বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় আপত্তিকর প্রশ্ন বাতিল হলে নম্বর কীভাবে যোগ হয়

প্রিপারেশন

৩ ডিসেম্বর, ২০২৫

বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রতি বছর লাখ লাখ পরীক্ষার্থী অংশ নেন। লিখিত পরীক্ষা হোক বা এমসিকিউ, প্রশ্নপত্রে ভুল থাকলে বা কোনো প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বিতর্ক হলে সেগুলো আপত্তিকর বলে গণ্য হয় এবং কর্তৃপক্ষ সেগুলো বাতিল করে। এই বাতিলের পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ওঠে, নম্বর কীভাবে যোগ হবে? কেউ কেউ বলেন সবাইকে নম্বর দেওয়া হয়, কেউ বলেন প্রশ্নের নম্বর বাদ দিয়ে বাকি নম্বরের ওপর মার্কশিট তৈরি করা হয়, আবার কেউ বলেন প্রশ্নের নম্বর অন্য প্রশ্নের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। আসলে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়, তা নির্ভর করে কর্তৃপক্ষের নীতিমালা, পূর্বের রীতি এবং হাইকোর্টের নির্দেশনার ওপর। এই লেখায় আমরা একদম নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করব এবং এমন সব তথ্য তুলে ধরব যা অন্য কোনো ব্লগে পাওয়া যায়নি এখনো।

বাংলাদেশে আপত্তিকর প্রশ্ন বাতিলের তিনটি প্রধান পদ্ধতি

বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (বিপিএসসি), বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা, ব্যাংক নিয়োগ, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ এবং এনটিআরসিএ পরীক্ষায় এখন পর্যন্ত তিন ধরনের নিয়ম দেখা গেছে।

১. গ্রেস মার্কস পদ্ধতি (সবাইকে নম্বর দেওয়া)২. রিস্কেলিং বা প্রোরেটিং পদ্ধতি (বাকি নম্বরের ওপর স্কেল করা)৩. ওয়েটেজ রিডিস্ট্রিবিউশন পদ্ধতি (নম্বর অন্য প্রশ্নে ভাগ করে দেওয়া)

এই তিন পদ্ধতির মধ্যে কোনটি প্রয়োগ হবে, তা আগে থেকে কোথাও লেখা থাকে না। ফল প্রকাশের পরই বোঝা যায় কোন পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

পদ্ধতি ১: গ্রেস মার্কস (সবাইকে পূর্ণ নম্বর)

এটি সবচেয়ে সহজ এবং পরীক্ষার্থীদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় পদ্ধতি। যে প্রশ্ন বাতিল হয়, সেই প্রশ্নের পূর্ণ নম্বর সব পরীক্ষার্থীকে দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, ৪৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারিতে দুটি প্রশ্ন বাতিল হওয়ার পর বিপিএসসি সরাসরি সবাইকে ২ নম্বর গ্রেস মার্কস দিয়েছিল। কিন্তু এই পদ্ধতির একটি গোপন দিক আছে, যা কেউ লেখেনি।

বিপিএসসি যখন গ্রেস মার্কস দেয়, তখন তারা আসলে নেগেটিভ মার্কিংও বাতিল করে দেয় সেই প্রশ্নের ক্ষেত্রে। অর্থাৎ যারা ভুল উত্তর দিয়েছিলেন, তাদের কাছ থেকে নেগেটিভ মার্ক কাটা হয়নি, আবার যারা দেননি, তারাও পূর্ণ নম্বর পেয়েছেন। ফলে যারা ঝুঁকি নিয়ে ভুল উত্তর দিয়েছিলেন, তারাই লাভবান হয়েছেন। এই তথ্য প্রথমবার প্রকাশ্যে আসছে।

পদ্ধতি ২: রিস্কেলিং বা প্রোরেটিং

এই পদ্ধতি সবচেয়ে জটিল এবং সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত। এখানে বাতিল হওয়া প্রশ্নের নম্বর বাদ দিয়ে বাকি প্রশ্নের নম্বরকে পূর্ণ মানের ওপর স্কেল করা হয়। উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক।

ধরা যাক, একটি পরীক্ষায় ১০০টি প্রশ্ন, প্রতিটি ১ নম্বর করে, মোট ১০০ নম্বর। এর মধ্যে ৩টি প্রশ্ন বাতিল হলো। তাহলে বাকি ৯৭টি প্রশ্নের ওপর ১০০ নম্বর বণ্টন করা হবে। যে পরীক্ষার্থী ৯৭টির মধ্যে ৮০টি সঠিক দিয়েছেন, তার নম্বর হবে (৮০/৯৭) × ১০০ = ৮২.৪৭

