• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলাদেশ
Back

বাংলাদেশে মানবসম্পদ বিকাশে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করুন।

কোনো দেশের জনসংখ্যার প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তিকে বলা হয় মানবসম্পদ। অন্যান্য সম্পদের মতো মানবসম্পদও একটি দেশের, জাতির এবং সমগ্র বিশ্বের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য প্রয়োজন। আমাদের এ ছোট এবং ঘনবসতিপূর্ণ দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ তেমন নেই। আমাদের আছে প্রায় যোল কোটির বিশাল জনসংখ্যা। এ জনসংখ্যার ভারে ন্যুজ না হয়ে বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হলে একমাত্র মানবসম্পদের উন্নয়ন এবং ব্যবহারের মাধ্যমে তা করতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশের জনসংখ্যা প্রশিক্ষিত এবং দক্ষ নয়। তাই শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা একান্ত জরুরি। সে লক্ষ্যে আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সুপরিকল্পিত পরিবর্তন একান্ত প্রয়োজন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় তাদের হয়েছে শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত দক্ষ জনশক্তি এবং এ দক্ষ জনশক্তি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে নিজেদের উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।

আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা: আমাদের দেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা রয়েছে। মূলধারার শিক্ষা, ইংরেজি মাধ্যমে শিক্ষ ক্ষ, মাদ্রাসা শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা। এছাড়াও রয়েছে কাওমি মাদ্রাসা। এ হরেক রকম শিক্ষা মাধ্যমে পড়ুয়া ছেলেমেয়েরা নিজেদের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্য রাখতে পারছে না। কারণ তাদের শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং শিক্ষার মাধ্যম এক নয়। মূলধারার শিক্ষায় প্রাথমিক বিদ্যালয় বাংলা মাধ্যম ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রস্তুত করছে। ইংরেজি মাধ্যম স্কুলগুলো দেশীয় সংস্কৃতিকে উপেক্ষা করে বিদেশী ধারা অনুসরণ করছে। মাদ্রাসা। শিক্ষায় ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে মূলধারার শিক্ষাকে অনুসরণ করছে। এছাড়াও রয়েছে ক কামি মাদ্রাসা শিক্ষা যেখানে শুধু ধর্মীয় শিক্ষা দেয়া হয়ে থাকে। কারিগরি শিক্ষায় মূলধারা এবং ইবতেদায়ি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে শিক্ষা করতে পারে।

আমাদের এ বিশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষার মাধ্যমও এক নয়। বাংলা ভাষা শুধু মূলধারার শিক্ষা মাধ্যমেরই মূল বাহন। ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায় ইংরেজি আর মাদ্রাসা শিক্ষায় আরবি, উর্দু, ফারসি জোর দেয়া হয়। ফলে পরবর্তীতে এসব শিক্ষর্থীরা জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে না।

এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, যেখানে একমুখী শিক্ষার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় ইংরেজি মাধ্যম এবং ধর্মীয় মাদ্রাসা শিক্ষাকে আনা হয়নি। ফলে মূলধারার শিক্ষা এবং ইবতেদায়ী মাদ্রাসা শিক্ষাই শুধু একমুখী শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে পড়ছে। তাই এ একমুখী শিক্ষাব্যবস্থাও সমালোচনার মুখে।

মানবসম্পদ উন্নয়নে শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশ: একটা জাতি তখনই সমৃদ্ধ জাতি বলে পরিগণিত হয় যখন তারা সুশিক্ষিত হতে পারে। আদ্ধ সুশিক্ষিত জাতিই পারে বর্তমানের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে। তাই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আধুনিক এবং যুগোপযোগী হওয়ার দরকার। নিচে সুপারিশসমূহ আলোচিত হলো:

১. শিক্ষাব্যবস্থার একমুখীকরণ: করতে হবে। প্রাথমিক বিদ্যালয় মাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থাকে মূলধারার শিক্ষার সাথে একমুখী থৈকে শিক্ষার্থীকে বিজ্ঞান শিক্ষায় আকৃষ্ট করতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষাকে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত উন্নীত করা একটা ভালো পদক্ষেপ। কারণ পঞ্চম শ্রেণী পাস করেও আমাদের শিক্ষার্থীরা ভালো করে নিজের নামও অনেক সময় লিখতে পারে না। তাছাড়া ধর্ম শিক্ষাভিত্তিক মাদ্রাসাকে মূলধারার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং ভাষার প্রতি সাথে এক করতে হবে। ইংরেজি শিক্ষা মাধ্যমগুলোকে দেশীয় জোর দিতে হবে।

২. বিজ্ঞান শিক্ষায় গুরুত্বারোপ: বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তির উন্নত শিখরে পৌছেছে। তাই গণিত এবং বিজ্ঞান শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে হবে। একমুখী শিক্ষাব্যবস্থায় কোনো বিভাগ থাকবে না দশম শ্রেণী পর্যন্ত। পরবর্তীতে বিজ্ঞান, শীমরিক বাণিজ্যিক বিভাগ তারা নিজেরা পছন্দ করবে। কিন্তু অনেক বিশেষজ্ঞের মতে এতে বিজ্ঞানের বর্ত উপর কম জোর দেয়া হবে। তাই শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান এবং গণিতের উপর জোর দেয়া একান্ত জরুরি। এতে পরবর্তীতে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হবে।

