- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩
- বিসিএস ২০১৩
- বাংলাদেশ
১৯৪৭ উত্তর সময়ে বাংলাদেশ অঞ্চলে বাংলা সাহিত্যের যে বিকাশ সাধিত হয়েছে এর বর্ণনা দিন।
সংস্কৃতি হলো সমাজ ও জীবনাচরণের দর্পণস্বরূপ আর সাহিত্য হলো তার প্রতিচ্ছবি। সাহিত্য ও সংস্কৃতি এক নিবিড় সম্পর্কে আবদ্ধ। প্রতিটা সমাজের নিজস্ব কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠার স্বতন্ত্র বড়তি বিদ্যমান। আমাদের বাংলাদেশের নিজস্ব সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্পকলা রয়েছে যা বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন রূপে আবির্ভূত হয়েছে, কেননা সাহিত্য ও সংস্কৃতি তো সমকালীন সমাজ কাঠামোরই প্রতিবিম্ব। স্বাধীনতা-পূর্বকালীন সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে রূপ পরিগ্রহ করেছে, সেটা স্বাধীনতা পরবর্তী সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক জীবনধারায় ধীরে ধীরে নব রূপে বিকশিত হয়েছে। তখনকার সমাজকাঠামোর তুলনায় আজকে উত্তর-আধুনিকতার যুগের সামাজিক আবহ এক নয় বরং অনেক ভিন্নতর। মানুষের বিশ্বাস, রীতিনীতি, জ্ঞান, শিল্প, ভাষা, মূল্যবোধ সকল ক্ষেত্রেই পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। তাইতো শিল্প-সাহিতা এবং সংস্কৃতির গতিপথ ও ধারাবাহিকতা স্রোতস্বিনী নদীর মতো এঁকে-বেঁকে আজকের পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সাহিত্য এবং সংস্কৃতির এ প্রবহমান প্রবণতা স্বতন্ত্র কিছু অবয়ব নিয়ে ক্রমশ সাজিয়েছে নিজের সাংস্কৃতিক ভুবন, যার পরিমণ্ডলেই আবর্তিত হয়েছে সাহিত্য ও শিল্পের চিত্রায়িত রূপ।
স্বাধীনতা-পূর্বকালীন সাহিত্য স্বাধীনতা-পূর্ববর্তীকালের তুলনায় স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের সাহিত্যও সংস্কৃতির উন্নয়নের চিত্র বর্ণনা করতে গেলে প্রথমত বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাসে স্বাধীনতা পূর্বকালের যে বিভিন্ন পর্ব রয়েছে তার সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা জরুরি। এ সময়ের মধ্যে গড়ে ওঠা বাংলা সাহিত্য নানা দিক থেকে উল্লেখযোগ্য। সামাজিক-রাজনৈতিক কার্যকারণকে বিভাজন রেখা হিসেবে বিবেচনা করে বাংলা সাহিত্যকে তিনটি পর্বে ভাগ করা যায়: প্রথম পর্ব (১৯৪৭-১৯৫৭), দ্বিতীয় পর্ব (১৯৫৮-১৯৭০) এবং তৃতীয় পর্ব (১৯৭১-বর্তমান সময় পর্যন্ত)।
১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের অব্যবহিত পরেই বাঙালি ও পূর্ব বাংলা নানামুখী সমস্যার সম্মুখীন হয়। দেশবিভাগজনিত উদ্বাস্তু সমস্যা, অর্থনৈতিক দুর্দশা, সাম্প্রদায়িক সমস্যা ইত্যাদির সাথে ছিল পূর্ব বাংলা ও বাংলা ভাষার প্রতি পাকিস্তানি শাসকশ্রেণীর বিরূপ মনোভাব। যার ধারাবাহিকতায় আসে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। এর ফলে বাঙালিরা স্বাধীকার চেতনার যে শক্তি অর্জন করে তার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে বাংলা সাহিত্যের প্রথম পর্ব। এ সময়ের অধিকাংশ সাহিত্যই রচিত হয় গ্রামবাংলার বৃহত্তর পটভূমিতে।
