যাকাত: ইসলামের মৌলিক স্তম্ভ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতীক
— প্রিপারেশন বিডি
যাকাত ইসলামের পাঁচটি মূল স্তম্ভের একটি অপরিহার্য অংশ এবং মুসলিম জীবনে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং সমাজে আর্থিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দারিদ্র্য বিমোচন এবং অর্থনৈতিক সমতা আনয়নের একটি কার্যকর ব্যবস্থা। আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে একাধিকবার যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন এবং এটিকে নামাজের সাথে একই সূত্রে উল্লেখ করেছেন। যাকাত শব্দের অর্থ পবিত্রতা এবং বৃদ্ধি - যা ইঙ্গিত করে যে সম্পদের একটি নির্ধারিত অংশ দান করার মাধ্যমে বাকি সম্পদ পবিত্র ও বরকতপূর্ণ হয়।
যাকাতের পরিচয় এবং শাব্দিক অর্থ
যাকাত আরবি শব্দ যার মূল ধাতু "যাকা" থেকে এসেছে। এর আভিধানিক অর্থ হলো পবিত্রতা, পরিশুদ্ধতা, বৃদ্ধি এবং বরকত। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায় যাকাত বলতে বোঝায় নির্ধারিত সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ নির্দিষ্ট খাতে ব্যয় করা, যা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করা হয়। এটি একজন সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর বাধ্যতামূলক এবং ইসলামী অর্থনীতির মূল ভিত্তি।
যাকাত প্রদানের মাধ্যমে একজন মুসলিম তার সম্পদকে পবিত্র করে এবং নিজের আত্মাকে কৃপণতা ও লোভ থেকে মুক্ত করে। এটি ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে এবং সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা সৃষ্টি করে। ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পদ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত এবং মানুষ এর খলিফা মাত্র। তাই সম্পদের সঠিক ব্যবহার এবং তা থেকে অভাবগ্রস্তদের হক আদায় করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।
যাকাতের ধর্মীয় ভিত্তি এবং গুরুত্ব
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য আয়াতে যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, নামাজ কায়েম করো এবং যাকাত আদায় করো। এভাবে কুরআনের প্রায় আশিটিরও বেশি স্থানে নামাজের সাথে যাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এর গুরুত্ব প্রমাণ করে।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি জিনিসের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যাকাত তার মধ্যে অন্যতম। তিনি আরও বলেছেন যে, যাকাত ইসলাম এবং ঈমানের সেতু। হাদিসে উল্লেখ আছে যে, যে ব্যক্তি সম্পদশালী হওয়া সত্ত্বেও যাকাত প্রদান করে না, কিয়ামতের দিন তার সম্পদকে আগুনে উত্তপ্ত করে তার শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়া হবে।
সাহাবায়ে কেরামের যুগে যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়েছিল, যা প্রমাণ করে যাকাত কতটা গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ ইবাদত। হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছিলেন যে, যারা নামাজ এবং যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করবে তাদের বিরুদ্ধে তিনি যুদ্ধ করবেন। এটি যাকাতের বাধ্যবাধকতা এবং এর প্রতি উম্মাহর দায়িত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়।
যাকাত ফরজ হওয়ার শর্তাবলী
প্রতিটি মুসলমানের উপর যাকাত ফরজ নয়, বরং নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ হলে তবেই যাকাত প্রদান বাধ্যতামূলক হয়। এই শর্তগুলো ইসলামী শরীয়ত দ্বারা নির্ধারিত এবং ফিকহবিদগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
মুসলমান হওয়া: যাকাত শুধুমাত্র মুসলমানদের উপর ফরজ। অমুসলিমদের উপর যাকাত ফরজ নয়, তবে তারা অন্যান্য কর ব্যবস্থার আওতাভুক্ত হতে পারে।
স্বাধীন হওয়া: দাসত্বের যুগে দাস-দাসীদের উপর যাকাত ফরজ ছিল না কারণ তাদের নিজস্ব কোনো সম্পদ থাকত না। বর্তমানে এই বিষয়টি প্রাসঙ্গিক নয়।
নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া: নিসাব হলো সেই নূন্যতম পরিমাণ সম্পদ যার মালিক হলে যাকাত ফরজ হয়। স্বর্ণের ক্ষেত্রে নিসাব সাড়ে সাত তোলা বা ৮৭ দশমিক ৪৮ গ্রাম এবং রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা ৬১২ দশমিক ৩৬ গ্রাম। নগদ অর্থ এবং ব্যবসায়িক পণ্যের ক্ষেত্রে রুপার মূল্যের সমপরিমাণ সম্পদ থাকলে যাকাত ফরজ হয়।
পূর্ণ মালিকানা থাকা: সম্পদের উপর পূর্ণ মালিকানা এবং নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। ঋণ বা কারো কাছে আমানত রাখা সম্পদ যাকাতযোগ্য নয় যতক্ষণ না তা ফেরত পাওয়া যায়।
মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া: দৈনন্দিন খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা এবং চিকিৎসার মতো মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর যে সম্পদ অবশিষ্ট থাকে শুধুমাত্র তার উপর যাকাত প্রযোজ্য। নিজের বসবাসের ঘর, ব্যবহারের গাড়ি, পেশাগত যন্ত্রপাতি ইত্যাদি যাকাতযোগ্য সম্পদের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এক বছর অতিবাহিত হওয়া: নিসাব পরিমাণ সম্পদের উপর পূর্ণ এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হতে হবে। এই শর্তটি নগদ অর্থ, স্বর্ণ-রূপা, ব্যবসায়িক পণ্য এবং গবাদি পশুর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। তবে কৃষিজাত ফসলের ক্ষেত্রে ফসল কাটার সময়েই যাকাত দিতে হয়, এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না।
ঋণমুক্ত হওয়া: যদি কারো উপর এমন ঋণ থাকে যা পরিশোধ করলে তার সম্পদ নিসাবের নিচে নেমে যায়, তাহলে তার উপর যাকাত ফরজ নয়। তবে এ বিষয়ে ফিকহবিদগণের মধ্যে মতভেদ আছে।
যাকাতযোগ্য সম্পদের প্রকারভেদ
ইসলামী শরীয়তে বিভিন্ন ধরনের সম্পদের উপর যাকাত ফরজ করা হয়েছে। প্রতিটি সম্পদের জন্য নিসাব এবং যাকাতের হার ভিন্ন হতে পারে।
নগদ অর্থ: ব্যাংকে জমাকৃত অর্থ, হাতে থাকা নগদ টাকা, সঞ্চয়পত্র, বন্ড এবং শেয়ারের মূল্য সবকিছু মিলিয়ে নিসাব পরিমাণ হলে তার শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হয়। বর্তমান যুগে এটি সবচেয়ে সাধারণ যাকাতযোগ্য সম্পদ।
স্বর্ণ ও রূপা: স্বর্ণ সাড়ে সাত তোলা এবং রূপা সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা তার বেশি হলে তার শতকরা আড়াই ভাগ যাকাত দিতে হয়। ব্যবহৃত অলংকার নিয়ে মতভেদ আছে - কিছু আলেমের মতে ব্যবহৃত স্বর্ণালংকারে যাকাত নেই, আবার অনেকের মতে সেখানেও যাকাত দিতে হয়।
ব্যবসায়িক পণ্য: ব্যবসার উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত সকল পণ্যের বাজার মূল্য নির্ধারণ করে তার উপর যাকাত হিসাব করতে হয়। দোকানের আসবাবপত্র বা স্থায়ী সম্পদ এর অন্তর্ভুক্ত নয়, শুধুমাত্র বিক্রয়যোগ্য পণ্যের মূল্যের উপর যাকাত প্রযোজ্য।
কৃষিজাত ফসল: যে জমিতে সেচের প্রয়োজন হয় সেখানকার ফসলের বিশ ভাগের এক ভাগ এবং যে জমিতে বৃষ্টির পানিতে ফসল হয় সেখানকার ফসলের দশ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হয়। এই যাকাত উশর নামেও পরিচিত।
গবাদি পশু: উট, গরু, ছাগল ইত্যাদি পশুসম্পদের উপরও নির্দিষ্ট হারে যাকাত ফরজ। তবে এগুলো অবশ্যই চারণভূমিতে চরে খাওয়া এবং ব্যবসার উদ্দেশ্যে পালিত হতে হবে। ব্যক্তিগত ব্যবহারের পশুতে যাকাত নেই।
খনিজ সম্পদ: ভূগর্ভ থেকে উত্তোলিত সোনা, রূপা, তেল বা অন্যান্য মূল্যবান খনিজের উপর যাকাত প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে এক বছর অপেক্ষা করতে হয় না।
ভাড়া থেকে আয়: ভাড়া থেকে প্রাপ্ত আয় এক বছর জমা রেখে নিসাব পরিমাণ হলে তার উপর যাকাত দিতে হয়। তবে ভাড়ার সম্পত্তি নিজে যাকাতযোগ্য নয়।
যাকাতের হার এবং হিসাব পদ্ধতি
যাকাতের সাধারণ হার হলো শতকরা আড়াই ভাগ বা চল্লিশ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ যদি কারো কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে এবং এক বছর অতিবাহিত হয়, তাহলে মোট সম্পদের আড়াই শতাংশ যাকাত হিসেবে প্রদান করতে হবে।
হিসাবের সহজ উপায় হলো মোট সম্পদকে চল্লিশ দিয়ে ভাগ করা। যেমন কারো কাছে যদি চার লাখ টাকা থাকে, তাহলে চার লাখকে চল্লিশ দিয়ে ভাগ করলে যাকাতের পরিমাণ হবে দশ হাজার টাকা।
কৃষিজাত ফসলের ক্ষেত্রে যদি প্রাকৃতিক বৃষ্টির পানিতে চাষ হয় তাহলে দশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ দশ শতাংশ এবং যদি কৃত্রিম সেচের মাধ্যমে চাষ হয় তাহলে বিশ ভাগের এক ভাগ অর্থাৎ পাঁচ শতাংশ যাকাত দিতে হয়।
যাকাত হিসাবের সময় কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। প্রথমত, বছরের শুরুতে এবং শেষে সম্পদের পরিমাণ নিসাবের সমান বা বেশি থাকতে হবে। মাঝখানে কমে গেলেও সমস্যা নেই। দ্বিতীয়ত, সকল প্রকার সম্পদ একত্র করে মোট হিসাব করতে হয়। তৃতীয়ত, যাকাত হিসাবের পূর্বে সকল প্রকার পরিশোধযোগ্য ঋণ বাদ দিতে হবে।
আধুনিক যুগে যাকাত ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে সহজেই যাকাতের পরিমাণ নির্ণয় করা যায়। তবে জটিল ক্ষেত্রে একজন ইসলামী স্কলার বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।
যাকাত প্রদানের খাত এবং উপযুক্ত ব্যক্তি
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা যাকাত বিতরণের আটটি নির্দিষ্ট খাত উল্লেখ করেছেন। সূরা তাওবার একটি আয়াতে এই খাতগুলো স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। যাকাত এই নির্ধারিত খাত ছাড়া অন্য কোথাও ব্যয় করা যাবে না।
ফকির: যাদের কোনো সম্পদ নেই বা অতি সামান্য সম্পদ আছে যা দিয়ে তাদের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ হয় না। এরা যাকাত পাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার।
মিসকিন: যারা নিজেদের ভরণপোষণের জন্য অন্যের সাহায্যের মুখাপেক্ষী। তাদের কিছু সম্পদ থাকলেও তা যথেষ্ট নয়।
যাকাত আদায়কারী: যারা যাকাত সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং বিতরণের দায়িত্ব পালন করে তাদের বেতন যাকাত থেকে দেওয়া যায়। তবে তাদের কাজের বিনিময়ে ন্যায়সঙ্গত পারিশ্রমিক হতে হবে।
নও মুসলিম: যারা সদ্য ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং তাদের ঈমান মজবুত করার জন্য বা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য তাদেরকে যাকাত প্রদান করা যায়।
দাসমুক্তি: দাসত্বের যুগে ক্রীতদাসদের মুক্তির জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যেত। বর্তমানে এই খাতটি প্রাসঙ্গিক নয়, তবে কিছু আলেমের মতে বন্দীমুক্তি বা মানবিক সাহায্যে এটি ব্যবহার করা যায়।
ঋণগ্রস্ত: যারা বৈধ কারণে ঋণগ্রস্ত এবং তা পরিশোধে অক্ষম, তাদের ঋণ পরিশোধে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যায়। তবে অপব্যয় বা অবৈধ কাজের জন্য করা ঋণ পরিশোধে সাহায্য করা যাবে না।
