বাংলাদেশের উপকূলে প্রতি বছর নতুন ভূমি
— প্রিপারেশন
দক্ষিণ-পূর্বের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে এখন নতুন জমি এবং সেখানে নতুন বসতি গড়ার এক নতুন আখ্যান তৈরি হচ্ছে। তিন যুগ ধরে সন্দ্বীপ, জাহাইজ্জার চর (বর্তমান স্বর্ণদ্বীপ) ও ভাসানচর- এই তিন দ্বীপ ধীরে ধীরে এক হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (SPARRSO) তাদের গবেষণায় এই চিত্র তুলে ধরে।
গবেষণার উদ্দেশ্য
সন্দ্বীপ বা মেঘনার মোহনার এই অঞ্চলটি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা নদীব্যবস্থার অংশ। এখানে প্রতিবছর বঙ্গোপসাগরে প্রায় ১০৬ কোটি টনের বেশি পলি জমা হয়, যা বৈশ্বিকভাবে কোনো মহাসাগরে সবচেয়ে বেশি পলি প্রবাহের একটি। এই বিপুল পরিমাণ পলি মহীসোপানে (সমুদ্রের উপকূল থেকে সমুদ্রের তলদেশ পর্যন্ত বিস্তৃত চালু এলাকা) জমা হয়ে নতুন ভূমির সৃষ্টি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই নতুন ভূমিগুলো টেকসই ভূমিতে পরিণত হতে পারে অথবা জোয়ার-ভাটার স্রোতের কারণে ক্ষয়প্রাপ্ত হতে পারে। এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল ১৯৯০-এর দশক থেকে সন্দ্বীপ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে দ্বীপ গঠন ও ক্ষয়ের গতিশীলতা অনুসন্ধান করা।
গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল
গবেষণায় ১৯৮৯-২০২৫ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করা হয়। ল্যান্ডস্যাট দিয়ে চিত্রগুলো জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে এবং নিম্ন জোয়ারের সময়ে সংগ্রহ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের জিওলজিক্যাল সার্ভে (USGS) ওয়েবসাইট থেকে ডেটা সংগ্রহ করে তা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় ১৯৮৯-২০২৫ সালের ভূমির গঠনগত পরিবর্তনের পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয়। এতে দেখা যায় ১৯৮৯ সালে সন্দ্বীপ বা এর কাছাকাছি এলাকায় স্থিতিশীল ভূমির পরিমাণ ছিল ৩২৮ বর্গকিমি, যা ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২৬ বর্গকিমি। অর্থাৎ এই সময়ে নতুন ভূমি সৃষ্টি হয়েছে ৩৯৮ বর্গকিমি (১২১%)। এই সময়ে কাদামাটি বৃদ্ধি পায় ৭৭ বর্গকিমি (২৩%)। ১৯৮৯ সালে এর পরিমাণ ছিল ৩৩৫ বর্গকিমি, ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪১৩ বর্গকিমি।
তিন দ্বীপের সম্মিলন
বঙ্গোপসাগরের একটি প্রাচীন দ্বীপ হলো সন্দ্বীপ, যা স্পারসোর গবেষণায় ৩,০০০ বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়। গবেষণায়: দেখা যায়, ১৯৮৯-২০২৫ সালের মধ্যে সন্দ্বীপের পাশেই জেগে উঠেছে জাহাইজ্জার চর ও ভাসানচর। ২০০৬ সালে মেঘনা মোহনার পলিমাটি জমে সৃষ্টি হয় ভাসানচর। এখন সন্দ্বীপ, স্বর্ণদ্বীপ: (জাহাইজ্জার চর) ও ভাসানচর একত্র হয়ে একক ভূমিরূপে আবির্ভূত হয়েছে। অর্থাৎ তিনটি দ্বীপ এখন ভৌগোলিকভাবে প্রায় সংযুক্ত। সন্দ্বীপ একটি পুরোনো দ্বীপ হলেও স্বর্ণদ্বীপ ও ভাসানচর তুলনামূলকভাবে নতুন এবং ক্রমাগত পলিমাটি জমে বিস্তৃত হয়েছে।
ভূমির বৈশিষ্ট্য
বাংলাদেশের ভূমির গঠন প্রধানত তিনটি- পাহাড়ি অঞ্চল (১২%), গড়াঞ্চল (৮%) এবং পলল ভূমি (৮০%)। বাংলাদেশ আসলে গড়ে উঠেছে বড় বড় নদী দিয়ে আসা বিপুল পরিমাণ পলি দিয়ে। এই পলির বেশির ভাগই সাগরে গিয়ে পড়ে, আর কিছু অংশ সঞ্চিত হয়ে গড়ে ওঠে ভূমি। খুলনা বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলে পলল দিয়ে ভূমির গঠন প্রক্রিয়া দ্রুততর হয় না। এর কারণ হলো এ অঞ্চলের কাছে থাকা বঙ্গোপসাগরের 'সোয়াচ অব নো গ্রাউন্ড'। ঠিক এর উল্টো হলো উপকূলীয় মেঘনা মোহনা। এখানকার নদী বেয়ে আসা বিপুল পলি সমুদ্রের বুকে মিশছে বটে, কিন্তু এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নতুন ভূমি গঠনে ভূমিকা রাখছে। এখানকার ভোলা, সন্দ্বীপ ও মনপুরা ঘিরে নতুন নতুন দ্বীপ গড়ে উঠছে।
নতুন ভূমিতে বসবাস
কোনো এলাকায় নতুন ভূমি গঠিত হলে সেখানে অন্তত ২০ বছরের। আগে মানববসতি গড়ে তোলা যুক্তিযুক্ত নয়। প্রথম দিকে এসব এলাকায় বন তৈরি করা উচিত। তবে এসব নদীমধ্যে বা নদীপাড়ে গড়ে ওঠা জনপদ হঠাৎ যে বিলীন হবে না এর কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মালিকানার দ্বন্দ্ব ও সম্ভাবনা
নদী বা সমুদ্রতীরবর্তী এলাকায় নতুন করে ভূমি জেগে উঠলে সেখানে দিয়ারা জরিপ হয়। এই জরিপের মাধ্যমে ভূমির নকশা ও রেকর্ড প্রস্তুত করা হয়। শিকস্তি ও পয়স্তি আইন অনুযায়ী, নদীভাঙনে জমি চলে গেলে (শিকস্তি) এবং সেই জমি আবার জেগে উঠলে (পয়স্তি) আগের মালিক জমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার অধিকারী হন কিছু শর্ত সাপেক্ষে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের জরিপ ও সায়রাত অনুবিভাগ নতুন জেগে ওঠা ভূমির জরিপের বিষয় দেখভাল করে।