গ্রামীণ জীবন ও তার সমস্যা সম্ভাবনাকে উপজীব্য করে রচিত হয় অনেক উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, নাটক ইত্যাদি। যেমন- আবু ইসহাকের সূর্যদীঘল বাড়ী, সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহর লালসালু (১৯৪৮), শামসুদ্দীন আবুল কালামের কাশবনের কন্যা (১৯৫৪) ইত্যাদি। এই কালপর্বে গ্রামীণ জীবন ও তার স্বরূপ অনুসন্ধান যেমন উপন্যাসের একটি প্রধান প্রবণতা, তেমনি মধ্যবিত্তের জীবনজিজ্ঞাসা ও জীবন সংকটকেও কেউ কেউ সাহিত্যের বিষয় করেছেন। যেমন- আবুল ফজলের জীবন পথের যাত্রী (১৯৪৮) ও রাঙ্গা প্রভাত (১৯৫৭) উল্লেখযোগ্য। গ্রামীণ নাগরিক জীবনের রূঢ়তা এবং বাস্তবের অনুপঙ্খ চিত্রায়ন এবং নাগরিক জীবনের অভিঘাত গ্রামীণ জীবনের নিস্তরঙ্গ ব্যবস্থা কিভাবে ভেঙে দিচ্ছিল তার চিত্রও সাহিত্যে স্থান পায়। যেমন- আলাউদ্দিন আল আজাদের জেগে আছি, ধান কন্যা, মৃগনাভি (১৯৫৫) প্রভৃতি এ সময়ের উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থ। এ সময়ে ধর্মীয় এবং পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে, সাধারণ মানুষ দেশের মাটি ও প্রকৃতিকে নিয়ে বেশ কিছু কবিতা রচিত হয় যেগুলোকে অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী ধারার কবিতা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
এ পর্বে বাঙালির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের জন্ম হয়- একুশে ফেব্রুয়ারি। এ ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রচিত হয় অসংখ্য সাহিত্য। যেমন- মুনীর চৌধুরির অসামান্য নাটক কবর (১৯৫৩); হাসান হাফিজুর রহমান 'একুশে ফেব্রুয়ারি' নামে একটি সংকলন প্রকাশ করেন।
দ্বিতীয় পর্ব- ১৯৫৭ সালে দেশে সামরিক শাসন প্রবর্তনের ফলে সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারা বেশ বাধাগ্রস্ত হয়। প্রকাশ্য রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা, গণতন্ত্রের অবয়বে একনায়কতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কারণে বাঙালিদের মধ্যে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হতে থাকে যা একসময় গণ আন্দোলনে রূপ নেয়। তাইতো এ সময়কালে বাঙালিদের স্বাধীনতা অর্জনের তীব্র প্রয়াস এবং স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উদ্ভব এসব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটে। বাংলাদেশের সমাজ জীবনে উল্লিখিত ঘটনাবলীর প্রভাবই ১৯৫৮-১৯৭১ কালপর্বের সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
এ পর্বেও প্রধানত গ্রামীণ জীবনের পটভূমিতে সাহিত্য রচনার প্রবণতা লক্ষ করা গেলেও মাত্রাগত পরিবর্তন যুক্ত হয়, ফলে একটু আলাদাভাবেই তখনকার রচনাগুলোকে বিচার করা যায়। যেমন- সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর 'চাঁদের অমবস্যা' (১৯৬৪) উপন্যাসের কথা স্মরণ করা যাক। এতে গ্রামীণ জীবনকে পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করলেও ঔপন্যাসিক মূলত আইয়ুবি দশকের ধর্মভীতি ও সমরাস্ত্র-শাসিত সমাজ জীবনকেই রূপায়িত করেছেন। এর পাশাপাশি জহির রায়হান গ্রামীণ জীবন বাস্তবতাকে উপজীব্য করে রচনা করেন 'হাজার বছর ধরে' (১৯৬৪)। নাগরিক জীবনের অভিঘাত ও জটিলতা কিভাবে দক্ষিণ বাংলার গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থাকে ক্রমশ বিনষ্ট করেছিল তার বাস্তব চিত্র অঙ্কিত হয় শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সারেং বৌ' (১৯৬২) উপন্যাসে। ইউরোপীয় সমাজের মধ্যবিত্ত সমাজের অনুসরণে এবং ব্যক্তিবোধের সূত্র ধরে অনেকেই এ পর্যায়ে রচনা করেন আধুনিক