আল্লাহর পথে জিহাদকারী: ইসলামের জন্য সংগ্রামরত ব্যক্তি, ইসলামী শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত ব্যক্তি এবং ধর্মীয় কাজে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিদের সাহায্যে যাকাত ব্যয় করা যায়।
মুসাফির: সফররত অবস্থায় অসহায় হয়ে পড়া ব্যক্তি যার নিজ দেশে সম্পদ থাকলেও সফরকালে তার কাছে অর্থ নেই, তাকে যাকাত দেওয়া যায়।
যাদেরকে যাকাত দেওয়া যায় না তাদের মধ্যে রয়েছে: নিজের মাতা-পিতা, দাদা-দাদি, সন্তান-সন্তানাদি, স্বামী-স্ত্রী, ধনী ব্যক্তি, অমুসলিম এবং হাশেমী বংশের লোক।
যাকাত আদায়ের সময় এবং পদ্ধতি
যাকাত আদায়ের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। যে মাসে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং এক বছর পূর্ণ হয়েছে, সেই সময় থেকেই যাকাত আদায় করা ফরজ। তবে অনেকে রমজান মাসে যাকাত আদায় করেন কারণ এই মাসে নেকির সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।
যাকাত বিলম্বে আদায় করা গুনাহের কাজ। তবে কারো যদি অসুবিধা থাকে তাহলে সামর্থ্য অনুযায়ী কিস্তিতে প্রদান করা যেতে পারে। আবার প্রয়োজনে বছর পূর্ণ হওয়ার আগেও যাকাত আদায় করা জায়েজ আছে।
যাকাত প্রদানের উত্তম পদ্ধতি হলো নিজ হাতে অভাবগ্রস্তদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এতে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি হয় এবং সামাজিক বন্ধন মজবুত হয়। তবে বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেও যাকাত প্রদান করা যায়।
যাকাত গোপনে প্রদান করা উত্তম যাতে গ্রহীতা লজ্জিত না হয় এবং দাতার মধ্যে অহংকার সৃষ্টি না হয়। তবে প্রকাশ্যে প্রদান করলেও অসুবিধা নেই যদি তা অন্যদের উৎসাহিত করার জন্য হয়।
যাকাত প্রদানের সময় নিয়ত করা অত্যাবশ্যক। নিয়ত ছাড়া যাকাত আদায় হবে না এবং তা সাধারণ দানে পরিণত হবে। মনে মনে বা মুখে এই কথা বলা যে এই অর্থ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যাকাত হিসেবে প্রদান করছি।
যাকাতের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
যাকাত ইসলামী অর্থনীতির একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য যা সমাজে ব্যাপক ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি শুধুমাত্র দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা দারিদ্র্য বিমোচন এবং সম্পদের ন্যায্য বণ্টনে কার্যকর ভূমিকা পালন করে।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাত ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমায়। যখন ধনী ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে একটি অংশ গরিবদের দেয়, তখন সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শ্রেণী বৈষম্য হ্রাস পায়। এটি সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা, সহানুভূতি এবং সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যাকাত অর্থ সঞ্চালন বৃদ্ধি করে। ধনীদের কাছে জমা থাকা অর্থ যাকাতের মাধ্যমে দরিদ্রদের হাতে পৌঁছায় এবং তারা সেই অর্থ ব্যয় করে, যা বাজারে চাহিদা বৃদ্ধি করে এবং অর্থনীতিকে গতিশীল রাখে। এটি মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক।
যাকাত ব্যবস্থা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হলে চরম দারিদ্র্য দূর করা সম্ভব। ইসলামী ইতিহাসে এমন সময় এসেছিল যখন মুসলিম সমাজে যাকাত নেওয়ার মতো কোনো গরিব ছিল না। খলিফা উমর ইবনে আবদুল আজিজের শাসনামলে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল।
