তারাবির নামাজ পড়ার নিয়ম ও দোয়া
— উড্ডয়ন
ছবি : সংগৃহিত
রমজান মাসের একটি বিশেষ ইবাদত হলো তারাবির নামাজ। এটি সুন্নতে মুয়াক্কাদা নামাজ যা এশার নামাজের পর পড়া হয়। তারাবির নামাজ রমজানের রাতগুলোকে আলোকিত করে এবং মুমিনদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে। এই আর্টিকেলে আমরা তারাবির নামাজের নিয়ত, পদ্ধতি, দোয়া এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মাসায়েল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করব।
তারাবির নামাজ কী এবং এর গুরুত্ব
তারাবি শব্দটি আরবি 'তারবিহা' থেকে এসেছে যার অর্থ বিশ্রাম নেওয়া। প্রতি চার রাকাত পর পর বিশ্রাম নেওয়া হয় বলে এই নামাজকে তারাবি বলা হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই নামাজ পড়েছেন এবং সাহাবিদের উৎসাহিত করেছেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় রমজান মাসে রাতে নামাজ পড়বে, তার অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। এই হাদিস থেকে তারাবি নামাজের ফজিলত সুস্পষ্ট।
হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু খলিফা হওয়ার পর মসজিদে জামাতের সঙ্গে তারাবি নামাজের ব্যবস্থা করেন। তিনি উবাই ইবনে কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইমাম নিযুক্ত করেন এবং এভাবে তারাবি নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায়ের রেওয়াজ প্রতিষ্ঠিত হয়। আজও পৃথিবীর সব মসজিদে এই সুন্নত অনুসরণ করা হয়।
তারাবির নামাজের রাকাত সংখ্যা
তারাবির নামাজ কত রাকাত পড়তে হবে এই নিয়ে আলেমদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ফকিহ এবং চার মাজহাবের ইমামগণ বিশ রাকাত তারাবি পড়াকে সুন্নত বলেছেন।
বিশ রাকাত তারাবি
হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি এবং হাম্বলি মাজহাবের মতে তারাবির নামাজ বিশ রাকাত। এই মত সাহাবায়ে কেরাম এবং তাবেয়িনদের যুগ থেকে চলে আসছে। হজরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতকালে সাহাবিগণ বিশ রাকাত তারাবি পড়তেন।
প্রতি চার রাকাত পর পর সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম নেওয়া হয়। এই সময় তাসবিহ পড়া বা কুরআন তেলাওয়াত করা সুন্নত। বিশ রাকাত তারাবির পর তিন রাকাত বিতর নামাজ পড়া হয়।
আট রাকাত তারাবি
কিছু আলেমের মতে আট রাকাত তারাবি পড়াও জায়েজ। তারা মনে করেন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাধারণত আট রাকাত তাহাজ্জুদ পড়তেন যা রমজানে তারাবি হিসেবে গণ্য হতো। তবে বিশ রাকাত পড়াই অধিক প্রচলিত এবং অনেক আলেমের কাছে উত্তম।
তারাবির নামাজের নিয়ত
নিয়ত অন্তরের সংকল্প। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয় তবে উচ্চারণ করলে মনোযোগ বৃদ্ধি পায়। তারাবি নামাজের জন্য নিম্নোক্ত নিয়ত করা যায়:
আরবিতে নিয়ত
نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَالٰى رَكْعَتَىْ صَلَاةِ التَّرَاوِيحِ سُنَّةُ رَسُوْلِ اللَّهِ تَعَالٰى مُتَوَجِّهًا اِلٰى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِيفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ
বাংলায় নিয়ত
আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর জন্য দুই রাকাত তারাবির সুন্নত নামাজ পড়ার নিয়ত করলাম, আল্লাহু আকবর।
ইমামের পেছনে নামাজ পড়লে নিয়তে এটা যোগ করতে হবে যে আপনি ইমামের পেছনে নামাজ পড়ছেন। যেমন: আমি কিবলামুখী হয়ে আল্লাহর জন্য এই ইমামের পেছনে দুই রাকাত তারাবির সুন্নত নামাজ পড়ার নিয়ত করলাম।
তারাবির নামাজের নিয়ম
তারাবির নামাজ দুই রাকাত করে পড়তে হয়। প্রতি দুই রাকাতে একবার সালাম ফেরাতে হবে। নিচে ধাপে ধাপে তারাবি নামাজের নিয়ম বর্ণনা করা হলো:
প্রথম রাকাত
• নিয়ত করে তাকবিরে তাহরিমা বলুন এবং হাত বাঁধুন
• সানা পড়ুন: سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالٰى جَدُّكَ وَلَا اِلٰهَ غَيْرُكَ
• আউযুবিল্লাহ এবং বিসমিল্লাহ পড়ুন
• সুরা ফাতিহা পড়ুন
• সুরা ফাতিহার সাথে অন্য একটি সুরা বা কমপক্ষে তিন আয়াত মিলিয়ে পড়ুন
• রুকুতে যান এবং তাসবিহ পড়ুন: سُبْحَانَ رَبِّىَ الْعَظِيمِ (কমপক্ষে তিনবার)
• রুকু থেকে উঠে سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهٗ বলুন এবং সোজা হয়ে দাঁড়ান
• দাঁড়ানো অবস্থায় رَبَّنَا لَكَ الْحَمْدُ বলুন
• সিজদায় যান এবং তাসবিহ পড়ুন: سُبْحَانَ رَبِّىَ الْأَعْلٰى (কমপক্ষে তিনবার)
• প্রথম সিজদা থেকে উঠে বসুন এবং দ্বিতীয় সিজদা করুন একই তাসবিহ সহ
দ্বিতীয় রাকাত
• দ্বিতীয় সিজদা থেকে উঠে দাঁড়ান
• বিসমিল্লাহ পড়ুন এবং সুরা ফাতিহা পড়ুন
• সুরা ফাতিহার সাথে অন্য সুরা বা আয়াত মিলিয়ে পড়ুন
• রুকু এবং সিজদা প্রথম রাকাতের মতো করুন
• দ্বিতীয় সিজদা শেষে বসুন এবং তাশাহুদ পড়ুন
• দরুদ শরিফ পড়ুন
• দোয়া মাসুরা পড়ুন (যদি জানা থাকে)
• ডানে এবং বামে সালাম ফেরান
এভাবে দুই রাকাত করে মোট বিশ রাকাত তারাবি পড়তে হবে। প্রতি চার রাকাত পর একটু বিশ্রাম নেওয়া সুন্নত।
তারাবির নামাজের গুরুত্বপূর্ণ দোয়া সমূহ
সানা
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ وَتَبَارَكَ اسْمُكَ وَتَعَالٰى جَدُّكَ وَلَا اِلٰهَ غَيْرُكَ
উচ্চারণ: সুবহানাকা আল্লাহুম্মা ওয়া বিহামদিকা ওয়া তাবারাকাসমুকা ওয়া তাআলা জাদ্দুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।
অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি পবিত্র, আপনার প্রশংসা আপনারই, আপনার নাম বরকতময়, আপনার মর্যাদা অতি উচ্চ এবং আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই।
তাশাহুদ
اَلتَّحِيَّاتُ لِلَّهِ وَالصَّلَوَاتُ وَالطَّيِّبَاتُ، اَلسَّلَامُ عَلَيْكَ اَيُّهَا النَّبِيُّ وَرَحْمَةُ اللَّهِ وَبَرَكَاتُهٗ، اَلسَّلَامُ عَلَيْنَا وَعَلٰى عِبَادِ اللَّهِ الصَّالِحِينَ، اَشْهَدُ اَنْ لَّا اِلٰهَ اِلَّا اللَّهُ وَاَشْهَدُ اَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهٗ وَرَسُولُهٗ
