পারিবারিক বন্ধন ও আধুনিকতা
— উড্ডয়ন
মানব সভ্যতার ইতিহাসে পরিবারই প্রথম সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মানুষের জন্ম, বিকাশ, শিক্ষা ও মূল্যবোধের শেকড় এ পরিবারেই। তবে আধুনিকতার প্রভাবে সমাজব্যবস্থা যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, তেমনি পারিবারিক বন্ধনেও আসছে নানা রূপান্তর।
পরিবার
পরিবার হলো মানুষের সংঘবদ্ধ জীবন যাপনের এক বিশ্বজনীন (Universal) রূপ। পরিবারের ইংরেজি প্রতিশব্দ Family এসেছে রোমান Famuleas শব্দ থেকে যার অর্থ 'ভৃত্য বা সেবক'। রোমের আইন ব্যবস্থায় ক্রীতদাস ও উৎপাদক গোষ্ঠী, অন্য ভৃত্যগণ, অভিন্ন বংশ বা বিবাহসূত্রে সম্পর্কিত অন্য সদস্যদের বোঝানোর জন্য Famulus শব্দটি ব্যবহৃত হতো। আবার অনেকে মনে করেন, Family শব্দটি ল্যাটিন Familia শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ 'সেবক'। সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ম্যাকাইর ও পেজ-এর মতে, 'Family is a group defined by a sex relationship sufficiently precise and enduring to provide for the procreation and upbrininging of children.' অর্থাৎ পরিবার হলো এমন একটি গোষ্ঠী যাকে সুস্পষ্ট জৈবিক সম্পর্কের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট করা যায়। এটি সন্তান-সন্ততি জন্মদান ও লালন-পালনের এক স্থায়ী প্রতিষ্ঠান।
পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব
মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। পারিবারিক বন্ধন মানুষের মানসিক নিরাপত্তা ও সামাজিক পরিচয়ের মূল ভিত্তি। কিন্তু এই পরিবারেই তার প্রথম পরিচয়, প্রথম শিক্ষা ও মানবিক গুণাবলি অর্জনের সূচনা ঘটে। পরিবারেই শিশুরা পায় ভবিষ্যৎ জীবনের পথনির্দেশনা, মূলত জীবন গড়ে ওঠে এখান থেকেই। শিশুর মনোজগৎ প্রস্তুত হয় পরিবারে। পরিবারের ধরন, প্রথা, রীতিনীতি এসবের ওপর ভিত্তি করে শিশুর জীবন-আচরণ গড়ে ওঠে। একটি সুস্থ ও পরিপূর্ণ পরিবার একটি মানুষের জীবনে আত্মবিশ্বাস, নৈতিকতা, সহনশীলতা ও দায়িত্ববোধ গড়ে তোলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়নে পরিবার এক অনস্বীকার্য উপাদান। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু পরিবারের আন্তরিকতা ও ভালোবাসায় বড় হয়, তারা ভবিষ্যতে আত্মবিশ্বাসী ও সহানুভূতিশীল ব্যক্তি হিসেবে গড়ে ওঠে। এছাড়া নারীর কর্মজীবন, অভিভাবকদের ব্যস্ততা, শিশুদের উপর পড়ার চাপ ইত্যাদি বিষয়গুলো বাংলাদেশের সমাজে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। বিশ্বের প্রতিটি দেশ ও সাংস্কৃতিক পরিসরে পরিবারের গুরুত্ব অপরিসীম। পরিবারকে বলা হয় সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ।
আধুনিক পরিবার
আধুনিকতা মানুষের জীবনকে দিন দিন গতিশীল ও প্রযুক্তিনির্ভর করেছে। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার ধারণা পারিবারিক জীবনে পরিবর্তন এনেছে। আধুনিক যুগে ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবাদের জোয়ারে পরিবারিক বন্ধন এখন ক্ষয়িষ্ণু। মানুষের পবিত্র আশ্রয়ের অদ্বিতীয় এ সংগঠনটি ভেঙে যাচ্ছে ঠুনকো কারণে, মাঝে মাঝে তা হয়ে উঠছে রণক্ষেত্র। বলতে গেলে আজ বিশ্বব্যাপী যে অস্থিরতা তার শিকড় গ্রথিত এই পারিবারিক অস্থিরতায়। শিশুর মানসিক বিকাশ, বয়স্ক অভিভাবকদের যত্ন, দাম্পত্য জীবনের স্থিতিশীলতা- এইসব ইস্যু এখন পরিবারে আলাদাভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
আধুনিক সমাজে পরিবারের প্রভাব: সমাজবিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে পরিবার হলো সমাজ জীবনের ভিত্তিভূমি। পরিবারই সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষার সূতিকাগার। পরিবারকে সমাজ দেহের হৃৎপিণ্ডের সাথে তুলনা করা চলে। এই হৃৎপিণ্ড যদি দুর্বল বা বিকল হয়ে পড়ে তাহলে পুরো সমাজ ব্যবস্থাই বিকল হয়ে যায়। সমাজব্যবস্থা মূলত হাজার বছর ধরে চলে আসা সংস্কৃতি এবং পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু দিন যতই যাচ্ছে, আমরা যেন ততই এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসছি। আমাদের পরিবারগুলোকে যেন ক্রমেই "স্বামী-স্ত্রী-সন্তানে'ই সীমাবদ্ধ করে ফেলছি। মা-বাবাদের গ্রামের বাড়িতে কাটাতে হচ্ছে নিঃসঙ্গ-অসহায় জীবন। আবার অনেক মা-বাবার ঠিকানা হচ্ছে 'বৃদ্ধাশ্রম'। বহু দেশে এখন সিঙ্গেল প্যারেন্ট, চাইল্ডলেস কাপল, বিবাহ বহির্ভূত দম্পতি ইত্যাদি পরিবার কাঠামোর উদ্ভব ঘটেছে।
পারিবারিক ভাঙন একান্নবর্তী পরিবার ব্যবস্থা বলতে মূলত আমাদের প্রাচীন সমাজব্যবস্থাকে বোঝায়। যেখানে মা-বাবা, সন্তান, দাদা-দাদিসহ পরিবারের সবাই একত্রে শান্তিতে বসবাস করত। বর্তমান সময়ে আধুনিক নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক কর্মসংস্থান, স্বনির্ভরতা বৃদ্ধি, ব্যক্তি স্বাধীনচেতা আত্মকেন্দ্রিকতাসহ নানা কারণে যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে। ক্ষুদ্র বা একক পরিবারের সন্তানরা ক্ষুদ্র জগতের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে আন্তরিকতা, মমতা, স্নেহ ও ভালোবাসা' কমে গেছে। শহুরে জীবনব্যবস্থায় এই ব্যাপারটি চরম আকার ধারণ করছে। কর্মজীবী নারী ও পুরুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সন্তান প্রতিপালনেও পরিবর্তন এসেছে। পরিবার বিমুখিতা তাদেরকে ঠেলে দিচ্ছে আত্বাকেন্দ্রিকতার দিকে এবং ধীরে ধীরে নষ্ট হচ্ছে চিরায়িত সামাজিক বন্ধনও।
পারিবারিক বন্ধনে ইতিবাচকতা: আধুনিকতা পারিবারিক জীবনে কিছু ইতিবাচক দিকও এনেছে। নারী-পুরুষের সমান অধিকার, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ, উচ্চশিক্ষার সুযোগ, প্রযুক্তিগত সুবিধা, উন্নত জীবনব্যবস্থা, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও সচেতন নাগরিক হিসেবে দায়বদ্ধতা তৈরি করছে এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক মনোভাবও তুলে ধরছে। আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা দূরে থেকেও পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করছে। উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক বিষয়গুলো- নারীর ক্ষমতায়ন ও ভূমিকার পরিবর্তন গণতান্ত্রিক ও সুষম সম্পর্ক ছোট ও সুশৃঙ্খল পরিবার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও বিকাশ সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
নেতিবাচক প্রভাব: বর্তমান বিশ্ব সহিংসতা, ক্রোধ আর উদাসীনতায় পরিপূর্ণ। অতিরিক্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা; ভোগবাদী মানসিকতা ও প্রযুক্তি আসক্তি পারিবারিক বন্ধন দুর্বল করছে। বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি দায়িত্ববোধে অবহেলা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহানুভূতির অভাব পারিবারিক অস্থিরতা সৃষ্টি করছে। অপরদিকে, উন্মুক্ত সংস্কৃতির বদৌলতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন চ্যানেল ও মিডিয়াতে পারিবারিক বন্ধন বা মূল্যবোধের বিষয়ের চাইতে পারিবারিক কলহের বিষয়গুলোই দেখানো হচ্ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমাদের পরিবার ও সমাজ তথা নতুন প্রজন্মের মন-মগজে। পারিবারিক বন্ধন ভেঙে যাচ্ছে বলেই আমাদের সামাজিক নানা সমস্যা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে।
পারিবারিক সমস্যা সমাধানে করণীয় একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে সন্তানকে গড়ার জন্য পিতা-মাতা ও পরিবারের সদস্যদেরই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হয়। বর্তমান শহুরে সমাজে অনেক পরিবারের অভিভাবক পিতা-মাতা উভয়ই নিজ কর্মস্থলে ব্যস্ত থাকে। ফলে তাদের কাছ থেকে যতটুকু সময় সন্তানের প্রাপ্য তা থেকে, সে-বঞ্চিত হয়। পারিবারিক সমস্যা সমাধানে সরকার, সমাজ ও পরিবার সব পক্ষকেই একযোগে কাজ করতে হবে। নিচে কিছু সম্ভাব্য করণীয় উল্লেখ করা হলো-
পারিবারিক মূল্যবোধের শিক্ষা: শিশুদের শৈশব থেকে পরিবার ও সম্পর্কের গুরুত্ব শেখাতে হবে। পরিবারে মা-বাবার প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে সন্তানকে শৈশব থেকেই নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলা। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত পরিবারের সাথে খাবার খায়, তারা স্কুলে ভালো করে, মানসিকভাবে সুস্থ থাকে এবং খারাপ অভ্যাস (যেমন মাদক, ধূমপান) থেকে দূরে থাকে। এটি শিশুদের মধ্যে সামাজিক দক্ষতা ও ভালো আচরণ গড়ে তোলে।
পারিবারিক সময় নির্ধারণ প্রতিদিন বা সপ্তাহে নির্দিষ্ট সময় পরিবার একসঙ্গে কাটানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় হয়। পারিবারিক বন্ধন মজবুত হয়। একসাথে খাওয়ার সময় পরিবারের সদস্যরা পরস্পরের সাথে কথা বলেন, দিনের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। এটি পারস্পরিক বোঝাপড়া, সহানুভূতি ও ভালোবাসা বাড়ায়।
সচেতনতা বৃদ্ধি: গণমাধ্যমের মাধ্যমে পারিবারিক সহিংসতা ও ভাঙনের বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অতিরিক্ত মোবাইল, ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা: দাম্পত্য দ্বন্দ্ব বা পারিবারিক বিষণ্ণতায় পেশাদার কাউন্সেলিং চালু করতে হবে। পরিবারের সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নশীল হওয়া।
সমবয়সীদের সংলাপ: সন্তানদের তাদের সমবয়সী বন্ধুদের সাথে মেলামেশা ও খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া এবং ভালো বিষয়ে সংলাপে উদ্বুদ্ধ করা। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা, সম্পর্কের গুরুত্বের বিষয়ে তাদের শিক্ষা দেওয়া।
বড়দের মান্য করা: প্রত্যেক সম্পর্ককে সম্মান করা, ভদ্রতা, নম্রতা পরিবারের কাঠামো দাদা-দাদি, ফুপা-ফুপু, চাচা-চাচিদের কাছ থেকে শিখবে। এই সকল বিষয় পারিবারিক অনুশাসনের
মধ্যে থেকে শিশুরা রপ্ত করবে। দাম্পত্য সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধা: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতামূলক মনোভাব বজায় রাখলে পারিবারিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়।
নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার চর্চা: পরিবারে নৈতিকতা, সততা, দায়িত্ববোধ ও ধর্মীয় মূল্যবোধ চর্চার মাধ্যমে সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালিত করা সম্ভব। শিশুকে পরিবার থেকে ধর্মীয়, সংস্কৃতি, সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ শেখানো। এটি প্রজন্মান্তরে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি উপায়।
আইন ও সামাজিক সহায়তা গ্রহণ: গুরুতর পারিবারিক সমস্যায় আইনগত সহায়তা বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাহায্য নেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তা
বিশ্বজুড়ে আধুনিক ধারার সমাজবিজ্ঞানী এবং স্বাস্থ্য-গবেষকদের সাম্প্রতিক গবেষণার ভিত্তিতে এটা আজ প্রমাণিত সত্য যে, পারিবারিক ও সামাজিক একাত্মতা একজন মানুষকে সুস্থ সুখী সফল জীবনের পথে চালিত করে। তাই আমাদেরও উচিত এ যূথবদ্ধ জীবনযাপনের প্রতিটি সুযোগকেই কাজে লাগানো এবং প্রয়োজন আমাদের উত্তর প্রজন্মকেও সাধ্যমতো এমন জীবনধারায় অভ্যস্ত করে তোলা।
সম্পর্কিত ব্লগ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেরা দশটি ছোটগল্প যা প্রতিটি সাহিত্যপ্রেমীর পড়া উচিত
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় রূপসী বাংলার প্রকৃতি ও বিষাদের অদ্ভুত রসায়ন

Corruption in Bangladesh Composition 200, 300, 500 Words