যাকাত শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং দক্ষতা উন্নয়নেও বিনিয়োগ করা যায়। অভাবী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা খরচ, রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় এবং বেকারদের প্রশিক্ষণ প্রদানে যাকাতের অর্থ ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান তৈরি করা সম্ভব।
যাকাত এবং আধুনিক যুগের চ্যালেঞ্জ
আধুনিক যুগে যাকাত ব্যবস্থা বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, অনেকে যাকাতের গুরুত্ব এবং নিয়মকানুন সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখেন না। শিক্ষার অভাবে অনেকে যাকাত আদায় করেন না বা ভুল পদ্ধতিতে আদায় করেন।
দ্বিতীয়ত, আধুনিক অর্থনৈতিক লেনদেনের জটিলতার কারণে যাকাত হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে। শেয়ার বাজার, বিমা, পেনশন ফান্ড, ক্রিপ্টোকারেন্সি ইত্যাদি নতুন ধরনের সম্পদের ক্ষেত্রে যাকাতের বিধান নিয়ে স্পষ্টতা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক সময় যাকাতের অর্থ সঠিক খাতে ব্যয় না হয়ে অপচয় বা দুর্নীতির শিকার হয়।
চতুর্থত, বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। বিভিন্ন দেশে যাকাত ব্যবস্থাপনার ভিন্ন ভিন্ন পদ্ধতি প্রচলিত, যা সামগ্রিক কার্যকারিতা হ্রাস করে।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাপক সচেতনতা কর্মসূচি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, স্বচ্ছ প্রতিষ্ঠান গঠন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যাকাত ক্যালকুলেটর, অনলাইন পেমেন্ট এবং রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সিস্টেম তৈরি করে যাকাত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা সম্ভব।
যাকাত না দেওয়ার পরিণতি
যাকাত ফরজ হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তি যাকাত প্রদান করে না তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যারা স্বর্ণ-রূপা জমা করে রাখে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না, তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।
হাদিসে বর্ণিত আছে যে কিয়ামতের দিন যাকাত না দেওয়া সম্পদকে আগুনে উত্তপ্ত করে তার দ্বারা মালিকের কপাল, পার্শ্ব এবং পিঠে দাগ দেওয়া হবে। এই শাস্তি পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান একটি দিন পর্যন্ত চলতে থাকবে।
দুনিয়াতেও যাকাত না দেওয়ার কারণে বিভিন্ন বিপদাপদ এবং সম্পদে বরকত না হওয়ার সমস্যা দেখা দেয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে জাতি যাকাত দেয় না, আল্লাহ তাদের উপর থেকে বৃষ্টি বন্ধ করে দেন এবং অনাবৃষ্টি ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়।
সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকেও যাকাত না দেওয়া ক্ষতিকর। এতে সমাজে বৈষম্য বৃদ্ধি পায়, গরিব-ধনীর মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয় এবং সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ইতিহাসে দেখা গেছে যেসব সমাজে যাকাত ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, সেখানে অপরাধ, চুরি, ডাকাতি এবং সামাজিক অশান্তি বৃদ্ধি পেয়েছে।
যাকাত এবং সাদাকাহর পার্থক্য
অনেকে যাকাত এবং সাদাকাহকে এক মনে করেন, কিন্তু এ দুটির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যাকাত একটি ফরজ ইবাদত যা নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের মালিকের উপর বাধ্যতামূলক। অপরদিকে সাদাকাহ হলো স্বেচ্ছায় প্রদত্ত দান যা কোনো বাধ্যবাধকতা নয়।
যাকাতের জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ এবং এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত। কিন্তু সাদাকাহ যেকোনো সময় যেকোনো পরিমাণে দেওয়া যায়। যাকাত নির্দিষ্ট আট খাতে ব্যয় করতে হয়, কিন্তু সাদাকাহ যেকোনো ভালো কাজে ব্যয় করা যায়।
