• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩

  • বিসিএস ২০১৩
  • বাংলাদেশ
Back

বাংলাদেশের অর্থনীতির বিকাশের জন্য এ যাবত গৃহীত কৌশল ও নীতিসমূহের সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করুন।

পৃথিবীতে এমন কোনো দেশ নেই যেখানে কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নেই। যে কোনো দেশের জাতীয় উন্নয়নে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিকল্পনার গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যবহ। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার জন্য সুষ্ঠু পরিকল্পনা অপরিহার্য। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। ব্যক্তিগত জীবনের দৈনন্দিন কাজ থেকে শুরু করে একটি রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সুচিন্তিত কর্মসূচির প্রয়োজন হয়। এ কর্মসূচিকে পরিকল্পনার মাধ্যমে সংগঠিত করতে হয়। কাজেই এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হলো অর্থনৈতিক সফলতা লাভে পূর্ব নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনে সুচিন্তিত কর্মসূচি।

অর্থনৈতিক পরিকল্পনা: অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হলো নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের জন্য দেশের যাবতীয় সম্ভাব্য উপকরণগুলোর হিসাব-নিকাশ ও তাদের দক্ষ ব্যবহারের জন্য রাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি সুচিন্তিত কর্মধারা। অথবা বলা যায়, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হচ্ছে পূর্ব নির্ধারিত ও স্বচ্ছভাবে বর্ণিত অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহ অর্জনের জন্য একটি বহুল পরিচিত কৌশল।

বিভিন্ন অর্থনীতিবিদ অর্থনৈতিক পরিকল্পনার বিভিন্ন সংজ্ঞা প্রদান করেছেন। যেমন-

অধ্যাপক এল, রবিন্স (Prof. L. Robins)-এর মতে, "উৎপাদন ও বিনিয়োগের বেসরকারি কর্মযজ্ঞ যৌথভাবে সম্পাদন বা নিয়ন্ত্রণের নামই হচ্ছে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।"

অধ্যাপক ডিকিন্‌সন (Dieckinson)-এর ভাষায়, “সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক পদ্ধতির সকল জরিপের ভিত্তিতে কোন সম্পদ কতটুকু পরিমাণ, কীভাবে, কখন ও কোথায় উৎপাদিত হবে এবং কোন খাত বা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির উদ্দেশ্যে ঐ সম্পদ কী পরিমাণে বণ্টন করা হবে; এসব ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় নির্ধারণী কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তই হচ্ছে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।"

অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে মতপার্থক্য বিদ্যমান। তবে অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন যে, একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্বচ্ছভাবে সংজ্ঞায়িত ও নির্ধারিত লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যে কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অর্থনীতির স্বেচ্ছাকৃত নিয়ন্ত্রণ ও নির্দেশ প্রদানই হাচ্ছে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা।

বাংলাদেশে গৃহীত অর্থনৈতিক পরিকল্পনাসমূহ: স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মোট ৯টি পরিকল্পনা গৃহীত হয়। এর মধ্যে ৬টি পঞ্চবার্ষিক ও ১টি দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনা ছাড়াও ২টি দারিদা বিমোচন কৌশলপত্র (PRSP) রয়েছে। নিচে বিভিন্ন অর্থনৈতিক পরিকল্পনা উপস্থাপন করে আলোচনা করা হলো-

[উৎস: ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন।

১. প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: স্বাধীনতা অর্জনের পর ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই থেকে বাংলাদেশে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা শুরু হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতির পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের জন্য এ পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ১৯৭৩ সালের ১ জুলাই শুরু হয়ে ১৯৭৮ সালের ৩০ জুন শেষ হয়। এ পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল জনগণের দারিদ্র্য লাঘব করা, মোট জাতীয় উৎপাদন বার্ষিক ৫.৫% হারে বৃদ্ধি করা, ২.৫% হারে মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি করা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বার্ষিক ৩% থেকে ২.৮% ভাগে নামিয়ে আনা, অভ্যন্তরীণ সম্পদের সদ্ব্যবহার ও আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করা, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। যদিও এ লক্ষ্যের অধিকাংশই অর্জিত হয়নি।

২. দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনা: ১৯৭৮-৮০ সালের জন্য একটি দ্বিবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এটি ছিল একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন প্রতিকূলতার কারণে। দেশের জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের অবস্থা তখন ছিল না। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অবস্থা এবং প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার ব্যর্থতা সরকারকে দীর্ঘকালীন পরিকল্পনা হতে বিরত রাখে। দ্বি-বার্ষিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোকে একটা সুষ্ঠু ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো, যার ভিত্তিতে একটা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়ন বরা যায়। এ পরিকল্পনায় প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার অসমাপ্ত প্রকল্পগুলো সমাপ্ত করার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়। এ পরিকল্পনাটি দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কিছুটা গতির সঞ্চার করে।

