• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলাদেশ
Back

বাংলাদেশে জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয় সম্পর্কে বিশদভাবে লিখুন।

ভূমিকা: দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম নিয়ামক হলো জলসম্পদের পরিকল্পিত ব্যবহার। আমরা প্রচলিত জলসেচন কর্মে পানির প্রকৃত চাহিদার তুলনায় ২ থেকে ৩ গুণের বেশি ব্যবহার করছি, যা মূল্যবান জলসম্পদের অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয়। মোটকথা, বাংলাদেশে জলসেচন কর্মের শতকরা ২৫ থেকে ৪০ ভাগ শস্য উৎপাদন কাজে ব্যবহৃত হয়, বাকি ৭৫ থেকে ৬০ ভাগ জলের অপচয় হয়। জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয়ের চিত্র উঠে এসেছে International Water Management Institute (IWMI)-এর তথ্যে। তাতে বলা হয়েছে, বিশ্বে জলসেচন কর্মে জলের অপচয় হয় গড়ে ৫০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে এর হার ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ দক্ষ ব্যবহার হচ্ছে এ জলের মাত্র ৩৪ শতাংশ। জলসেচন কর্মের সর্বোত্তম ব্যবহারে ধান উৎপাদনকারী, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যেও বাংলাদেশের অবস্থান নিচের সারিতে।

বাংলাদেশে জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয়: দেশে বিদ্যমান সেচযন্ত্র দিয়ে যে জলসেচন কর্ম সম্পাদন করা হয় তাতে জলসম্পদের অতিমাত্রায় অপচয় হয়। নিচে বাংলাদেশে জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয় সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:

১. অনিয়ন্ত্রিত গভীর ও অগভীর নলকূপ স্থাপন: বাংলাদেশে বর্তমানে ৫০ লাখেরও অধিক সেচযন্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে আছে ভূগর্ভ থেকে পানি উত্তোলনের জন্য গভীর ও অগভীরসহ ৬ ধরনের নলকূপ। ভূ-উপরিস্থ পানি সেচের জন্য রয়েছে লো-লিফটসহ যান্ত্রিক পাম্প ও সনাতন পদ্ধতির নানাবিধ সেচব্যবস্থা। এসব সেচ যন্ত্র প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচের কাজ করে। জানা যায়, একযুগের ব্যবধানে প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার সেচযন্ত্র বেড়েছে। তার ফলে সেচের জমি বেড়েছে ২০ লাখ হেক্টরেরও বেশি। কিন্তু পরিতাপের বিষয় এই যে, এসব গভীর ও অগভীর নলকূল অনিয়ন্ত্রিত উপায়ে স্থাপন হওয়ার দরুন জলসম্পদের অপচয় হচ্ছে।

২. ড্রেনেজ ব্যবস্থায় দুর্বলতা জলসেচন কর্মে পানি সরবরাহের মাধ্যম হলো ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এসব ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে দূর-দূরান্তে পানি সরবরাহ করা হয় কৃষি ফসল ফলানোর উদ্দেশ্যে। কিছু এসব ড্রেনেজ ব্যবস্থা আঁধা কাঁচা আঁধা পাকা হওয়ায় চুইয়ে চুঁইয়ে অনেক পানির অপচয় হয়। ফলে সরবরাহকৃত পানির একটা বৃহৎ অংশ ড্রেনেজ দুর্বলতার কারণে পথিমধ্যেই অপচয় হয়।

৩. পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির অভাব: বাংলাদেশে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির প্রকট অভাব। কৃষকরা যেমন পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে খুব একটা আগ্রহী নন তেমনি কৃষি বিভাগ ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডও এ ব্যপারে খুব একটা আগ্রহী বা সচেতন নন। ফলে জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয় হচ্ছে অতিমাত্রায়।