যাকাত প্রদানে নিয়ত করা আবশ্যক এবং তা যাকাত হিসেবেই উল্লেখ করতে হয়। সাদাকাহ নীরবে বা প্রকাশ্যে যেকোনোভাবে দেওয়া যায়। যাকাত না দিলে গুনাহ হয় এবং পরবর্তীতে তা আদায় করা ফরজ থেকে যায়। কিন্তু সাদাকাহ না দিলে কোনো গুনাহ হয় না।
তবে উভয়টিই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম এবং সমাজসেবার গুরুত্বপূর্ণ উপায়। যাকাত আদায়ের পাশাপাশি নফল সাদাকাহ করা অত্যন্ত পুণ্যের কাজ এবং তা সম্পদে বরকত বৃদ্ধি করে।
যাকাত সংক্রান্ত সাধারণ ভুল ধারণা
যাকাত সম্পর্কে সমাজে কিছু ভুল ধারণা প্রচলিত যা সংশোধন করা প্রয়োজন। অনেকে মনে করেন শুধু রমজান মাসেই যাকাত দিতে হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যে মাসে সম্পদের এক বছর পূর্ণ হবে সেই মাসেই যাকাত ফরজ হয়। তবে রমজানে দিলে বেশি সওয়াব পাওয়া যায় বলে অনেকে সেই সময় দেন।
কেউ কেউ মনে করেন যাকাত শুধু মসজিদ বা মাদ্রাসায় দিতে হয়। কিন্তু যাকাতের নির্ধারিত আট খাতে সরাসরি গরিব-অসহায়দের দেওয়াই উত্তম। মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা সাধারণত জায়েজ নয়, যদিও সেখানকার গরিব ছাত্র-শিক্ষকদের সাহায্যে দেওয়া যায়।
অনেকে ভাবেন ব্যবহৃত স্বর্ণালংকারে যাকাত নেই। এ বিষয়ে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ আলেমের মতে নিসাব পরিমাণ হলে ব্যবহৃত স্বর্ণালংকারেও যাকাত দিতে হয়।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো নিজের আত্মীয়-স্বজনকে যাকাত দেওয়া যায় না। বাস্তবে পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, সন্তান-সন্তানাদি এবং স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্যান্য গরিব আত্মীয়দের যাকাত দেওয়া যায় এবং তা দ্বিগুণ সওয়াবের কারণ।
কেউ কেউ মনে করেন একবার যাকাত দিলে আর দিতে হয় না। কিন্তু প্রতি বছর যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে তাহলে প্রতি বছরই যাকাত দিতে হবে।
যাকাত ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রের ভূমিকা
ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থায় যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের দায়িত্ব সরকারের। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং খোলাফায়ে রাশেদীনের যুগে রাষ্ট্রীয় তত্ত্বাবধানে যাকাত আদায় করা হতো। বাইতুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে যাকাতের অর্থ জমা হতো এবং সেখান থেকে প্রাপকদের মধ্যে বিতরণ করা হতো।
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার সুবিধা হলো স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুষম বিতরণ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেস থেকে প্রকৃত অভাবীদের চিহ্নিত করা, দুর্নীতি রোধ করা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ হয়।
বর্তমানে কিছু মুসলিম দেশে যাকাত বোর্ড বা ফাউন্ডেশন রয়েছে যারা যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণের কাজ করে। সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান এবং সুদানে সরকারিভাবে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা রয়েছে। বাংলাদেশেও যাকাত তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা না থাকলে ব্যক্তিগতভাবে যাকাত আদায় করা এবং সরাসরি প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। গুরুত্বপূর্ণ হলো যাকাত যেন সঠিক খাতে এবং সঠিক সময়ে আদায় হয়।