৩. দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: ১৯৮০ সালের ১ জুলাই দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। জনগণের মৌলিক প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলোর যোগান বৃদ্ধির মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, বার্ষিক জাতীয় উৎপাদন ৫.৪% হারে বৃদ্ধি, মাথাপিছু বার্ষিক আয় ৩.৫% হারে বৃদ্ধি, কৃষি ও শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধির হার যথাক্রমে ৫% ও ৮.৪% অর্জন, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ২.৭% থেকে ১.৫%-এ নামিয়ে আনা, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, পল্লী এলাকার উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং বৈদেশিক সাহায্যের ওপর নির্ভরশীলতা হ্রাস ইত্যাদি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা করা হয়।

৪. তৃতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: ১৯৮৫ সালের ১ জুলাই হতে ১৯৯০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এ পরিকল্পনার মেয়াদ ছিল। এ পরিকল্পনার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনের কাজ সম্পন্ন করা, কৃষি ও শিল্প উভয় খাতে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য লাঘব করা। পরিবারকে জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক ইউনিট হিসেবে ধরে তাদের ভেতরকার সম্ভাবনাময় সম্পদের সর্বোত্তম বিকাশের প্রচেষ্টা চালানো, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার হ্রাস করা, দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী জনগোষ্ঠীর জন্য উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে তাদের আত্মনির্ভরশীল করে তোলা, সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা ও মানবসম্পদের উন্নয়ন, দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোগত পরিবর্তন সাধনের জন্য প্রযুক্তিগত ভিত্তির উন্নয়ন সাধন করা, খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা, স্বনির্ভরতা ত্বরান্বিত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি চাঙ্গা করা, জনগণের সর্বনিম্ন মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করা, সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে যৌথ কার্যক্রম চালু করা, এতিম ও অসহায় শিশুদের যথোপযুক্ত বিকাশ এবং তাদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানসমূহে পারিবারিক পরিবেশ সৃষ্টি করা। এ পরিকল্পনায় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫.৪০% কিন্তু অর্জিত হয় ৪.১৫%।

৫. চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: এ পরিকল্পনার অধীনে যমুনা বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতসমূহকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়। চতুর্থ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ছিল দারিদ্রদ্র্য দূরীকরণ। এ পরিকল্পনায় সমন্বিত ও কার্যকর কর্মসূচি প্রণয়নের লক্ষ্যে পরিবারকে সমাজসেবা কার্যক্রমের মৌলিক একক হিসেবে ধরা হয়। এ পরিকল্পনার উদ্দেশ্য ছিল দুস্থ মহিলা ও পুরুষদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং উৎপাদন ও উন্নয়নমুখী কর্মকাণ্ডে দরিদ্র ও অসহায় শ্রেণীর অংশগ্রহণ সুনিশ্চিত করা। পরিবারকেন্দ্রিক কর্মসূচি ও সমষ্টিকেন্দ্রিক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ কেন্দ্রের মাধ্যমে পঙ্গুদের পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন, কিশোর অপরাধী ও মাদকাসক্তদের যথাযথ যত্ন, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ সৃষ্টি করা, অনুদান কর্মসূচির মাধ্যমে রেজিস্ট্রিকৃত বেসরকারি সংস্থাসমূহকে সীমিত আর্থিক সাহায্য, উপদেশ, নির্দেশনা, সেবা প্রদান এবং সমন্বয় সাধন করা। বিদেশী সাহায্যনির্ভর এ পরিকল্পনা প্রশাসনিক ত্রুটি, দক্ষ কর্মীর অভাবে সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।

৬ পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: পঞ্চম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি ছিল শহর-গ্রাম সমষ্টি উন্নয়ন, দৈহিক, মানসিক পঙ্গু ও প্রতিবন্ধীদের কল্যাণ কার্যক্রম, এতিম-অনাথ শিশুদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম, কিশোর অপরাধ ও যুবকল্যাণ কার্যক্রম, বৃদ্ধ ও অক্ষমদের কল্যাণ কার্যক্রম, মাদকাসক্তদের পুনর্বাসন কার্যক্রম, ভিক্ষুক, ভবঘুরে ও দুস্থ কল্যাণ কার্যক্রম, সামাজিক নিরাপত্তা প্রভৃতি। এ পরিকল্পনার মূল উদ্দেশ্য ছিল দারিদ্র্য দূরীকরণ, মানবসম্পদের উন্নয়ন। এ পরিকল্পনায় সমাজকল্যাণ খাতে মোট ৫,২৫৩.৭০ মিলিয়ন টাকা অর্থ বরাদ্দ করা হয়।

