• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলা
Back

রচনা লিখুন : বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থানে নারীর অবদান

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উত্থানে নারীর অবদান

বাংলাদেশের ইতিহাস একটি অসাধারণ সংগ্রামের কাহিনী। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক যুগ পর্যন্ত এই ভূখণ্ডের উত্থানে নারীরা অপরিহার্য ভূমিকা পালন করেছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়, কিন্তু তার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া। ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন এবং সামাজিক উন্নয়ন—সর্বক্ষেত্রে নারীর অবদান অস্বীকার করা যায় না। নারীরা যোদ্ধা, সংগঠক, শিক্ষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং নেত্রী হিসেবে রাষ্ট্রের ভিত্তি মজবুত করেছেন। এই রচনায় আমরা বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব নারীর এই অবদানের ঐতিহাসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিকগুলো। আমাদের লক্ষ্য হলো দেখানো যে, বাংলাদেশের উত্থান শুধু পুরুষদের সংগ্রাম নয়, বরং নারী-পুরুষের যৌথ প্রচেষ্টার ফল।

ঐতিহাসিক পটভূমি: প্রাচীনকাল থেকে ভাষা আন্দোলন


বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উত্থানের শিকড় গভীর ঐতিহাসিক। প্রাচীন বাংলায় নারীরা সমাজের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন। পাল যুগে (৮ম-১২শ শতাব্দী) নারীরা শিক্ষা, শিল্প এবং ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশ নিতেন। রানী প্রিয়মুদা বা চন্দ্রবর্মণের মতো নারী শাসকরা রাজ্য পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন। মধ্যযুগে সুফি সাধিকা এবং লোককবি নারীরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন। কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রের উত্থান শুরু হয় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে।

১৯শ শতাব্দীর সামাজিক সংস্কার আন্দোলনে নারীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বেগম রোকেয়া সখাওয়াত হোসেন (১৮৮০-১৯৩২) নারী শিক্ষার পথিকৃৎ। তাঁর 'সুলতানার স্বপ্ন' (১৯০৫) গ্রন্থ নারী ক্ষমতায়নের দর্শন উপস্থাপন করে। তিনি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং পর্দা প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেন। এই সংস্কার বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে নারীরা অর্থনৈতিক সংগ্রামে যোগ দেন। গ্রামীণ নারীরা কৃষি, হস্তশিল্প এবং পরিবার পরিচালনায় অবদান রাখেন, যা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত করে।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উত্থানের প্রথম মাইলফলক। এই আন্দোলনে নারীরা সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সুফিয়া কামাল, হালিমা খাতুন, রাবেয়া খাতুন প্রমুখ মিছিলে নেতৃত্ব দেন। সুফিয়া কামাল (১৯১১-১৯৯৯) ভাষা সৈনিকদের সমর্থনে কবিতা লেখেন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর নারীরা প্রতিবাদ সভা আয়োজন করেন। এই আন্দোলন বাঙালি পরিচয়কে শক্তিশালী করে, যা ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পথ প্রশস্ত করে। ভাষা আন্দোলনে নারীর অংশগ্রহণ প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় নারীরা শুধু পর্দার অন্তরালে নন, বরং সামনে এসে লড়াই করতে পারেন।

মুক্তিযুদ্ধে নারীর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় উত্থানের চূড়ান্ত পর্যায়। এই যুদ্ধে নারীর অবদান অসামান্য। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারে লাখো নারী শরণার্থী হন, কিন্তু অনেকে যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। 'বীরাঙ্গনা' শব্দটি এই নারীদের জন্যই তৈরি হয়। প্রায় ৩০০০ নারী সরাসরি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেন। ক্যাপ্টেন সিতারা বেগম (জন্ম ১৯৪৮) মুক্তিযুদ্ধের প্রথম নারী ক্যাপ্টেন। তিনি সেক্টর ২-এ যুদ্ধ করেন এবং আহত যোদ্ধাদের চিকিৎসা করেন। তারা বেগম, ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী, লুৎফুন্নাহার লতা প্রমুখ নারী অস্ত্র হাতে শত্রুর মোকাবিলা করেন।

নারীরা গুপ্তচরবৃত্তিতে অসাধারণ দক্ষতা দেখান। গ্রামীণ নারীরা পাকিস্তানি সেনাদের গতিবিধি মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দিতেন। উদাহরণস্বরূপ, কুমিল্লার নারীরা গেরিলা অপারেশনে সহায়তা করেন। চিকিৎসা ক্ষেত্রে নার্স এবং ডাক্তাররা শরণার্থী শিবিরে সেবা দেন। ভারতের আগরতলা এবং কলকাতায় নারী স্বেচ্ছাসেবকরা হাসপাতাল চালান। খাদ্য সরবরাহে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামে লুকিয়ে রাখা খাদ্য মুক্তিযোদ্ধাদের দেওয়া হতো নারীদের মাধ্যমে।

যুদ্ধের অন্ধকার দিক ছিল নারী নির্যাতন। জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুসারে, প্রায় ২-৪ লক্ষ নারী ধর্ষণের শিকার হন। কিন্তু এই নির্যাতিত নারীরা যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসনে অবদান রাখেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের 'বীরাঙ্গনা' ঘোষণা করেন এবং পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন করেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং নারী সংগঠকরা এই কাজে সাহায্য করেন। মুক্তিযুদ্ধে নারীর ত্যাগ স্বাধীনতাকে অর্জন করতে সাহায্য করে এবং রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি গড়ে।