জীবন ভাবনা সম্পন্ন উপন্যাস। এসব উপন্যাসে লক্ষ করা যায় মূল্যেবোধে অবিশ্বাস, প্রেমশক্তিতে অনাস্থা, জীবনের প্রতি প্রবল বিতৃষ্ণা, বিতৃষ্ণা, ব্যক্তিমানুষের নিঃসঙ্গতা, বিচ্ছিন্নতা, নাগরিক মধ্যবিত্তের স্থূলতা, নৈতিকতাবর্জিত বিত্তসর্বস্বতা, রুচিবিকার ইত্যাদি। এরকম কিছু উপন্যাস যেমন- শেষ বিকেলের মেয়ে, দিলারা হাশেমের 'ঘর মন জানালা' (১৯৬৫), মধ্যবিত্ত জীবনের সংগ্রাম ও ব্যর্থতা বোধের কাহিনী। এছাড়াও উল্লিখিত প্রবণতার বাইরে গিয়ে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ রচনা করেন 'কাঁদো নদী কাঁদো' (১৯৬৮), এই উপন্যাসে অঙ্কিত হয়েছে ব্যষ্টি ও সমষ্টি, মানুষের বাইরের ও ভেতরের জীবন, অস্তিত্ব ও অনস্তিত্বের সংঘাত। এ সময়ে সাধারণ প্রবণতার বাইরে সমাজ বাস্তবতাকে মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে অবলোকন ও চিত্রনের চেষ্টা করেছেন আলাউদ্দিন আল আজাদ। তার গল্পে শ্রেণী সংগ্রামের নির্মম পরিণতি প্রকাশিত হয়েছে। তখনকার উপন্যাসে সমকালীন রাজনীতির গতি প্রকৃতি এবং জাতীয়তাবাদী মুক্তির সংগ্রাম যেসব উপন্যাসে বস্তুনিষ্ঠভাবে ধরা পড়েছে সেগুলোর মধ্যে শহীদুল্লাহ কায়সারের 'সংশপ্তক', জহির রায়হানের 'আরেক ফাল্গুন' (১৯৬৯) ইত্যাদি।
তখনকার কবিরাও তাদের শিল্পে খুব বস্তুনিষ্ঠভাবে তুলে ধরেন সমকালীন রাজনীতি, স্বদেশ প্রেম, জাতীয় গৌরব, সাম্প্রদায়িক বৈরীভাব, প্রেম, প্রকৃতি ও মানুষকে নিয়ে সরল রোম্যান্টিক ভাবোচ্ছাস সম্পন্ন কবিতাও হয়ে ওঠে প্রধান কাব্যধারা। যেমন- সৈয়দ আলী আহসানের 'উচ্চারণ', শামসুর রাহমানের 'বিধ্বস্ত নীলিমা' (১৯৬৭) ইত্যাদি।
সর্বোপরি ঐ সময়কার সাহিত্যে বিষয়বস্তু হিসেবে যেগুলো প্রধানরূপে স্থান পেয়েছিল সেগুলো হলো পূর্ব বাংলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, প্রকৃতি, জনজীবনের দুর্দশা, জাতীয় স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, জাতিগত নির্যাতন ও নিষ্পেষণ এবং প্রতিবাদ। এছাড়াও তখনকার অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার চিত্রায়ণও খুব ভালোভাবে অঙ্কিত হয়েছে সাহিত্যিকদের কালির আঁচড়ে।
স্বাধীনতা-পূর্বকালীন সংস্কৃতির চিত্র: বাংলাদেশের সংস্কৃতির রয়েছে গৌরবময় ঐতিহ্য। এ দেশের পথে প্রান্তরে সহজ-সরল বিশ্বাসী মানুষের পদচারণা, কাব্য ও শিল্পচর্চা প্রাচীনকাল থেকেই লক্ষ করা যায়। এ দেশের সাহিত্যে গীতি প্রবণতা ও সঙ্গীতের প্রাধান্য দেখা যায় সেই সুদূর প্রাচীনকাল থেকেই। বাংলার ভাটিয়ালি, যাত্রা, বাউল, মুর্শিদী, মারফতী, পালাকীর্তন, কবিগান ইত্যাদির মধ্যে বাংলার অন্তরের সুরটি ধ্বনিত হয়। স্বাধীনতা-পূর্বকালের বাংলা সংস্কৃতির পরিমণ্ডলে এসব আচার অনুষ্ঠানের চর্চা উপস্থিত ছিল বেশ ভালোভাবেই। এখানে বাস করে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী মানুষ আর বাংলা সংস্কৃতি, সকল জাতির সকল স্তরের মানুষের মিলিত মানস-চর্চার বহিঃপ্রকাশ। একে অপরের ভিতর পারস্পরিকতা, বল্যতা, সৌহার্দ্যতা, মমত্ববোধ সেই অনেক জনম থেকেই প্রবল।
