• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলা
Back

রচনা লিখুন : বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও বাংলাদেশের গণমাধ্যম

বেসরকারি টিভি চ্যানেল ও বাংলাদেশের গণমাধ্যম

ভূমিকা : আধুনিক যুগ মানে তথ্যের অবাধ প্রবাহের যুগ। আধুনিক যুগ মানে সরকারি খাতকে পিছনে ফেলে বেসরকারি খাতের বিকাশ ও প্রতিযোগিতার যুগ। তাই সর্বক্ষেত্রে সরকারি নিয়ন্ত্রণের বেড়াজাল ছিন্ন করে আজ বেসরকারি খাত তথা শিল্প ও ব্যবসায়ী সমাজ তাদের আধিপত্য কায়েম করেছে। গামনকি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি তথা মিডিয়ার ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী CNN, BBC. National Geographic, Adventure One-সহ নানাবিধ পশ্চিমা সংবাদ ও বিনোদন চ্যানেলের দেখাদেখি ভারত, বাংলাদেশ, চীন, হংকং, সিঙ্গাপুরসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও এখন প্রচুর বেসরকারি টিভি চ্যানেল চালু হয়েছে। বাংলাদেশে অবশ্য এ জাতীয় প্রয়াস খুব বেশি দিনের না হলেও বেসরকারি টিভি চ্যানেলের যাত্রা এক যুগ অতিক্রম করেছে।

বাংলাদেশের বেসরকারি টিভি চ্যানেল : বাংলাদেশে দীর্ঘকাল যাবৎ শুধু একটি সরকারি টিভি চ্যানেল দিল। সরকারি ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণাধীন থাকায় এ চ্যানেলটির তেমন অগ্রগতি ও উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে বেসরকারি খাতে টেলিভিশন চ্যানেলের অনুমতি প্রদান ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক নববিপ্লবের সূচনা হয়েছে। জানুয়ারি ২০১৫ পর্যন্ত দেশে লাইসেন্সপ্রাপ্ত বেসরকারি টিভি সানেলের সংখ্যা ৪১টি হলেও এর অনেকগুলোই এখনো সম্প্রচারে আসতে পারেনি। নিচে সম্প্রচারে এসেছে এমন বেসরকারি চ্যানেলগুলি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো :

১. এটিএন বাংলা : বাংলা ভাষায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠান প্রচারের পটভূমিকায় যাত্রা শুরু হয় এটিএন বাংলার। ১৯৯৪ সালের ১ জুন এ চ্যানেলটি সরকারি অনুমোদন লাভ করলেও অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৯৭ সালের ১৫ জুলাই। এটি সিন স্যাটেলাইট আইকম ৩-এর মাধ্যমে তার সম্প্রচার চালিয়ে থাকে। বাংলাদেশের মাল্টিমিডিয়া প্রোডাকশন কোম্পানি লি.-এর পরিচালনা কর্তৃপণ্ড। এবং এর চেয়ারম্যান মাহফুজুর রহমান। এ চ্যানেলটি প্রতিদিন ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে থাকে। ইসলামী অনুষ্ঠানমালা, বাংলা ছায়াছবি, নাটক, নাটিকা, ম্যাগাজিন, টক শো, সঙ্গীতানুষ্ঠান, নাচ ও সংবাদ প্রচারসহ নানাবিধ আয়োজনের সম্ভার নিয়ে এটিএন হাজির হয় দর্শকদের মাঝে।

২. চ্যানেল আই : ১৯৯৯ সালের ১ অক্টোবর সিঙ্গাপুর থেকে সম্প্রচারিত স্যাটেলাইট অ্যাপেস্টার/২- এর মাধ্যমে এটি তার অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। বাংলাদেশে এ টিভি চ্যানেলটির পরিচালনা কর্তৃপণ্ড। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড। বাংলা ছায়াছবি, সঙ্গীতানুষ্ঠান, ম্যাগাজিন, টক শো, প্রামাণ্য অনুষ্ঠান, বিদেশী সিরিজ, নাটক, সাক্ষাৎকার, আলোচনা অনুষ্ঠান, সংবাদসহ হরেক রকমের আয়োজন এর অনুষ্ঠানমালায় স্থান পায়।

৩. ইটিভি বা একুশে টিভি : বাংলাদেশের দূরদর্শন সম্প্রচারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয় ২০০০ সালে। সে বছর ১০ মে বেসরকারি নিয়ন্ত্রণে একুশে টিভি (ইটিভি) নামে একটি টিভি চ্যানেল সম্প্রচার শুরু করে। এ চ্যানেলটি চালু হওয়ার পর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার অনুষ্ঠান ও সংবাদ এপ্রচারে নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হতে থাকে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতে ইটিভির লাইসেন্স গ্রহণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতি ও জালিয়াতি প্রমাণিত হওয়ায় ২০ আগস্ট, ২০০২ চ্যানেলটি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে দেয়া হয়। উল্লেখ্য, ইটিভিই ছিল একমাত্র বেসরকারি চ্যানেল, যা বাংলাদেশ টেলিভিশনের টাওয়ারের মাধ্যমে টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচার সুবিধা ভোগ করত। ফলে ইটিভির ছিল বিটিভির মতো দেশব্যাপী সম্প্রচারের সুবিধা। ৩০ মার্চ ২০০৭ ইটিভি পুনরায় স্যাটেলাইট সম্প্রচার শুরু করে।

৪. এনটিভি বা ইন্টারন্যাশনাল টেলিভিশন চ্যানেল লি. : 'সময়ের সাথে আগামীর পথে' এই প্রোগানে নিরপেক্ষ ও মানসম্পন্ন সংবাদ প্রচারের লক্ষ্য নিয়ে বেসরকারি খাতে তৃতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেল হিসেবে যাত্রা শুরু করে এনটিভি। ৩ জুলাই ২০০৩ এ চ্যানেলটি সম্প্রচার শুরু করে। ১৯৯৯ সালে বন্ধ হয়ে যাওয়া টোটাল এন্টারটেইনমন্টে নেটওয়ার্ক বা টিইএন এর লাইসেন্সটি কিনে নেয় বর্তমান এনটিভি কর্তৃপক্ষ। সিঙ্গাপুর থেকে সম্প্রচারিত স্যাটেলাইট এপেস্টার/২ এব মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে।

৫. আরটিভি : আজ এবং আগামীর' এ স্লোগান নিয়ে ১ ডিসেম্বর ২০০৫ থেকে পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু করেছে নতুন স্যাটেলাইট চ্যানেল আরটিভি। ২৫ ডিসেম্বর ২০০৫ পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাগে সম্প্রচার চলার পর ২৬ ডিসেম্বর থেকে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে মূল সম্প্রচার শুরু করে।

৬. বৈশাখী টেলিভিশন : ২৯ ডিসেম্বর ২০০৫ সালে এ বেসরকারি টিভি চ্যানেলটি তার কার্যক্রম শুরু করে।

৭. চ্যানেল ওয়ান : 'সম্ভাবনার কথা বলে'- এ স্লোগান নিয়ে ১৭ জানুয়ারি ২০০৬ পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে চ্যানেল ওয়ান। ২৪ জানুয়ারি ২০০৬ রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে স্যাটেলাইটটি টেলিযোগাযোগ আইন লঙ্ঘন করায় ২৭ এপ্রিল ২০১০ সরকার চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়। 

৮. বাংলাভিশন : শ্যামল বাংলা মিডিয়া লিমিটেডের পরিচালনায় ৩১ মার্চ ২০০৬ কার্যক্রম শুরু করে বাংলাভিশন। এ চ্যানেলের স্লোগান 'দৃষ্টিজুড়ে দেশ'।

৯. ইসলামিক টিভি : 'একটি সুন্দর পৃথিবীর জন্য' স্লোগানকে ধারণ করে ১৪ এপ্রিল ২০০৭ ইসলামিক টিভির অভিযাত্রা শুরু হয়। এ চ্যালেনটি সংবাদসহ ইসলামিক অনুষ্ঠানসূচির ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করে। ৫ মে ২০১৩ মধ্যরাত থেকে সরকার সাময়িকভাবে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়।

১০. দিগন্ত টিভি : 'সত্য ও সুন্দরের পক্ষে অঙ্গীকারবদ্ধ' স্লোগান নিয়ে ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট প্লানেলটির পরীক্ষামূলক সম্প্রচার শুরু হয়। ৫ মে ২০১৩ মধ্যরাত থেকে সরকার সাময়িকভাবে চ্যানেলটি বন্ধ করে দেয়।

১১. দেশ টিভি : ২৬ মার্চ ২০০৯ আনুষ্ঠানিক সম্প্রচার শুরু করে দেশের ১১তম বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল 'দেশ টিভি'। এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাট্যব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূর।

১২. মাই টিভি : ১২তম বেসরকারি স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল হিসেবে ১৫ এপ্রিল ২০১০ আনুষ্ঠানিকভাবে সম্প্রচার শুরু করে। প্রোগান 'সৃষ্টিতে বিস্ময়'।

১৩. এটিএন নিউজ : 'বাংলার ২৪ ঘণ্টা, স্লোগান নিয়ে ৭ জুন ২০১০ পূর্ণ সম্প্রচার শুরু করে ২৪ ঘণটার সংবাদভিত্তিক স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এটিএন নিউজ।

১৪. মোহনা টিভি : নভেম্বর ২০১০ সালে মোহনা টিভি তার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করে।
১৫. সময় টেলিভিশন : ২৪ ঘণ্টা সংবাদ প্রচারের অঙ্গীকার নিয়ে সময় টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয় ১৭ এপ্রিল ২০১১ সালে।

১৬. ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন : ২৮ জুলাই ২০১১ বাংলাদেশে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়।

১৭. মাছরাঙ্গা টেলিভিশন : ৩০ জুলাই ২০১১ বেসরকারি টিভি চ্যানেল মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের যাত্রা শুরু হয়।

১৮. বিজয় টিভি : বিজয় টিভির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৬ ডিসেম্বর ২০১১।

১৯. চ্যানেল ৯ : চ্যানেল 9-এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ৩০ জানুয়ারি ২০১২।

২০. জিটিভি : ১২ জুন ২০১২ সালে জিটিভি'র আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।

২১. চ্যানেল 24 : এ চ্যানেলের কার্যক্রম শুরু হয় ২৩ মে ২০১২ সালে।

২২. একাত্তর টিভি : একাত্তর টিভির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২১ জুন ২০১২।

২৩. এশিয়ান টিভি : ১৮ জানুয়ারি ২০১৩ এশিয়ান টিভির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

২৪. এসএ টিভি : এসএ টিভির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯ জানুয়ারি ২০১৩।

গমাধ্যমের অগ্রযাত্রায় বেসরকারি টিভি চ্যানেলের প্রভাব : বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশ ও সনমাধ্যমের যাত্রাপথে এ পর্যন্ত যে কয়টি পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে তার মধ্যে বেসরকারি টিভি সানেলসমূহের বিকাশ ও সাফল্য অন্যতম। কতিপয় নেতিবাচক সম্ভবনা ও উপসর্গ বাদ দিলে বলা যায়, এএ দেশের গণমাধ্যমের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনার অন্যতম মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। যেমন-

১. স্যাটেলাইটের বৃহত্তর জগতে প্রবেশ : বিশ্বব্যাপী যখন স্যাটেলাইট নিয়ে ব্যাপক প্রতিযোগিতা চলছিল, মহাকাশের শূন্যপথে যখন অবাধে সাংস্কৃতিক বাণিজ্য আর আমদানি-রপ্তানি চলছিল, এক শুগ আগেও বাংলাদেশ ছিল কেবলই আমদানিকারক। দেশে স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এলেও ১৯৯৭ সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনো দেশীয় স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না। স্যাটেলাইটে এ দেশের মানুষ কেবল বিদেশী চ্যানেলে অনুষ্ঠান উপভোগ করত। ১৯৯৭ সালে দেশের প্রথম স্যাটেলাইট চ্যানেল 'এটিএন বাংলা'-এর যাত্রা শুরু হলে স্যাটেলাইটের বৃহত্তর জগতে বাঙাদি সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষার অনুপ্রবেশ ঘটে এবং সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়।

২. বাঙালি সংস্কৃতির আন্তর্জাতিকতা : স্যাটেলাইটে নতুন নতুন টিভি চ্যানেলের আত্মপ্রকাশ বাঙালি সংস্কৃতির আন্তর্জাতিকীকরণের ক্ষেত্রে অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। কেননা এ সকল টেলিভিশন বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিকে আশ্রয় করে যে সকল অনুষ্ঠান সম্প্রচার করছে তা বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি দর্শকের কাছে চলে যাবে এবং বাঙালি সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নিজেকে তুলে ধরার সুযোগ পাবে।

৩. বিদেশী চ্যানেলের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস : বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো চালু হওয়ায় এ দেশের দর্শকরা অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ খেলা, কোনো বিখ্যাত আন্তর্জাতিক পুরষ্কার প্রদান অনুষ্ঠান এবং বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সংবাদের জন্য বিদেশী চ্যানেলগুলোর ওপর সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল ছিল। এক্ষেত্রে বিটিভি দর্শকদের চাহিদার খুব কমই পূরণ করতে পারত। নব্বই দশকের শেষ দিকে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর প্রতিষ্ঠা এক্ষেত্রে দর্শকদের সামনে এক বিকল্প আশ্রয় হিসেবে দেখা দেয়। আগে যেখানে স্টার স্পোর্টস বা ইএসপিএন ছাড়া খেলা দেখা যেত না, সেখানে এ দেশীয় দর্শকদের জন্য বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বিভিন্ন কোম্পানির সৌজন্যে বিভিন্ন খেলাধুলা সম্প্রচার করে থাকে।

৪. দেশীয় গণমাধ্যমের প্রতিযোগিতা : একসময় এ দেশে গণমাধ্যম বিশেষত ইলেকট্রনিক মিডিয়া বলতে বোঝাত বিটিভি এবং বাংলাদেশ বেতারকে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি আর পুঁজির অবাধ প্রবাহে এ দুটি সরকারি গণমাধ্যম তাদের একক কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারেনি এবং এভাবে টিকিয়ে রাখাটা কামাও নয়। তাই নব্বই-পরবর্তীকালে রাজনৈতিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার বোধ প্রবল হওয়ার সুবাদেই এ দেশের গণমাধ্যমেও প্রতিযোগিতার সূচনা হয়। পুরাতনের অচলায়তন ভেঙ্গে নতুনের আহ্বান নিয়ে একের পর এক আবির্ভূত হয় চ্যানেল আই, ইটিভি, এটিএন আর এনটিভির মতো টিভি চ্যানেল। অনুষ্ঠান নির্মাণের ধরন ও মান এবং সংবাদ প্রচারসহ প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা পারস্পরিক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত।

৫. গণমাধ্যমের ওপর সরকারি প্রভাব হ্রাস : ইতিপূর্বে দেশে যখন বেসরকারি উদ্যোগে কোনো বেতার কিংবা টিভি কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদনের নিয়ম ছিল না, তখন বিশেষ করে ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ওপর সরকারের ছিল একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। সরকারি টিভি বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতারে সরকার ইচ্ছোমতো অনষ্ঠান ও সংবাদ প্রচার করত। কিন্তু বেসরকারি টিভি ও চ্যানেলের আবির্ভাব এ ক্ষেত্রে সরকারি মাধ্যমগুলোর কর্তৃত্বকে কিছুটা হলে রাশ টেনে ধরতে সক্ষম হয়েছে।

৬. অনুষ্ঠান নির্মাণে বৈচিত্র্য : বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বাংলাদেশ টেলিভিশনের গতানুগতিক উপ একঘেয়ে অনুষ্ঠান সম্প্রচারের অচলায়তন থেকে বেরিয়ে এসে দর্শকদের চাহিদা ও রুচির সাথে তাল মিলিয়ে অনুষ্ঠান নির্মাণের ব্যাপারে খুব যত্নশীল। তাই তাদের অনুষ্ঠানে রয়েছে বৈচিত্র্য ও নতুনত্ব। উদাহরণ হিসেবে ইটিভির সংবাদ প্রচারের বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। ইটিভির পথ ধরেই বর্তমানে প্রতিটি চ্যানেলই প্রতিবেদনমূলক সংবাদ প্রচার করছে।