৭. দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (PRSP)-১: বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর দারিদ্রদ্র্য
বিমোচনে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে দারিদ্রদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রের (PRSP-I) পরিকল্পনার সূচনা ঘটে ২০০২ সালে, যা চূড়ান্ত হয় ২০০৫ সালের নভেম্বর মাসে। জুলাই ০৫-৩০ জুন '০৮ মেয়াদি এ দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্রের প্রধান লক্ষ্য হলো দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী দেশের সাধারণ নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন। আর এ লক্ষ্য অর্জনের জন্য ৪টি কৌশলগত উপাদানকে চিহ্নিত করা হয়। যার মধ্যে রয়েছে কৃষি, পল্লী উন্নয়ন, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্প, পরী অবকাঠামো, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, নিরাপদ পানি সরবরাহ, পয়ঃনিষ্কাশন প্রভৃতি খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে মানব উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা।

৮. দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (PRSP)-২: ২০১৪-১৫ সালে জিডিপি ৮ শতাংশে উন্নীত করা। এবং দারিদ্র্যের হার ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ২৯ ডিসেম্বর ২০০৯ সংশোধিত দ্বিতীয় দারিদ্র্য নিরসন কৌশলপত্র (পিআরএসপি-২) অনুমোদিত হয়। পিআরএসপি-২ (২০০৯-১১) বাস্তবায়নে ২১টি খাতের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, কারিগরিসহ সার্বিক শিক্ষায়। বিশেষ করে বিদ্যুৎ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা হয়। সর্বশেষে পিআরএসপি-২ বাস্তবায়নের মেয়াদকাল জুলাই ২০১০-জুন ২০১২ নির্ধারণ করা হয়।

৯. ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা: সাতটি অগ্রাধিকার খাত ও অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ষষ্ঠ
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা দলিল চূড়ান্ত হবার পর ২২ জুন ২০১১ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (ECNEC) বৈঠকে তা অনুমোদিত হয়। পরিকল্পনার মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২০১০ সালের জুলাই থেকে ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। তবে এটি কার্যকর হয় জুলাই ২০১১ সাল থেকে। উক্ত পরিকল্পনার আওতায় মোট বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হয়েছে ১৩ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। গণখাতে বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা যা মোট বিনিয়োগের ২২.৮ শতাংশ। ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রাক্কলন করা হয়েছে ১০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা যা মোট বিনিয়োগের ৭৭ শতাংশ।

ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্যসমূহ:

  • দারিদ্র্যের হার বর্তমানের ৩১.৫ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে হ্রাস করা।
  • শিল্পখাতে কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধির হার ১৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করা।
  • পরিকল্পনা মেয়াদে ৯২ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা।
  • শিশুমৃত্যু হার হাজারে ৩১ জনে নামিয়ে আনা।
  • মাতৃমৃত্যু হার লাখে ১৪৪ জনে নামিয়ে আনা।
  • ৯৬% জনগোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা।
  • ৯০% জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগারের ব্যবস্থা করা।
  • বিদ্যুতায়নের হার ৬৫ শতাংশে উন্নীত করা।
  • ২০১৫ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার ১৫,৩৫৭ মেগাওয়াটে উন্নীত করা।
  • প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা বর্তমান ৬৭ শতাংশ থেকে ১০০ শতাংশে নিয়ে যাওয়া।
  • দ্বাদশ শ্রেণীতে ভর্তির হার ৬০ শতাংশে উন্নীত করা।
  • উচ্চ শিক্ষায় ছাত্রী ও ছাত্র অনুপাত ৪০: ৬০-এ উন্নীত করা।
  • দ্বাদশ শ্রেণীতে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা এবং ২০১৫ সালের মধ্যে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগের হার ৩০ শতাংশ ও টেলি ঘনত্বের হার ৭০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সমস্যাবলী

১. মূলধনের স্বল্পতা: বাংলাদেশের জনগণের মাথাপিছু আয় কম বিধায় সঞ্চয়ের হারও কম। তাছাড়া রয়েছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা। ফলে সরকার পরিকল্পনার প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহে ব্যর্থ হয়। এতে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।