উচ্চারণ: আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াসসালাওয়াতু ওয়াততাইয়্যিবাতু। আসসালামু আলাইকা আইয়্যুহান্নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু। আসসালামু আলাইনা ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালিহিন। আশহাদু আল লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
দরুদ শরিফ
اَللَّهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰٓى اٰلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰٓى اِبْرَاهِيمَ وَعَلٰٓى اٰلِ اِبْرَاهِيمَ اِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ، اَللَّهُمَّ بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ وَّعَلٰٓى اٰلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰٓى اِبْرَاهِيمَ وَعَلٰٓى اٰلِ اِبْرَاهِيمَ اِنَّكَ حَمِيدٌ مَّجِيدٌ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা সাল্লাইতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিউ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদিন কামা বারাকতা আলা ইবরাহিমা ওয়া আলা আলি ইবরাহিমা ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।
দোয়া মাসুরা
اَللَّهُمَّ اِنِّىْ ظَلَمْتُ نَفْسِىْ ظُلْمًا كَثِيرًا وَّلَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّا اَنْتَ، فَاغْفِرْ لِىْ مَغْفِرَةً مِّنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِىْ اِنَّكَ اَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ
উচ্চারণ: আল্লাহুম্মা ইন্নি জালামতু নাফসি জুলমান কাসিরাও ওয়ালা ইয়াগফিরুজ জুনুবা ইল্লা আনতা ফাগফিরলি মাগফিরাতাম মিন ইনদিকা ওয়ারহামনি ইন্নাকা আনতাল গাফুরুর রাহিম।
অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আমার নফসের উপর অনেক জুলুম করেছি। আপনি ছাড়া কেউ গুনাহ মাফ করতে পারে না। তাই আপনার পক্ষ থেকে আমাকে মাফ করে দিন এবং আমার প্রতি দয়া করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল ও দয়াবান।
তারাবির নামাজের ফজিলত
তারাবির নামাজের অসংখ্য ফজিলত রয়েছে। কুরআন এবং হাদিসে এর গুরুত্ব বর্ণিত হয়েছে। নিচে কিছু প্রধান ফজিলত উল্লেখ করা হলো:
গুনাহ মাফ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমান এবং সওয়াবের আশায় রমজানে রাতের নামাজ পড়বে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। এটি তারাবি নামাজের সবচেয়ে বড় ফজিলত।
আল্লাহর নৈকট্য লাভ
তারাবির নামাজ বান্দাকে আল্লাহর কাছাকাছি নিয়ে যায়। রমজানের রাতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে নামাজ পড়া এবং কুরআন তেলাওয়াত শোনা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক মজবুত করে। এটি আত্মিক প্রশান্তি এবং অন্তরের পরিশুদ্ধি আনে।
কুরআন তেলাওয়াতের সওয়াব
তারাবির নামাজে পুরো কুরআন শোনার সুযোগ পাওয়া যায়। অনেক মসজিদে এক মাসে খতম তারাবি পড়া হয়। কুরআনের প্রতিটি হরফে দশটি সওয়াব রয়েছে। তাই তারাবিতে কুরআন শোনা এবং মনোযোগ দেওয়া অসংখ্য সওয়াবের কারণ।
