গণতন্ত্র: জনগণের শাসনের সৌন্দর্য ও ইতিহাস

প্রিপারেশন

২৬ নভেম্বর, ২০২৫

‘গণতন্ত্র’ শব্দটি আমাদের কাছে অতি পরিচিত। বাংলায় এই শব্দটি এসেছে ইংরেজি ‘Democracy’ থেকে, আর Democracy-র উৎস গ্রিক ‘Δημοκρατία’ (Dēmokratía)। ‘Dēmos’ মানে জনগণ, ‘Kratos’ মানে ক্ষমতা বা শাসন। সুতরাং শব্দটির আভিধানিক অর্থই হলো—জনগণের হাতে শাসনক্ষমতা।

গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস গণতন্ত্রকে সংজ্ঞায়িত করেছিলেন এভাবে:“যে শাসনব্যবস্থায় ক্ষমতা কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে না, বরং সমাজের প্রতিটি সদস্যের হাতে সমানভাবে ন্যস্ত থাকে—তাই গণতন্ত্র।”

আধুনিক যুগের সবচেয়ে প্রসিদ্ধ সংজ্ঞাটি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর গেটিসবার্গের ভাষণে:“গণতন্ত্র হলো জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য এবং জনগণের সরকার।”

গণতন্ত্রের প্রকারভেদ

গণতন্ত্রকে সাধারণত দু’টি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়:

১. প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রনাগরিকরা সরাসরি আইন প্রণয়ন, নীতি নির্ধারণ ও শাসনকার্যে অংশ নেন। আধুনিক বিশ্বে সুইজারল্যান্ড এই ব্যবস্থার সবচেয়ে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সেখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণ নিজেরাই গণভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন।

২. প্রতিনিধিত্বমূলক বা পরোক্ষ গণতন্ত্রজনগণ সরাসরি শাসন না করে তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে শাসন পরিচালনা করেন। বর্তমান বিশ্বের অধিকাংশ দেশ—ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, বাংলাদেশসহ—এই ধারার অনুসারী।

উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ

বিশ্বের প্রথম গণতন্ত্রের জন্ম হয় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম শতকে এথেন্স নগর-রাষ্ট্রে। প্রথমে রাজতন্ত্র, পরে অভিজাততন্ত্র এবং অবশেষে সোলন (Solon), ক্লিসথেনিস ও পেরিক্লিসের হাত ধরে প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। পেরিক্লিসের শাসনকালকে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৬১-৪২৯) গ্রিক সভ্যতার ‘স্বর্ণযুগ’ বলা হয়। সেখানে নাগরিকদের সম্মিলিত পরিষদ (Ekklesia) ছিল সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী।

আধুনিক সংসদীয় গণতন্ত্রের বীজ রোপিত হয় ইংল্যান্ডে। ১২১৫ সালের ১৫ জুন কিং জনের সঙ্গে ব্যারনদের মধ্যে স্বাক্ষরিত ম্যাগনা কার্টা (Magna Carta) রাজকীয় স্বৈরাচারের ওপর প্রথম বড় ধরনের সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। এটিই পরবর্তীকালে সংসদীয় গণতন্ত্রের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস

২০০৭ সালের ৮ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ সর্বসম্মতিক্রমে ১৫ সেপ্টেম্বরকে ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এর পেছনে মুখ্য ভূমিকা পালন করে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়ন (IPU) এবং কাতার। প্রতি বছর এই দিনে বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও জনগণের ক্ষমতায়নের প্রতি সচেতনতা বৃদ্ধি করা হয়।

গণতন্ত্রের সূতিকাগার: এক নজরে

  • গণতন্ত্রের জন্মস্থান: প্রাচীন গ্রিস (এথেন্স)
  • প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের আধুনিক দেশ: সুইজারল্যান্ড
  • সংসদীয় গণতন্ত্রের উৎপত্তি: যুক্তরাজ্য (ম্যাগনা কার্টা, ১২১৫)
  • রাষ্ট্রপতি শাসিত গণতন্ত্রের উৎপত্তি: যুক্তরাষ্ট্র
  • বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ (জনসংখ্যার বিচারে): ভারত
  • গণতন্ত্রের জনক: সোলন (প্রাচীন গ্রিস)
  • আধুনিক গণতন্ত্রের জনক: জন লক (ইংল্যান্ড)
  • সংসদীয় গণতন্ত্রের জনক: সাইমন ডি মন্টফোর্ট (ইংল্যান্ড)

গণতন্ত্র কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, এ এক জীবন্ত আদর্শ—যেখানে প্রতিটি মানুষের কণ্ঠস্বর মর্যাদা পায়, যেখানে ক্ষমতা জনগণের কাছেই থাকে এবং জনগণের জন্যই ব্যবহৃত হয়। এই আদর্শকে রক্ষা করা ও সমৃদ্ধ করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।

বিষয় : সাধারণ জ্ঞান
গণতন্ত্র: জনগণের শাসনের সৌন্দর্য ও ইতিহাস | Uddoyon