নাগর্নো-কারাবাখ: ঐতিহাসিক বিতর্ক থেকে শান্তির পথে
— প্রিপারেশন
দক্ষিণ ককেশাসের পর্বতময় এই অঞ্চল, নাগর্নো-কারাবাখ, কয়েক দশক ধরে আজারবাইজান এবং আর্মেনিয়ার মধ্যে এক গভীর বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। এই স্থলবেষ্টিত অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৪,৪০০ বর্গকিলোমিটার, যা দুই প্রতিবেশী দেশের জাতিগত, সাংস্কৃতিক এবং ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতীক। তবে, ২০২৫ সালের ৮ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউসে এক ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির স্বাক্ষর ঘটনা এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসানের আশার আলো জ্বালিয়েছে। এই চুক্তি কেবল যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি নয়, বরং অঞ্চলের অর্থনৈতিক এবং যোগাযোগমূলক উন্নয়নের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি: সোভিয়েত যুগ থেকে স্বাধীনতার সংকট
নাগর্নো-কারাবাখের ইতিহাস রাশিয়ান সাম্রাজ্যের পতনের সাথে জড়িত। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর, এই অঞ্চলটি ট্রান্সককেশীয় গণতান্ত্রিক ফেডারেটিভ রিপাবলিকের অংশ হয়ে ওঠে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ব্রিটিশ বাহিনী এটি দখল করে, এবং পরবর্তীকালে আর্মেনিয়া, আজারবাইজান ও জর্জিয়ার সমন্বয়ে গঠিত হয় ট্রান্সককেশিয়ান সোশ্যালিস্ট ফেডারেটিভ সোভিয়েত রিপাবলিক (টিএসএফএসআর)।
১৯২৩ সালের ৭ জুলাই তৎকালীন সোভিয়েত নেতা জোসেফ স্ট্যালিনের নির্দেশে নাগর্নো-কারাবাখকে আজারবাইজানের অধীনে এক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে রূপান্তরিত করা হয়, যার নাম হয় নাগর্নো-কারাবাখ অটোনোমাস ওব্লাস্ট (এনকেএও)। এই সিদ্ধান্তটি পরবর্তীকালে বিতর্কের বীজ বপন করে। ১৯৩৬ সালের ৫ ডিসেম্বর টিএসএফএসআর ভেঙে পড়লে আজারবাইজান, জর্জিয়া ও আর্মেনিয়া তিনটি স্বতন্ত্র সোভিয়েত প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। ১৯৮৮ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আর্মেনীয় জনগণ নাগর্নো-কারাবাখকে আর্মেনিয়ার সাথে একীভূত করার দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু করে। ১৯৯১ সালের ২৬ নভেম্বর এনকেএও আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়ে যায়, এবং আজারবাইজান এর উপর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ১৯৯১ সালের ১০ ডিসেম্বর এই অঞ্চলে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যাতে আর্মেনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেয়।
এই ঘটনাপ্রবাহের ফলে যুদ্ধের জন্ম নেয়। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ১৯৯৪ সালের ৫ মে বিষ্কেক প্রোটোকল নামে এক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যা ১২ মে থেকে কার্যকর হয়। এটি সংঘাতের প্রথম অস্থায়ী শান্তির চেষ্টা ছিল, কিন্তু সম্পূর্ণ সমাধানের পথে বাধা সৃষ্টি করে।
সাম্প্রতিক উন্নয়ন: আবুধাবি থেকে হোয়াইট হাউসের পথ
