- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- প্রাচীন বাংলার জনপদ
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
প্রাচীন সীমারেখা ও বাংলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য
প্রাচীনকাল থেকে অনেকবার আঞ্চলিক বাংলার রাজনৈতিক পালাবদল ঘটেছে। ফলে এর সীমারেখারও অনেক পরিবর্তন হয়েছে।
বাংলাদেশের উত্তরে রয়েছে বিশাল হিমালয় পর্বতমালা, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের বিশাল নীল জলরাশি। দক্ষিণ-পূর্বে মিয়ানমার ছাড়া সমগ্র দেশটির বাকি সীমারেখা ঘিরে রেখেছে ভারত। এর অধিকাংশ অঞ্চলই সমভূমি। অসংখ্য নদ-নদী আর খাল-বিল ছড়িয়ে আছে এদেশের বুকজুড়ে। মূল নদ-নদীগুলো হচ্ছে পদ্মা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, তিস্তা ও করতোয়া।
কোন দেশের মানুষের জীবনাচরণ ও ইতিহাসের ওপর সে দেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের প্রভাব অপরিসীম। এ জন্যই পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের জীবনধারা, আচার-আচরণে এত বৈচিত্র্য লক্ষ করা যায়। বাংলাদেশের বিশাল সমভূমি আর প্রচুর নদ-নদী থাকায় এদেশের যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনের একটি বড় মাধ্যম নদীপথ। পাশাপাশি উর্বর ভূমির কারণে কৃষিভিত্তিক সমাজও গড়ে ওঠে।
এখানকার আবহাওয়া নাতিশীতোষ্ণ। আবার ঋতুবৈচিত্র্যের কারণে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সাথে যুদ্ধ করতে হয় বাংলাদেশের মানুষকে, তাই তারা হয়ে ওঠে সংগ্রামী। শুধু স্বভাব চরিত্র নয়, বাংলার অধিবাসীদের খাদ্য তালিকা, পোশাক, ঘর-বাড়ি সবকিছুই এদের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। বৈচিত্র্যময় এই প্রাকৃতিক অবস্থান প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলার মানুষকে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। নদ-নদী এ দেশকে বহুকাল আড়াল করে রেখেছিল বিদেশি শক্তির লোভাতুর দৃষ্টি থেকে।
জনপদ
প্রাচীন যুগে বাংলা বর্তমান বাংলাদেশের মতো একক ও অখণ্ড ছিল না। সাম্রাজ্যভিত্তিক বা কেন্দ্রীয়শাসন শুরু হওয়ার আগে বাংলা ছোট ছোট অনেকগুলো অংশে বিভক্ত ও স্থানীয়ভাবে শাসিত হতো। প্রাচীন বাংলার কৃষিনির্ভর এই ছোট ছোট জনবসতিগুলোকেই বলা হয় জনপদ।
নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য জনপদের বর্ণনা দেওয়া হলো:
গৌড়: ষষ্ঠ শতকে বাংলার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম অংশে গৌড় জনপদ গড়ে উঠে। পরে এই জনপদ একটি স্বাধীন রাজ্য হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সপ্তম শতকে শশাঙ্ককে গৌড়রাজ বলা হতো। এ সময় গৌড়ের রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণ। বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলায় ছিল এর অবস্থান। বাংলায় তুর্কি বিজয়ের কিছু আগে মালদহ জেলার লক্ষণাবতীকেও গৌড় বলা হতো।
বঙ্গ: বঙ্গ একটি অতি প্রাচীন জনপদ। বর্তমান বাংলাদেশের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বঙ্গ জনপদ নামে একটি অঞ্চল গড়ে উঠেছিল। অনুমান করা হয়, এখানে বঙ্গ বলে একটি জাতি বাস করতো। তাই জনপদটি পরিচিত 'বঙ্গ' নামে। প্রাচীন শিলালিপিতে বঙ্গের দুটি অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়-একটি বিক্রমপুর ও আরেকটি নাব্য। ঢাকা, ময়মনসিংহ, ফরিদপুর, বাখেরগঞ্জ ও পটুয়াখালি বঙ্গ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। বঙ্গ রাজ্যে পাঁচজন রাজার নাম পাওয়া যায়। তারা হলেন ধর্মাদীপ্ত, দ্বাদশাদীপ্ত, সুধন্যাদীপ্ত, গোপচন্দ্র এবং সমাচার দেব।
