বাংলাদেশের সোনালী আঁশ পাট

পাটের কারণেই বাংলাদেশকে বলা হয় সোনালী আঁশের দেশ। পাট নিয়ে বিস্তারিত আয়োজন-

উড্ডয়ন

১৩ এপ্রিল, ২০২৬

পাটের উৎপত্তি

উড়িয়া শব্দ jhuta বা jota থেকে jute শব্দটির উদ্ভব। অবশ্য, 'জুটা' ও 'পট্ট' বস্ত্র ব্যবহারের কথা যথাক্রমে বাইবেল এবং মনুসংহিতা ও মহাভারতে উল্লেখ রয়েছে। বৈজ্ঞানিকভাবে পাট Tiliaceae বর্গের Corchorus গণভুক্ত দ্বিবীজপত্রী আঁশযুক্ত উদ্ভিদ। বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পাট আঁশ প্রধানত দুটি প্রজাতি, সাদাপাট (Corchorus capsularis) ও তোষাপাট (Corchorus olitorius) থেকে উৎপন্ন হয়। সাদা ও তোষা পাটের উৎপত্তিস্থল যথাক্রমে দক্ষিণ চীনসহ ইন্দো-বার্মা এবং ভূমধ্যসাগরীয় আফ্রিকা। উল্লেখ্য, পাট স্বপরাগায়িত উদ্ভিদ। পাটের আঁশের উপাদান হলো আলফা এবং হেমি সেলুলোজ-৮৫%, লিগনিন-১১.৫%, অ্যাশ-১.৬%, নাইট্রোজেনাস যৌগ-১% এবং অন্যান্য-০.৯%।

বাংলায় পাট

সংস্কৃত শব্দ পট্ট থেকে পাট শব্দের উদ্ভব হয়েছে। ৫ জুন ২০১৭ কার্যকর হওয়া পাট আইন, ২০১৭ অনুযায়ী পাট অর্থ পাট গাছের আঁশ, জীব বিজ্ঞানে যা জেনাস করকরাস (Genus Corchorus) নামে পরিচিত এবং উক্ত জেনাসের সল্প স্পেসিস (species) আঞ্চলিক ভাষায় পাট, কোস্টা, নাইল্যা, সাদা পাট, তোষা পাট নামে অভিহিত করা হয়। চট্টগ্রামে পাটকে 'নারিস' শাক নামেও অভিহিত করা হয়। ১৮৩৮ সাল থেকে এ দেশে বাণিজ্যিকভাবে পাটের চাষ শুরু হয়। ১৮৫০-১৯৫০ সাল ছিল বাংলায় পাট চাষের উত্থানপর্ব। ওই সময়ে বিশ্বজুড়ে শিল্প বিপ্লবের সঙ্গী হয় বাংলার পাট। পণ্যের মোড়ক ও ভারি পণ্য বাঁধার জন্য পাট হয়ে ওঠে আবশ্যক উপকরণ। ১৮৫৩ সালে রাশিয়ার সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্যের যে যুদ্ধ হয়, যা ক্রিমিয়ার যুদ্ধ নামে পরিচিত, তা বাংলার পাটের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। এরপর আর বাংলার পাট ও পাট চাষিদের পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ১৮৫০ সালে যেখানে বাংলা অঞ্চলে পাটের চাষ হতো মাত্র ৫০ হাজার একর জমিতে, ১৯০০ সালের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০ লাখ একর। ষাটের দশকে তৎকালীন পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম উৎস ছিল পাট ও পাটজাত দ্রব্য।

স্বাধীনতার পর পশ্চিম পাকিস্তানি পাট ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যায়। তাদের পাট কারখানাগুলো বাংলাদেশেই রয়ে যায়। ১৯৭২ সালে সব পাটকল জাতীয়করণ হয়। এসব জাতীয় পাটকল রাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের অধীনে চলে আসে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে পাটকলে উৎপাদিত প্রধান তিনটি ব্যবহৃত পণ্য কার্পেট, চট ও বস্তা। সুতা, শক্ত কাপড়, চটের ব্যাগ, টুহল কাপড়, কার্পেট ব্যাকিং, মোটা-কাপড়, গালিচা প্রভৃতি পাটজাত দ্রব্যের প্রথাগত ব্যবহার।

পাটের ব্যবহার

প্রাচীনকালে পাট শুধুমাত্র সবজি-ও চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হতো। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে সিন্ধু সভ্যতায় বস্ত্র তৈরিতে পাট ব্যবহার হয়ে আসছে। মধ্যযুগে পাট দিয়ে গানিবস্তা ও শাড়ি তৈরি শুরু হয়। আবুল-ফজলের আইন-ই-আকবরী থেকে জানা যায় যে, ভারতের দরিদ্র গ্রামবাসীরা একসময় পাটের তৈরি পোশাক পরতেন। সপ্তদশ শতাব্দীতে শনের বিকল্প হিসেবে পাটের বাণিজ্যিক ব্যবহার শুরু হয় পশ্চিম ইউরোপে বিশেষ করে ডান্ডিতে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের রাজত্বকালে সামরিক বাহিনীতেও পাটের ব্যবহার শুরু হয়। ডান্ডিকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ পাট ব্যরনরা পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তা থেকে তৈরি পণ্য বিক্রি করে ধনী হয়ে ওঠে। ডান্ডি জুট ব্যারন এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় অনেক পাটকল স্থাপন করে এবং ১৮৯৫ সালের মধ্যে বাংলায় পাট শিল্প স্কটল্যান্ডের স্কটিশ পাট ব্যবসাকে ছাড়িয়ে যায়।

পাটের জিন নকশা

১৬ জুন ২০১০ তোষা পাটের জিনোম 'অনুক্রম (জীবনরহস্য) আবিষ্কারের ঘোষণা দেন বিজ্ঞানী ড. মাকসুদুল আলম। ২০১২ সালে পাটের জন্য তিনি ক্ষতিকর ম্যাক্রোফমিনা ফাসিওলিনা ছত্রাকের জীবনরহস্য উন্মোচন করেন। আবার ১৮ আগস্ট ২০১৩ সাদা পাটের জিনোম আবিষ্কারেরও ঘোষণা দেন ড. মাকসুদুল আলম। এর আগে তিনি ২০০৯ সালে মালয়েশিয়ার হয়ে রাবারের জীবন রহস্য উন্মোচন করেন।

উৎপাদন ও অর্থনীতি

১৯৮০ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশ পাটের ওপর নির্ভরশীল ছিল এবং এটিই ছিল দেশের বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী পণ্য। তবে, বর্তমানে তৈরি পোশাক শিল্প 'সর্বাধিক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। দেশে সর্বোচ্চ পাট উৎপাদন করা হয় ফরিদপুর জেলায়। পাট উৎপাদনে শীর্ষদেশ-ভারত, রপ্তানিতে বাংলাদেশ এবং আমদানিতে ভারত। পাট উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ২০২৪-২৫ 'অর্থ বছরে পাটের উৎপাদন হয় ৬.৯৩ লক্ষ হেক্টর জমিতে। পাট দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৩-৪% এবং মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) ১.৫% এবং কৃষি GDP-এর ২.৬% অবদান রাখে। ০১ মার্চ ২০২৩ পাটকে কৃষিপণ্য ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে বাংলাদেশ সরকার।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ১২টি দেশে কাঁচাপাট রপ্তানি হয়। এর মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি -পাট রপ্তানি হয়। মোট রপ্তানি ৮,০৯৫.২০ কোটি টাকা। পাট চাষের জন্য দোআঁশ মাটি সবচেয়ে উপযোগী। চৈত্র মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে সারা চৈত্র মাস পর্যন্ত দেশী পাট বপনের উপযুক্ত সময়। তবে কিছু জাত ফাল্গুন মাসের শেষ থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্তও বপন করা যায়।
পাট উৎপাদনে পাট আইন, ২০১৭; জাতীয় পাটনীতি, ২০১৮ ও চারকোল নীতিমালা, ২০২২ প্রণয়ন করা হয়। বৈজ্ঞানিক তথ্য বিন্যাস। বৈজ্ঞানিক নাম corchorus spp! এটি Tiliaceae বর্গের অন্তর্গত একটি উদ্ভিদ। পাটের ক্রোমোজোম সংখ্যা ১৪।
জীবনকাল ১০০-১২০ দিন পর্যন্ত। প্রতি বেলে ১৮২ কেজি পাট থাকে। পাটের আঁশ পট, কোষ্ট, নলিতা নামেও পরিচিত। কাঁচা পাটের এক গাইট ৪.৫ মণ।

