সাওম: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ এবং আত্মশুদ্ধির মহান ইবাদত

প্রিপারেশন বিডি

১৪ ঘণ্টা আগে

সাওম: ইসলামের তৃতীয় স্তম্ভ এবং আত্মশুদ্ধির মহান ইবাদত

সাওম

সাওম বা রোজা ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে তৃতীয় এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় কর্তব্য নয়, বরং মানুষের শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা। সাওম শব্দটি আরবি, যার অর্থ বিরত থাকা বা নিয়ন্ত্রণ করা। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়, সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে পানাহার এবং অন্যান্য নির্দিষ্ট বিষয় থেকে বিরত থাকাকে সাওম বলা হয়।

রমজান মাসের সাওম প্রতিটি সুস্থ ও প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিমের জন্য ফরজ। এই ইবাদত মুসলিম উম্মাহকে একতাবদ্ধ করে, আত্মসংযম শেখায় এবং তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জনের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মুসলমান প্রতি বছর এই মহান ইবাদত পালন করেন এবং নিজেদের আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন করেন।

সাওমের ঐতিহাসিক পটভূমি

পূর্ববর্তী উম্মতদের মধ্যে সাওম

সাওম শুধুমাত্র মুসলিম উম্মাহর জন্য নির্ধারিত কোনো ইবাদত নয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, পূর্ববর্তী উম্মতদের উপরেও সাওম ফরজ ছিল। এর মাধ্যমে বোঝা যায় যে, সাওম একটি সার্বজনীন এবং চিরন্তন ইবাদত, যা বিভিন্ন নবী ও রাসূলদের উম্মতদের জন্য নির্ধারিত ছিল।

ইহুদি ধর্মে ইয়োম কিপুর নামে একটি উপবাসের দিন রয়েছে, যেখানে তারা পাপ মোচনের জন্য উপবাস পালন করে। খ্রিস্টান ধর্মেও লেন্ট বা চল্লিশা নামে একটি উপবাসের সময়কাল রয়েছে, যদিও তা বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে শিথিল হয়ে গেছে। এসব থেকে বোঝা যায়, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য সাওম একটি প্রাচীন এবং স্বীকৃত পদ্ধতি।

ইসলামে সাওমের প্রবর্তন

হিজরতের দ্বিতীয় বছর শাবান মাসে মুসলমানদের উপর রমজানের সাওম ফরজ করা হয়। এর আগে মুসলমানরা প্রতি মাসে তিন দিন সাওম পালন করতেন, যা নফল ইবাদত হিসেবে বিবেচিত হতো। আশুরার দিনেও সাওম পালন করা হতো, যা পরবর্তীতে মুস্তাহাব হিসেবে বহাল রয়েছে।

রমজান মাসে সাওম ফরজ হওয়ার কারণ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল শুরু হয়েছিল লাইলাতুল কদর বা শবে কদরে। কুরআন মানবজাতির জন্য হেদায়েত এবং সত্য-মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছে। তাই এই মহান মাসকে সাওমের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে, যাতে মুসলমানরা কুরআনের সাথে তাদের সম্পর্ক নবায়ন করতে পারে এবং আল্লাহর নিদর্শনাবলী নিয়ে চিন্তা-গবেষণা করতে পারে।

সাওমের শরীয়ত বিধান

ফরজ সাওম

রমজান মাসের সাওম প্রতিটি সুস্থ, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম নর-নারীর উপর ফরজ। এটি ইসলামের মৌলিক পাঁচটি রুকনের একটি এবং অস্বীকার করলে ঈমান নষ্ট হয়ে যায়। যারা কোনো বৈধ কারণ ছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে রমজানের সাওম ভঙ্গ করে, তারা মহাপাপী হিসেবে গণ্য হয়।

রমজানের সাওম ছাড়াও কিছু অন্যান্য ফরজ সাওম রয়েছে। যেমন, মানত করা সাওম, কাফফারা হিসেবে আদায়কৃত সাওম এবং ক্বাজা সাওম। কেউ যদি রমজানে অসুস্থতা বা সফরের কারণে সাওম না রাখতে পারে, তাহলে পরবর্তীতে সেই সাওমগুলো ক্বাজা করা ফরজ।

