- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- অপরিচিতা [গদ্য]
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
উদ্দীপক ও প্রশ্নোত্তর
মা মরা ছোট মেয়ে লাবনি আজ শ্বশুর বাড়ি যাবে। সুখে থাকবে এই আশায় দরিদ্র কৃষক লতিফ মিয়া আবাদের সামান্য জমিটুকু কথক রেখে পণের টাকা যোগাড় করলেন। কিন্তু তাতেও কিছু টাকার ঘাটতি রয়ে গেল। এদিকে বর পারভেজের বাবা হারুন মিয়ার এক কথা সম্পূর্ণ টাকা না পেলে তিনি ছেলেকে নিয়ে চলে যাবেন। বিষয়টি পারভেজের কানে গেলে সে বাপকে সাফ জানিয়ে দেয়, 'সে দরদাম বা কেনাবেচার পণ্য নয়। সে একজন মানুষকে জীবনসঙ্গী করতে এসেছে, অপমান করতে নয়। ফিরতে হলে লাবনিকে সঙ্গে নিয়েই বাড়ি ফিরবে।'
অনুপমের মামা ও হারুন মিয়ার মতো মানুষের কারণে আজও কল্যাণী ও লাবনিরা অপমানের শিকার হয়- মন্তব্যটির যথার্থ নিরূপণ কর।
অনুপমের মামা ও হারুন মিয়ার মতো মানুষের কারণে আজও কল্যাণী ও লাবনিরা অপমানের শিকার হয়- বক্তব্যটি সর্বাংশে সঠিক।
যৌতুক আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি অভিশাপের নাম, যার অসহায় বলি হচ্ছে এদেশের অসংখ্য নারী ও কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা। এই বিষবাষ্পের তীব্র দহনে অকালে ঝরে যায় হাজারো সুখস্বপ্ন; বুকচাপা আর্তনাদ ও বোঝাসম জীবন নিয়ে বেঁচে থাকতে হয় অনেক নারীকে। এই সামাজিক অকল্যাণকর ও অভিশপ্ত প্রথাকে জিইয়ে রেখেছে হীন মনোবৃত্তির অধিকারী একশ্রেণির অভিভাবক। যাদের সার্থক প্রতিনিধি উদ্দীপকের হারুন মিয়া ও ' অপরিচিতা গল্পের অনুপমের মামা।
'অপরিচিতা' গল্পে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাজে আসন গেড়ে বসা নির্মম যৌতুক প্রথার ভয়ংকর ছোবলের স্বরূপ ফুটিয়ে তুলেছেন সুনিপুণ দক্ষতায়। গল্পে যৌতুকের এই ঘৃণ্য কর্মযজ্ঞের মূল হোতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন অনুপমের মামাকে। যিনি পবিত্র বিয়েতে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছেন যৌতুককে। বিয়ের মঞ্চে উঠার পূর্বেই যৌতুকের স্বর্ণ গয়নাকে কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে পেতে কল্যাণীর বাবার সাথে মেতে উঠে অসভ্য, বর্বর আচরণে। অনুপমের মামার এরূপ নির্মম আচরণে ব্যথিত হয়ে অবশেষে কল্যাণীর বাবা বিয়ে ভেঙে দেন, যার ফলে কল্যাণী স্বামী-সংসারবিহীন এক নিস্তরঙ্গ জীবন পথ বেছে নিতে বাধ্য হয়। অকালে ঝরে যায় তার আজন্ম লালিত শ্বশুর বাড়ির স্বপ্ন। যার প্রধান এবং একমাত্র কারণ হিসেবে দায়ী অনুপমের মামার নীচু মনোবৃত্তি। অনুপমের মামার এ হীন মানসিকতাই প্রতিফলিত হয়েছে উদ্দীপকের হারুন মিয়ার চরিত্রে। যৌতুকের জন্য মা মরা ছোট মেয়ে লাবনির বিয়ের মূল থেকে বরকে উঠিয়ে আনতে উদ্যত হতে সে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করেনি। লাবনির বাবা জমি বন্ধক রেখেও যৌতুকের পুরো টাকা সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলে সে জানিয়ে দেয় যে, সম্পূর্ণ টাকা হাতে না পেলে ছেলেকে নিয়ে চলে যাবে। যা সম্পূর্ণ অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অবৈধ। পাত্র পারভেজ জোরালো প্রতিবাদ না করলে হারুন মিয়া তা-ই করতো। যার ফলে লাবনির জীবনে নেমে আসত ঘোর অমানিশা।
উপর্যুক্ত আলোচনার পরিশেষে সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, অনুপমের মামা এবং পারভেজের বাবার মতো নীচ মনোবৃত্তির অধিকারী কতিপয় স্বার্থপর ব্যক্তিরাই কল্যাণী এবং লাবনির মতো নিষ্পাপ মেয়েদের জীবনকে ঘোর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়, তাদেরকে অপমানের শিকার করে।
মন্তব্য ও আলোচনা (০)
সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর সমূহ
শম্ভুনাথ সেকরার হাতে কী পরখ করতে দিয়েছিলেন?