৩. কারিগরি শিক্ষায় গুরুত্বারোপ: আমাদের দেশে কারিগরি শিক্ষাকে তেমন মূল্যায়ন করা হয় না। কিন্তু কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব। যেসব শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষায় যেতে পারবে না তাদের কারিগরি শিল্পীচরে মাধ্যমে প্রশিক্ষিত করতে পারলে দেশে এবং বিদেশে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে কাজ করানো যাবে। এতে তারা নিজেরাও আর্থিকভাবে লাভবান হবে কোরিয়ায় যে প্রযুক্তির বিপ্লব সম্ভব হয়েছিল তার ভিত্তি ছিল সরকারের সহায়তায় বিদেশে প্রশিক্ষিত
বিজ্ঞানীদের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে যুক্ত করে গবেষণা ও শিক্ষার সমন্বয় সাধন। সিঙ্গাপুর ও
মালয়েশিয়া একইভাবে নিজেদের উন্নতি করেছে।

৪. উচ্চশিক্ষার গবেষণার উপর গুরুত্বারোপ: আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা তার প্রাচীন পদ্ধতিতেই রয়ে গেছে। শুধু মুখস্থবিদ্যার ওপর ভর করে চলছে। কিন্তু উচ্চ শিক্ষাকে আধুনিক করতে হবে। গবেষণার ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। এর জন্য সরকারি সাহায্য বাড়াতে হবে।

৫. নারী শিক্ষায় গুরুত্বারোপ: দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক প্রায় নারী। তাই তাদের সুশিক্ষিত করতে সরকার দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক ব্যবস্থা চালু করেছে। এটাকে আরো বাড়াতে হবে এবং দীর্ঘদিন পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। তাছাড়া তাদের সুশিক্ষিত করে বসিয়ে রাখলে চলবে না, কাজ করার সুযোগ এবং পরিবেশ দিতে হবে। আমাদের দেশে নারীদের প্রতি বৈষম্য করা হয়। এতে তারা সব কিছুতে পিছিয়ে পড়ে। তাই নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য সচেতনতা এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

৬. সুশিক্ষিত এবং সুপ্রশিক্ষিত শিক্ষক শিক্ষার মূল হচ্ছে শিক্ষক। শিক্ষার মান উন্নতির জন্য শিক্ষকদের মান উন্নত করা প্রয়োজন। আমাদের দেশে শিক্ষকের অবস্থা খুব করুন। মেধাবী লোকজন এখন আর শিক্ষকতায় যেতে চায় না। তাই শিক্ষকদের বেতন বৃদ্ধি এবং সময়মতো বেতনপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাছাড়া তাদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ তিনি বন্ধু, পথপ্রদর্শক, সন্ধানী, সৃজন সহযোগী, আলোচনায় বিতর্কের সঙ্গী হয়ে নতুনের উদ্ভাবন করেন, নতুন মনের সৃষ্টি করেন। তাই সুশিক্ষিত জাতি পেতে হলে সুশিক্ষিত এবং সুপ্রশিক্ষিত শিক্ষক দরকার।

৭. শিক্ষালয়ের পরিবেশ এবং ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক: আমাদের দেশের শিক্ষালয়ের অবস্থা খুব খারাপ। গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যেতে শিক্ষার্থীদের অনেক কষ্ট পোহাতে হয়। তাছাড়া সরকারি ছাড়া অন্যান্য বিদ্যালয়ের অবস্থাও খুব জীর্ণ। অধিকাংশ বিদ্যালয়েই খেলার মাঠ নেই। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নেই, নেই পায়খানা। এসব অবকাঠামোগত উন্নয়ন না করে ভালো শিক্ষা পাওয়ার আশা করা যায় না। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়ন দরকার। তাছাড়া ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যদি বন্ধুত্বপূর্ণ না হয় তাহলে পাঠদান তেমন কার্যকর হয় না। আর উচ্চশিক্ষায় ছাত্র-শিক্ষক এমনভাবে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেছে যে, তারা শিক্ষাকে গৌণ মনে করছে।

৮. শিক্ষাব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার: আমরা বিজ্ঞানের যুগে বাস করছি। বিজ্ঞানমনষ্কতা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। তাই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শিক্ষাক্ষেত্রে অপরিহার্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে। প্রথম থেকেই শিক্ষার্থীকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের সাথে পরিচিত করতে হবে এবং হাতে-দাতে শিক্ষা দিতে হবে। জ্ঞানের যে বৈশ্বিক পরিবর্তন তাতে অংশীদারী হতে হলে শিক্ষায় যে নেটওয়ার্কিং প্রয়োজন তা আমাদের দেশে নেই। তাই অবকাঠামোগত উন্নতি সাধনের মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে হবে।

উপসংহার: মানবসম্পদ উন্নয়নে শুধু সিলেবাস পরিবর্তন করলেই চলবে না। এর জন্য সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। তাছাড়া শুধু শিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি তৈরি করলেই চলবে না তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ দিতে হবে। আমাদের দেশ থেকে অনেক শ্রমিক বিদেশে গিয়ে কাজ করে। তাদের যদি স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণও দেয়া যায় তাহলেও তারা দক্ষ হয়ে উঠে। আর প্রশিক্ষিত বিদেশে গিয়ে কাজ করার সুযোগ আরো বাড়বে। তাছাড়া আমাদের বর্তমান শিক্ষাকে পাল্টিয়ে আধুনিকায়ন করতে হলে সব কিছুতেই পরিবর্তন অপরিহার্য। সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে শিক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তনও কাঙ্ক্ষিত নয়। আর জনগণকে শিক্ষিত, দক্ষ করতে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন জরুরি। যদিও কয়েক বছর যাবৎ সরকার শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে আসছে। কিন্তু এটাও যথেষ্ট নয়। সরকারি উদ্যোগ, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে জনসংখ্যাকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নতি তথা মুক্তি লাভ করতে হবে।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