বাংলাদেশের সংস্কৃতির ভিতর যে ধর্মীয় রীতিনীতি, উৎসব, লোকসাহিত্য, সঙ্গীত, ঋতু উৎসব, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, সামাজিক প্রথা রয়েছে তা বহুকাল পূর্ব থেকে চলে আসছে, তবে বিভিন্ন সময়ে কালের আবর্তে সংস্কৃতির চলমান ধারায় বেশ কিছু পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্ধন ও সমৃদ্ধির ছোঁয়া লক্ষ করা যায়। যেমন-ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি সংস্কৃতির সংস্পর্শ ও পাকিস্তানি আমলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক তথা সামাজিক কারণে এ দেশের মানুষ অনেকখানি কোণঠাসা অবস্থার মধ্যে পড়ে। ফলে সেই ঐতিহ্যগত সংস্কৃতির ধারা বাধাগ্রস্ত হয়, এমনকি এদেশের নিজস্ব সংস্কৃতির অস্তিত্বও অনেকখানি নাজুক হয়ে পড়ে।
তারপরও এ দেশের গ্রামীণ জীবন, সমাজকাঠামো, ধর্মীর বিশ্বাস, জ্ঞান, প্রকৃতির আবহ সবকিছুকে ঘিরে একটি ভিন্নধর্মী সাংস্কৃতিক রূপ লক্ষ করা যায় যা কিনা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে সমুজ্জ্বল। তৎকালীন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, বহির্বিশ্বের সাংস্কৃতিক আবহাওয়া সবকিছুই সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করে। তথ্যপি সেই লোকনৃত্য, গাজী কালুর কিচ্ছা, পালাগান, যাত্রাপালা ইত্যাদি মুখরিত করেছে গ্রামবাংলার প্রান্তর। এছাড়া কৃষিনির্ভর অর্থনীতির ওপর অধিক নির্ভরশীলতার ফলে কৃষিনির্ভর সংস্কৃতির চর্চাও তখন বেশ পরিলক্ষিত হতো।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সাহিত্য ও সংস্কৃতির রূপ: স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির যে বৈশিষ্ট্য বা প্রকৃতি সেগুলো হলো-
- গ্রামীণ জীবন ব্যবস্থার চিত্র অঙ্কন।
- প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ।
- গ্রামীণ মানুষের আচার-আচরণ।
- গ্রামীণ অর্থনীতি।
- তৎকালীন সংগ্রামী রাজনৈতিক পরিমণ্ডল।
- প্রেমময়তা বা রোমান্টিকতা।
- মধ্যবিত্ত পরিবারের মধ্যে অন্তর্ষন্দু, দুর্দশা, ক্লেশ, ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যবোধ ইত্যাদি।
- শোষণ, নিপীড়ন প্রভৃতি।
- বাংলার রূপ, প্রকৃতি, মাঠ, নদী, পথ-প্রান্তর প্রভৃতি। এগুলোকেই ঘিরে পরিগ্রহ করেছে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের রূপ: স্বাধীনতাপূর্ব বাংলা সাহিত্য এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্যের ক্রমবিকাশের ধরন, প্রকৃতি এবং বিষয়বস্তুর মধ্যে বেশ ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। এ পর্বের উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের নারকীয়তা, তার মধ্যে সুন্দর বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখা এবং তারপর স্বাধীনতা অর্জন সবকিছুই স্থান পেয়েছে। সৈয়দ শামসুল হক এ পর্বে যেসব উপন্যাস রচনা করেছেন তাতে ধরা পড়েছে স্বাধীনতা-উত্তর গ্রামীণ জীবনের জটিল ও বহুমাত্রিক দ্বন্দ্ব। তার 'দূরত্ব' (১৯৮১) উপন্যাসে কলেজ শিক্ষক জয়নালের জীবনকথায় পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের সামাজিক রাজনৈতিক জীবনের জটিল বাস্তবতার চিত্র ধরা পড়েছে অত্যন্ত বিশ্বস্ততার সাথে। তার 'মহাশূন্য পরান মাষ্টার' (১৯৮২) ও 'আয়না বিবির পালা' (১৯৮২) উপন্যাস দুটিতে গ্রাম জীবনের পরিবর্তন ও তার ভাঙনের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। স্বাধীনতা অব্যবহিত পরবর্তী কয়েক বছরের অস্থিরতা ও সমাজ রাজনীতির চিত্র উপস্থাপিত হয়েছে হাসনাত আবদুল হাই রচিত 'তিমি' (১৯৮১) উপন্যাসে। স্বাধীনতা-উত্তর গ্রামীণ জীবনের সংঘাত ও অস্তিত্ব জিজ্ঞাসার এক চমৎকার শব্দরূপ সৃষ্টি হয়েছে বশীর আল হেলালের 'শেষ পানপত্র' (১৯৮৬) উপন্যাসে। স্বাধীনতা-পরবর্তী গ্রামীণ জীবনের বিনষ্টের যে চিত্র উল্লিখিত উপন্যাসগুলোতে পাওয়া যায়, তার বিপরীত গ্রামীণ জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া যায় হরিপদ দত্তের ঈশান 'অগ্নিদাহ' ও অন্ধকূপের 'জন্মোৎসব' উপন্যাস দুটিতে।
দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে যে বিশাল মধ্যবিত্ত শ্রেণী স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল, তাদের একটি বড় অংশ স্বাধীনতার পরে দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অব্যাহত বিশৃঙ্খলা দেখে হতাশ হয়ে পড়ে; ফলে শুরু হয় স্বপ্নভঙ্গের পালা। ১৯৭১-পরবর্তী উপন্যাসে মধ্যবিত্ত জীবনের সেই হতাশ ও স্বপ্নভঙ্গের চিত্রই অঙ্কিত হয়েছে। যেমন- সরদার জয়েনউদ্দীনের শ্রীমতি ক ও খ এবং শ্রীমান তালেব আলী (১৯৭৩) এমন একটি উপন্যাস, যেখানে স্বাধীনতা পরবর্তী বাঙালি জীবনের সামগ্রিক অবয়বের ছবি অঙ্কিত হয়েছে। যুদ্ধ-পরবর্তী-জীবনের হতাশাকে পরিপূর্ণরূপে চিত্রিত না করলেও হুমায়ুন আহমদের 'নন্দিত নরকে' (১৯৭২) ও 'শঙ্খনীল কারাগার' উপন্যাস দুটিতে মধ্যবিত্ত জীবনের পরিবর্তনহীনতা এবং পারিবারিক বৃত্তের মধ্যে সংঘটিত ব্যর্থতা ও নিঃসঙ্গতাকে রূপ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া সমাজবিচ্ছিন্ন ব্যক্তির আত্মসুখ খুঁজে ফেরা ভোগবাদী মানসিকতার চিত্ররূপ দেখতে পাওয়া যায় সৈয়দ শামসুল হকের 'খেলা রাম খেলে যা' (১৯৭৩) উপন্যাসে।
অন্যদিকে, রাজিয়া রহমানের 'রক্তের অক্ষর' (১৯৭৮) উপন্যাসে নগর জীবনের অন্ধকারাচ্ছন্ন বীভৎস ও পাশবিক হিংস্রতায় জর্জরিত পতিতা পল্লীর জীবন চিত্রিত হয়েছে। আবার রাজিয়া খানের 'হে মহাজীবন' উপন্যাসে দেখা যায় মুক্তিকামী এক নারীর জীবনচিত্র।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে রাজনীতি সচেতনতা, সেনাতন্ত্র, ধর্মতন্ত্র এবং যুদ্ধাপরাধী পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে যে জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজমান ছিল, তার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে একাধিক উপন্যাস। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শওকত ওসমানের 'পতঙ্গ পিঞ্জর' (১৯৮৩) ও সেলিনা খানের 'নিরন্তর ঘণ্টাধ্বনি' (১৯৮৭) প্রভৃতি।
ঐ সময়কার কবিতাগুলোও রচিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে। স্বাধীনতা-উত্তর কবিতাকে এক কথায় মুক্তিযুদ্ধের কবিতা বলা চলে। কারণ এ সময়ের কবিতায় বিশেষভাবে মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধের আবেগ ও অভিজ্ঞতা ধরা পড়েছে। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের কবিতা অঙ্গনে লেখনীতে যারা সক্রিয় ছিলেন তারা হলেন রফিক আজাদ, মহম্মদ রফিক, আবদুল্লাহ আবু সাঈদ, আসাদ চৌধুরী প্রমুখ। এদের পরে যারা তীব্র আবেগ, দ্রোহ আর প্রেমের কবিতা রচনা করেছেন তাদের মধ্যে নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, হুমায়ুন আজাদ, দাউদ হায়দার প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। এদের কবিতা অনেক বেশি জীবনঘনিষ্ঠ এবং মাটি-মানুষের কাছাকাছি। এ সময়ের কবিতা ব্যক্তিগত সুখদুঃখ বা বেদনাবোধের পরিবর্তে সমষ্টির চেতনাকে অধিক রূপায়িত করেছে; এবং কবিতায় চিরচেনা ভাব ও ভাষাকে বাদ দিয়ে এরা অনমনীয় ও বিষয়নির্ভর কবিতা রচনার প্রতি মনোযোগী হয়েছেন।