ওয়াজিব সাওম

কাফফারার সাওম ওয়াজিব হিসেবে গণ্য হয়। যেমন, কেউ যদি শপথ ভঙ্গ করে, তাহলে তাকে নির্দিষ্ট সংখ্যক সাওম রাখতে হবে। একইভাবে, হজের সময় নির্দিষ্ট কিছু ভুলের জন্যও সাওম রাখা ওয়াজিব হয়ে যায়।

সুন্নত ও নফল সাওম

রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন দিনে সাওম পালন করতেন এবং উম্মতকেও উৎসাহিত করতেন। এর মধ্যে রয়েছে:

শাওয়াল মাসের ছয় রোজা: রমজানের পর শাওয়াল মাসে ছয়টি সাওম পালন করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি রমজানের সাওম পালন করল এবং তারপর শাওয়াল মাসে ছয়টি সাওম রাখল, সে যেন সারা বছর সাওম পালন করল।

আশুরার সাওম: মুহাররম মাসের দশ তারিখের সাওম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসূল (সা.) বলেছেন, এই সাওম বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেয়। আশুরার সাথে নবম অথবা একাদশ তারিখেও সাওম রাখা মুস্তাহাব।

আরাফার দিনের সাওম: জিলহজ মাসের নবম তারিখ আরাফার দিনে সাওম পালন করলে বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। তবে হাজীদের জন্য এই দিন সাওম রাখা নিষেধ।

সাপ্তাহিক সাওম: প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার সাওম পালন করা সুন্নত। রাসূল (সা.) নিয়মিত এই দুই দিন সাওম রাখতেন এবং বলেছেন যে, এই দুই দিনে বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়।

মাসিক সাওম: প্রতি চন্দ্র মাসের তেরো, চৌদ্দ ও পনেরো তারিখে সাওম পালন করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ। এই দিনগুলোকে আইয়ামে বীজ বলা হয়।

সাওমের শর্তাবলী ও আদাব

সাওমের শর্ত

সাওম সহীহ হওয়ার জন্য কিছু মৌলিক শর্ত রয়েছে:

মুসলিম হওয়া: অমুসলিমদের উপর সাওম ফরজ নয় এবং তাদের সাওম গ্রহণযোগ্যও নয়।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: নাবালেগ শিশুদের উপর সাওম ফরজ নয়, তবে তাদেরকে অভ্যস্ত করার জন্য সাওম রাখানো উচিত।

সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী হওয়া: যাদের মানসিক সমস্যা রয়েছে, তাদের উপর সাওম ফরজ নয়।

সক্ষমতা থাকা: যারা সাওম রাখতে সক্ষম, কেবল তাদের উপরই সাওম ফরজ। দুরারোগ্য রোগী এবং অতিশয় বৃদ্ধদের ছাড় রয়েছে।

মুকীম থাকা: সফররত অবস্থায় সাওম না রাখার অনুমতি রয়েছে, তবে পরবর্তীতে তা কাজা করতে হবে।

নিয়ত করা: সাওমের জন্য নিয়ত করা আবশ্যক। ফজরের আগে অন্তরে নিয়ত করলেই যথেষ্ট। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে করলে ক্ষতি নেই।

সাওমের আদাব

সাওম একটি পূর্ণাঙ্গ ইবাদত এবং এর কিছু বিশেষ আদাব রয়েছে:

সেহরি খাওয়া: রাতের শেষ প্রহরে সেহরি খাওয়া সুন্নত। হাদিসে সেহরিকে বরকতময় খাবার বলা হয়েছে এবং এটি সাওম পালনে সহায়ক।

দেরিতে সেহরি খাওয়া: ফজরের আযানের কিছু আগ পর্যন্ত সেহরি খাওয়া যায়। দেরিতে সেহরি খাওয়া উত্তম।

তাড়াতাড়ি ইফতার করা: সূর্যাস্তের সাথে সাথে ইফতার করা সুন্নত। বিলম্ব করা উচিত নয়।

খেজুর বা পানি দিয়ে ইফতার: রাসূল (সা.) খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন। খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করতেন।

ইফতারের দোয়া পড়া: ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। তাই এই সময় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা উচিত।

বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা: রমজান কুরআন নাজিলের মাস। তাই এই মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত।

তারাবিহ নামাজ পড়া: রমজান মাসে এশার নামাজের পর তারাবিহ নামাজ পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এতে বিশেষ সওয়াব রয়েছে।

