হিমোফিলিয়া কি, কেন ও কিভাবে?
— উড্ডয়ন
১৭ এপ্রিল বিশ্ব হিমোফিলিয়া দিবস। বিশ্ব হিমোফিলিয়া ফেডারেশন ১৯৮৯ সাল থেকে প্রতিবছর এ দিবসটি পালন করে আসছে। এর উদ্দেশ্য হলো এই হিমোফিলিয়া ও সেই সঙ্গে রক্তক্ষরণজনিত অন্যান্য যে বিরল রক্তরোগ আছে সে সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি করা।
হিমোফিলিয়া
হিমোফিলিয়া শব্দটি এসেছে দুটি গ্রিক শব্দ হাইমা (Haîma) ও ফিলিয়া (Philía) থেকে। হাইমা অর্থ রক্ত ও ফিলিয়া অর্থ আকর্ষণ। দেহের কোনো অংশে রক্তপাত শুরু হলে সাধারণত সেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে থাকে। এ প্রক্রিয়াকে ত্রুটিং বলে। ত্রুটিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু হিমোফিলিয়া রোগীর রক্তক্ষরণ দীর্ঘসময় চলতে থাকে। কারণ রক্ত জমাট বাঁধার জন্য যে বিশেষ প্রোটিন FVIII ও FIX প্রয়োজন হয় রোগীর শরীরে তার ঘাটতি থাকে। এ দুইটি ফ্যাক্টরের জিন মানুষের এক্স ক্রোমোজমে থাকে। রক্তের একটি বিশেষ জন্মগত বা জিনগত রোগ যেখানে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়। উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের রানি ভিক্টোরিয়া ছিলেন হিমোফিলিয়া জিনের বাহক। তার পুত্র সন্তান লিওপোল্ডের ছিল হিমোফিলিয়া রোগ। আর রাজকন্যা অ্যালিস ও বেয়াত্রিস এরা ছিলেন বাহক। এরপর রানীর উত্তরসূরিদের বৈবাহিক সম্পর্কের কারণে ইউরোপ ও রাশিয়ার রাজপরিবারেও এই জিন ছড়িয়ে পড়ে। যা পরবর্তীতে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে। ১৯৫২ সালে ওই একই ব্রিটিশ রাজপরিবারের স্টিফেন ক্রিসমাস একই ধরনের হিমোফিলিয়া-বি রোগে আক্রান্ত হন। তার নাম অনুযায়ী হিমোফিলিয়া বি কে ক্রিসমাস ডিজিজ বলা হয়। ওই সময়ে হিমোফিলিয়াকে রয়েল ডিজিজ বলা হতো।
প্রকারভেদ
শরীরে ক্লটিং ফ্যাক্টরের অভাবের ওপর ভিত্তি করে হিমোফিলিয়াকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।
হিমোফিলিয়া A: Factor VIII (FVIII)-এর ঘাটতি
হমোফিলিয়া B: Factor IX (FIX)-এর ঘাটতি
রোগের তীব্রতা ও ফ্যাক্টরের মাত্রা অনুযায়ী হিমোফিলিয়াকে তিনভাগে ভাগ করা হয়। যেমন:.
মৃদু: ফ্যাক্টর মাত্রা > ৫৪০%। এদের তেমন কোনো উপসর্গ থাকে না। তবে কোথাও কেটে গেলে বা আঘাত পেলে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হয়।
মাঝারি: ফ্যাক্টর মাত্রা ১-৫%। মাঝে মাঝে মাংসপেশি, হাড়ের জয়েন্ট ও অন্যান্য টিস্যু তে রক্তক্ষরণ হয়।
মারাত্মক: ফ্যাক্টর মাত্রা ১%। এখানে কোনো রকম আঘাত ছাড়াই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হতে পারে।
বিস্তার
হিমোফিলিয়া বাবা-মায়ের জিন থেকে সন্তানের শরীরে প্রবেশ করে। পুরুষদের মধ্যে রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায় এবং নারীরা বংশানুক্রমে এ রোগের জিন বহন করে। কারণ বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় X-linked disease যা শুধু এক্স ক্রোমোজমের মাধ্যমে বংশ পরম্পরায় চলতে থাকে।
লক্ষণ
- জন্মের পর নাড়ি কাটা, খৎনা করার পর প্রচুর রক্তক্ষরণ হওয়া
- সামান্য কাটা-ছেঁড়ায় দীর্ঘ সময় ধরে রক্তক্ষরণ হওয়া
- সামান্য আঘাতে চামড়ার নিচে রক্ত জমে কালচে দাগ পড়া
- নির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই নাক থেকে রক্তপাত হওয়া
- অস্থিসন্ধি যেমন- হাঁটু, কনুই ও পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা এবং ফুলে যাওয়া।
শনাক্তকরণ
যথাযথ ইতিহাস ও লক্ষণ জানার পর রক্তের স্ক্রিনিং পরীক্ষার মাধ্যমে ধারণা করা যায় যে, APTT নামক পরীক্ষার ফল বেশি। এর পরে নির্দিষ্ট ফ্যাক্টর পরীক্ষা (Factor VIII or IX Assay) করে হিমোফিলিয়া রোগ নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসা
এটি একটি জন্মগত রোগ, তাই বিশ্বে এখন পর্যন্ত হিমোফিলিয়া সম্পূর্ণভাবে নিরাময়ের কোনো চিকিৎসা আবিষ্কার হয়নি। তবে এ রোগের মূল লক্ষণই হলো রক্তক্ষরণ। তাই রক্তক্ষরণ যাতে না হয় কিংবা রক্তক্ষরণ হলেই দ্রুত যাতে বন্ধ করা যায়, সেদিকেই বেশি নজর দিতে হবে।
সতর্কতা
- যেসব কাজকর্মে আঘাতপ্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে, তা থেকে দূরে থাকা।
- রক্তক্ষরণ শুরু হলে বিশ্রামে থাকা, রক্তক্ষরণের স্থলে বরফ দিয়ে চেপে রাখা।
- অস্থিসন্ধি স্থলে রক্তক্ষরণ হলে সে জায়গাটির নড়াচড়া বন্ধ করা অথবা ক্রেপ ব্যান্ডেজ ব্যবহার করা।
- যেসব ওষুধ রক্তক্ষরণ বৃদ্ধি করতে পারে, সেগুলো খাওয়া থেকে বিরত থাকা।
- অ্যাসপিরিন ও মাংসপেশিতে ইনজেকশন নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া।
- ছেলে শিশুদের সার্জারির আগে পারিবারিক ইতিহাস জানা।
