এ্যাসিরিয়া কর্তৃক বিজিত হয়েছিল। নীলনদের অববাহিকা মিশর ও এর সন্নিকটবর্তী এলাকায় উন্নত ও এক বৈভবময় সভ্যতার বিকাশ ঘটেছিল। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতাকে গ্রিক ঐতিহাসিক হিরোডোটাস 'নীলনদের দান' আখ্যা দিয়েছিলেন। এর কারণ নীলনদ ছিল এই সভ্যতার প্রাণ। দক্ষিণ-উত্তরে প্রবহমান এর বয়ে আনা পলিমাটি দিয়ে মিশরে কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠে। আজ থেকে আনুমানিক সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে সেখানে বিকশিত হয় মিশরীয় সভ্যতা। শুধু কৃষিই নয়, নীলনদকে কেন্দ্র করে মিশরীয় সভ্যতার পুরো অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছিল।
দেশ ও সমাজ: ৫০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মিশর উচ্চ (উত্তর) ও নিম্ন (দক্ষিণ) মিশরে বিভক্ত ছিল। দুটো অঞ্চল মিলে ৪০টি নোম বা নগর ছিল। এসময়কালের মিশরকে বলা হয় প্রাক-রাজবংশীয় যুগ। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০০ অব্দে ফারাও মেনসের নেতৃত্বে দুই অঞ্চল একত্র হয়। শুরু হয় প্রথম রাজবংশের শাসনকাল। ৩১টি রাজবংশ প্রায় ৩০০০ বছর প্রাচীন মিশরে রাজত্ব করেছে। এ রাষ্ট্রের প্রথম রাজধানী ছিল থিবিসে পরে তা মেমফিসে স্থানান্তরিত হয়।
প্রাচীন মিশরীয় সমাজে আমরা কতিপয় পেশাভিত্তিক শ্রেণির সাক্ষাৎ পাই। এঁরা রাজপরিবার, পুরোহিত, অভিজাত ব্যবসায়ী, লিপিকর শিল্পী এবং কৃষক-ভূমিদাস প্রভৃতি ভাগে বিভক্ত ছিল। মিশরীয় সমাজে সর্বোচ্চ স্তরে অবস্থান ছিল শাসক সম্প্রদায় ও রাজপরিবারের সদস্যবৃন্দ। পুরোহিতগণ ছিলেন বেশ প্রভাবশালী, লিপিকরদের সামাজিক মর্যাদা ভালো ছিল। তবে শ্রমজীবী, কৃষক ও ভূমিদাসদের অবস্থা ভালো ছিল না। এরা সমাজে সবচেয়ে নিম্নস্তরের বিবেচিত হতো।
ধর্মবিশ্বাস: প্রাচীন জাতিসমূহের মধ্যে মিশরীয়রা ধর্মীয় বোধে উজ্জীবিত হয়ে প্রথম ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রচলন শুরু করে। তাঁরা সূর্য, চাঁদ, বস্ত্র, ঝড়, বন্যা, বায়ু এবং পশুর মধ্যে বাঘ, সিংহ, সাপ, কুমির, হরিণ, বাজপাখি, বাঁদর এমনকি বিড়ালের পূজা করত। এর মধ্যে সূর্যদেবতা 'রে' ছিলেন প্রধান। ফারাও চতুর্থ আমেন হোটেপ বহু দেব-দেবীর পূজার পরিবর্তে, 'এটন' নামক এক দেবতার উপাসনা প্রবর্তন করেন। এভাবে একেশ্বরবাদী ধারণা চালু হয়।
মিশরীয়রা বিশ্বাস করত যে, মানুষের মধ্যে 'বা' অর্থাৎ আত্মা এবং 'কা' অর্থাৎ দ্বিতীয় সত্তা আছে। মৃত্যুর পর 'বা' ও 'কা' ফিরে এসে দেহকে পুনরুজ্জীবিত করবে। তাদের ধর্মবিশ্বাস মতে, পরজন্মে ওসিরিসের সামনে উপস্থিত হয়ে কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে। ধর্ম পালন করার জন্য মিশরে মন্দির নির্মাণের প্রথা প্রচলিত ছিল। মন্দিরের মধ্যে কারনাক মন্দির, রানি হাটশেপস্যুটের মন্দির ও আবু সিম্বিলির মন্দির প্রসিদ্ধ ছিল।
অর্থনৈতিক জীবন: মিশরীয় অর্থনৈতিক কাঠামো কৃষির উপর নির্ভর করেই গড়ে উঠেছিল। মিশরের উর্বর ভূমিতে পর্যাপ্ত ফসল জন্মাত। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩০০ অব্দে মিশরীয়রা লাঙলের ব্যবহার শুরু করলে কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। জলসেচ, জলাশয় সৃষ্টি এবং কৃষিক্ষেত্রে বিভিন্ন কলাকৌশল উদ্ভাবনে তারা অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। যব, তুলা, পেঁয়াজ ইত্যাদি ছিল তাদের অন্যতম কৃষিজাত পণ্য। মিশরীয় অর্থনীতির অন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল বাণিজ্য। ঈজিয়ান দ্বীপ, ক্রীট ফিনিশিয় প্যালেস্টাইন ও সিরিয়ার সাথে মিশরের বাণিজ্য প্রসারিত ছিল। ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে জনসাধারণের একটা বড় অংশের শিল্প-কলকারখানায় কর্মসংস্থান হয়। ধীরে ধীরে শিল্প প্রতিষ্ঠানের বিকাশ ঘটতে থাকে।
ফারাও ইখনাটনের সময় ফারাও পুরোহিতরা দুর্নীতিপরায়ণ হয়ে পড়েন। তারা এক-সপ্তমাংশ চাষাযোগ্য জমি, প্রচুর গরু ও ভেড়া লাভ করতেন। পুরোহিতরা দেশের শিল্পকারখানার উপর কর্তৃত্ব আরোপ করতে থাকেন। এভাবে ধীরে ধীরে মিশরীয় অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়ে।
শাসন ব্যবস্থা: পুরোহিতরা শাসন ব্যবস্থার শিরোমণি ছিলেন। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধিত্ব করতেন। রাজা নিজেকে মনে করতেন সূর্যদেবতা 'রে' (Re) এর পুত্র। মিশরের রাজাদের উপাধি ছিল ফারাও বা ফেরাউন। ফেরাউন শব্দটি ফারাও-এর আরেক রূপ। ফারাও শব্দটি "পের-অ" শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। অর্থ সুবৃহৎ বাসগৃহ বা রাজপরিবার হতে। রাজকীয় পরিবারের বাইরে ফারাওরা বিয়ে করতে পারতেন না। ধারণা করা হয় যে, তাতে তাদের ঐশ্বরিক রক্ত বিশুদ্ধ-থাকত এ মর্মে রাজপরিবার হতে রাজা নির্বাচিত হতেন। "পের অ" বা ফারাও বা ফেরাউন শব্দটির তত্ত্বকথা এখানেই নিহিত।
ফারাও এর প্রধান কর্মকর্তা ছিলেন পুরোহিত। নানা সুবিধা ও কর্তৃত্ব আয়ত্তে রাখার জন্য ফারাও নিজে প্রধান পুরোহিতের ভূমিকা পালন করতেন। অন্য কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী, হিসাবাধ্যক্ষ, একজন প্রধান স্থপতি, পরিদর্শক ও একজন বিচারপতি ছিলেন। অধিকন্তু ৪২ জন ভূস্বামী সরকার পদ্ধতিতে সংযুক্ত ছিলেন। গ্রিকদের অনুকরণে রাষ্ট্রের অধীনস্থ বিভিন্ন নগররাষ্ট্রে এসময় ফারাও কর্তৃক গভর্নর নিয়োজিত হতো।
সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি: প্রাচীন মিশরীয় শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল উন্নত। বর্ণভিত্তিক চিত্র লিপির উদ্ভাবন মিশরীয়দের গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এ ধারার লিখন পদ্ধতিতে এক একটি চিত্র অক্ষরের বিকল্প হিসেবে মনের ভাব প্রকাশ করত। এ লিখন পদ্ধতি হায়ারোগ্লিফিক (hieroglyphic) নামে পরিচিত। এ পদ্ধতিতে ২৪টি চিহ্ন ছিল এবং প্রতিটি চিহ্ন একটি বিশেষ অর্থ নির্দেশ করত। বিস্ময় উদ্রেককারী তাদের লিখন পদ্ধতি তিন ভাগে বিভক্ত ছিল। যথা: চিত্রভিত্তিক (pictographic), অক্ষরভিত্তিক (syllabic) এবং বর্ণভিত্তিক (alphabetic)। ব্যঞ্জনধ্বনি মুক্ত এক ধরনের লেখাকে হায়ারেটিক (hicratic) বলা হতো। পুরোহিতরা ধর্মীয় কাজে এ লিপি ব্যবহার করত। ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত লিপি চালু হওয়ার ফলে লিখন শিল্পে বিপ্লব সৃষ্টি হয়। ব্যঞ্জনধ্বনি যুক্ত লিপিটি ডেমোটিক (demotic) নামে অভিহিত হয়। শিক্ষা ব্যবস্থার মূল ভিত্তি ছিল চিত্র লিখন পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত লেখকগোষ্ঠী। পড়ালেখা ও অঙ্ক শাস্ত্র নিয়েই পূর্ণাঙ্গ পাঠক্রম তৈরি হতো।
লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের ফলে মিশরীয়দের মনোবিকাশের দ্বার উন্মোচিত হয়। আদেশনামা, ধর্মের বাণী প্রভৃতি লিখন প্রয়োগে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। পাথর বা কাঠের গায়ে প্রথমে লিপি খোদাই করা হতো। নলখাগড়া জাতীয় প্যাপিরাস নামীয় এক প্রকার উদ্ভিদ থেকে কাগজ তৈরি করার রীতি চালু হয়। নরম কার্বন আঠা আর পানি মিশিয়ে মিশরীয়রা কালো কালি তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। মিশরীয়গণ ডান হতে বাম দিকে লিখত। মিশরীয়গণ ২৭৭৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ৩৬৫ দিনের এক বর্ষপঞ্জি (Calender) প্রণয়নের কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছিল। মিশরীয় সভ্যতা ২৫০০ বৎসরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়েছিল। তাদের সাহিত্য মূলত ধর্ম ও দর্শনভিত্তিক ছিল। লিখন পদ্ধতির সূচনালগ্ন থেকে মিশরীয় সাহিত্যকর্ম সৃষ্টি হতে থাকে। মৃতদের পুস্তক 'বুক অব ডেড' (book of dead)-এর ইখনাটন কর্তৃক সূর্যদেবতার স্তুতি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য।
নবপোলীয় যুগে আবিষ্কৃত বর্ষপঞ্জির দুর্বলতা নির্ণয় করে আধুনিকীকরণের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসা মিশরীয় সভ্যতার আর একটি অবদান। ফি-বছর নীলনদের প্লাবন তথা কৃষির প্রয়োজনে প্রাকৃতিক অবস্থা নিরূপণের লক্ষ্যে এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। স্থাপত্য: মিশরীয় সভ্যতার অপরূপ উপহার তাদের স্থাপত্যকর্ম। বিস্ময়কর প্রকৌশল জ্ঞানের যথার্থ প্রয়োগ দেখা যায় তাদের স্মৃতিসৌধ ও ধর্মমন্দিরে। স্মৃতিসৌধের অনন্য উদাহরণ হলো পিরামিড। এটি প্রাচীন স্থাপত্যবিদ্যার বিস্ময়কর নিদর্শন।
পিরামিডের কারুকার্য, নির্মাণশৈলী ও বিশালত্ব অবাক হওয়ার মতো। খুকুর পিরামিড ১৩ একর জমির উপর অবস্থিত। পিরামিডের প্রত্যেক দিক ৭৫৫ ফুট লম্বা এর উচ্চতা ৪৮১ ফুট। এর নির্মাণ কাজে ২৩ লক্ষ পাথরের বড় বড় টুকরা বা খন্ড ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি পাথরের ওজন ছিল ২.৫ টন। সে মতে এই পিরামিডের ওজন ছিল ৩৮ লক্ষ ৮৩ হাজার টন। ব্রিস্টেড বলেন, "If we compare the technical inventory of the Egyptions with our own, it is evedent that before invention."
পিরামিডের ভিত্তি সমচতুর্ভুজ। এর উপরের দিকে চারপাশ ছোট হতে হতে ত্রিভুজ আকারের হয়ে এক বিন্দুতে মিশেছে। পিরামিড ছাড়া প্রাচীন মিশরের আরও যে দুটো জিনিস অমর কীর্তির স্বাক্ষর হিসেবে টিকে আছে, সেগুলো হলো স্ফিংকস ও মমি। বহু পাথরের গায়ে তা খোদাই করা। স্ফিংকস-এর দেহ সিংহের মতো আর মস্তক ফারাও এর মতো। এগুলো ছিল মর্যাদা ও শক্তির প্রতীক।
মিশরীয়রা প্রাচীনকালে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মৃতদেহ সংরক্ষণ করত। তারা বিশ্বাস করত মৃত্যুর পর মানুষ পুনরুজ্জীবিত হবে এবং এজন্য তাঁরা মরদেহকে সংরক্ষণ করত। বৈজ্ঞানিক উপায়ে সম্প্রক্ষিত এ মৃতদেহকে মমি বলা হতো। অনাদিকাল পর্যন্ত টিকে থাকার অভিনব পদ্ধতি আর কোথাও দেখা যায় না। মিশরীয় সভ্যতার এটি একটি উল্লেখযোগ্য দিক।
চিত্রকর্ম ও কারুশিল্প: মিশরীয় শিল্পকলা ইহুদি, গ্রিকজাতি এবং ইউরোপীয় জাতিসমূহকে প্রভাবিত করেছে। কেবল ধর্ম ও শিল্পকলা নয়, অন্যান্য বহুক্ষেত্রে মিশরীয় প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। চিত্রকর্ম ও কারুশিল্পে মিশরীয়দের অবদান অনস্বীকার্য। সমাধিসৌধ ও মন্দির সজ্জায় লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার মনোহর পরিবেশনা দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে। থিবিসে নির্মিত মন্দিরগাত্রে এ ধরনের অসংখ্য দেয়াল চিত্রও দৃষ্ট হয়। প্রযুক্তি জ্ঞানের প্রয়োগ পেশাগত দিক থেকে কারুশিল্পে মিশরীয়দের জুড়ি ছিল না। রঙিন মাটির পাত্র, সোনার অলঙ্কার, খোদাইকৃত আসবাবপত্র, হাতির দাঁতের তৈজসপত্র, বাদ্যযন্ত্র, খেলনা ও সূক্ষ্ম লিলেন কাপড় ইত্যাদি তৈরিতে দক্ষ ছিল।