স্বাধীনতা-উত্তর দেশের মুক্ত পরিবেশে সাহিত্য রচনার যে স্বাধীন আবহ তৈরি হয়েছিল তা ক্রমেই বিনষ্ট হয়েছে বিভিন্ন কারণে। কেননা মানুষ এদেশের নিকট যা প্রত্যাশা করেছিল তা বাস্তবায়নের কোনো সম্ভাবনা না দেখে আশাহত ও বঞ্চনার বেদনায় মুষড়ে পড়েন এদেশের সাধারণ মানুষের মতো কবি ও সাহিত্যিকরাও। তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে দাউদ হায়দারের 'জন্মই আমার আজন্ম পাপ', রফিক আজাদের 'ভাত দে হারামজাদা তা-না-হলে মানচিত্র খাবো' ইত্যাদিতে।
এ সময়ের কবিতায় আরেক প্রধান বিষয় ছিল প্রেম। রাজনৈতিক চিন্তা ভাবনার পাশাপাশি কবিদের চেতনায় চিত্তের বৈভবটিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্রেম ও বিপ্লবকে তারা সমার্থক বিবেচনা করে তাদের কাঙ্ক্ষিত ভুবনকে পাওয়ার জন্য আকুল হয়েছেন। এ কারণে স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বিপ্লবী কবিতার পাশাপাশি অজস্র প্রেমের কবিতা রচিত হয়েছে।
কিন্তু এদেশের কবিতাও সাহিত্য এবং এর লেখকরা কখনোই প্রেমসর্বস্ব হয়ে থাকেনি। দেশের শাসনব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে যখন সামরিক স্বৈরাচার ক্ষমতাসীন, তখনও কবিরা নিজেদের হতাশা, ক্ষোভ ও প্রতিবাদ ব্যক্ত করতে দ্বিধাগ্রস্ত হননি। আশির দশকের কবিতা মূলত প্রতিবাদী চেতনায় পূর্ণ। তখন বাংলাদেশে চলছিল সামরিক স্বৈরাচার ও ক্ষমতালোভীদের শাসন-শোষণ; তাই সরাসরি দ্রোহের প্রকাশ ঘটেছে সে সময়ের কবিতায়।
অবশ্য নব্বইয়ের দশকে নতুন একটি চেতনা বাংলাদেশের কবিতাজগৎকে আন্দোলিত করে। এ দশকে কবিরা সচেতনভাবে উত্তর-আধুনিকতার চর্চা শুরু করেন। মূলত লিটল ম্যাগাজিনগুলোকে কেন্দ্র করে দেশীয় ঐতিহ্যের নানা বিষয় নিয়ে তারা ফিরে তাকান আদি ও প্রকৃত বাংলাদেশের দিকে। মূলত আরোপিত আধুনিকতার খোলস থেকে বাংলা কবিতাকে বের করে যথার্থ বাংলা ভাষা ও বাংলাদেশের কবিতা করে তোলাই উত্তর-আধুনিক কবিদের প্রচেষ্টা।
এ সময়ের ছোটগল্প স্বাধীনতা-পূর্ব যুগের তুলনায় অনেক বেশি গণমুখী ও রাজনীতি সংলগ্ন। মুক্তিযুদ্ধ, যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্তের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা, গ্রামীণ ও নাগরিক জীবনের ভাঙন, পারিবারিক জীবনে সুস্থিরতার অভাব ইত্যাদি বারবার উঠে এসেছে এ সময়ের গল্পে। আবার, মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন বাংলাদেশের সামাজিক অস্থিরতা, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, যুব সমাজের নৈতিক অবনতি এবং সামগ্রিক মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়কে বিষয়বস্তু করে একাধিক গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। যেমন- শওকত ওসমানের 'জন্ম যদি তব বঙ্গে' (১৯৭৫), আলাউদ্দিন আল আজাদের 'আমার রক্ত', 'স্বপ্ন আমার' (১৯৭৫) ইত্যাদি।
স্বাধীনতা-পরবর্তী ছোটগল্পের একটি বড় পরিবর্তন হচ্ছে জীবন দৃষ্টির পরিবর্তন। সমাজের উঁচু তলার মানুষের পাশাপাশি নিচুতলার মানুষও গল্পের বিষয়বস্তু হিসেবে স্থান পায়। সাধারণ মানুষের কামনা-বাসনার উন্মুখ চিত্র সম্বলিত একটি অনিন্দ্যসুন্দর গল্পগ্রন্থ হলো আল মাহমুদের 'পানকৌড়ির রক্ত'।