২. প্রশাসনিক দুর্বলতা: সৎ, দক্ষ, নীতিবান প্রশাসন যে কোনো দেশের উন্নয়নে একান্ত অপরিহার্য। কিন্তু উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বাংলাদেশের প্রশাসনব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। পরিকল্পনায় সুফল অর্জন করতে পারে না।

৩. রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা: বাংলাদেশ রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীল একটি দেশ। এখানের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য, শ্রদ্ধা, পারস্পরিক বিশ্বাসের যথেষ্ট অভাব রয়েছে। তাই এক সরকার এসে কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করলে অন্য সরকার তা বাতিল করে বা অকার্যকর করে রাখে। এরূপ নীতির কারণে বাংলাদেশে অধিকাংশ উন্নয়ন পরিকল্পনাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।

৪. কৃষি সংক্রান্ত সমস্যা: বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণ হলো কৃষি। এদেশের কৃষির সাথে প্রায় ৮০ ভাগ লোক প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। অথচ এদেশের কৃষি ব্যবস্থায় জমির খণ্ডীকরণ, জলসেচের অভাব, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অভাবসহ নানাবিধ সমস্যায় আক্রান্ত।

৫. আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমিকের অভাব: শিল্পায়নের এ যুগে যে কোনো পরিকল্পনাকে বাস্তবে সফল করতে হলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমশক্তি। অথচ বাংলাদেশে আধুনিক প্রযুক্তির অভাবের পাশাপাশি শ্রমশক্তি থাকলেও তারা অদক্ষ। ফলে সার্বিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা অসম্ভব।

৬. অন্যান্য: এছাড়াও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, দক্ষ বিশেষজ্ঞের অভাব, অধিক জনসংখ্যা, সঠিক তথ্য-তত্ত্বের অভাবসহ নানাবিধ সমস্যা পরিলক্ষিত হয়।

উন্নয়ন পরিকল্পনার সমস্যার সমাধান

১. দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন: বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বার বার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। যা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক। কাজেই এ রকম দুর্নীতিগ্রস্ত প্রশাসন দিয়ে আর যাই হোক উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল হবে না। কোনো পরিকল্পনাকে বাস্তবে রূপদান করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের।

২. সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সার্থক করে তুলতে হলে প্রয়োজন সঠিক বাস্তবোচিত পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, আকাশ কুসুম বা তথ্যনির্ভরহীন পরিকল্পনা কখনোই আলোর মুখ দেখে না। বাংলাদেশে পরিকল্পনা প্রণয়নে বাস্তবতার অভাব পরিলক্ষিত হয়

৩. পরিকল্পনা হবে নমনীয়: পরিকল্পনা হবে এমন যা প্রয়োজনমাফিক পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও পরিমার্জন করার সুযোগ থাকে। কেননা, সময়ের পরিবর্তনে মানুষের চিন্তাচেতনা ও চাহিদার পরিবর্তন ঘটে। তাই পরিকল্পনা হতে হবে সুদূরপ্রসারী।

৪. প্রশাসক ও পরিকল্পক সম্পর্ক: প্রশাসক ও পরিকল্পকদের মধ্যে সুসম্পর্ক থাকতে হবে। যা পরিকল্পনার সফল বাস্তবায়নে জরুরি।

৫. সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিতকরণ: বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশে সম্পদের যথেষ্ট অপ্রতুলতা রয়েছে। এ অপ্রতুল বা স্বল্প সম্পদকে কীভাবে অধিক পরিমাণে কাজে লাগানো যায় তা নিশ্চিত করতে হবে।

৬. অন্যান্য: এছাড়াও পরিকল্পনার ক্ষেত্রে সঠিক লক্ষ্য, উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হবে, সঠিক তথ্য, তত্ত্বের সমাহার ঘটাতে হবে। মূল্যস্তরের ঊর্ধ্বগতির লাগাম টেনে ধরতে হবে, সঠিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

উপসংহার: যে কোনো দেশের জাতীয় নীতির প্রতিফলন ঘটে সে দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার মাধ্যমে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা অপরিহার্য। সুষ্ঠু পরিকল্পনা ব্যতীত জাতীয় উন্নয়ন অসম্ভব। সার্বিক উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে পরিকল্পনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতিকে ত্বরান্বিত করতে এ পর্যন্ত অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হলেও তা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। পরিকল্পনার সঠিক বাস্তবায়নে প্রয়োজন সকলের একান্ত সহযোগিতা। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারাই যে কোনো পরিকল্পনা সঠিকভাবে গৃহীত ও বাস্তবায়িত হতে পারে।

শেয়ার :

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