জ্ঞান-বিজ্ঞান: প্রাচীন মিশরীয়দের মাঝে মুক্তবুদ্ধির চর্চা ছিল। তাদের সমুদয় চিন্তা-চেতনা ধর্মের পরিসীমায় আবদ্ধ ছিল না। দার্শনিক ও মুনি-ঋষিগণ অনন্ত বিশ্বচরাচরে বিশ্বাসী ছিলেন। নৈতিকতা বিষয়ক রচনা ম্যাক্সিম গ্রন্থে গভীর দার্শনিক তত্ত্বের পরিচয় মেলে। দর্শন ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মিশরীয়দের অবদান অতুলনীয়। অঙ্কশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিদ্যায় তাদের অগ্রগতি বিস্ময়কর। তারাই সর্বপ্রথম অঙ্ক ও জ্যামিতি শাস্ত্রের উদ্ভাবন করেন। যোগ-বিয়োগ, গুণ, ভাগ ও দশমিক প্রথার প্রবর্তন করেন।
জ্যামিতি শাস্ত্রে তারাই প্রথম কৌণিক, আয়তক্ষেত্র ও বড়ভুজের আবিষ্কার করেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও ছিল তাদের অপরিসীম জ্ঞান। সে সময় মিশরে চোখ, দাঁত, প্লীহা রোগের সুচিকিৎসা ছিল। নাড়ি ও হৃৎপিন্ডের স্পন্দন ও কার্যাবলি সম্বন্দ্বে তাদের জ্ঞান ছিল। জোয়ার-ভাটা, নদ-নদীর গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে তারা জানত।
মিশরীয় সভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ আধুনিক সভ্যতার মূলভিত্তি রচনা করে। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, আইন, শাসন ও সরকার পদ্ধতির উদ্ভাবন ও বিন্যাস সাধন যুগোপযোগী কর্মধারার সূচনা করেছিল। সেখান থেকে ধার করে প্রাচ্য-প্রতীচ্যের সকল সভ্যতার দিক নির্দেশনা লাভ করেছিল। এ প্রসঙ্গে প্রফেসর সেইসের মন্তব্যটি প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন, "We are the heirs of the civilize past and a goodly position of civilize that past was the creation of ancient Egypt." অর্থাৎ আমরা প্রাচীন সভ্যতার নিকট ঋণী এবং উক্ত প্রাচীন সভ্যতার অধিকাংশই ছিল মিশরীয়দের সৃষ্টি।
প্রাচীন সুমেরীয় সভ্যতা (The Ancient Sumerian Civilization)
সুমেরীয়, আক্কাদীয়, ব্যবিলনীয়, আমুরীয়, অ্যাসিরীয়, ক্যালদীয় ইত্যাদি অন্যতম। এর মধ্যে সুমেরীয় সভ্যতা সবচেয়ে প্রাচীন। তাই সুমেরীয়দের মেসোপটেমীয় সভ্যতার স্রষ্টা মনে করা হয়। গ্রিকদের দেওয়া নাম সুমের অর্থ কালো মানুষ। অসেমেটিক, সুমের জাতির নামানুসারে নাম হয় সুমেরীয় সভ্যতা। মেসোপটেমিয় অঞ্চলে সুমেরীয় সভ্যতার উন্মেষ ঘটে। নবোপলিয় যুগে খ্রিষ্টপূর্ব ৬০০০ অব্দে সুমেরীয়দের আবির্ভাব ঘটে।
দেশ ও সমাজ: সুসভ্য জাতির প্রতীক হলেও তারা কতিপয় কারণে সুসংহত রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেনি। সভ্যতাটি নগররাষ্ট্রভিত্তিক ছিল। ইরিদু, নিপুর, কিস, লাগাস, উর, আল উবাইদ প্রভৃতি প্রাচীরবেষ্টিত নগরকেন্দ্রিক এ সভ্যতায় একজন রাজা ও স্বনির্বাচিত দেবতা ছিল। নগররাষ্ট্রের প্রধানকে 'পতেজি' বলা হতো। রাষ্ট্রপ্রধান নিজেই সেনাধ্যক্ষ, কর্মাধ্যক্ষ ও সেচকার্যের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। সুমেরীয়ানরাই প্রথমে নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ধ্যান-ধারণার অধিকারী ছিল। সুমেরুদের সমাজে নানা বিভক্তি ছিল। সমাজের উচ্চাসনে অধিষ্ঠিত ছিল পুরোহিত, অভিজাত শ্রেণি, বণিক, শিল্পমালিক ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। মধ্য শ্রেণিভুক্ত ছিলেন চিকিৎসক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়িগণ, কৃষক, শ্রমিক ও ভূমিদাসগণ নিম্নশ্রেণিভুক্ত ছিল। নারীরা সমাজে উঁচু মর্যাদা ভোগ করত। পিতার সম্পত্তিতে পুত্র ও কন্যার সমান অংশ ছিল।
ধর্মবিশ্বাস: সুমেরীয়গণ নানা দেব-দেবীতে বিশ্বাসী ছিলেন। তারা প্রাকৃতিক শক্তিকে দেবতা জ্ঞানে পূজা করত। তাদের দেব-দেবী ছিল সূর্যদেবতা শামাস, চন্দ্র দেবতা নান্নান, বায়ু ও বৃষ্টির দেবতা এনলিল, উর্বরতার দেবী ইশতার, প্লেগ দেবতা নারগল ও পানির দেবতা এনকি উল্লেখযোগ্য। সুমেরীয়দের ধর্মমন্দিরকে 'জিগুরাত' বলা হতো। এরা পরকালে বিশ্বাস করত না। দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে মানুষ ও পশু বলি দিত। কফিন ছাড়াই মৃতদেহ বাসগৃহের নিচে সমাহিত করত।
শাসনব্যবস্থা: একটি গতিশীল ও নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে সুমেরীয় নগররাষ্ট্র (city states) পরিচালিত হতো। রাজতান্ত্রিক ধারায়। একটা চমৎকার সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল।
নগররাষ্ট্রগুলো স্বাধীনভাবে শাসিত হতো, যার প্রধানকে বলা হতো পাতেশী (putesi)। তিনি একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক বাহিনীর সবার্ধিনায়ক, প্রধান পুরোহিত। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য কিছুসংখ্যক বুদ্ধিদীপ্ত অভিজাত ও ভূস্বামী যুগলদের সমন্বয়ে কাউন্সিল গঠন করা হতো। এরা সম্ভবত আধুনিককালের স্বরাষ্ট্র ব্যবস্থার আদলে কার্যক্রম পরিচালনা করত। এদের মাঝে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য বজায় থাকলেও সুশৃঙ্খল জীবনাচারে সবাই আগ্রহী ছিল। সুমেরীয় সম্রাট ভুঙ্গীর আইন প্রণয়ন কার্যক্রম তার প্রমাণ বহন করে।
অর্থনৈতিক জীবন: সুমেরীয়দের অর্থনৈতিক কাঠামো ছিল সচ্ছল। কৃষি ছিল অর্থনীতির প্রধান উৎস আর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাণিজ্য। তারা খাল কেটে প্রথম সেচ ব্যবস্থার আবিষ্কার করে। ভোঁতা কৃষি যন্ত্রের বদলে ধাতুর লাঙল, কোদাল, কান্তে, নিড়ানির ব্যবহার করে উন্নত কৃষি সভ্যতা গড়ে তোলে। কৃষিতে উন্নত প্রযুক্তির প্রয়োগ কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব সাধিত হয়। ব্যবসায়-বাণিজ্যে সুমেরীয়রা বিশেষ সাফল্য অর্জন করেছিল।