জামাতে নামাজের ফজিলত
জামাতে নামাজ পড়ার ফজিলত একা পড়ার চেয়ে সাতাশ গুণ বেশি। তারাবির নামাজ মসজিদে জামাতের সাথে পড়া সুন্নত। এতে মুসল্লিদের মধ্যে ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্ব বৃদ্ধি পায়।
শবেকদরের প্রস্তুতি
তারাবির নামাজ নিয়মিত পড়লে শবেকদরে ইবাদত করার জন্য শারীরিক এবং মানসিক প্রস্তুতি হয়ে যায়। যারা নিয়মিত তারাবি পড়েন তাদের জন্য রমজানের শেষ দশকে রাত জেগে ইবাদত করা সহজ হয়।
তারাবির নামাজের সময়
তারাবির নামাজের সঠিক সময় হলো এশার ফরজ এবং সুন্নত নামাজের পর থেকে শুরু করে ফজরের ওয়াক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত। তবে কিছু নিয়ম এবং পছন্দনীয় সময় রয়েছে যা জানা জরুরি।
উত্তম সময়
এশার নামাজের পরপরই তারাবির নামাজ পড়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম এশার নামাজের পর তারাবি পড়তেন। বেশিরভাগ মসজিদে এই নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
তবে যারা এশার সময় মসজিদে যেতে পারেন না তারা রাতের যেকোনো সময় বাসায় তারাবি পড়তে পারবেন। রাত যত দেরি হবে তত ভালো কারণ রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহ বান্দার কাছে এসে দোয়া কবুল করেন।
বিতর নামাজের সাথে সম্পর্ক
তারাবির নামাজের পর বিতর নামাজ পড়তে হয়। বিতর হলো রাতের নামাজের সমাপ্তি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বিতরকে তোমাদের রাতের শেষ নামাজ বানাও। তাই তারাবির পর বিতর পড়া এবং এরপর আর কোনো নফল না পড়া উত্তম।
তবে কেউ যদি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ার ইচ্ছা করেন তাহলে তারাবির পর বিতর না পড়ে তাহাজ্জুদের পর বিতর পড়তে পারেন। এক রাতে দুইবার বিতর পড়া যায় না।
মহিলাদের তারাবির নামাজ
মহিলাদের জন্যও তারাবির নামাজ সুন্নতে মুয়াক্কাদা। তারাও পুরুষদের মতো বিশ রাকাত তারাবি এবং তিন রাকাত বিতর পড়বেন। তবে মহিলাদের জন্য কিছু বিশেষ নিয়ম রয়েছে।
বাসায় পড়া উত্তম
মহিলাদের জন্য বাসায় নামাজ পড়া উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহিলাদের নামাজ ঘরের ভেতরের কামরায় পড়া মসজিদের চেয়ে উত্তম। তাই মহিলারা বাসায় একা বা পরিবারের অন্য মহিলাদের সাথে তারাবি পড়তে পারেন।
মসজিদে যাওয়া
যদি কোনো মহিলা মসজিদে গিয়ে তারাবি পড়তে চান এবং পরিবারের অনুমতি থাকে তাহলে তিনি মসজিদে যেতে পারবেন। তবে সম্পূর্ণ পর্দার সাথে এবং সুগন্ধি ছাড়া যেতে হবে। মসজিদে মহিলাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কুরআন না জানলে
যদি কোনো মহিলা কুরআন না জানেন বা মুখস্থ না থাকে তাহলে তিনি কুরআন দেখে পড়তে পারবেন। হাতে কুরআন নিয়ে নামাজ পড়া জায়েজ আছে। অথবা ছোট ছোট সুরা দিয়ে তারাবি পড়তে পারেন যেগুলো জানা আছে।
তারাবি নামাজে কুরআন খতম
অনেক মসজিদে রমজান মাসে তারাবির নামাজে পুরো কুরআন খতম করা হয়। এটি একটি উত্তম আমল এবং সাহাবায়ে কেরামের যুগ থেকে চলে আসছে। তবে কুরআন খতম করা ফরজ নয়, সুন্নত।