শম্ভুনাথ সেকরার হাতে বরপক্ষের দেয়া একজোড়া এয়ারিং (কানের দুল) পরখ করতে দিয়েছিলেন।
'বাংলাদেশের মধ্যে আমিই একমাত্র পুরুষ যাহাকে কন্যার বাপ বিবাহ আসর হইতে নিজে ফিরাইয়া দিয়াছে' বলতে কী বোঝানো হয়েছে?
প্রশ্নোক্ত উক্তিটি দ্বারা নির্জীব এবং ব্যক্তিত্বহীন অনুপমের আত্মোপলব্ধির দিকটি বোঝানো হয়েছে।
আমাদের সমাজে সুদর্শন ও শিক্ষিত বরের কদর সমধিক। এমন পাত্র কেউই হাতছাড়া করতে চায় না। বিশেষ করে কন্যা দায়গ্রস্ত পিতা পাত্রের খোঁজ পেলেই যে কোনোভাবে তার সাথে কন্যার বিয়ে দিতে চান। কিন্তু 'অপরিচিতা' গল্পের পিতা শম্ভুনাথ সেন এক্ষেত্রে। সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূমিকা পালন করেছেন। পাত্র হিসেবে অনুপম শিক্ষিত এবং সুদর্শন হওয়া সত্ত্বেও নিজের আত্মসম্মানবোধ এবং নারীর সম্মান রক্ষার্থে শম্ভুনাথ সেন বিয়ের আসর থেকে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তার এ নির্ভীক ভূমিকা তুলে ধরা এবং অনুপমের নিজের অক্ষমতা প্রকাশ করাই আলোচ্য উক্তিটির মূল ভাবার্থ।
অনুপম ও পারভেজের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের বৈপরীত্য ব্যাখ্যা কর।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মসম্মানের দিক দিয়ে অনুপম ও পারভেজের মধ্যে চারিত্রিক বৈপরীত্য রচিত হয়েছে।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য অর্থ ব্যক্তির নিজস্ব মত ও প্রাধান্য এবং আত্মসম্মান অর্থ ব্যক্তির নিজের ভালোলাগা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা এবং পছন্দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন বা তার মতামতকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। ব্যক্তির স্বকীয় মতামত এবং তা বাস্তবায়ন করার জন্য প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা যেকোনো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষের প্রধান চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। 'অপরিচিতা' গল্পের অনুপমের চরিত্রে সে বৈশিষ্ট্যটি সম্পূর্ণভাবে অনুপস্থিত। আর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যটিই অনুপম ও পারভেজের চরিত্রের মধ্যে দুর্ভেদ্য দেয়াল রচনা করে দিয়েছে।
উদ্দীপকের পারভেজ উজ্জ্বল সুচারিত্রিক গুণের অধিকারী একজন যুবক। যৌতুকের দাবিতে পিতার কশাইসুলভ আচরণে বিক্ষুব্ধ হয়ে সে পিতার বক্তব্যের প্রতিবাদ করে। যৌতুকের সম্পূর্ণ টাকা হাতে না পেলে বিয়ের মঞ্চ থেকে ছেলেকে তুলে নিয়ে চলে যাবেন- পিতার এমন অমানবিক আচরণে সে বাপকে সাফ জানিয়ে দেয় যে, দরদাম বা কেনাবেচার মধ্যে সে নেই, ফিরতে হলে লাবনিকে সাথে করেই সে বাড়ি ফিরবে। পারভেজের এরূপ বীরোচিত বক্তব্যে পাঠকমাত্রই তার প্রতি শ্রদ্ধাবনত থাকতে বাধ্য হয়। তার বক্তব্য যেন সমাজে পরগাছার মতো চেপে বসা কুসংস্কারের বিষমূলে অব্যর্থ কুঠারাঘাত। অন্যায়ের প্রতিবাদে সে দৃঢ়কণ্ঠ, তার পছন্দের এবং মতামতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে সে আপন পিতার অযৌক্তিক দাবির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। বিপরীতে 'অপরিচিতা' গল্পের অনুপম যেন তার মামার হাতের কাঠের পুতুল, তার ঘুড়িসম জীবনে মামার হাতে যেন নাটাই। অনুপমের মামাই তার সর্বেসর্বা। মামার মতামতের ওপর ভিত্তি করে তার সকল ভালোলাগা-মন্দলাগা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা, মতামতের জলাঞ্জলি দিতে হয়। তার মামার অন্যায্য যৌতুকের দাবির নিচে চাপা পড়ে যায় সকল চাওয়া-পাওয়া, ভালোলাগা এবং কল্যাণীকে বিয়ের স্বপ্ন। বিয়ে বাড়ি থেকে নির্লজ্জের মতো চলে আসতে হয় তাদের। কল্যাণীর বাবা তার মতামত জানতে চাইলেও সে থাকে নির্বাক। যা সকল পাঠককে হতাশ করে। এতে করে তার দুর্বল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের লক্ষণই প্রকাশ পায়। ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিন্দুমাত্র বৈশিষ্ট্য তার চরিত্রে দৃশ্যমান নয়। তাই বলা যায় যে, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য ও আত্মসম্মানের দিক দিয়ে অনুপম ও পারভেজের মধ্যে চারিত্রিক বৈপরীত্য সূচিত হয়েছে।