এ সময়ে বাংলাদেশের নগর সংস্কৃতি নিয়ে বিভিন্ন গল্প গড়ে উঠেছে এক ভিন্ন ধারায়। এ সংস্কৃতির দুটি প্রান্ত যার একদিকে চিত্ত-বৈভব, অন্যদিকে নিঃসঙ্গতা। বিত্তবানদের চিত্তদৈন্য আর নিঃস্বঙ্গের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এ দুই বিপরীতমুখী বিষয়কে অবলম্বন করে অনেকেই সৃষ্টি করেছেন তাদের গল্পের ভুবন। যেমন- রাহাত খানের 'অন্তহীন যাত্রা', 'অনিশ্চিত লোকালয়' প্রভৃতি।
স্বাধীনতা-উত্তরকালের ছোটগল্প ও বিভিন্ন সাহিত্যে সামাজিক দায়বদ্ধতা অধিক পরিমাণে প্রকাশিত হয়, কারণ সমাজে তখন নানামুখী পরিবর্তন সূচিত হচ্ছিল; রাজনৈতিক ভাঙাগড়া, শোষণ, বঞ্চনা বৃদ্ধির ফলে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি তেমন ঘটেনি। তবে এর মধ্যেই গজিয়ে ওঠে একটি উচ্চবিত্ত শ্রেণী। তার জীবনাচরণও গল্পে জায়গা করে নিয়েছে। দারিদ্র্যক্লিষ্ট ভূমিহীন কৃষক, জোতদার ও মহাজনের শোষণ পীড়ন, রাজনৈতিক ফড়িয়া, দালাল ও ধর্মব্যবসায়ীদের দ্বারা বিভ্রান্ত বিপর্যস্ত গ্রামবাংলার লোকদের কথা গল্পে স্থান পেয়েছে অনেক পূর্বেই, তবে এ সময়েও কেউ কেউ এ বিষয়কে ঘিরে গল্প রচনা করেছেন।
এ সময়ের নাট্যজগতেও আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন, কেননা তখন এদেশের সংস্কৃতি চর্চার মুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়। তাছাড়া নাট্যকারদের উদ্ভাবনী শক্তি, রাজনীতি সচেতনতা, কৌশলগত আঙ্গিক ও পরিশীলিত ভাষা-স্বাধীনতা পরবর্তী নাটকে এক প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের নাটক হয়ে ওঠে নাট্য আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার, গড়ে ওঠে নানা নাট্যগোষ্ঠী এবং নিয়মিত নাট্য মঞ্চায়নের মাধ্যমে নাটককে ক্রমশ একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে বর্তমানের নাট্যকর্মীরা।
স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে যেটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক তা হলো- সাহিত্য নিয়ে গবেষণার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ করা যায় এবং এর প্রেক্ষিতে বহু গবেষণামূলক গ্রন্থ রচিত হয়।
স্বাধীনতা-উত্তর সংস্কৃতির চিত্র: সাহিত্য ও সংস্কৃতি একই বৃস্তে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে, সংস্কৃতিবোধ ঘিরে জন্ম হয় নব নব সাহিত্য ও শিল্পের। এদেশের সংস্কৃতির ইতিহাস বহু জনমের ঐতিহ্যকে লালন করে এবং ধারণ করে। কিন্তু সংস্কৃতির এ গতিধারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নমুখী হয়ে নতুন নতুন আচার, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, শিল্প, জ্ঞান ইত্যাদিকে আলিঙ্গন করেছে। ঠিক তেমনিভাবে এদেশের স্বাধীনতা-পূর্বকালের সংস্কৃতির গতিপথ এবং স্বাধীনতা-উত্তর সংস্কৃতির পথচলা একই স্রোতমুখো নয় বরং কিছুটা ভিন্ন পথে প্রবহমান। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যে অবস্থা তার ওপর দাঁড়িয়ে সংস্কৃতি তার রূপ বদলিয়েছে। এক সময় এদেশের সংস্কৃতির যে চিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে আজ তার রূপ আমরা খুব কমই দেখতে পাই। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সংস্কৃতির অঙ্গনকে এ দেশের নব নব অর্থনৈতিক ভিত্তি, সামাজিক কাঠামো, রাজনৈতিক পরিমণ্ডল বিভিন্ন উপায়ে প্রভাবান্বিত করে। সেই লোকনৃত্য, জারি, সারি, ভাওয়াইয়া, পালাগানের জায়গা দখল করেছে আধুনিক তথা উত্তরাধুনিককালের পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির চর্চা। অতীতের কৃষিনির্ভর সংস্কৃতি বিলুপ্ত হতে থাকে এবং তথাকথিত আধুনিক যন্ত্রনির্ভর সংস্কৃতি চর্চা শুরু হয়।
সমাজ কাঠামোতে পরিবর্তন সূচিত হয়। পরিবারের ভিতর যে একাত্ম মনোভাব, ঐক্যতান ছিল সেটি ধীরে ধীরে লোপ পেয়ে পরিবার প্রথায় স্বাতন্ত্র্যবোধের জন্ম হয়। ফলে, একক পরিবার গড়ে উঠতে থাকে। স্নেহবোধ, আন্তরিকতা, দায়িত্ববোধ লোপ পেতে থাকে। আজ যেটি আরও বেশি তীব্রতর রূপ নিয়েছে।
একদিন পল্লী জীবনের হৃদয়গ্রাহী যে চিত্র আমাদের মানসপটে ভেসে উঠতো তা ধীরে ধীরে মুছে যেতে শুরু করলো, একতারা, ঢোল, তবলা, সারিন্দার জায়গা দখল করলো পশ্চিমা বাদ্যযন্ত্র।
পোশাক পরিচ্ছদে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য ছিল। বিদেশী সংস্কৃতির, ব্যাপক প্রসার ও চর্চার প্রভাবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিচ্ছদে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। বাংলা ভাষা ব্যবহারেও আজ অরুচি, ইংরেজি ভাষা ব্যবহারেই সকলে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।
আগে যেমন গ্রামীণ সংস্কৃতির রস আস্বাদন করে মানুষ আনন্দ উপভোগ করতো আজ সেখানে জায়গা নিয়েছে চলচ্চিত্র, নাটক, টিভি সিরিয়াল ইত্যাদি। আজ আমাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও নীতিবোধের জায়গাও বড় বেশি নাজুক হতে চলেছে।
এত কিছুর পরেও আজ মানুষ অনেক বেশি সচেতন। আজ মানুষ বিশ্বমানের চিন্তা, বিশ্বাস, শিল্পকলা, সৃষ্টিশীলতা ইত্যাদিতে মগ্ন। আজ বিশ্বায়নের প্রভাবে সামাজিক সংস্কৃতির অবক্ষয় পরিলক্ষিত হালেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের অনেক বেশি নিকটবর্তী হচ্ছে অর্থাৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক উষ্ণ সম্পর্কের জন্ম হয়েছে যেটা বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতিতে বিশ্বাসী মানুষকে পারস্পরিকভাবে কাছাকাছি আসতে সহায়তা করছে।
সত্য বলতে কি, স্বাধীনতা-পরবর্তী সংস্কৃতির ধারা মূলত তথাকথিত আধুনিক বা পশ্চিমা সংস্কৃতির রূপকে পরিগ্রহ করে আবর্তিত হচ্ছে, কেননা মানুষ আধুনিকতার প্রভাবে প্রভাবান্বিত।
উপসংহার: উল্লেখিত দুই কালের সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে অনেক পার্থক্য লক্ষণীয়। স্বাধীনতা-পূর্ব সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা হতো গ্রামীণ জীবন, প্রকৃতি, কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, ঐতিহ্যগত বিশ্বাস ও রীতিনীতি, তখনকার সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন, শোষণ-নিপীড়ন প্রভৃতিকে ঘিরে। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির গতিপথ কিছুটা ভিন্নখাতে প্রবাহিত হয়। নতুন সামাজিক অর্থনৈতিক তথা রাজনৈতিক কাঠামোই নতুন সংস্কৃতির জন্ম দেয়, যার প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে সাহিত্যে, কেননা সাহিত্য মানব জীবনাচরণেরই প্রতিবিম্ব। স্বাধীনতা-উত্তর সাহিত্যের ক্ষেত্রে অনেক তরুণ লেখক তাদের শিল্পিত হৃদয় নিয়ে আবির্ভূত হয়, কিন্তু সেই পূর্বের শৈল্পিক রূপটি আজকালকার সাহিত্যে তেমনটি লক্ষ করা যায় না। কেননা এখনকার সাহিত্য চর্চা মানবসর্বস্ব হওয়ার চেয়ে বড় বেশি বাণিজ্যসর্বস্ব হয়ে পড়েছে।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

