ক্ষুধার্ত গাজা, নির্বাক বিশ্ব

প্রিপারেশন

২৬ নভেম্বর, ২০২৫

৭ অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে সেখানে যে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে, তা শুধু বোমা আর গোলার আঘাতে সীমাবদ্ধ নয়। এর পাশাপাশি ইসরায়েল একটি নিষ্ঠুর কৌশল অবলম্বন করেছে ক্ষুধাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার। খাদ্য, পানি, ওষুধ ও জ্বালানির প্রবেশ পথ সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করে, ত্রাণবাহী ট্রাকগুলোকে সীমান্তে আটকে রেখে এবং মানবিক করিডোরে গুলি চালিয়ে তারা গাজার দুই মিলিয়নেরও বেশি মানুষকে ক্রমাগত অনাহারের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

ক্ষুধার ছায়ায় অন্ধকার গাজা

গাজার ৮৫ শতাংশেরও বেশি পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা ধ্বংস বা অকেজো। বিদ্যুৎ নেই, হাসপাতালে ওষুধ নেই, বাজার শূন্য। যে পরিমাণ ত্রাণ প্রয়োজন তার নামমাত্রও প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না। সীমান্তের ওপারে হাজার হাজার টন খাবার, পানি ও চিকিৎসা সামগ্রী মজুত থাকলেও সেগুলো গাজার মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই আটকে যাচ্ছে। ফলে শিশু ও বৃদ্ধরা ক্রমশ কঙ্কালসার হয়ে পড়ছে, অপুষ্টি আর রোগে প্রতিদিন মানুষ মরছে।

বিশ্বের নামী মানবাধিকার সংস্থাগুলো অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা এই নীতিকে স্পষ্টভাবে “যুদ্ধাপরাধ” ও “মানবতাবিরোধী অপরাধ” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারা বলছে, বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনাহারে ফেলা আধুনিক যুদ্ধের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ।

গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন: বিতর্কিত এক প্রয়াস

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (GHF) নামের সংস্থাটি যখন ত্রাণ বিতরণের দায়িত্ব নেয়, তখন অনেকে আশা করেছিলেন পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থা আরও মর্মান্তিক হয়ে উঠেছে। কয়েকটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে ত্রাণ দেওয়ার নামে হাজার হাজার ক্ষুধার্ত মানুষকে সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে যেতে বাধ্য করা হয়। ২০২৫ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে অন্তত ৮৫৯ জন ফিলিস্তিনি এই ত্রাণকেন্দ্রের আশপাশে খাবারের খোঁজে গিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের গুলিতে নিহত হন। ক্ষুধার প্রলোভনে মানুষকে মৃত্যুর ফাঁদে ঠেলে দেওয়া ছাড়া এর অন্য নাম হয় না।

ক্ষুধা যখন অস্ত্র

ক্ষুধা কেবল শারীরিক যন্ত্রণা নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ও সামরিক হাতিয়ার। ইতিহাস বলে, যখনই কোনো শক্তি তার প্রতিপক্ষকে পরাজিত করতে চেয়েছে, তখন সে প্রথমে তাদের পেটে লাথি মেরেছে। প্রাচীনকালে শহর অবরোধ করে খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করা হতো। মধ্যযুগে দুর্গ ঘেরাও। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ। স্তালিনের হলোডোমরে লক্ষ লক্ষ ইউক্রেনীয়কে ইচ্ছাকৃত দুর্ভিক্ষে হত্যা। নাৎসিদের লেনিনগ্রাদ অবরোধে নয় মাসে দশ লক্ষের বেশি মানুষ ক্ষুধায় মারা যায়।

গাজায় আজ ঠিক সেই একই কৌশলের পুনরাবৃত্তি ঘটছে শুধু এবার আরও আধুনিক, আরও নিখুঁত এবং আরও নির্মমভাবে।

আন্তর্জাতিক আইন কী বলে?

জেনেভা কনভেনশন (১৯৪৯) এবং তার অতিরিক্ত প্রোটোকল-১ (১৯৭৭)-এর ৫৪ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে:

“Starvation of civilians as a method of warfare is prohibited.”

অর্থাৎ যুদ্ধে বেসামরিক জনগোষ্ঠীকে অনাহারে ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এটি যুদ্ধাপরাধ। কিন্তু আইন আছে বলেই কি সবাই তা মানে?

শেষ কথা

যখন একটি শিশু ক্ষুধায় কাঁদে আর তার মায়ের কাছে খাবার থাকে না, তখন বিশ্বের সব বক্তৃতা, সব রেজোলিউশন, সব নিন্দা প্রস্তাব মিথ্যে হয়ে যায়। গাজার আকাশে ড্রোনের গুঞ্জন আর পেটে ক্ষুধার জ্বালা যখন একসঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়, তখন বিশ্বের নীরবতা আরও ভারী হয়ে ওঠে।

বিষয় : আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী