জাহাজ জলপথের জয়গান
— উড্ডয়ন
জাহাজ মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন। প্রাচীন মানুষ থেকে আধুনিক পৃথিবী পর্যন্ত, জাহাজ আমাদের বাণিজ্য, যুদ্ধ, অনুসন্ধান ও সভ্যতার বিস্তারে অপরিসীম অবদান রেখে চলছে।
জলপথের সারথি
জাহাজ (Ship) এক ধরনের বৃহদাকার নৌযান যা সমুদ্র বা অন্যান্য জলপথে চলাচল করে। এটি নৌকার চেয়ে অনেক বড় এবং সাধারণত গভীর সমুদ্র, সাগর বা বড় বড় নদীতে নানা কাজে ব্যবহৃত হয়। জাহাজের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। যেমন-যাত্রীবাহী জাহাজ, পণ্যবাহী জাহাজ, যুদ্ধ জাহাজ, মাছ ধরার জাহাজ, গবেষণা জাহাজ ইত্যাদি।
ইতিহাসের বাঁকে
নৌকা থেকে শুরু: মানুষের প্রথম নৌযান ছিল গাছের গুঁড়ি খোদাই করে বানানো, 'ভুগআউট ক্যানো' (Dugout Cance) বা কাঠের গুঁড়ি বেঁধে তৈরি করা ভেলা। বর্তমানে আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন নৌকাটি হলো পেসে ক্যানো (Pesse Canoe), যা প্রায় ১০,০০০ বছর আগের পুরনো বলে ধারণা করা হয়। এদিকে খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫০০ শতকে মিসরীয় রাজবংশের নির্দেশে তৈরি হয় সুবিশাল জাহাজ। প্যাপিরাসের তৈরি সেই জাহাজে ব্যবহৃত হয় কাঠের ফ্রেম। গ্রিকরাট্রাইরেম নামক এক ধরনের জাহাজ তৈরি করে, যা ছিল যুদ্ধের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
পরবর্তী আবিষ্কার: মধ্যযুগে জাহাজের আকার আরও বড় হয়। ভাইকিংরা খুব মজবুত এবং দ্রুতগামী জাহাজ তৈরি করত। ১৫শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ ও স্প্যানিশরা উন্নত জাহাজ তৈরি করে। কলম্বাস বা ভাস্কো দা গামা এই পালবাহিত জাহাজগুলো ব্যবহার করেই নতুন নতুন মহাদেশ আবিষ্কার করেন। ১৬০০ সালের দিকে স্পেনিয়রা 'গ্যালিওন' নামের এক বিশাল জাহাজ তৈরী করে। এর কিছুদিন পর ব্রিটিশরা যুদ্ধের কাজে জাহাজ ব্যবহার শুরু করে।
ইঞ্জিনের ব্যবহার ও আধুনিকতার ছোয়া জাহাজে বাতাসের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ইঞ্জিনের ব্যবহার শুরু হয় শিল্প বিপ্লবের পর। ১৮০৭ সালে রবার্ট ফুলটন বাণিজ্যিকভাবে সফল বাষ্পচালিত জাহাজ উদ্ভাবন করেন। বিশ্বের প্রথম বাষ্পচালিত যুদ্ধজাহাজ, ১৮১২ সালের যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য নির্মিত হয়। এ সময় কাঠের বদলে জাহাজের বডি তৈরিতে লোহা এবং পরবর্তীতে ইস্পাত (Steel) ব্যবহার শুরু হয়, যা জাহাজকে অনেক বেশি টেকসই ও বিশাল করে তোলে। ১৯১২ সালে তৈরী হয় সে সময়ের সবচেয়ে উন্নত সমুদ্রগামী সম্পূর্ন ডিজেল চালিত জাহাজ 'এমএস সেল্যান্ডিয়া'। ২১ জুলাই ১৯৫৯ বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক শক্তিচালিত বাণিজ্যিক জাহাজ এনএস সাভানা যাত্রা শুরু করে। বর্তমানে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও স্মার্ট প্রযুক্তির মাধ্যমে জাহাজকে আরও নিরাপদ ও টেকসই করার চেষ্টা চলছে।
ভিন্ন তথ্য
'কোয়ারেন্টাইন' (Quarantine) শব্দটি জাহাজ থেকেই এসেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন প্লেগ ছড়িয়ে পড়ে, তখন ইতালির ভেনিস বন্দরে কোনো জাহাজ আসলে সেটিকে বন্দরে ভিড়তে দেওয়া হতো না। জাহাজটিকে মাঝ সমুদ্রে ৩০ দিন পরবর্তীতে ৪০ দিন (ইতালীয় ভাষায় 'quaranta giormi') অপেক্ষা করতে হতো যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে জাহাজে কোনো সংক্রমিত রোগী নেই। এই ৪০ দিন বা 'কোয়ারানতা' থেকেই কোয়ারেন্টাইন শব্দটি এসেছে।
বিশ্বে বর্তমানে সবচেয়ে বড় প্রমোদতরি Icon of the Seas। ২৭ জানুয়ারি ২০২৪ জাহাজটি যাত্রা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রয়েল ক্যারিবিয়ান ইন্টারন্যাশনালের মালিকানাধীন এই প্রমোদতরির দৈর্ঘ্য ৩৬৫ মিটার। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় যাত্রীবাহী জাহাজ MV. Bay One I
২০২৩ সালে বিশ্বের পরিত্যক্ত ৪৪৬টি জাহাজের মধ্যে ১৭০টিই ভাঙা হয় চট্টগ্রামে।
কেন, কীভাবে?
প্রশ্ন: লোহার তৈরি জাহাজ পানিতে ভাসে কীভাবে? উত্তর: লোহার টুকরো পানিতে ডুবে গেলেও বিশাল জাহাজ ডোবে না। জাহাজ মূলত পানিতে ভাসে আর্কিমিডিসের নীতি এবং প্লবতার কারণে। জাহাজের বিশাল আয়তন তার ওজনের চেয়ে বেশি পরিমাণ পানি অপসারিত করে। অপসারিত এই পানির ঊর্ধ্বমুখী চাপ (প্লবতা) জাহাজকে ওপরের দিকে ঠেলে ধরে রাখে। প্রশ্ন: সমুদ্রে দূরত্ব কেন নটিক্যাল মাইলে বলা হয়? উত্তর: প্রাচীনকালে জাহাজের গতি বের করার জন্য সমদূরত্বে গিট্টু (Knot) বাঁধা দড়ি ব্যবহার করা হতো। দড়ির এক মাথায় একটি কাঠের খণ্ড বেঁধে চলন্ত জাহাজ থেকে ফেলে দেওয়া হতো সমুদ্রে। দড়ির আরেক মাথা থাকত জাহাজের নাবিকের হাতে। জাহাজ চলত আর তিনি দড়ি ছাড়তেন। কত সময়ে কয়টি গিট্টু (Knot) পার হচ্ছে তা গণনা করে জাহাজের গতি বের করা হতো। সেই ঐতিহ্য থেকেই সমুদ্রপথে দূরত্বের একক হিসেবে নটিক্যাল মাইল ব্যবহৃত হয়। এক নটিক্যাল মাইল সমান ১.১৫ মাইল বা ১.৮৫ কিমি।