খতমের পদ্ধতি
সাধারণত তিরিশ দিনে তিরিশ পারা শেষ করার হিসাব করা হয়। প্রতিদিন তারাবিতে এক পারা তেলাওয়াত করা হয় যাতে রমজানের শেষে পুরো কুরআন খতম হয়ে যায়। কিছু মসজিদে দশ দিনে এক খতম বা পনের দিনে এক খতম করা হয়।
ধীরে তেলাওয়াত উত্তম
কুরআন খতম করার চেয়ে ধীরে এবং সুন্দরভাবে তেলাওয়াত করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাড়াহুড়া করে তেলাওয়াত করলে মুসল্লিরা মনোযোগ দিতে পারেন না এবং তেলাওয়াতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, কুরআন ধীরে ধীরে স্পষ্টভাবে পড়ো।
মুসল্লিদের শোনার গুরুত্ব
তারাবির নামাজে মুসল্লিদের উচিত মনোযোগ দিয়ে কুরআন তেলাওয়াত শোনা। যখন কুরআন তেলাওয়াত হয় তখন চুপ থেকে শোনা এবং অর্থ বোঝার চেষ্TA করা ফরজ। এতে অন্তরে কুরআনের প্রভাব পড়ে এবং আমল করার তাওফিক হয়।
তারাবিতে সাধারণ ভুল ত্রুটি
তারাবির নামাজে কিছু সাধারণ ভুল হয়ে থাকে যেগুলো এড়িয়ে চলা উচিত। এই ভুলগুলো সংশোধন করলে নামাজ আরও উত্তম হবে।
তাড়াহুড়া করা
অনেকে তারাবির নামাজ খুব তাড়াতাড়ি শেষ করার চেষ্টা করেন। রুকু সিজদা ঠিকমতো না করে দ্রুত উঠে যান। এটি নামাজের মূল উদ্দেশ্যের পরিপন্থী। প্রতিটি রুকন ধীরে স্থিরভাবে করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাড়াহুড়ায় নামাজ পড়া ব্যক্তিকে নামাজ আবার পড়তে বলেছিলেন।
খুব জোরে তেলাওয়াত করা
ইমাম সাহেব অনেক সময় খুব উঁচু আওয়াজে তেলাওয়াত করেন যাতে পাশের মুসল্লিরা বিরক্ত হন। তেলাওয়াত এমনভাবে করতে হবে যাতে সবাই শুনতে পায় কিন্তু কষ্ট না হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা একে অপরের উপর উঁচু আওয়াজে কুরআন পড়ে কষ্ট দিও না।
মনোযোগ না দেওয়া
অনেক মুসল্লি তারাবির নামাজে মনোযোগ দেন না। এদিক সেদিক তাকান, কথা বলেন বা মোবাইল ব্যবহার করেন। এগুলো সবই নামাজের খুশু নষ্ট করে। নামাজে পূর্ণ মনোযোগ দেওয়া ফরজ। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, যখন কুরআন পড়া হয় তখন মনোযোগ দিয়ে শোনো এবং চুপ থাকো।
বিশ্রামে বেশি সময় নেওয়া
প্রতি চার রাকাত পর যে বিশ্রাম নেওয়া হয় তা খুব সংক্ষিপ্ত হওয়া উচিত। কেউ কেউ এই সময় অনেক লম্বা করে ফেলেন এবং অহেতুক গল্প করেন। বিশ্রামের সময় তাসবিহ পড়া বা কুরআন তেলাওয়াত করা উচিত।
বিতর ছেড়ে দেওয়া
কেউ কেউ তারাবি পড়ার পর বিতর না পড়ে চলে যান। বিতর নামাজ ওয়াজিব এবং তারাবির সাথে পড়া উচিত। বিতর ছাড়া তারাবি অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
তারাবি নামাজের বিশেষ মাসায়েল
মুসাফিরের তারাবি
যে ব্যক্তি সফরে আছেন তিনিও তারাবি পড়বেন। তবে ফরজ নামাজ কসর করলেও তারাবি পুরো পড়তে হবে কারণ তারাবি সুন্নত নামাজ এবং সুন্নত কসর করা হয় না। মুসাফির চাইলে একা বা জামাতের সাথে তারাবি পড়তে পারেন।
রোগীর তারাবি