স্বাধীনতা-পরবর্তী অর্থনৈতিক উত্থানে নারীর ভূমিকা

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ যুদ্ধবিধ্বস্ত ছিল। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে নারীর অবদান অপরিসীম। ১৯৭০-এর দশকে কৃষি এবং হস্তশিল্পে নারীরা প্রধান শক্তি। গ্রামীণ নারীরা ধান রোপণ, ফসল তোলা এবং পশুপালনে অংশ নেন। এটি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

১৯৮০-এর দশকে গার্মেন্টস শিল্পের উত্থান ঘটে। এই শিল্প নারী শ্রমিকদের দ্বারা পরিচালিত। বর্তমানে ৪০ লক্ষেরও বেশি শ্রমিকের ৮০% নারী। তারা রপ্তানি আয়ের ৮৪% যোগ করে (বিজিএমইএ ডেটা)। এই আয় দারিদ্র্য হ্রাস করে (১৯৯০-এ ৫৬% থেকে ২০২৩-এ ১৮%)। নারী শ্রমিকরা পরিবারের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যে বিনিয়োগ করেন।

এনজিওগুলো নারী ক্ষমতায়নে গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ ব্যাংক (প্রতিষ্ঠা ১৯৮৩) মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে নারীদের মাইক্রোক্রেডিট দেয়। ৯৭% ঋণ গ্রহীতা নারী। লক্ষ লক্ষ নারী উদ্যোক্তা হয়ে পোলট্রি, মৎস্যচাষ এবং ছোট ব্যবসা চালান। ব্র্যাক, আশা প্রমুখ এনজিও শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করে। ফলস্বরূপ, নারীর কর্মসংস্থান হার ১৯৯০-এ ২০% থেকে ২০২৩-এ ৩৬% বেড়েছে (বিবিএস ডেটা)। এই অর্থনৈতিক অবদান বাংলাদেশকে নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত করে।

শিক্ষা এবং সামাজিক উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ

শিক্ষা রাষ্ট্রের উত্থানের মূল চালিকাশক্তি। বেগম রোকেয়ার উত্তরাধিকার অব্যাহত রাখেন স্বাধীনতা-পরবর্তী নারী শিক্ষকরা। সরকারি নীতি যেমন মেয়েদের জন্য ফ্রি শিক্ষা এবং স্টাইপেন্ড প্রাথমিকে মেয়েদের ভর্তি ৫১% করে। মাধ্যমিকে স্টাইপেন্ড প্রোগ্রাম (১৯৯৪ থেকে) ড্রপআউট হ্রাস করে।

নারী শিক্ষকরা গ্রামে স্কুল চালান। ব্র্যাকের নন-ফরমাল স্কুলে ৭০% শিক্ষক নারী। উচ্চশিক্ষায় নারীরা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে রাষ্ট্রসেবা করেন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে নার্স এবং মিডওয়াইফরা মাতৃমৃত্যু হ্রাস করেন (১৯৯০-এ ৫৭৪/লক্ষ থেকে ২০২৩-এ ১৭৩)। সামাজিক আন্দোলনে নারীরা শিশুবিবাহ, দহেজ বিরোধী প্রচার চালান।

রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর নেতৃত্ব

রাজনীতিতে নারীর অবদান বাংলাদেশকে অনন্য করে। খালেদা জিয়া (জন্ম ১৯৪৫) ১৯৯১-৯৬ এবং ২০০১-০৬ প্রধানমন্ত্রী হয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন। তিনি অর্থনৈতিক সংস্কার এবং নারী কোটা চালু করেন। শেখ হাসিনা (জন্ম ১৯৪৭) ১৯৯৬ থেকে একাধিকবার নেতৃত্ব দেন। তাঁর আমলে জিডিপি গ্রোথ ৬-৮%, ডিজিটাল বাংলাদেশ, পদ্মা সেতু নির্মাণ। নারী ক্ষমতায়নে সংসদে ৫০টি সংরক্ষিত আসন, স্থানীয় সরকারে ৩৩% কোটা।

দিপু মনি, সেলিনা হোসেন প্রমুখ নারী মন্ত্রী এবং সাংসদ রাষ্ট্রনীতি গঠনে অবদান রাখেন।

চ্যালেঞ্জ এবং ভবিষ্যৎ দিগন্ত

চ্যালেঞ্জ রয়েছে: লিঙ্গ বৈষম্য (ওয়েজ গ্যাপ ৩০%), শিশুবিবাহ (৫১% মেয়ে ১৮ বছরের আগে), কর্মক্ষেত্রে হয়রানি। যুদ্ধের ক্ষত এখনও আছে। তবু অগ্রগতি আছে। ভিশন ২০৪১-এ নারী ক্ষমতায়ন প্রাধান্য পাবে।

উপসংহার

বাংলাদেশের উত্থানে নারীর অবদান অপরিসীম। ঐতিহাসিক সংগ্রাম থেকে আধুনিক উন্নয়ন—সর্বত্র নারীরা অংশীদার। তাদের সাহস এবং কর্ম দেশকে স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল করে তুলেছে। ভবিষ্যতে আরও ক্ষমতায়ন হলে বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে উজ্জ্বল হবে। নারীর অবদানকে স্মরণ করে সমতাভিত্তিক সমাজ গড়তে হবে।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