৪. পানি সাশ্রয়ী পদ্ধতি উদ্ভাবনের অভাব: বাংলাদেশে পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির অভাব থাকা সত্ত্বেও পানি সাশ্রয়ী নতুন নতুন পদ্ধতি উদ্ভাবনে খুব একটা সাড়া লক্ষ্য করা যায় না। পানির সঠিক ব্যবহারের বিষয়টি মাথায় রেখে উন্নয়নশীল বিশ্বের ধান আবাদি এলাকার জন্য আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন করেছে পানি সাশ্রয়ী এক নতুন পদ্ধতি, যা 'এডব্লিউডি' নামে পরিচিত। বাংলাদেশে প্রচলিত সেচ পদ্ধতিতে ১ কেজি ধান উৎপাদন করতে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার লিটার পানির প্রয়োজন হয়। আর নতুন পদ্ধতিতে ১ কেজি ধান উৎপাদনের জন্য পানির প্রয়োজন হয় মাত্র ১৩০০ থেকে ১৭০০ লিটার। বাংলাদেশে এ ধরনের নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন না করার দরুন জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয় হচ্ছে।

৫. টেকসই সেচ না দেয়া: বাংলাদেশে যে প্রক্রিয়ায় ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে সেচ দেয়া হচ্ছে তা মোটেই টেকসই নয়। মাটির নিচের পানি দিয়ে কৃষিতে জলসেচন কর্ম বেশিদিন চালানো সম্ভব নয়। কারণ এ পানি অফুরন্ত নয়। নানা ওয়াটার মডিউলিং করে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ দেখানোর চেষ্টা করে যে, বরেন্দ্র অঞ্চল থেকে যে পানি তোলা হয়, বর্ষায় তা পুনর্ভরণ হয়। কিন্তু এটা অবিশ্বাস্য। কারণ অগভীর নলকূপ থেকে এখন আর পানি আসে না। তাই ভূগর্ভস্থ পানি কৃষিতে ব্যবহার আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। অর্থাৎ টেকসই সেচ না দেয়ার কারণেও পানির অপচয় হচ্ছে।

৬. বিতরণ ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে দুর্বলতা বাংলাদেশে কৃষিক্ষেত্রে জলসেচনের ক্ষেত্রে বিতরণ ও প্রয়োগ পদ্ধতিতে যথেষ্ট দুর্বলতা বিদ্যমান। ফলে পানির অদক্ষ ব্যবহার হচ্ছে হরহামেশা। সুতরাং জলসেচনের ক্ষেত্রে বিতরণ ও প্রয়োগ পদ্ধতির দুর্বলতা রোধ এখন সময়ের দাবি।

৭. অপরিকল্পিত পানি উত্তোলন বাংলাদেশে জলসেচন কর্যের জন্য অপরিকল্পিত উপায়ে পানি উত্তোলন করা হয় এবং চাহিদার তুলনায় অসচেতনভাবে বেশি পানি ব্যবহার করা হয়। এতে করে একদিকে জলসম্পদের অপচয় হচ্ছে অন্যদিকে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জন্য খুবই আশঙ্কাজনক।

৮. বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা: বাংলাদেশে সেচের জন্য ব্যবহারযোগ্য প্রায় ১৪ লাখ গভীর ও অগভীর নলকূপ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ডিজেল চালিত। বাকি ৩ লাখ চলে বিদ্যুতে। গভীর নলকূপের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়তি চাপ পড়ছে বিদ্যুতের ওপর। সেচের জন্য প্রতিদিন বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় দেড় হাজার থেকে ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট। কিন্তু বাংলাদেশে বিদ্যুতের অপর্যাপ্ততা থাকায় চাহিদামতো সেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হয় না। অর্থাৎ সেচ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা যাতায়াতের মধ্যে থাকে। এতে করে জলসম্পদের অপচয় হয়।

৯. সচেতনতার অভাব: বাংলাদেশের কৃষিকাজে নিয়োজিত অধিকাংশ কৃষকই অল্পশিক্ষিত বা অশিক্ষিত। তাই তাদের মাঝে আধুনিক প্রযুক্তি ও কলাকৌশলের যেমন অভাব বিদ্যমান তেমনি জলসেচে পানির অপচয়রোধে সচেতনতার অভাবও বিদ্যমান। এতে করে তারা চাহিদার তুলনায় বেশি পরিমাণে পানি সেচ ব্যবস্থায় ব্যবহার করে ও পানির অপচয় করে।