যে ব্যক্তি অসুস্থ এবং দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে পারছেন না তিনি বসে তারাবি পড়তে পারবেন। বসে পড়া সম্ভব না হলে শুয়ে ইশারায় নামাজ পড়া যায়। রোগীর জন্য শুধু ফাতিহা পড়ে বা ছোট সুরা দিয়ে তারাবি পড়াও জায়েজ। আল্লাহ তায়ালা কষ্ট চান না এবং সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না।
দেরিতে আসলে
যদি কেউ মসজিদে দেরিতে আসেন এবং কিছু রাকাত মিস হয়ে যায় তাহলে ইমামের সাথে যতটুকু পাবেন ততটুকু পড়বেন। এরপর ইমাম সালাম ফেরালে বাকি রাকাত একা পড়ে নেবেন। মিস হওয়া রাকাত পড়ার সময় শুধু ফাতিহা পড়লেও চলবে।
একা পড়লে
যদি কেউ বাসায় একা তারাবি পড়েন তাহলে তিনি চাইলে আট রাকাত বা বিশ রাকাত যেকোনো একটি পড়তে পারেন। কুরআন না জানলে ছোট ছোট সুরা বারবার পড়ে তারাবি পড়া যায়। একা পড়লে কুরআন হাতে নিয়েও পড়া যায়।
পরিবারের সাথে জামাত
বাসায় পরিবারের সদস্যদের নিয়ে জামাতে তারাবি পড়া উত্তম। স্বামী ইমাম হতে পারেন এবং স্ত্রী ও সন্তানরা মুক্তাদি হতে পারেন। এতে পরিবারে ইবাদতের পরিবেশ তৈরি হয় এবং সন্তানরা শিখতে পারে।
তারাবি নামাজে খুশু বৃদ্ধির উপায়
নামাজে খুশু মানে পূর্ণ মনোযোগ এবং বিনয়ের সাথে নামাজ পড়া। খুশু ছাড়া নামাজ আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। নিচে কিছু উপায় দেওয়া হলো যেগুলো তারাবিতে খুশু বৃদ্ধি করতে সাহায্য করবে।
কুরআনের অর্থ বোঝা
তারাবিতে যে সুরাগুলো বেশি পড়া হয় সেগুলোর অর্থ শিখে নিন। অর্থ জানলে তেলাওয়াত শোনার সময় মনোযোগ বৃদ্ধি পায় এবং অন্তরে প্রভাব পড়ে। প্রতিদিন কয়েকটি সুরার অর্থ শিখলে ধীরে ধীরে অনেক কিছু বোঝা যাবে।
দুনিয়াবি চিন্তা ত্যাগ করা
নামাজে দাঁড়ানোর আগে মনকে প্রস্তুত করুন। দুনিয়ার সব চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে দিন এবং ভাবুন যে আপনি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। নামাজের সময় মোবাইল বন্ধ করে রাখুন এবং এমন জায়গায় দাঁড়ান যেখানে কোনো বিঘ্ন নেই।
আয়াতের উপর চিন্তা করা
যখন ইমাম সাহেব আযাবের আয়াত পড়েন তখন আল্লাহর কাছে পানাহ চান। রহমতের আয়াত পড়লে রহমত কামনা করুন। জান্নাতের বর্ণনা শুনলে জান্নাতের আশা করুন। এভাবে তেলাওয়াতের সাথে সম্পৃক্ত হলে খুশু বৃদ্ধি পায়।
সিজদা লম্বা করা
সিজদায় বান্দা আল্লাহর সবচেয়ে কাছে থাকে। সিজদায় তাসবিহের পর দোয়া করুন। আল্লাহর কাছে নিজের সব প্রয়োজন পেশ করুন। সিজদায় দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সিজদায় অনেক সময় কাটাতেন।
নিয়মিত পড়া
প্রতিদিন তারাবি পড়ার অভ্যাস করুন। একদিন ছাড়লে মন শিথিল হয়ে যায়। নিয়মিত পড়লে নামাজে মনোযোগ দেওয়া সহজ হয় এবং ইবাদতে স্বাদ পাওয়া যায়। রমজানের প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত একটি দিনও বাদ না দিয়ে তারাবি পড়ার চেষ্টা করুন।
তারাবির পর করণীয়
তারাবি এবং বিতর নামাজ শেষ হওয়ার পর কিছু আমল করা সুন্নত এবং মুস্তাহাব। এই আমলগুলো করলে রাতের ইবাদত পরিপূর্ণ হয়।
তাসবিহ পড়া