পুণ্ড্র: পুণ্ড্র শব্দের অর্থ আখ বা ইক্ষু। প্রাচীন বাংলার জনপদগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো পুণ্ড্র। খুব সম্ভবত পুণ্ড্র বলে একটি জনগোষ্ঠী এ জনপদ গড়ে তুলেছিল। বর্তমান বগুড়া, রংপুর, রাজশাহী ও দিনাজপুর এলাকা নিয়ে এ পুণ্ড্র জনপদটির সৃষ্টি হয়েছিল। রাজধানীর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। পরবর্তীকালে এর নাম হয় মহাস্থানগড়।
মহাস্থানগড় প্রাচীন পুণ্ড্র নগরীর ধ্বংসাবশেষ বলে পণ্ডিতেরা মনে করেন। প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শনের দিক দিয়ে পুণ্ড্রই ছিল প্রাচীন বাংলার সবচেয়ে সমৃদ্ধ নগরসভ্যতা। পাথরের চাকতিতে খোদাই করা লিপি এখানে পাওয়া যায়। লিপিটির নাম মহাস্থান ব্রাহ্মীলিপি। ধারণা করা হয়, বাংলাদেশে প্রাপ্ত এটিই প্রাচীনতম শিলালিপি।
হরিকেল: সপ্তম ও অষ্টম শতক হতে দশম ও একাদশ শতক পর্যন্ত হরিকেল নামে একটি স্বতন্ত্র জনপদ ছিলো বলে কোনো কোনো লেখক বর্ণনা করেছেন। এ জনপদের অবস্থান ছিল বাংলার পূর্ব প্রান্তে। মনে করা হয়, আধুনিক সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত এই জনপদ বিস্তৃত ছিল।
সমতট: পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় বঙ্গের পাশাপাশি সমতটের অবস্থান। সমতটের রাজধানী বড় কামতা এবং দেবপর্বত কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে অবস্থিত। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রকূলবর্তী এলাকা এবং বর্তমান ভারতের ত্রিপুরার প্রাচীন অংশই সমতট। কুমিল্লার ময়নামতিতে কয়েকটি প্রাচীন নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে। শালবন বিহার এদের অন্যতম। কেউ কেউ মনে করেন, সমতট বর্তমান কুমিল্লার প্রাচীন নাম।
বরেন্দ্র: বরেন্দ্রী, বরেন্দ্র বা বরেন্দ্রভূমি নামে প্রাচীন বাংলায় অপর একটি জনপদের কথা জানা যায়। এটিও উত্তরবঙ্গের একটি জনপদ। অনুমান করা হয়, পুত্রের একটি অংশ জুড়ে বরেন্দ্রর অবস্থান ছিল। বগুড়া, দিনাজপুর ও রাজশাহী জেলার অনেক এলাকা এবং সম্ভবত পাবনা জেলাজুড়ে বরেন্দ্র বিস্তৃত ছিল।
তাম্রলিপ্ত: হরিকেলের দক্ষিণে অবস্থিত ছিল তাম্রলিপ্তি জনপদ। বর্তমান মেদিনীপুর জেলার তমলুকই ছিল তাম্রলিপ্তর প্রাণকেন্দ্র। সপ্তম শতক থেকে এটি দণ্ডভুক্তি নামে পরিচিত হতে থাকে।
চন্দ্রদ্বীপ: প্রাচীন বাংলায় আরও একটি ক্ষুদ্র জনপদের নাম পাওয়া যায়। এটি হলো চন্দ্রদ্বীপ। বর্তমান বরিশাল জেলাই ছিল চন্দ্রদ্বীপের মূল ভূখণ্ড ও প্রাণকেন্দ্র। এ প্রাচীন জনপদটি বালেশ্বর ও মেঘনার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত ছিল।
প্রাচীন বাংলার জনপদ থেকে আমরা তখনকার বাংলার ভৌগোলিক অবয়ব, সীমারেখা, রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারি। প্রাচীন বাংলায় তখন কোনো রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। শক্তিশালী শাসকগণ তাদের আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে একাধিক জনপদের শাসন ক্ষমতা লাভ করতেন।
প্রাচীন বাংলার জনপদ - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