যাকাত: আত্মিক পবিত্রতার মাধ্যম
যাকাত শুধুমাত্র একটি আর্থিক লেনদেন নয়, বরং এটি আত্মিক পবিত্রতা এবং নৈতিক উন্নতির একটি শক্তিশালী মাধ্যম। যাকাত প্রদানের মাধ্যমে একজন মুমিন তার হৃদয়কে কৃপণতা, লোভ এবং অহংকার থেকে মুক্ত করে।
সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। যাকাত এই আসক্তি কমাতে সাহায্য করে এবং মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃত মালিক আল্লাহ এবং আমরা শুধু তাঁর আমানতদার। নিয়মিত যাকাত প্রদান করলে সম্পদের প্রতি মোহ কমে এবং আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা বৃদ্ধি পায়।
যাকাত দাতার মধ্যে কৃতজ্ঞতাবোধ সৃষ্টি করে। যখন সে তার সম্পদ থেকে অন্যদের সাহায্য করে, তখন সে উপলব্ধি করে আল্লাহ তাকে কত বড় নিয়ামত দিয়েছেন। এই উপলব্ধি তাকে আরও বেশি শোকরগুজার করে তোলে।
যাকাত প্রদানকারী সমাজে সম্মানিত হয় এবং মানুষের দোয়া লাভ করে। আখিরাতে তার জন্য বিশাল প্রতিদান রয়েছে। হাদিসে বলা হয়েছে যে যাকাত গুনাহসমূহ নিভিয়ে দেয় যেমন পানি আগুন নিভিয়ে দেয়।
যাকাত আদায়ের মাধ্যমে তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর উপর ভরসার গুণ বৃদ্ধি পায়। দাতা বুঝতে পারে যে যা দিয়ে দেওয়া হয়েছে তা ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা শুধুমাত্র আল্লাহর। এই বিশ্বাস তার ঈমানকে মজবুত করে।
উপসংহার
যাকাত ইসলামের একটি অনন্য এবং পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা যা ধর্মীয়, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক সকল দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু দরিদ্রদের সাহায্যের একটি মাধ্যম নয়, বরং একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা গড়ার শক্তিশালী হাতিয়ার। যাকাত ধনীদের সম্পদে গরিবদের অধিকার নিশ্চিত করে এবং সমাজে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করে।
পবিত্র কুরআন এবং হাদিসে যাকাতের যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট যে এটি একজন মুসলমানের জীবনে কতটা অপরিহার্য। নামাজের পরেই যাকাতের স্থান এবং বহু আয়াতে এ দুটিকে একসাথে উল্লেখ করা হয়েছে। যারা যাকাত আদায় করে তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে এবং জান্নাতের উত্তরাধিকারী হয়।
আধুনিক যুগে যাকাত ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার জন্য প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি, সঠিক শিক্ষা প্রদান এবং স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে যাকাত সংগ্রহ ও বিতরণকে আরও সহজ এবং কার্যকর করা সম্ভব। সরকার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষ সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় যাকাত ব্যবস্থা তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বিকশিত হতে পারে।
প্রতিটি সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত যাকাতের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং সঠিক নিয়মে যথাসময়ে তা আদায় করা। এটি শুধু আল্লাহর হুকুম পালন নয়, বরং সমাজের প্রতি দায়িত্ব পালন এবং নিজের আত্মশুদ্ধির একটি মাধ্যম। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আমরা একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক এবং সমৃদ্ধ সমাজ গড়তে পারি যেখানে কেউ অভুক্ত থাকবে না এবং সবাই সম্মানের সাথে জীবনযাপন করতে পারবে।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নিয়মিত যাকাত আদায় করার এবং তাঁর বিধান মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমীন
