• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলাদেশ
Back

১৮৭১ সাল হতে ২০০১ সাল পর্যন্ত জনগণনাসমূহে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী এ দেশের ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করুন।

জাতীয় পরিকল্পনার জন্য অন্যতম বিষয় হলো আদমশুমারি বা জনগণনা। দেশের পরিমিত সম্পদের সাথে দেশে বসবাসরত জনসংখ্যার সামঞ্জস্য আছে কি-না সে বিষয়টি সম্পর্কে সঠিকভাবে অবগত হওয়ার জন্য জনগণনা করা হয়ে থাকে। প্রাচ্য অথবা প্রতীচ্যের সরকারসমূহ মধ্যযুগ থেকে কর আদায় অথবা সামরিকবাহিনীতে জনসাধারণের অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনে কখনো কখনো জনগণনার আশ্রয় নিতেন। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে তাতে বিষয়টি অনেকটাই উদ্বেগের। কেননা স্বাধীনতার পরেই ১৯৭৪-এ যে লোকগণনা হয় তাতে দেখানো হয়েছিল প্রায় সাড়ে সাত কোটি জনসংখ্যা। কিন্তু অর্ধ শতাব্দীরও কম সময়ের ব্যবধানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ বা প্রায় ১৬ কোটি হয়েছে। স্বাধীনতা উত্তরকাল থেকে এ চল্লিশ বছরে জনসংখ্যা যে হারে বেড়েছে তাতে বিষয়টি অবশ্যই শঙ্কার। কেননা এ জনসংখ্যা সমস্যার কারণে দেশে নানাবিধ সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

আদমশুমারি বা জনগণনার বৈশিষ্ট্যসমূহ: জাতিসংঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী আদমশুমারিতে নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো থাকা প্রয়োজন।

  • প্রতিটি ব্যক্তির তথ্য গণনা,
  • একটি চিহ্নিত এলাকায় সামষ্টিক গণনা,
  • একই সঙ্গে সারাদেশে কার্যক্রম চালানো এবং
  • নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠান।

আদমশুমারির জন্য আরো কিছু তথ্য প্রয়োজন, যেগুলো নিম্নরূপ:

১. ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য: জনসংখ্যার সমষ্টি, এলাকা-শহর, গ্রাম।

২. ব্যক্তিগত এবং বাড়িসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য: পরিবারের গঠন, বাড়িতে বসবাসকারী সদস্যদের গঠন।

৩. অর্থনৈতিক বৈশিষ্ট্য: আর্থ-সামাজিক অবস্থা, নির্ভরতা ইত্যাদি।

আদমশুমারির জন্য মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়ে থাকে; যথা-

(i) Dejure বা আইনত: এ পদ্ধতিতে প্রতিটি মানুষকে তার প্রকৃত আবাসিক এলাকা অনুযায় গণনা করা হয়ে থাকে।

(ii) De fact বা কার্যত: এ পদ্ধতিতে মানুষের প্রকৃত বাসস্থান যাই থাক না কেন ব্যক্তির শুমারিকালীন উপস্থিতি অনুযায়ী তাকে যে কোনো স্থান থেকে গণনা করা হয়ে থাকে।

১৮৭১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জনগণনাসমূহে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী এ দেশের ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য : জনগণনা বা আদমশুমারিতে ব্যক্তির বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, ধর্ম, শিক্ষার হার, জন্ম-মৃত্যু হার, শিশুর জন্ম-মৃত্যু হার ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়। বাংলায় প্রথম আদমশুমারি বা জনগণনা হয় ১৮৭২ সালে এবং সর্বশেষ স্বাধীন বাংলাদেশে হয় ২০১১ সালে। স্বাধীন বাংলাদেশে হয়েছে ৫ বার (১৯৭৪-২০১১)। নিচে ১৮৭১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত জনগণনাসমূহে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য আলোচনা করা হলো:

ডিৎস: Census of India (1931, 1941), Bangladesh Population Census, 1991, 2001, 2011)

উৎস: Census of India (1931, 1941), Bangladesh Population Census, 1991, 2001, 2011)

ক. ১৮৭১-১৯৪১ সাল পর্যন্ত জনগণনা অনুযায়ী ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য: ১৮৭২ সালে বাংলায়ৎ প্রথম আদমশুমারি পরিচালিত হয়। কিন্তু মানুষের সন্দেহ ও দ্বিধার কারণে প্রথম আদমশুমারি লক্ষ্য অর্জনে সফল হতে পারেনি। লক্ষ্য অর্জনে সফল না হলেও এই আদমশুমারি থেকেই বাংলা একটি মুসলিমপ্রধান রাজ্যরূপে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী আদমশুমারিসমূহ ১৮৮৯ এবং ১৮৯১ সালে অনুষ্ঠিত হয়, যা ১৮৭২ সালের আদমশুমারির তুলনায় অনেক বেশি উন্নতমানের ছিল। জনমিতি বিশারদদের মতে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দুটি আদমশুমারি গুণগতভাবে যথেষ্ট ভালো ছিল।

১৯৩১-এর আদমশুমারি আংশিকভাবে এবং ১৯৪১-এর আদমশুমারি ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারায় তথ্যের ইচ্ছাকৃত বিকৃতির কারণে। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই তাদের স্ব স্ব ধর্মের পক্ষে মিথ্যা তথ্য প্রদান করে। অন্যদিকে পূর্ববাংলার (পূর্ব পাকিস্তান) প্রথম আদমশুমারি একটি ভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। ভারতবর্ষ ও পূর্ববাংলার মধ্যে দ্বি-মুখী ব্যাপক মাইগ্রেশনের কারণে বিভিন্ন জেলার লোকসংখ্যার গণনা দুরূহ সমস্যায় পড়ে।

খ. ১৯৫১-২০০১ সাল পর্যন্ত জনগণনা অনুযায়ী ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য: ১৯৫১-২০০১ সাল পর্যন্ত জনগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য নিচে উল্লেখ করা হলো:

১. এক বা পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের সংখ্যা প্রতিটি আদমশুমারিতেই কম দেখানো হয়েছে।

২. ১৯৫১-এর আদমশুমারি সুবিন্যস্তভাবে পরিচালিত হয়নি এবং জাতীয়ভাবে শুমারি-পরবর্তী নিরীক্ষা জরিপও পরিচালিত হয়নি। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে শহর এলাকায় ৫% মানুষ কম গণনা করা হয়েছে ধরা হলেও বাস্তবে তা আরো বেশি বলে ধারণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে, জাতীয় পর্যায়ে ৪% মানুষ ১৯৫১-এর আদমশুমারিতে কম ধরা হয়েছে অনুমান করে মোট জনসংখ্যার নতুন হিসাব দেখানো হয়। এই আদমশুমারির মোট জনসংখ্যা যে কারণে প্রভাবিত হয়েছিল তার মধ্যে ছিল প্রথমত, ১৯৪১ পরবর্তী সময়ে বিপুল সংখ্যক নেট মাইগ্রেশন (বহির্গমন বেশি, আগত কম); দ্বিতীয়ত, ১৯৪১ সালের জনসংখ্যা বেশি দেখানো এবং তৃতীয়ত, ১৯৪৩-এর দুর্ভোগ।

৩. সাধারণভাবে ১৯৬১-এর আদমশুমারিকে খুব ভালোভাবে পরিচালিত বলা হলেও বাদপড়া মানুষের সংখ্যা ৮.৬২% ধরে মোট জনসংখ্যা পুনর্বিন্যাস করা হয়।

৪. ১৯৭৪-এর শুমারি-পরবর্তী নিরীক্ষা জরিপের ভিত্তিতে ৪টি প্রধান শহরাঞ্চলে বাদপড়া মানুষের সংখ্যা ১৯.৩% ধরা হয়, অন্যান্য অঞ্চলে তা ৬.৫% ধরা হয়। মোট জনসংখ্যা ৬.৮৮% বাদপড়া মানুষের জন্য পুনর্বিন্যস্ত করা হয়।