সাওম ভঙ্গের কারণসমূহ

যেসব কারণে সাওম ভঙ্গ হয় এবং কাজা ও কাফফারা উভয়ই ওয়াজিব

ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সহবাস করলে সাওম ভঙ্গ হয়ে যায় এবং এর জন্য একটি সাওম কাজা করা এবং একটি কাফফারা আদায় করা ওয়াজিব হয়। কাফফারা হলো একাধারে ষাটটি সাওম পালন করা। এটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ এবং এ থেকে বিরত থাকা আবশ্যক।

যেসব কারণে সাওম ভঙ্গ হয় এবং শুধু কাজা ওয়াজিব

ইচ্ছাকৃত পানাহার: জেনেশুনে খাবার বা পানীয় গ্রহণ করলে সাওম ভঙ্গ হয়ে যায়।

ইনজেকশন গ্রহণ: পুষ্টি প্রদানকারী ইনজেকশন নিলে সাওম ভঙ্গ হয়। তবে সাধারণ ইনজেকশন নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

ইচ্ছাকৃত বমি করা: জোরপূর্বক বমি করলে সাওম ভঙ্গ হয়, তবে আপনা-আপনি বমি হলে সাওম ভঙ্গ হয় না।

মহিলাদের মাসিক ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাব: এই অবস্থায় সাওম রাখা যায় না এবং পরবর্তীতে কাজা করতে হয়।

যেসব কারণে সাওম ভঙ্গ হয় না

ভুলবশত পানাহার: যদি কেউ ভুলে খাবার বা পানি খেয়ে ফেলে, তাহলে তার সাওম ভঙ্গ হয় না। এক্ষেত্রে আল্লাহ তাকে খাইয়েছেন এবং পান করিয়েছেন বলে মনে করা হয়।

অনিচ্ছাকৃত বমি: আপনা-আপনি বমি হলে সাওম ভঙ্গ হয় না।

স্বপ্নদোষ: ঘুমের মধ্যে স্বপ্নদোষ হলে সাওম ভঙ্গ হয় না।

মিসওয়াক করা: দিনের যেকোনো সময় মিসওয়াক করা যায় এবং এতে সাওম ভঙ্গ হয় না।

সুরমা ব্যবহার: চোখে সুরমা ব্যবহার করা যায়।

তেল মাখা: মাথায় বা শরীরে তেল মাখা যায়।

গোসল করা: গরমের সময় ঠান্ডা হওয়ার জন্য গোসল করা যায়।

সাওমের ব্যতিক্রম ও বিশেষ বিধান

যাদের জন্য সাওম না রাখার অনুমতি আছে

রোগী: যে রোগী সাওম রাখলে তার রোগ বৃদ্ধি পাবে বা সুস্থ হতে বিলম্ব হবে, তার জন্য সাওম না রাখার অনুমতি রয়েছে। সুস্থ হওয়ার পর তাকে কাজা করতে হবে।

মুসাফির: সফররত অবস্থায় সাওম না রাখার অনুমতি আছে। তবে সফর থেকে ফিরে এসে কাজা করতে হবে। তবে সফরে থেকেও যদি কষ্ট না হয়, তাহলে সাওম রাখা উত্তম।

গর্ভবতী ও স্তন্যদায়িনী মা: যদি তারা নিজেদের বা সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা করেন, তাহলে সাওম না রাখতে পারবেন এবং পরে কাজা করবেন।

বৃদ্ধ ও দুরারোগ্য রোগী: যারা সাওম রাখতে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং ভবিষ্যতেও সক্ষম হবেন না, তারা প্রতিটি সাওমের বদলে একজন গরিব মিসকিনকে খাবার দিয়ে দিবেন। এটাকে ফিদইয়া বলা হয়।

মহিলাদের বিশেষ অবস্থা: মাসিক ও প্রসবোত্তর রক্তস্রাবের সময় মহিলারা সাওম রাখবেন না। এটা নিষিদ্ধ। পরে তারা কাজা করবেন।

ফিদইয়া

যে ব্যক্তি সাওম রাখতে সম্পূর্ণ অক্ষম এবং ভবিষ্যতেও সক্ষম হবেন না, তিনি প্রতিটি সাওমের বদলে একজন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে খাবার বা খাবারের মূল্য দান করবেন। এটাই ফিদইয়া। বর্তমান সময়ে অনেক আলেম মনে করেন যে, এক সাওমের ফিদইয়া হলো প্রায় দেড় কেজি খাদ্যশস্য বা তার সমপরিমাণ মূল্য।