নামাজের পর তেত্রিশবার সুবহানাল্লাহ, তেত্রিশবার আলহামদুলিল্লাহ এবং তেত্রিশবার আল্লাহু আকবর পড়া সুন্নত। এরপর একবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদির পড়া।
দোয়া করা
নামাজের পর দোয়া কবুলের বিশেষ সময়। তাই হাত তুলে আল্লাহর কাছে নিজের এবং উম্মতের জন্য দোয়া করুন। দুনিয়া এবং আখিরাতের কল্যাণ কামনা করুন। বিশেষ করে রমজানে গুনাহ মাফ এবং জান্নাত লাভের দোয়া করুন।
পানাহারের ব্যবস্থা
অনেক মসজিদে তারাবির পর সেহরির জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। এটি উত্তম আমল। মুসল্লিদের জন্য পানি এবং হালকা খাবারের ব্যবস্থা করলে অনেক সওয়াব হয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে রোজাদারকে ইফতার করায় তার রোজার সমান সওয়াব পাবে।
সেহরি খাওয়া
তারাবির পর বাসায় গিয়ে সেহরি খাওয়ার প্রস্তুতি নিন। সেহরি খাওয়া সুন্নত এবং এতে বরকত আছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সেহরি খাও কারণ এতে বরকত রয়েছে। সেহরি দেরিতে খাওয়া উত্তম তবে ফজরের আজান শোনার আগেই খাওয়া শেষ করতে হবে।
শেষ দশকের তারাবি
রমজানের শেষ দশ দিন বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই সময় লাইলাতুল কদর রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দশ দিন খুব বেশি ইবাদত করতেন।
বেশি ইবাদত করা
শেষ দশকে তারাবি আরও মনোযোগের সাথে পড়ুন। সম্ভব হলে মসজিদে ইতেকাফ করুন। রাত জেগে নফল ইবাদত করুন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দশ দিন নিজের কোমর শক্ত করে বেঁধে নিতেন এবং পরিবারকেও জাগাতেন।
লাইলাতুল কদরের দোয়া
শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে বিশেষভাবে এই দোয়াটি পড়ুন: اَللَّهُمَّ اِنَّكَ عَفُوٌّ تُحِبُّ الْعَفْوَ فَاعْفُ عَنِّىْ (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি)। অর্থ: হে আল্লাহ, আপনি ক্ষমাশীল, ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করে দিন।
কুরআন খতমের চেষ্টা
যদি এখনো পুরো কুরআন শুনেননি তাহলে শেষ দশকে চেষ্টা করুন পুরো কুরআন শোনার। মসজিদে তারাবিতে কুরআন শোনার পাশাপাশি বাসায় তেলাওয়াত করুন বা তেলাওয়াত শুনুন। রমজানে কুরআন খতম করা অনেক সওয়াবের কাজ।
উপসংহার
তারাবির নামাজ রমজান মাসের একটি বরকতময় ইবাদত। এটি শুধু শারীরিক একটি কাজ নয় বরং আত্মিক পরিশুদ্ধির মাধ্যম। সঠিক নিয়ত এবং পদ্ধতি মেনে তারাবি পড়লে আল্লাহর নৈকট্য লাভ হয় এবং গুনাহ মাফ হয়।
তারাবির নামাজ পড়ার সময় নিয়তে বিশুদ্ধতা, নামাজে খুশু, কুরআন তেলাওয়াতে মনোযোগ এবং দোয়ায় আন্তরিকতা থাকা জরুরি। প্রতিটি রাকাত যেন আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়। এভাবে পুরো রমজান তারাবি পড়লে রমজানের শেষে আপনি একজন পরিশুদ্ধ মানুষ হিসেবে বের হবেন।
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে নিয়মিত তারাবির নামাজ পড়ার তাওফিক দান করুন। আমাদের নামাজগুলো কবুল করুন এবং রমজানের বরকত থেকে আমাদের বঞ্চিত না করুন। আমিন।