৫. ১৯৮১-এর আদমশুমারিতে মোট জনসংখ্যার ৩.১% গণনা করা হয়নি ধরে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়।

৬. ১৯৯১-এর আদমশুমারিতে মোট জনসংখ্যার ৪.৬% গণনা করা হয়নি বলে ধরা হয় (গ্রামাঞ্চলে ৪%, ৮.৬% পৌর এলাকায় এবং ৫% অন্যান্য শহর এলাকায়)।

৭. ২০০১-এর আদমশুমারিতে মোট জনসংখ্যার ৪.৯৮% গণনার আয় আনা যায়নি বলে ধরা হয় ৪.৫৪% গ্রামাঞ্চলে, ৫.৮১% পৌর এলাকায়, ৩.৭৩% অন্যান্য শহর এলাকায় ও ৭.৬৭% এসএমএসমূহে অর্থাৎ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনায়।

গ. ২০১১ সালে জনগণনা অনুযায়ী ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য: ২০১১ সালের ১৫-১৯ মার্চ বাংলাদেশের পঞ্চম আদমশুমারি ও গৃহগণনা অনুষ্ঠিত হয়। নিচে ২০১১ সালের আদমশুমারি বা জনগণনা অনুযায়ী বাংলাদেশের ডেমোগ্রাফিক বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো:

১. জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%।

২. জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১,০১৫ জন বা প্রতি বর্গমাইলে ২,৫২৮ জন।

৩. নারী ও পুরুষের অনুপাত ১০০: ১০০.৩।

৪. দেশে সাক্ষরতার হার ৫১.৮%। এর মধ্যে পুরুষ ৫৪.১% ও নারী ৪৯.৪৫%।

৫. জনসংখ্যায় বৃহত্তম বিভাগ ঢাকা (জনসংখ্যা ৪,৯৩,২১,৬৮৮ জন), ক্ষুদ্রতম বিভাগ বরিশাল (জনসংখ্যা ৮৬,৫২,৩২৪ জন)।

৬. বাংলাদেশে খানাপ্রতি গড় সদস্য সংখ্যা ৪.৪ জন (অনুমিত)।

৭. গড় আয়ু ৬৯ বছর ইত্যাদি।

ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যা: স্বাধীন বাংলাদেশে আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী ধর্মভিত্তিক জনসংখ্যার হার (%) নিচে দেয়া হলো:

উপসংহার: আদমশুমারির প্রয়োজনীয়তা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত জাতীয় পরিকল্পনার কারণে। বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতির কারণে (পপুলেশন মোমেন্টাম)। এ বৃদ্ধি আগামী চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর ধরে ঘটতে থাকবে। এই চলমান প্রক্রিয়ায় শিশু জনসংখ্যার হার দ্রুত, হ্রাস পাবে, কর্মক্ষম জনসংখ্যার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাবে, জনসংখ্যার নির্ভরতা (Dependency Ratio) অনেক কমে যাওয়ায় নীতি নির্ধারকদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ আসবে। উপযুক্ত নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্রুত জাতীয় আয় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যে এগিয়ে যাবে। পপুলেশন মোমেন্টাম চলাকালীন সময়ে দেশের বৃদ্ধ মানুষের আনুপাতিক হারও ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং পরবর্তীকালে জনসংখ্যার নির্ভরতার হারও বৃদ্ধি পাবে। ওই সময়ে আরো একটি প্রক্রিয়া বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় প্রচণ্ড প্রভাব ফেলবে এবং তা হলো ব্যাপক গ্রাম থেকে শহরে মাইগ্রেশন। ঐ মাইগ্রেশনের ফলে খুব দ্রুত বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাবে। তাই ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা সম্পর্কে ধারণা পেতে হলেও আদমশুমারির নির্ভুল গণনার বিকল্প নেই। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জনসংখ্যার বৃদ্ধির কারণে জনমিতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিণতি সম্পর্কে ধারণা পেতে হলেও বয়সভিত্তিক জনসংখ্যার সঠিক গণনা প্রয়োজন।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