সাওমের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উপকারিতা

তাকওয়া অর্জন

সাওমের মূল উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অর্জন করা। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সাওম ফরজ করা হয়েছে, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।"

তাকওয়া মানে হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে মানুষ সর্বদা আল্লাহকে ভয় করে চলে এবং তাঁর নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করে। সাওম মানুষকে এই গুণ অর্জনে সাহায্য করে। কারণ একজন সাওম পালনকারী জানে যে, সে যদি গোপনে পানাহার করে, তাহলে কেউ জানবে না। কিন্তু সে আল্লাহর ভয়ে তা করে না। এই অনুশীলন তার মধ্যে আল্লাহভীতি জাগ্রত করে।

আত্মসংযম ও ধৈর্য

সাওম মানুষকে আত্মসংযম শেখায়। একজন সাওম পালনকারী সারাদিন ক্ষুধা-পিপাসা সহ্য করে এবং নিজের কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণ করে। এই অনুশীলন তাকে জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও সংযত থাকতে সাহায্য করে। সে জানে কীভাবে প্রলোভন থেকে দূরে থাকতে হয় এবং কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

ধৈর্য ইসলামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ গুণ। সাওম মানুষকে ধৈর্যশীল হতে শেখায়। সারাদিন না খেয়ে থাকা, তৃষ্ণার্ত থাকা এবং বিভিন্ন কষ্ট সহ্য করা ধৈর্যের একটি বড় অনুশীলন। এই ধৈর্য জীবনের সকল ক্ষেত্রে কাজে লাগে।

গরিবদের প্রতি সহানুভূতি

সাওম পালনের মাধ্যমে একজন সচ্ছল মানুষ বুঝতে পারে ক্ষুধার কষ্ট কেমন। যারা সারা বছর পেট ভরে খেতে পায় না, তাদের কষ্ট সাওম পালনকারী অনুভব করে। এটি তার মধ্যে গরিব-দুঃখীদের প্রতি সহানুভূতি জাগায় এবং তাদের সাহায্য করার আগ্রহ সৃষ্টি করে।

রমজান মাসে দান-সদকার গুরুত্ব বৃদ্ধি পাওয়ার এটি একটি কারণ। রাসূল (সা.) রমজান মাসে অত্যন্ত দানশীল হতেন। সাওম পালনকারীরা এই মাসে বেশি বেশি দান করার চেষ্টা করেন।

পাপ থেকে বিরত থাকা

সাওম শুধু পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, বরং সকল প্রকার পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও মিথ্যা আচরণ পরিত্যাগ করেনি, আল্লাহর কাছে তার পানাহার থেকে বিরত থাকার কোনো প্রয়োজন নেই।"

সাওম পালনকারীকে তাই সকল প্রকার পাপ থেকে বিরত থাকতে হয়। মিথ্যা কথা বলা, গীবত করা, কাউকে কষ্ট দেওয়া, রাগ করা ইত্যাদি সবকিছু থেকে দূরে থাকতে হয়। এভাবে সাওম মানুষকে একজন উত্তম চরিত্রের অধিকারী করে তোলে।

একতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ

বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি মুসলমান একসাথে সাওম পালন করেন। এটি মুসলিম উম্মাহর মধ্যে একটি অপূর্ব ঐক্য ও সংহতি সৃষ্টি করে। সবাই একই সময়ে সেহরি খায়, একই সময়ে ইফতার করে এবং একই নিয়মে ইবাদত করে। এটি তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করে।

রমজান মাসে মুসলমানরা একে অপরকে বেশি বেশি সাহায্য-সহযোগিতা করে। সবাই মসজিদে একসাথে ইফতার করে, তারাবিহ পড়ে এবং একে অপরের সাথে সময় কাটায়। এটি সামাজিক বন্ধন মজবুত করে।

সাওমের স্বাস্থ্যগত উপকারিতা

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান সাওমের অনেক স্বাস্থ্যগত উপকারিতা আবিষ্কার করেছে:

শরীরের বিষাক্ত পদার্থ নির্গমন

সাওমের সময় শরীর তার সঞ্চিত চর্বি ব্যবহার করে এবং এতে জমে থাকা বিষাক্ত পদার্থগুলো বের হয়ে যায়। এটি শরীরকে পরিষ্কার করে এবং স্বাস্থ্যকর করে তোলে।

হজমতন্ত্রের বিশ্রাম

সারা বছর হজমতন্ত্র কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। রমজান মাসে নিয়মিত বিরতির মাধ্যমে হজমতন্ত্র বিশ্রাম পায় এবং পুনরায় কর্মক্ষম হয়ে ওঠে।

ওজন নিয়ন্ত্রণ

সঠিক নিয়মে সাওম পালন করলে ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে। অতিরিক্ত চর্বি কমে যায় এবং শরীর সুস্থ থাকে।

রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ

নিয়মিত সাওম পালন রক্তচাপ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। এতে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।

মানসিক স্বাস্থ্য

সাওম মানসিক শান্তি এবং স্থিরতা প্রদান করে। এটি মানসিক চাপ কমায় এবং মনকে শান্ত রাখে। ইবাদতের মাধ্যমে অর্জিত আধ্যাত্মিক পরিতৃপ্তি মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারী।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

গবেষণায় দেখা গেছে যে, সাওম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এটি বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।

রমজান মাসের বিশেষত্ব

কুরআন নাজিলের মাস

রমজান মাস মহান আল্লাহর কাছে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ কারণ এই মাসেই পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। লাইলাতুল কদর বা শবে কদরে কুরআন লাওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে নাজিল হয়। এরপর ২৩ বছর ধরে পর্যায়ক্রমে রাসূল (সা.)-এর উপর নাজিল হতে থাকে।

কুরআন মানবজাতির জন্য হেদায়েত, জীবনবিধান এবং সফলতার পথ। তাই যে মাসে এই মহাগ্রন্থ নাজিল হয়েছে, সেই মাস স্বাভাবিকভাবেই বরকতময় এবং মর্যাদাপূর্ণ।

লাইলাতুল কদর

রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর রয়েছে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। এই রাতে ইবাদত করলে হাজার মাসের ইবাদতের সওয়াব পাওয়া যায়। রাসূল (সা.) এই রাত তালাশ করার জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করতেন এবং শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন।

লাইলাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ গোপন রাখা হয়েছে, যাতে মুসলমানরা সবগুলো রাতেই ইবাদতে মনোযোগী থাকে। তবে বেজোড় রাতগুলোতে, বিশেষ করে ২৭ রমজানে এই রাত পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।

জান্নাতের দরজা খোলা ও জাহান্নামের দরজা বন্ধ

হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রমজান মাস শুরু হলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। এটি একটি বিশেষ রহমতের মাস, যেখানে নেক আমল করা সহজ হয় এবং পাপ থেকে বিরত থাকা সহজ হয়।

সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি

রমজান মাসে নেক আমলের সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। একটি নফল ইবাদত অন্য সময়ের ফরজের সমান এবং একটি ফরজ ইবাদত সত্তর গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। তাই এই মাসে বেশি বেশি ইবাদত করা উচিত।

রমজানে করণীয় আমল

কুরআন তিলাওয়াত

রমজান কুরআনের মাস। তাই এই মাসে বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত করা উচিত। রাসূল (সা.) প্রতি রমজানে জিবরাইল (আ.)-এর সাথে পূর্ণ কুরআন দোহরাতেন। মৃত্যুর বছর তিনি দুইবার দোহরান।

অনেকে পুরো রমজানে একবার সম্পূর্ণ কুরআন খতম করার চেষ্টা করেন। এটি অত্যন্ত উত্তম একটি আমল। তবে শুধু দ্রুত পড়ার চেয়ে অর্থ বুঝে ধীরে ধীরে পড়া বেশি উপকারী।

তারাবিহ নামাজ

রমজান মাসের একটি বিশেষ ইবাদত হলো তারাবিহ নামাজ। এটি এশার নামাজের পর পড়া হয়। এই নামাজে সাধারণত পূর্ণ কুরআন তিলাওয়াত করা হয়। তারাবিহ নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে পড়া উত্তম, তবে বাড়িতেও পড়া যায়।

রাসূল (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজানের রাতে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়বে, তার পূর্ববর্তী সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।"

দান-সদকা

রমজান দান-সদকার মাস। এই মাসে দান করলে বিশেষ সওয়াব পাওয়া যায়। রাসূল (সা.) রমজান মাসে ঝড়ের বেগে দান করতেন। গরিব-মিসকিন, এতিম, বিধবা এবং অসহায় মানুষদের সাহায্য করা এই মাসে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সাওম পালনকারীকে ইফতার করানো একটি বিশেষ সওয়াবের কাজ। হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি কোনো সাওম পালনকারীকে ইফতার করাবে, সে তার সমান সওয়াব পাবে, তবে সাওম পালনকারীর সওয়াব কমবে না।

ইতিকাফ

রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করা সুন্নত। ইতিকাফ মানে আল্লাহর ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করা। রাসূল (সা.) প্রতি রমজানে শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন। এই সময় তিনি পরিবার থেকে আলাদা হয়ে মসজিদে থাকতেন এবং ইবাদতে মগ্ন থাকতেন।

ইতিকাফকারী দুনিয়ার সকল ঝামেলা থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করে। এটি লাইলাতুল কদর তালাশ করার একটি উত্তম উপায়।

তওবা ও ইস্তিগফার

রমজান ক্ষমা প্রার্থনার মাস। এই মাসে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার করা উচিত। আল্লাহ তায়ালা এই মাসে বান্দাদের বিশেষভাবে ক্ষমা করেন। হাদিসে বলা হয়েছে, প্রতি রাতে আল্লাহ অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।

তওবা মানে শুধু মুখে ক্ষমা চাওয়া নয়, বরং পাপ থেকে ফিরে আসা এবং ভবিষ্যতে আর না করার দৃঢ় সংকল্প করা। সাথে সাথে যদি কারও হক নষ্ট করা হয়ে থাকে, তাহলে তা ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া।

দোয়া

রমজান দোয়া কবুলের মাস। বিশেষ করে ইফতারের সময় দোয়া কবুল হয়। তাই এই সময়গুলোতে বেশি বেশি দোয়া করা উচিত। নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, মুসলিম উম্মাহর জন্য এবং সমস্ত মানবতার কল্যাণের জন্য দোয়া করা উচিত।

শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করার সময় বিশেষ একটি দোয়া শেখানো হয়েছে: "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নি" (হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন)।

সাওমের পরীক্ষা ও চ্যালেঞ্জ

রাগ নিয়ন্ত্রণ

সাওম অবস্থায় রাগ নিয়ন্ত্রণ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ক্ষুধা-পিপাসার কারণে মেজাজ খিটখিটে হয়ে যেতে পারে। কিন্তু রাসূল (সা.) বলেছেন, "যখন তোমাদের কেউ সাওম থাকে, সে যেন অশ্লীল কথা না বলে এবং শোরগোল না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা মারামারি করতে আসে, সে যেন বলে, আমি সাওম পালনকারী।"

রাগ নিয়ন্ত্রণ করা সাওমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই অনুশীলন জীবনের অন্যান্য সময়েও কাজে লাগে।

গীবত ও অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা

সাওম শুধু মুখের নয়, সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের। জিহ্বাকেও সাওম পালন করতে হয়। গীবত, পরনিন্দা, মিথ্যা কথা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা থেকে বিরত থাকা আবশ্যক। এগুলো সাওমের সওয়াব কমিয়ে দেয়।

চোখের হেফাজত

চোখকেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। অবৈধ কিছু দেখা, অশ্লীল কিছু দেখা থেকে বিরত থাকতে হয়। টিভি, ইন্টারনেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা দরকার।

কানের হেফাজত

অশ্লীল গান, অনর্থক কথা, গীবত শোনা থেকে বিরত থাকতে হয়। কান দিয়েও পাপ হয় এবং সাওমের সওয়াব কমে যায়।

সময়ের সদ্ব্যবহার

রমজান একটি সীমিত সময়ের মাস। প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই সময়ের সদ্ব্যবহার করা উচিত। অপ্রয়োজনীয় কাজ, ঘুম, আড্ডা কমিয়ে ইবাদতে বেশি সময় দেওয়া উচিত।