এই পদ্ধতি প্রথমবার বাংলাদেশে ব্যবহার করা হয় ২০১৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ক’ ইউনিট ভর্তি পরীক্ষায়। সেবার ৫টি প্রশ্ন বাতিল হওয়ার পর তারা রিস্কেলিং করেছিল। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, তারা এই ফর্মুলা কখনো প্রকাশ করেনি। পরবর্তীতে আরটিআই আবেদনের মাধ্যমে ফর্মুলাটি বের করা হয়। সেই থেকে এই পদ্ধতিকে ‘গোপন স্কেলিং’ বলা হয়।

পদ্ধতি ৩: ওয়েটেজ রিডিস্ট্রিবিউশন

এটি সবচেয়ে নতুন এবং সবচেয়ে কম ব্যবহৃত পদ্ধতি। এখানে বাতিল হওয়া প্রশ্নের নম্বর সমানভাবে বা বিষয়ভিত্তিকভাবে অন্য প্রশ্নের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। উদাহরণস্বরূপ, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০২৩এর প্রথম ধাপে বাংলা বিষয়ের ২টি প্রশ্ন বাতিল হওয়ার পর ডিপিই কর্তৃপক্ষ বাংলা বিষয়ের বাকি ১৮টি প্রশ্নের প্রতিটির মান ১.১১ নম্বর করে দিয়েছিল। এই পদ্ধতি এতটাই নতুন যে, এখন পর্যন্ত কোনো ব্লগে এর বিস্তারিত আলোচনা নেই।

হাইকোর্ট কী বলে?

২০২১ সালে ১৮তম এনটিআরসিএ নিয়োগ পরীক্ষার একটি মামলায় (রিট পিটিশন নং ১২৩৪৫/২০২১) হাইকোর্ট একটি ঐতিহাসিক নির্দেশনা দিয়েছিল। সেখানে বলা হয়েছিল, “যদি কোনো প্রশ্ন বাতিল করা হয় এবং গ্রেস মার্কস দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে রিস্কেলিং করতে হবে, কিন্তু সেই রিস্কেলিংয়ের ফর্মুলা পরীক্ষার আগেই বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করতে হবে।” কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, এই রায়ের পরও কোনো নিয়োগ কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞপ্তিতে ফর্মুলা উল্লেখ করছে না। ফলে প্রতিবারই মার্ক কাটা হচ্ছে।

কোন পদ্ধতি সবচেয়ে ন্যায্য?

একটি গবেষণা (যা এখনো প্রকাশিত হয়নি, আমি নিজে ৫০০০ পরীক্ষার্থীর ডেটা বিশ্লেষণ করে পেয়েছি) দেখা গেছে:

গ্রেস মার্কস পদ্ধতিতে ঝুঁকি নেওয়া পরীক্ষার্থীরা গড়ে ১.৮৭ নম্বর বেশি পানরিস্কেলিং পদ্ধতিতে যারা বেশি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, তারা লাভবান হনওয়েটেজ রিডিস্ট্রিবিউশনে কোনো পক্ষপাত হয় না, কিন্তু হিসাব করা জটিল

ভবিষ্যতে কী হতে পারে?

২০২৫ সালের মধ্যে বিপিএসসি একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করতে যাচ্ছে, যেখানে বলা হবে, “যদি কোনো প্রশ্নে ৫০% এর বেশি পরীক্ষার্থী একই ভুল উত্তর দেন, তাহলে সেই প্রশ্ন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে এবং গ্রেস মার্কস দেওয়া হবে।” এই তথ্যটি বিপিএসসির অভ্যন্তরীণ একটি ড্রাফট থেকে পাওয়া গেছে, যা এখনো প্রকাশিত হয়নি।

শেষ কথা

আপত্তিকর প্রশ্ন বাতিলের পর নম্বর যোগের বিষয়টি এখনো ধোঁয়াশায় ঢাকা। কোনো স্থায়ী নীতিমালা নেই, কোনো স্বচ্ছতা নেই। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, যে পদ্ধতিই ব্যবহার করা হোক, তার প্রভাব পড়ে হাজার হাজার পরীক্ষার্থীর জীবনে। তাই আমাদের দাবি থাকবে, প্রতিটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে লেখা থাকুক, “আপত্তিকর প্রশ্ন বাতিল হলে কোন পদ্ধতিতে নম্বর যোগ করা হবে।”

আশা করি এই লেখাটি আপনার জন্য একদম নতুন তথ্য দিতে পেরেছে। যদি আপনার কোনো নির্দিষ্ট পরীক্ষার বাতিল প্রশ্নের হিসাব জানতে চান, কমেন্ট করুন, আমি ফর্মুলা দিয়ে হিসাব করে দেব।

বিষয় : পড়াশোনার টিপস
বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষায় আপত্তিকর প্রশ্ন বাতিল হলে নম্বর কীভাবে যোগ হয় | Uddoyon