সমুদ্র ও স্থলপথে তারা কাঠ, নীলকান্ত মণি, লাল পাথর ইত্যাদি আমদানি করত এবং রপ্তানি করত বয়নজাত দ্রব্য, যুদ্ধাস্ত প্রভৃতি। সিন্ধু, আফগানিস্তান, পারস্য, সিরিয়া, প্যালেস্টাইন, আনাতোলিয়া, ফিনিশিয়া, ক্রীট এবং মিশরের সাথে তাদের বাণিজ্য ছিল। সুমেরীয়রা আধুনিককালের মতো কিছু নিয়মকানুন ও আইন প্রবর্তন করে। তারা ব্যবসায় ক্ষেত্রে বিল, রশিদ নোট ও ঋণপত্রের ব্যবহার প্রচলন করে। পাশাপাশি দরপত্র ও সিলের ব্যবহার চালু করে।
সাহিত্য, শিল্প ও সংস্কৃতি: মানব সভ্যতার বিকাশে সুমেরীয়দের অবদান অসামান্য। তারা চিত্রলিপির মাধ্যমে লিখন পদ্ধতির প্রচলন করে এবং বিজ্ঞানে নতুন নতুন বিষয় আবিষ্কার করে। চিত্রলিপির মাধ্যমে তাদের লিখন পদ্ধতিকে কিউনিফর্ম বলা হয়। প্রথমে ২০০০ পরে ৬০০ ও আরও পরে ৩৫০টি চিহ্ন সংবলিত এ লিখন পদ্ধতি পরবর্তীতে ব্যবিলনীয়, অ্যাসিরীয় ও পারস্য সভ্যতায় অনুসৃত হয়। সুমেরীয়দের শ্রেষ্ঠ অবদান মহাকাব্য 'গিলগামেশ কাব্য'। এটি ১২টি বড় মাটির ফলকে লেখা। এতে উরুক নগর, রাষ্ট্রের রাজা গিলগামেশের বীরত্ব ও কৃতিত্ব বর্ণিত হয়েছে।
আইন প্রবর্তন: সুমেরীয় যুগে কিছু বিধিবদ্ধ আইন বা Code চালু ছিল। সুমেরীয় সভ্যতার অন্যতম অবস্থান বিধিবদ্ধ আইন প্রণয়ন করা। বদলা আইন অর্থাৎ "চোখের বদলে চোখ" "হাতের বদলে হাত" "দাঁতের বদলে দাঁত" "পায়ের বদলে পা" অপরাধী যে অপরাধ সংঘটিত করবে তাকে সে অপরাধের অনুরূপ শাস্তি ভোগ করতে হবে। অপরাধীকে ক্ষতিগ্রন্ত ব্যক্তি বিচারকের নিকট উপস্থিত করত। বিচারক বাদী বিবাদীর মধ্যে যথাসাধ্য মীমাংসা করে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন এবং অপরাধীকে শান্তিদান করতো। সুমেরীয় সমাজে সকল মানুষ সমান ছিলেন না বিদায় শাস্তি আভিজাত, সাধারণ এবং সার্ফদের ভিন্ন ভিন্ন ছিল।
জ্ঞান-বিজ্ঞান: প্রকৃত জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা শুরু হয় সুমেরীয়দের আমলে পানি দ্বারা চালিত জলঘড়ি, স্বর্ণঘড়ি এবং চন্দ্র পঞ্জিকার আবিষ্কার, গুণ-ভাগের পদ্ধতি, ওজন ও পরিমাপ প্রবর্তন ও প্রচলন বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতিতে অনন্য। ২৪ ঘণ্টায় ১ দিন, ৭দিনে ১ সপ্তাহ এবং ৬০ মিনিটে ১ ঘণ্টা তারাই নিরূপণ করেন। সুমেরীয় পুরোহিতরা সূর্য ও চন্দ্রের আপেক্ষিক অবস্থিতি নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। পাশাপাশি তারা গ্রহেরও সময় নির্দেশ করেন। ভেষজ চিকিৎসায় সুমেরীয়দের সাফল্য অসামান্য। ঔষধ পঞ্জিকা সংক্রান্ত চিকিৎসাবিষয়ক উপাত্ত তার প্রমাণ বহন করে। সুমেরীয়দের বিখ্যাত উদ্ভাবন হচ্ছে চাকা আবিষ্কার। চাকা আবিষ্কারের পর খুব দ্রুত মেসোপটেমীয় সভ্যতার অগ্রগতি সাধিত হয়। পাশাপাশি তা মানব সভ্যতার উন্নতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে।
স্থাপত্য ও ভাস্কর্য শিল্প: সুমেরীয়গণ ধাতব দ্রব্য, মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মাণে সুদক্ষ ছিল। মেয়েরা নানাবিধ শিল্পকর্মে সিদ্ধহস্ত ছিল। স্তরে স্তরে নির্মিত ধর্মমন্দির জিপুরাত সুমেরীয় স্থাপত্য শিল্পের এক অপূর্ব নিদর্শন।
চিত্রকর্ম ও কারুশিল্প: সাধারণত ধাতব দ্রব্য, খোদাই মূর্তি এবং ভাস্কর্যে সুমেরীয় চিত্রকলার প্রকাশ ঘটে। তাদের বাস্তবধর্মী চিত্রের প্রকাশ ঘটে যুদ্ধাস্ত্র, পানপাত্র, অলঙ্কার এবং মানুষ বা জন্তুর প্রকৃতিতে।
হিব্রু সভ্যতা (The Hebrew Civilization)
মরুভূমিকে ঘিরে সৃষ্ট হিব্রু সম্প্রদায় সেমিটিক জাতিরই একটি শাখা প্রচলিত একটি মতে, খাবিরু বা হাবিবু নাম থেকে হিব্রু নামকরণ হয়েছে। অপর মতে, ইভার থেকে শব্দটি এসেছে। এগুলোর অর্থ নিম্নবংশীয় বা যাযাবর ভ্রাম্যমাণ গোষ্ঠী। যাহোক, তদানীন্তন সভ্যজাতিগুলোর মধ্যে হিব্রুগণ একটি বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে। দেশ ও সমাজ: শুরুতে হিব্রুরা প্যালেস্টাইন ও সিরিয়ায় প্রতিষ্ঠা লাভকরলেও এদের আদিপুরুষ ইব্রাহিমের নেতৃত্বে মেসোপটেমিয়ায় বসতি স্থাপন করেন। পরে তাঁর পুত্র (ইয়াকুব আ.)-এর নেতৃত্ব সংঘটিত হয়। ইয়াকুবের অপর নাম ইসরাইল। ইয়াকুবের অব্যবহিত পরে খ্রিষ্টপূর্ব ১৩৩০-৫০ অব্দে হযরত মুসা (আ.) হিব্রুদের পুনরায় সংঘবদ্ধ করেন। তিনি দাসত্বের শৃঙ্খল হতে মুক্ত করে প্যালেস্টাইনে উন্নত সভ্যতার দ্বার উন্মোচন করেন। প্যালেস্টাইন ব্যবসায়-বাণিজ্যের পাশপাশি অর্থনীতিতে কৃষি ও পশুপালনে প্রাধান্য পায়। ফলে সমাজ নগরবাসী কৃষক ও পশুপালক শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর একটি অংশ ছিল পুরোপুরি যাযাবর বা বেদুইন। এরা পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় মরুভূমির প্রান্তিক ভূখণ্ডে বসবাস করত। হিব্রু শাসকদের মধ্যে ডেভিড (দাউদ আ.) ও তাঁর পুত্র সলোমান (সোলায়মান আ.) জেরুজালেম অধিকার করে এক বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর রাজত্বকালে রাষ্ট্রের সমৃদ্ধি ও গৌরব চরমে ওঠে। সলোমানের আমলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিপুলভাবে প্রসার লাভ করে। আরব ও আফ্রিকার সাগর উপকূলে যে বাণিজ্য সম্ভারের আদান-প্রদান চলত তার মধ্যে লৌহ, তামা, হাতির দাঁত, সোনা ও মণিমুক্তা ছিল প্রধান। তার সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি তার এক সৌধ। যার নাম তারই নামানুসারে বলা হয় 'Solomans Temple', হিব্রুদের সময় দাস প্রথার ব্যাপক প্রচলন ঘটে। রাজা ও মন্ত্রীদের জমিতে দলবদ্ধভাবে দাসদের নিয়ে অত্যাচারের মাধ্যমে কাজ করানো হতো।
দাউদ (আ.)-এর আমলে দাসশ্রমের অবসান ঘটে। তাঁর নেতৃত্বে হিব্রুদের জাতীয়তাবাদের ও জাতীয় ঐক্যের সূচনা হয়। তিনি বিভিন্ন জাতির লোকদের ঐক্যবদ্ধ করে সুশৃঙ্খল ও অংশীদারিত্বমূলক সমাজ বিনির্মাণে সবিশেষ ভূমিকা রাখেন। ফলে ন্যায় ভিত্তিক সুসংবদ্ধ সমাজ গড়ে উঠে।
ধর্মবিশ্বাস: মানব সভ্যতার ইতিহাসে হিব্রু জাতির বিশেষ অবদান হলো তাদের ধর্মীয় চিন্তার উন্নতি। নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে হিব্রু ধর্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠা লাভ করে। তাদের মাঝে একেশ্বরবাদী ভাবধারা প্রতিষ্ঠার ফলে অন্ধকার যুগেও আলোক বর্তিকা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে। হিব্রুধর্ম নৈতিক মানদন্ডকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব প্রদান করে। তারা 'জেহেবাকে' একেশ্বর আইন প্রদানকারী ও নৈতিক আদর্শের প্রতীক জ্ঞান করত। তারা বিশ্বাস করে যে, ভবিষ্যতে একজন মহামানবের আবির্ভাব ঘটবে। তিনি সমগ্র মানবজাতির ত্রাণসাধন করবেন। ক্রমশ তারা শেষ বিচারের দিন এবং পরলোকে বিশ্বাসী হয়। শেষ বিচারের দিন ও একেশ্বরবাদিতার সরল রেখা অনুকরণ করে খ্রিষ্টান ও ইসলাম ধর্মের আবির্ভাব ঘটে। স্টুয়ার্ড ইস্টন বলেন, "Both Christianity and Islam have adopied a considerable portion of the Hebrew religious in sights as theiar own." হিব্রুদের ধর্মীয় গ্রন্থের নাম Old Testament যা তাওরাত নামে পরিচিত।
অর্থনৈতিক জীবন: হিব্রুদের অর্থনীতি প্রাকৃতিক সম্পদ, পশুপালন বা গোচারণের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। প্যালেস্টাইনে পানি সেচ ব্যবস্থা অত্যন্ত জটিল ও সমস্যাসংকুল ছিল। কারণ দেশটির অধিকাংশ অঞ্চল পর্বতময় এবং সেখানে উপরিস্থিত পানির অভাব ছিল। কিন্তু বৃষ্টির পানি ব্যবহারের দ্বারা কোনো কোনো এলাকায় গম ও যব এবং অন্যান্য খাদ্যশস্য ও বৃক্ষলতার চাষাবাদ হতো। উঁচু পার্বত্য এলাকায় ব্যাপক ভিত্তিতে ভেড়া ও ছাগল চরানো হতো। ব্যবসায়-বাণিজ্য, কৃষি এবং পশু পালনের যথেষ্ট উন্নতি ঘটে। হিব্রু অর্থ ব্যবস্থার উন্নতিতে করব্যবস্থার প্রবর্তন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। সেখানে ধনী অঞ্চলগুলোকে বেশি এবং দরিদ্র অঞ্চলগুলোকে কম কর দিতে হতো।
শাসন ব্যবস্থা: আইন-শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনাচারে অভ্যস্ত হিব্রুরা আইনের দ্বারা সুনিয়ন্ত্রিত হতো। ইতিহাস খ্যাত হাম্বুরাবি আইন অপেক্ষা তাদের আইন উন্নত ছিল। দাসমুক্তি, নিঃস্বদের স্বার্থরক্ষা, ভোজবাজির নিন্দা ও সুদপ্রথা রহিতকরণে উৎসাহ প্রদান তাদের আইনের প্রতিপাদ্য ছিল। হিব্রু আইনের ধারাবাহিক সংগ্রহ তালমুদ একটি উল্লেখযোগ্য সাহিত্য নিদর্শন।
সাহিত্য ও দর্শন: সাহিত্য ও দর্শনে হিব্রুদের অবদান উল্লেখযোগ্য। ধর্মভিত্তিক সাহিত্যদর্শনের সার হিব্রধর্মগ্রন্থ শুল্ড টেস্টামেন্টে নিহিত ছিল। এছাড়া ধর্ম, বীরত্বগাথা বহু প্রেম ইত্যাদি ছিল হিব্রু সাহিত্যের বিষয়বস্তু। তাঁদের সাহিত্যের অনন্য নিদর্শন হলো 'Book of Job' বা জবের পুস্তক। পুস্তকটিতে অত্যন্ত নাটকীয়ভাবে মানুষ, শয়তান ও ঈশ্বরের চরিত্র এবং ভূমিকা বিধৃত হয়েছে। পরবর্তী পুস্তক ধর্মসঙ্গীত (The Book of Psalms) অত্যন্ত সুধাময় সাহিত্যিক নিদর্শন। গ্রিকদের পূর্বেই হিব্রুরাই বিস্ময়কর দর্শনের জন্ম দিতে পেরেছিল। এ দর্শন বিশ্বব্রহ্মাণ্ড, মানুষ ও জীবন সম্পর্কে নতুন ধারণার অবতারণা করে। বিশ্বব্রহ্মান্ডের গঠন প্রকৌশল, অদৃষ্টবাদ, সন্দেহবাদ, দুঃখবাদ ও পরিমার্জনা প্রভৃতি তাদের দর্শনের বিবেচিত বিষয় ছিল।
চিত্রকর্ম ও কারুশিল্প: চিত্রশোভিত সীল হিব্রু সভ্যতার চিত্রকর্মের অনন্য উদাহরণ। সুমেরীয় ও হিটাইট প্রভাবে খোদিত এসকল শিল্পকর্ম হিব্রু সভ্যতাকে বিশিষ্টতা দান করেছে।
স্থাপত্য ও শিল্পকলা। স্থাপত্য ও শিল্পকলায় হিব্রু সভ্যতার অবদান অনস্বীকার্য। স্থাপত্য ও শিল্পকলা কীর্তির অসংখ্য নিদর্শন হিব্রুরা রেখে গেছেন। জেরুজালেম নগরীর সুরম্য প্রাসাদ, অট্টালিকা, রাজপথ তৎকালীন বিশ্বের বিস্ময় ছিল। একটি গুহার অভ্যন্তরে পঞ্চাশটি মৃৎপাত্রে চামড়ার উপর হিব্রু ভাষায় লিখিত ডেড সী স্কুল বা মরুসাগরের দস্তাবেজ হিব্রু সভ্যতার শিল্পকর্মের গভীরতা ও বৈশিষ্ট্যকেই নির্দেশ করে। আধুনিক সভ্যতার সৃষ্টিতে হিবু সভ্যতার প্রভাব বিদ্যমান। তাদের সরকার ব্যবস্থা, আইনের সার্বভৌমত্ব এবং ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও ব্যক্তির অধিকারের স্বীকৃতি আধুনিক গণতন্ত্র বিকাশে উৎসাহ যুগিয়েছে।
গ্রিক সভ্যতা (The Greek Civilization)
ইন্দো-ইউরোপীয় গোষ্ঠীভুক্তরা ছিল গ্রিকদের আদি পুরুষ। মূলত এরা আর্যগোষ্ঠী সম্ভূত। এদের আদি নিবাস দানিউব নদীর তীরে অবস্থিত তৃণভূমি অঞ্চল থেকে ইজিয়ান পর্যন্ত। খ্রিষ্টপূর্ব ১১৫০-১০০০ অব্দে মূল গ্রিস ডোরীয়দের অধিকারে আসে। ডোরীয়দের সংমিশ্রণে ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী জাতির অভ্যুদয় হয়। তারা সে অঞ্চলে এক সভ্যতা গড়ে তোলে। এ সভ্যতাই গ্রিক সভ্যতা। গ্রিকগণ মূলত দুভাগে বিভক্ত। যথা: (১) লেলেনিক (২) হেলেনিস্টিক।
হেলেনিকগ্রিক সভ্যতার আদিপর্ব এর মূলকেন্দ্র ছিল গ্রিক উপদ্বীপ। হেলেনিক সভ্যতার প্রধান কেন্দ্র ছিল এথেন্স। গ্রিক সংস্কৃতির মধ্যে অ-গ্রিক উপাদান সংমিশ্রিত হলে তখনই উদ্ভব হয় হেলেনিস্টিক যুগ। খ্রিষ্টপূর্ব ১৪৬ এ হেলেনিস্টিক যুগের সূত্রপাত হয়।
বিশ্বসভ্যতার উন্মেষ ও বিকাশ সাধনে গ্রিকদের অবদান ছিল অসামান্য। ইতিহাসের জনক হেরোডোটাস, জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস, এরিস্টটল, প্লেটো, নন্দিত বিজ্ঞানী পিথাগোরাস, আর্কিমিডিস, ইউক্লিড, হিপোক্রেটস গ্রিসে জন্মগ্রহণ করে গ্রিসকে ধন্য করেছেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সংস্কৃতির ব্যাপক অনুধাবন ও চর্চা করে নতুন সভ্যতার উদ্ঘাটন করেছেন। বিশ্বব্যাপী এর অসামান্য প্রভাবের ফলে জ্ঞানের সকল শাখা পরিপুষ্টি লাভ করেছে। বিশ্বখ্যাত করি শেলী যথার্থই বলেন, "আমরা সবাই গ্রিক, আমাদের আইন, আমাদের সাহিত্য, আমাদের কলা- এগুলোর (সকলের) মূলে রয়েছে গ্রিস।"
দেশ ও সমাজ: প্রাচীন গ্রিসে কোনো একক রাষ্ট্র ছিল না। প্রতিরক্ষার প্রয়োজনে দুর্গ দ্বারা সুরক্ষিত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগররাষ্ট্রের সমন্বয়ই ছিল গ্রিক রাষ্ট্র। বস্তুত সুরক্ষিত অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে নগর এবং নগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে থাকে সরকার ব্যবস্থা। এভাবেই গ্রিক নগররাষ্ট্রের উত্থান ও বিকাশ হতে থাকে। গ্রিসের মূল ভূখণ্ডে এথেন্স, থিবস, মেগরা, পেলোগনেসাস অঞ্চলে স্পার্টা এবং কোরিন্থ, এশিয়া মাইনরের তীরে মিলেটাস প্রভৃতি। জনসংখ্যাও সীমারেখার দিক থেকে নগররাষ্ট্রসমূহ ছিল বিভিন্ন প্রকৃতির।
নগররাষ্ট্রসমূহের মধ্যে বিখ্যাত ছিল এথেন্স ও স্পার্টা। খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬০ অব্দে পেরিক্লিসের শাসনামলে এথেন্স গৌরবের শিখরে আরোহণ করে। খ্রিষ্টপূর্ব ৮০০ অব্দ থেকে হোমারিক যুগে গোত্রীয় লোকেরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিধিবদ্ধ সমাজ গড়ে তোলে। এরা অভিজাত, মধ্যবিত্ত এবং কৃষক, কারিগর ও বণিকশ্রেণিতে বিভক্ত ছিল।
শাসনব্যবস্থা: প্রাচীন মিশরীয় পদ্ধতির অনুকরণে নগররাষ্ট্রসমূহের সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। একটি বিধিবদ্ধ কাউন্সিলের মাধ্যমে দুজন রাজা রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। রাজারা সামরিক, ধর্মীয় ও আইনগত বিষয়ের নেতৃত্ব দিতেন। প্রশাসনিক কার্যক্রম, সভা আহ্বান, ফৌজদারি আদালতের কার্যাবলিও পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান করতেন।
অর্থনৈতিক জীবন: খ্রিষ্টপূর্ব ৫৯৪ অব্দে সোলোন নামে জনৈক সংস্কারক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ব্যাপক পরিবর্তন সাধন করেন। তিনি সব কৃষকের ঋণ মওকুফ ও ভূমি রাজস্ব সংস্কার করে অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। ভূমির সাথে সম্পৃক্ত শ্রমিকশ্রেণি 'হেলট'রাই ছিল কৃষি উৎপাদনের মূল শ্রমশক্তি। তাদের শ্রমশক্তিই গ্রিসের অর্থনৈতিক জীবনের আধার ছিল। সীমিত পরিসরে অর্থকাঠামোর সহায়ক শক্তি ছিল বাণিজ্য ও শিল্প। বাণিজ্য ও শিল্প পেরিওয়েসি শ্রেণির নিয়ন্ত্রণে ছিল।
ধর্মবিশ্বাস: ধর্ম ও দর্শনে গ্রিকরা অগ্রগামী ছিল। প্রাচীন গ্রিকদের মধ্যে দেব-দেবীর পূজার প্রচলন ছিল। গ্রিকদের বারোটি দেব-দেবী ছিল, জিউস (Zws) ছিল দেবতাদের রাজা; এ্যাপোলো (Apollo) ছিল সূর্য দেবতা, যাকে আলো, সংগীত, সৌন্দর্য ও ভবিষ্যদ্বাণীর দেবতা বলা হতো। পোসিডন (Poseidon) সাগরের দেবতা ছিল। এথেনা (Athena) ছিল জ্ঞানের দেবী। বারোজন দেবতার মধ্যে এই চারজন ছিল শ্রেষ্ঠ। দেবতাগণ মহিমান্বিত ব্যক্তিত্ব, পার্থিব ও লোভী বিবেচিত ছিল। ধর্মীয় আরাধনা হিসেবে ধর্ম শোভাযাত্রা, প্রার্থনা, বিভিন্ন দ্রব্য উৎসর্গ, ধর্ম ভোজের ব্যবস্থা প্রভৃতি অন্তর্ভুক্ত ছিল। এভাবে দেবতাগণ গ্রিকদের সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল। অলিম্পিক খেলাধুলাকেও ধর্মীয় কর্মকান্ডের অপরিহার্য অঙ্গ জ্ঞান করা হতো।
দর্শন: দর্শনের ক্ষেত্রে গ্রিকদের অবদান ছিল অসামান্য। বিশ্বখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস, এরিস্টটল ও প্লেটো প্রাচীন গ্রিসেই জন্ম লাভ করেন। এঁরা বিশ্বমানব, বিশ্ব মানবাত্মা, দেবতাদের একাত্মতা, মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবন সম্পর্কে অতীব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও তত্ত্ব প্রদান করে গেছেন। বিজ্ঞান ও নীতিশাস্ত্রের অগ্রগতি সাধনে তাদের সবিশেষ অবদান রয়েছে।
স্থাপত্য: মন্দির ও বাসগৃহকে উপজীব্য করে নগররাষ্ট্রগুলো সুশোভিত হয়ে উঠেছিল। কাঠ ও রৌদে পোড়ানো ইট দ্বারা ডোরীয়, আয়োনীয় ও করিন্থীয় পদ্ধতিতে জমকালো মন্দির ও প্রাসাদ নির্মাণ করত। মন্দির ও প্রাসাদ ছাড়া লাইব্রেরি, জাদুঘর, আলোক গৃহ ও থিয়েটার গৃহ নির্মাণ করেছিল। মেঝেতে মোজাইক ও দেয়ালচিত্র অঙ্কনের মাধ্যমে স্থাপত্যকর্মকে সুষমামন্ডিত করে তুলত।
চিত্রকলা ও ভাস্কর্য: শিল্পকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য ও চারু-কারু কর্মে গ্রিকগণ অপূর্ব শিল্প নৈপুণ্য ও দক্ষতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। গ্রিক শিল্পকলা আর্কেয়িক, হেলেনিক শিল্পকলা গ্রহণ করেছিল। প্রাচীন গ্রিকগণ বাঁশি বাজাতে জানতেন এবং বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্রের প্রচলন ছিল। পিথাগোরাস বিজ্ঞানসম্মতভাবে গানের সুর-লয়-তাল সৃষ্টিতে অবদান রাখেন। চিত্রকলা ও ভাস্কর্য শিল্পেও প্রাচীন গ্রিক সভ্যতা অমূল্য অবদান রেখেছিল। চিত্র শিল্পীরা কলসে বিভিন্ন জীবজন্তু ও চিত্তাকর্ষক ছবি অঙ্কন করত। আলেকজান্ডারের সময় চিত্রশিল্পী অ্যাপেলেস চিত্রাঙ্কনের জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। চিত্র ছাড়াও গ্রিসের শিল্পীরা ভাস্কর্য শিল্পেও উৎকর্ষ সাধন করেছিলেন। তারা পাথর খোদাই করে মানুষ, শকট, ঘোড়া প্রভৃতির অবিকল প্রতিকৃতি তৈরিতে সিদ্ধহস্ত ছিল।
ইতিহাস ও সাহিত্যের জগৎকে পুরিপুষ্টি সাধনে গ্রিকদের অবদান বিস্ময়কর। কিছু অক্ষর সংযোজন ও বিয়োজন করে গ্রিক সাহিত্যিকগণ ফিনিসীয়দের অক্ষরসমূহ গ্রহণ করেছিল। বিখ্যাত সাহিত্যিক হোমার সে যুগে 'ইলিয়ড' ও 'ওডিসি' নামক মহাকাব্য রচনা করে অমরত্ব লাভ করেন। গীতিকাব্য ও নাটক রচনার ক্ষেত্রে গ্রিক সাহিত্যিকদের জুড়ি মেলা ভার ছিল।
ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রেও গ্রিকগণ খ্যাতি অর্জন করে। ইতিহাসের জনক 'হিরোডোটাস ও ইতিহাসবেত্তা থুকিডাইডিস ইতিহাস রচনায় নতুন মাত্রা সংযোজন করেন।
জ্ঞান-বিজ্ঞান: বিজ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রে গ্রিক পণ্ডিতদের উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে গ্রিক দর্শনের বিকাশের মধ্যদিয়ে যে যুক্তিনির্ভর বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটেছিল, বিজ্ঞানের উন্নয়নে তার ভূমিকা মুখ্য ছিল। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ, পৃথিবীর জন্ম রহস্যের উদ্ঘাটন, সূর্যগ্রহণ ইত্যাদি ক্ষেত্রে খালেস প্রমুখ বিজ্ঞানীদের অবদান রয়েছে। গ্রিক গণিতবিদ পিথাগোরাস বিশ্ববিখ্যাত গণিতজ্ঞ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। জ্যামিতির উন্নয়নে তার অবদান অনস্বীকার্য। তিনিই গাণিতিকভাবে প্রমাণ করেছেন যে, পৃথিবী বৃত্তাকার। গ্রিক ভূগোলবিদ এরাসটোফেন পৃথিবীর পরিধি ও দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করেন। গ্রিক বিজ্ঞানী এনাক্সোগোরাস প্রথম ধারণা দেন যে, সূর্য হচ্ছে উত্তপ্ত ও পাথরের গলিত পিন্ড এবং চন্দ্র সূর্যের আলোতেই আলোকিত।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও হেলেনীয় যুগে যথেষ্ট অগ্রগতি সাধিত হয়েছিল। হিপোক্রাটস্ ছিলেন এ যুগের বিখ্যাত চিকিৎসাবিজ্ঞানী। তিনি শরীরবিদ্যার উপর গবেষণা করে রোগের প্রকৃতি নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। চিকিৎসাবিদ হিরোফিলিয়াস শরীরের ব্যবচ্ছেদের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।
প্রাচীন গ্রিস সভ্যতার নিকট আধুনিক বিশ্ব বিভিন্নভাবে ঋণী। ভাষা-সাহিত্য, দর্শন-ইতিহাস, বিজ্ঞানের প্রতিটি শাখা তাদের করস্পর্শে সমৃদ্ধ হয়েছে। গ্রিক পন্ডিতদের প্রভাব বিশ্বের সকল দেশ ও জাতির নিকট অনুকরণীয় হয়ে থাকবে।
রোমীয় সভ্যতা (The Roman Civilization)
রোমক সভ্যতা নামে বহুলভাবে বিদিত। আর এই সভ্যতার উন্মেষ ঘটে গ্রিক সভ্যতার গৌরব বিবর্ণ হওয়ার বহু পূর্বে। ইটালির টাইবার নদীর তীরে ব্যাপকভাবে বিকশিত হয়ে সমস্ত বিশ্বে এর প্রভাবচ্ছটা বিকিরিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-সাহিত্য, স্থাপত্যকলা প্রভৃতি ক্ষেত্রে তাদের অবিস্মরণীয় অবদান রয়েছে।
দেশ ও সমাজ: ৭৫৩-৫১০ খ্রিষ্টপূর্ব যুগে রোমে রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজতান্ত্রিক সাম্রাজ্যের পট পরিবর্তনের পর রোমে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। নানা উত্থান-পতনের এক পর্যায়ে খ্রিষ্টপূর্ব ৪৬ অব্দে রাজা জুলিয়াস সিজর ক্ষমতা গ্রহণ করে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একজন প্রতিভাবান শাসক ছিলেন। রাজনীতিবিদ, বাগ্মী ও আইন প্রণেতা হিসেবে তার সুখ্যাতি ছিল। জুলিয়াস সিজার নিহত হওয়ার পর অগাস্টাস সিজার ক্ষমতায় আসেন। তিনি বিখ্যাত অগাস্টাস যুগের সূচনা করেন। ৩১ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রথম রোমান সম্রাট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পর অগাস্টাস সিজার নিজকে রোমান ধর্ম ও সামরিক ক্ষেত্রেরও প্রধান হিসেবে ঘোষণা দেন। যুদ্ধ ও বিপ্লবে বিধ্বস্ত রোমের সমাজজীবন ভালো ছিল না। 'অধিকাংশ রোমবাসীই ছিল অশিক্ষিত। যুদ্ধ ও কৃষিকাজ ছিল প্রধান জীবিকা। কারিগরি শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসার তেমন ব্যান্ড ছিল না। তবে স্টোরিক দর্শনের প্রভাবে মুক্ত শ্রম বাজার সৃষ্টি হয়। ফলে দাসত্ব প্রথার অবসান ঘটতে থাকে। মুক্ত মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি হয়। এরা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায় গড়ে তোলে। অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে সমাজে অস্থিরতা ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটে। সমকামিতা সমাজে একটা সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়। সমাজে উৎপীড়ন ও অপরাধের প্রচণ্ডতা বৃদ্ধি পায়।
ধর্মবিশ্বাস: সাম্রাজ্যিক রোমে দেব-দেবীর প্রচলন ছিল। রোম সম্রাটকে ঈশ্বরতুল্য পূজাও করত। অগাস্টাসের রাজত্বকালে যিশুখ্রিষ্টের জন্মগ্রহণের ফলে পৃথিবীতে নতুন ধর্মমতের সূচনা হয়। ভালোবাসা, ক্ষমা ও শান্তির বাণী বহনকারী মাত্র ৩০ বছর বয়সে যিশুর প্রচেষ্টায় খ্রিষ্টধর্মের ব্যাপক বিস্তার ঘটে। সম্রাট কনস্টানটাইনের আমলে রোমে খ্রিষ্টধর্ম রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা লাভ করে। ফলে এ নতুন ধর্মের অনুকূলে রোমান সাম্রাজ্যে প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন সাধিত হয়।
অর্থনৈতিক জীবন: রোমের অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নত ছিল। সুউচ্চ হর্মরাজি, দিগন্ত বিস্তৃত শস্য শ্যামলাময় মাঠ জনসাধারণের স্বাচ্ছন্দ্যের প্রতীক বিবেচনা করা হয়। কৃষি ও শিল্প ছিল রোমের মূল অর্থনৈতিক উৎস। প্রচুর খাদ্যশস্য ও সবজি উৎপাদিত। হতো। রাসায়নিক সারের ব্যবহার ও হাঁস-মুরগির খামার গড়ে উঠেছিল। রোমান সাম্রাজ্যে জনসাধারণ প্রচুর শিল্প-কারখানা পরিচালনা করত। আসবাবপত্র, যুদ্ধাস্ত্র এবং ব্রোঞ্জ ও লৌহজাত দ্রব্য রোমের কারখানাগুলোতে তৈরি হতো। ক্ষুদ্র শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে পশমি বস্তুবয়ন ও মৃৎপাত্র প্রস্তুত করা হতো। রোম সভ্যতার জনসাধারণ ভারত ও চীনের মতো দূরবর্তী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। ভারত থেকে তারা মসলা, দামি পাথর, চন্দন কাঠ প্রভৃতি আমদানি করত। চীন থেকে রোমানরা রেশমি আমদানি করত।
রোমের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে গিল্ডের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের কারিগর, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীগণ একত্রিতভাবে যে সংগঠন করে একে গিন্ড বলা হতো। রোম সরকার কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যে উৎসাহ প্রদান করত। রাস্তাঘাটের উন্নতি সাধন করে সম্রাট অগাস্টাস সিজার বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথ সুগম করেছিলেন।
স্থাপত্য ও ভাস্কর্য: রোমের বিশাল ও জমকালো ইমারতগুলো রোমীয় সাম্রাজ্যের শক্তি ও প্রাচুর্যের বহিঃপ্রকাশরূপে দন্ডায়মান। রোমে স্থাপত্যকর্মে কংক্রিটের ব্যবহার ইমারত নির্মাণে বিপ্লব সাধিত হয়। কংক্রিটে শক্তভাবে পাথর জোড়া লাগাত। ফলে বিলনি ও গম্বুজ নির্মাণ সম্ভব হয়েছিল। উল্লিখিত প্রযুক্তি ব্যবহারের দ্বারা সুন্দর সুন্দর গির্জা, থিয়েটার, স্নানাগার, গৃহ প্রভৃতি নির্মাণ করে স্থাপত্য শিল্পে তাদের নিপুণতা প্রদর্শন করেছে। ৮০ খ্রিস্টাব্দে রোমান সম্রাট টিটাস কর্তৃক নির্মিত কলোসিয়াম নাট্যশালা হয়েছিল, সেখানে একসঙ্গে ৫৬০০ জন দর্শক বসতে পারত। স্থলভাগের দৃশ্য, গির্জার দেয়াল চিত্রায়নে, বাইবেলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিকরণে এবং সাধু পুরুষদের জীবন বৃত্তান্ত সংবলিত পুস্তকাবলি অলঙ্করণে রোমানরা পারদর্শী ছিল। রোমের ভাস্কর্য হিসেবে দেবতা, রাজা ও উচ্চপদস্থ কর্মচারীদের প্রস্তর নির্মিত আবক্ষ নির্মাণে সবিশেষ দক্ষতা অর্জন করেছিল।
ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি: রোমীয়রা তাদের যোগ্যতা বলে গ্রিক ভাষা, বিজ্ঞান শিক্ষা কলার সাথে বহু পূর্বেই পরিচিত হয়েছিল। গ্রিস দখল করার পর ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়। সম্ভবত সেকারণেই রোমীয় সংস্কৃতিতে হেলেনীয় সংস্কৃতির প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ অব্দের শুরুতে রোমে লিখন পদ্ধতির প্রচলন হয়েছিল। তাদের এ লিখন পদ্ধতি আইন ও চুক্তি তৈরির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হতো। তাদের বিভিন্ন সমাধির দেওয়ালে রোমান লিপি পাওয়া যায়। ইতঃপূর্বে রোমানগণ প্রথম গ্রিক বর্ণমালার ভিত্তিতে ল্যাটিন বর্ণমালা চালু করেন। বর্ণমালা সৃষ্টির ফলশ্রুতিতে তদীয় সভ্যতার অগ্রযাত্রা সাধিত হয়। অগাস্টাস সিজারের সময় রোমে ল্যাটিন ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশ ঘটে এবং চরম উন্নতি সাধিত হয়। ফলে সমগ্র রোমের অধিবাসীদের এ ভাষা চর্চা করতে হয়। ল্যাটিন ভাষা থেকেই উন্নতি ঘটিয়ে আধুনিক ফরাসি, জার্মান ও স্পেনিশ, ইংরেজি প্রভৃতি ভাষা নিজ স্বরূপ লাভ করে। সাহিত্য, ইতিহাস ও দর্শনে রোমান অগ্রযাত্রা অভাবনীয়। রোমান সাহিত্য দর্শনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। গ্রিক কবি হোরাস ও ভার্জিলের লেখনিতে এপিকিউরীয় ও স্টোয়িক দর্শনের প্রভাব বিদ্যমান। ভার্জিলের অসামান্য রচনা কর্ম 'ইনিড' বহুভাষায় অনূদিত হয়েছিল। ওভিদ ও লিভি সমকালীন রোমের খ্যাতিমান কবি ছিলেন।
রোমান আইনের ব্যাখ্যা: সভ্যতার ইতিহাসে রোমানদের সবচেয়ে গৌরবজনক অবদান ছিল আইনের ক্ষেত্রে। যুক্তি ও প্রথার সম্মেলনেই রোমান আইনের সৃষ্টি। সেকারণেই এ আইনের বস্তুনিষ্ঠ কার্যকারিতা লক্ষণীয়। প্রাথমিক যুগে মৌলিক আইন দ্বারাই রোমানরা তাদের সমস্যা মিটাত। ৪৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ১২টি ব্রোঞ্জ পাতে সংকলিত আইনের দৃষ্টিতে সাম্যের স্বীকৃতি ছিল। সাম্রাজ্যিক রোমে আইনের ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি হয়। বেসামরিক আইন, জনগণের আইন ও প্রাকৃতিক আইনের আওতায় সমগ্র রাজ্য শাসিত হতো। নিরপেক্ষ, উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন আইনগুলোতে দেখা যায়।
জ্ঞান-বিজ্ঞান: বিজ্ঞানমনষ্ক রোমীয়রা বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সবিশেষ অবদান রাখেন। পৃথিবীর ঘূর্ণন প্রক্রিয়া, লিপিয়ারের বাস্তব ধারণা রোমানদের সৃষ্টি। চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা, চিকিৎসক নিয়োগ একটি স্বাস্থ্যবান জাতি গড়তে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। গ্যালেন ছিলেন সে যুগের একজন ইতিহাস প্রসিদ্ধ চিকিৎসক। প্রকৌশল বিদ্যায় রোমানরা শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিল। রাজনৈতিক আদর্শ, আইন, সামরিক সংগঠন ও প্রকৌশল বিদ্যায় অভাবনীয় উন্নতি ছিল রোমান সভ্যতার মূল কথা। জনগণের ইচ্ছাই যে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রণের চালিকাশক্তি সে ধারণা রোমানদের সৃষ্টি। জৌলুষ ও প্রতিপত্তির দিক দিয়ে এটি ছিল অনন্য সভ্যতা। এ সভ্যতার আলোকমালায় উদ্ভাসিত হয়ে বাইজান্টাইন সভ্যতা গড়ে ওঠে। সুতরাং যুগ-সমাজের আবহে রোম সভ্যতার সৃষ্টি ও প্রতিষ্ঠা জগৎবাসীকে সম্মুখপানে এগিয়ে নিতে সাহায্য করেছিল।
প্রাক ইসলামি আরব - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