৭. নাট্যশিল্পের বিকাশ : গণমাধ্যমকে আশ্রয় করে নাট্যশিল্পের যে বিকাশধারা তা নব্বইয়ের জশকের মাঝামাঝি এসে বেশ গতি পায়। বিশেষ করে প্যাকেজ নাটক নির্মাণে নির্মাতাদের আগ্রহ আনেক গুণ বেড়ে যায়। পূর্বে বিটিভির একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে একটি নাটক সম্প্রচারের জন্য বহু কাঠখড় পোড়াতে হতো। কিন্তু বেসরকারি চ্যানেলগুলো নির্মাতাদের জন্য এক্ষেত্রে ব্যাপক সুযোগ এনে দিয়েছে। ফলে নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, নাট্যাভিনেতা-অভিনেত্রীসহ সকল ক্ষেত্রে চাঞ্চল্য আসে এবং একের পর এক নতুন নতুন নাটক নির্মিত হতে থাকে।

৮. সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা : আধুনিকতার এ চরম উৎকর্ষের যুগেও সাধারণ জনগণ বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ থেকে নানা কারণে নানাভাবে বঞ্চিত হয়ে থাকে। বিভিন্ন সময়ে সরকারগুলো প্রচার মাধ্যমগুলোর তপর নানাভাবে আক্রমণ অব্যাহত রেখেছে। এক্ষেত্রে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোর অনুসন্ধানমূলক ও প্রতিবেদনমূলক সংবাদ প্রচারের প্রয়াস কিছুটা হলেও বস্তুনিষ্ঠতার সন্ধান দিয়েছে। এরা সরকারের সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত এ কথা বলা না গেলেও নিঃসন্দেহে বিটিভি কিংবা বাংলাদেশ বেতারের তুলনায় ভালো।

সমস্যাবলী : বাংলাদেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলোকে তাদের অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রে নানা অস্যায় পড়তে হচ্ছে। যেমন-

প্রথমত, আমাদের দেশে দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কলাকুশলীর যথেষ্ট অভাব রয়েছে। বিশেষ করে অনুষ্ঠান নির্মলের উপযোগী লোকবলই অনেক সময় পাওয়া যায় না।

দ্বিতীয়ত, আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোর প্রযুক্তিগত অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বিশেষ করে ইটিভি এখাবে বিটিভি থেকে টেরিস্ট্রিরিয়াল সুবিধা পেয়েছিল সেরূপ সুবিধা এখন অন্য চ্যানেলগুলো না পাওয়ায় তাদের সম্প্রচার দেশের একটা ক্ষুদ্রাংশের মাঝেই সীমিত হয়ে আছে।

তৃতীয়ত, টিভি চ্যানেলগুলো বেসরকারি হলেও এগুলো এখনো সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ময়। সরকারি একটা প্রচ্ছন্ন প্রভাব এদের ওপর থেকেই গেছে।

চতুর্থত, আমাদের দেশের খুব বেশি লোক স্যাটেলাইট সুবিধা পায় না। সাধারণত শহরের উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মদানির শ্রেণীই স্যাটেলাইট সংযোগ নিয়ে থাকে এবং এদের সংখ্যা খুবই কম। এমতাবস্থায় শানিগুলোও টিভি চ্যানেলগুলোর অনুষ্ঠান স্পন্সর ও বিজ্ঞাপনদানের ব্যাপারে তেমন আগ্রহ দেখায় না।

পঞ্চমত, বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো লাভের বিচারে অনেক সময় অবাঞ্ছিত বিজ্ঞাপন প্রচার করে থিকে। যেমন ধুমপানের বিজ্ঞাপন প্রচার জাতীয় স্বার্থে অনুচিত হলেও এরা নির্দ্বিধায় তা করে যাচ্ছে।

ষষ্ঠত, স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর সার্বক্ষণিক অনুষ্ঠান প্রচার অনেক ক্ষেত্রে শিশু-কিশোরদের পড়াশোনায় দারুণ ব্যাঘাত ঘটিয়ে থাকে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায়, বিশ্বায়ন আর তথ্যপ্রযুক্তির এ প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বব্যবস্থায় টিকে অন্দর জন্য জাতিকে প্রস্তুত করতে গণমাধ্যম অতীব জরুরি। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল মাত্র আংলাদেশে এক্ষেত্রে যে বিপ্লব ঘটেছে তা নিঃসন্দেহে গণমাধ্যমের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবহ।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