সাওম পরবর্তী দায়িত্ব

ঈদুল ফিতর

রমজান শেষে আসে ঈদুল ফিতর। এটি মুসলমানদের আনন্দের দিন। সাওম পালনের পর আল্লাহর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য এই দিনটি উদযাপন করা হয়। ঈদের নামাজ পড়া, নতুন কাপড় পরা, পরিবার-পরিজন ও বন্ধুবান্ধবদের সাথে সাক্ষাৎ করা এই দিনের বিশেষত্ব।

সদকাতুল ফিতর

ঈদের নামাজের আগে সদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। এটি সাওমের ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষতিপূরণ এবং গরিব-মিসকিনদের ঈদের আনন্দে শামিল করার ব্যবস্থা। প্রতিটি মুসলিম নর-নারী, শিশু-বৃদ্ধ সবার পক্ষ থেকে সদকাতুল ফিতর দিতে হয়।

রমজানের শিক্ষা বাস্তবায়ন

রমজানে যে আত্মসংযম, তাকওয়া এবং নৈতিকতা অর্জন করা হয়, তা সারা বছর ধরে রাখা উচিত। রমজান একটি প্রশিক্ষণের মাস। এই প্রশিক্ষণের ফল বাকি এগারো মাস প্রয়োগ করতে হবে।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ নিয়মিত পড়া, কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখা, দান-সদকা চালিয়ে যাওয়া, পাপ থেকে বিরত থাকা — এসব কাজ সারা বছর করা উচিত। রমজান যেন জীবন পরিবর্তনের একটি সূচনা হয়, শুধু একটি মৌসুমী ইবাদত না হয়।

উপসংহার

সাওম ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যাপক ইবাদত। এটি শুধুমাত্র পানাহার থেকে বিরত থাকা নয়, বরং সম্পূর্ণ জীবনযাপনের একটি পদ্ধতি। সাওমের মাধ্যমে একজন মুসলমান আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করে, তাকওয়া অর্জন করে এবং নিজেকে একজন উত্তম মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।

রমজান মাসের সাওম আল্লাহর একটি বিশেষ নিয়ামত। এই মাসে জান্নাতের দরজা খোলা থাকে, জাহান্নামের দরজা বন্ধ থাকে এবং শয়তান শৃঙ্খলিত থাকে। এটি পাপ মোচন এবং নেক আমল বৃদ্ধির একটি সুবর্ণ সুযোগ।

সাওমের শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক অসংখ্য উপকারিতা রয়েছে। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা স্বীকার করেছে। মানসিক শান্তি এবং আত্মিক পরিতৃপ্তি এর অন্যতম ফল।

সাওম পালন করার সময় কিছু বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। সাওম শুধু মুখের নয়, সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের। চোখ, কান, জিহ্বা, হাত, পা — সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। গীবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা এবং সকল প্রকার পাপ থেকে দূরে থাকতে হবে। তবেই সাওম পরিপূর্ণ হবে এবং আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে।

রমজান মাস একটি সীমিত সময়ের মাস। এই মাসের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত মূল্যবান। তাই এই মাসকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো উচিত। বেশি বেশি কুরআন তিলাওয়াত, তারাবিহ নামাজ, তাহাজ্জুদ নামাজ, দান-সদকা, দোয়া-ইস্তিগফার করা উচিত। শেষ দশকে লাইলাতুল কদর তালাশ করা এবং ইতিকাফ করা সুন্নত।

সাওম পালনের মূল উদ্দেশ্য তাকওয়া অর্জন করা। তাকওয়া মানে আল্লাহকে ভয় করে চলা এবং তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলা। এই গুণ অর্জিত হলে জীবনের সকল ক্ষেত্রে সফলতা আসে। দুনিয়া এবং আখিরাত উভয় জগতে মানুষ সফল হয়।

সাওম মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করে। সারা বিশ্বের মুসলমানরা একসাথে সাওম পালন করেন, একসাথে ইফতার করেন এবং একসাথে ঈদ উদযাপন করেন। এই ঐক্য মুসলমানদের শক্তি এবং তাদের পরিচয়।

পরিশেষে, আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদের সবাইকে সঠিকভাবে সাওম পালন করার তৌফিক দান করেন, আমাদের সাওমগুলো কবুল করেন এবং আমাদেরকে তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে জান্নাতের উত্তরাধিকারী বানান। আ

বিষয় : ইসলাম শিক্ষা