১০. প্রশিক্ষণের অভাব: বাংলাদেশ কৃষিমন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দেশে ধানের আবাদ হয় প্রতিবছর সাড়ে এক কোটি হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে বোরো ধানের আবাদ হয় ৪৭-৪৮ লাখ হেক্টর জিনিতে। বোরোর এ আবাদে সেচের প্রয়োজন হয় সবচেয়ে বেশি। এর বাইরে গম ও ভুট্টার আবাদেও সেচের প্রয়োজন হয়। এ লাখ লাখ হেক্টর জমিতে কতটুকু সেচ দিলে সর্বোচ্চ ফলন হবে সে বিষয়ে আমাদের কৃষকদের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। ফলে সেচ ব্যবস্থায় পানির অপচয় বাড়ছে।

১১. পানি ধরে রাখতে না পারা: একে তো দুর্বল ড্রেনেজ সিস্টেমের মাধ্যমে ফসলি জমিতে সেচ দেওয়া হয়, তারপর আবার সেই জমিতে ঠিকমত আইল না থাকায় ক্ষেতে পর্যাপ্ত পানি ধরে রাখা সম্ভব হয় না। এতে করে পুনঃপুন ফসলি জমিতে সেচ দিতে হয়। যা পানির অপচয়কে বাড়িয়ে দেয় বহুগুণে।

১২. সময়মত সেচ না দেওয়া পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যে, আমাদের দেশে ফসলি জমিতে যে সেচ দেওয়া হয় তার বেশির ভাগই হয় সেচের আগে, আর না হয় সেচের পরে। এতে করে ক্ষতিগ্রদু হয় ফসল ও ফসলের উৎপাদন এবং অপচয় হয় জলসম্পদের।

জলসম্পদের অপচয় রোধে করণীয়: বাংলাদেশে জলসেচন কর্মে যে প্রচুর পরিমাণ জলসম্পদের অপচয় ঘটে তা রোধ করা না গেলে দেশে জলসেচন তো বটেই পাশাপাশি সুপেয় পানির চাহিদা পূরণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। নিচে জলসম্পদের অপচয়রোধে করণীয় দিকসমূহ উল্লেখ করা হলো:

  • ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ কমাতে হবে,
  • সরকার কর্তৃক বিভিন্ন প্রকল্প ও প্রযুক্তি সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিতে হবে,
  • সেচের পানির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করতে কৃষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • প্রথাগত সেচনালা সম্প্রসারণ না করে টেকসই বারিড পাইপ সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • খাল খনন বা পুকুর খননসহ ভেড়িবাঁধ, রাবার ড্যাম নির্মাণ ও সোলার প্যানেলের মাধ্যমে সেচ কার্যক্রম জনপ্রিয় করতে হবে।
  • পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি জনপ্রিয় করতে কৃষকদেরকে উৎসাহ ও আর্থিক প্রণোদনা দিতে হবে।
  • এডব্লিউডি পাইপ (এলাকাভেদে হাতিম ও যাদু পাইপ নামে পরিচিত) এর সম্প্রসারণ করতে হবে।
  • পানির অপচয় রোধে প্রচার বাড়াতে হবে ইত্যাদি।

উপসংহার: বাংলাদেশে জলসেচন কর্মে জলসম্পদের অপচয় আজ বিরাট সমস্যা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। যদি এই বিপুল পরিমাণ জলসম্পদের অপচয়রোধ করা সম্ভব হয় তবে প্রতিবছর কৃষিক্ষেত্রে ব্যবহৃত ডিজেল ও বিদ্যুৎ থেকে অতিরিক্ত ৩৫০ কোটি টাকা জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব হবে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার হ্রাস পাবে, সুপেয় পানির প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাবে এবং কৃষি উৎপাদন, মৎস্য চাষ, শিল্প উৎপাদন ও মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে। এছাড়া যুগের প্রয়োজনে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং গৃহস্থালী কাজে ব্যবহৃত পানির পুনঃব্যবহারের বিষয়টিও আমাদের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