'সোনালী ব্যাগ' হলো পাট থেকে উদ্ভাবিত এক ধরনের ব্যাগ। এই ব্যাগ তৈরির প্রত্রিয়া আবিষ্কার করেন ড. মোবারক আহমেদ খান। পাটের আঁশের শিল্প শব্দ হলো কাঁচা পাট। পাট পচানোর পদ্ধতি 'রিবন রেটিং”। অর্থাৎ রিবন রেটিং পদ্ধতিতে কাঁচা পাটের ছাল ছাড়িয়ে বড় চাড়ি বা পাত্রে পাট পচানো। আঁশ ফসলের জন্য চার ধরনের পাট রয়েছে। দেশি পাট, তোষা পাট, কেনাফ ও মেস্তা পাট।

গবেষণা ও মিল

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে এ্যাক্টের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় বর্তমান বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট (BJRI)।
কাঁচা পাট-বলতে পাট গাছের কাণ্ড থেকে প্রাপ্ত সাদা থেকে বাদামি রঙের তন্ত্রকে বোঝানো হয়, যা থেকে পরে বিভিন্ন ধরনের পাটজাত পণ্য তৈরি হয়।

  • বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশন (BJMC) গঠিত হয় ১৯৭২ সালে।
  • ১৮৮৫ সালে ব্রিটিশ বাংলায় প্রথম পাটকল স্থাপিত হয়।
  • ১৯৫৭ সালে ঢাকার তেজগাঁও-এ একটি পাট গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।

পাট গবেষণা সংস্থা ও মন্ত্রণালয়।

  • ১৯০০ সালে সর্বপ্রথম ভারত সরকার পাট গবেষণার জন্য অবিভক্ত বাংলায় একজন পাট বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করেন।
  • ১৯৩৮ সালে ঢাকায় সর্বপ্রথম একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পাট গবেষণাগার প্রতিষ্ঠিত হয়।
  • ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান সরকার জুট বোর্ড গঠন করে।
  • ১৯৭৩ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্বতন্ত্র পাট বিভাগ (Jute Division) গঠিত হয়।
  • ১৯৭৬ সালে পাট বিভাগকে পূর্ণ মন্ত্রণালয়ে উন্নীত করা হয়।

পাট অর্থনীতির উন্নয়ন ও পাট আমদানি করা দেশসমূহের মধ্যে পরামর্শদাতার কাজ করার উদ্দেশ্যে আন্তর্জাতিক পাট সংস্থা (IJO) প্রতিষ্ঠা করা হয়। ২৭ এপ্রিল ২০০২ আন্তর্জাতিক পাট গবেষণা গ্রুপ গঠিত হয়। International Jute Studz Group-এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায় অবস্থিত। দেশে জাতীয় পাট দিবস ৬ মার্চ।

সোনালী আঁশ

বাংলাদেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অর্থনীতির সঙ্গে যে কৃষিপণ্য গভীরভাবে জড়িত, তার মধ্যে পাট অন্যতম। একসময় পাটই ছিল বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস। পাটের আঁশের (fiber) রঙ সোনালী হওয়ার কারণে প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় একে সোনালী আঁশ বলা হয়।

প্রাচ্যের ড্যান্ডি নারায়ণগঞ্জ

১৮৫৩ সালে ক্রিমিয়ার যুদ্ধ বাংলার পাটের চাহিদা বাড়িয়ে দেয়। সে সময় রাশিয়া থেকে লিনেন ও শনের আমদানি বন্ধ হওয়ার পর ১৮২২ সালে ড্যান্ডির উৎপাদকরা পাটের আঁশ থেকে সুতা বানাতে শুরু করেন। তখন পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশের ওপর কাঁচা পাট সংগ্রহের ভার পড়ে। তখন থেকে পাট ও পাটশিল্পের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জড়িয়ে পড়ে। এখানকার কাঁচা পাটের ওপর নির্ভর করে ইংল্যান্ডে এক নতুন শিল্পজগৎ গড়ে ওঠে। ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ বাংলার নারায়ণগঞ্জে সর্বপ্রথম পাটকল স্থাপন করা হয়। পাট ব্যবসার সুখ্যাতির জন্য স্কটল্যান্ডের পাট ও লিনেন শিল্পের সুবিখ্যাত ড্যান্ডি শহরের সঙ্গে তুলনা করে তখন নারায়ণগঞ্জকে 'প্রাচ্যের ড্যান্ডি শহর' বলা হতো। প্রাচ্যের ড্যান্ডির সূত্র ধরে নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্র নদীর তীর ঘেঁষে বিভিন্ন রকমের পাটের চাষ হতো।

বিষয় : বিবিধ