প্রায় চার দশকের এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটাতে ২০২৫ সালের জুলাই মাসে আবুধাবিতে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভ এবং আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান এখানে সম্মিলিত হন, যেখানে তারা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে স্বাভাবিকীকরণের উপায় নিয়ে গভীর আলোচনা করেন। এই বৈঠকের ফলশ্রুতি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতিতে ৮ আগস্ট হোয়াইট হাউসে শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এই চুক্তির মূলে রয়েছে একটি বাণিজ্যিক ও পরিবহনমূলক রুটের স্থাপন, যা আর্মেনিয়ার মধ্য দিয়ে আজারবাইজানকে তার বিচ্ছিন্ন নাখচিভান এক্সক্লেভের সাথে যুক্ত করবে। এটি ‘ট্রাম্প রুট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস অ্যান্ড প্রসপারিটি’ (ট্রিপ্প) নামে পরিচিত, যা পূর্বে ‘জাঙ্গেজুর করিডোর’ হিসেবে উল্লেখিত ছিল। আর্মেনিয়া এই ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ সংযোগপথের উন্নয়নের একচেটিয়া অধিকার যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদান করেছে, যাতে ক্যাস্পিয়ান সাগর থেকে পশ্চিমের সাথে যোগাযোগের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এই করিডোরটি আর্মেনিয়ার সিউনিক প্রদেশের মধ্য দিয়ে গিয়ে নাখচিভানকে তুরস্কের সাথে যুক্ত করবে, এবং ৯৯ বছরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইজারায় পরিচালিত হবে। এটি কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ খুলবে না, বরং এনএটিও-সমর্থিত একটি কৌশলগত চ্যানেলও গড়ে তুলবে।
গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ
- ভৌগোলিক ও জাতিগত প্রেক্ষাপট: নাগর্নো-কারাবাখ আজারবাইজানের অভ্যন্তরীণ পর্বতময় অঞ্চল, যা দীর্ঘদিন ধরে জাতিগত আর্মেনীয়দের নিয়ন্ত্রণে ছিল আর্মেনিয়া সরকারের সমর্থনে। আর্মেনিয়ার অধিকাংশ জনগণ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী, যেখানে তেলসমৃদ্ধ আজারবাইজান মূলত মুসলিম-প্রধান।
- আন্তর্জাতিক ভূমিকা: রাশিয়া ঐতিহ্যগতভাবে আর্মেনিয়ার মিত্র হিসেবে কাজ করেছে, যখন তুরস্ক আজারবাইজানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই শান্তিচুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইরানের প্রভাব কমিয়ে পশ্চিমের ভূ-কৌশলগত উপস্থিতি বাড়িয়েছে, যা কিছু পর্যবেক্ষক ‘যুক্তরাষ্ট্রের অনুপ্রবেশ’ হিসেবে সমালোচনা করেছেন।
এই চুক্তি কোনো স্বপ্নের সমাপ্তি নয়, বরং একটি সতর্কতার সাথে গড়া ভবিষ্যতের ভিত্তি। এটি অঞ্চলের শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য একটি আশাবাদী অধ্যায়ের সূচনা করেছে, যদিও সীমান্ত নির্ধারণ এবং সাংস্কৃতিক সংরক্ষণের মতো বিষয়গুলো এখনও সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে।
FACT FILE
- অফিসিয়াল নাম: Republic of Artsakh or Nagorno-Karabakh Republic (NKR)
- ভৌগোলিক সীমা: পশ্চিমে আর্মেনিয়া, দক্ষিণে ইরান, উত্তর ও পূর্বে আজারবাইজান
- রাজধানী: স্তেপানকা (Stepanakert)
- দাপ্তরিক ভাষা: আর্মেনীয় সরকার ব্যবস্থার ধরন Unitary Semi-presidential republic
- স্বাধীনতা ঘোষণা: ২ সেপ্টেম্বর ১৯৯১
- জনসংখ্যা: ১,২০,০০০ (২০২১ সাল পর্যন্ত)
- নৃতাত্ত্বিকজাতি: আর্মেনিয়ান, রাশিয়ান, ইউক্রেনীয়, গ্রিক, জর্জিয়ান, আজারবাইজানীয়, বেলারুশিয়ান ইত্যাদি
- মুদ্রা:আর্মেনিয়ান দ্রাম (Armenian Dram-AMD)। বর্তমানে আজারবাইজান অঞ্চলটিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
