- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
৩৪তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১৩
- বিসিএস ২০১৩
- বাংলাদেশ
বণ্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশের সাফল্য ও ব্যর্থতা কি?
প্রয়োজনের তুলনায় বনাঞ্চলের পরিমাণ কম থাকার পরেও বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ একটি দেশ। বাংলাদেশে রয়েছে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বৃহদাংশ। অভয়ারণ্য লাউয়াছড়াও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। পার্বত্য চট্টগ্রামের বনাঞ্চল, মধুপুর বনাঞ্চলসহ ছোট বড় অন্যান্য স্বনাঞ্চলে নানা প্রাণীর বিচরণ, দুর্লভ উদ্ভিদের সমারোহ। বিভিন্ন নদ-নদী, হাওর-বিলসহ সকল জলাশয় সিভিয়া জীবের বিচরণক্ষেত্র। সুন্দরবনে রয়েছে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগার, লাউয়াছড়ায় রয়েছে বিলুপ্ত প্রায় উল্লুক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য অন্যায়ভাবে বন্যপ্রাণী হত্যা, বণ্যপ্রাণীর আবাসনের পাংস, নির্বিচারে পাখি নিধন, জলবায়ুর পরিবর্তনসহ মানবসৃষ্ট নানা অপকর্মের কারণে বন্যপ্রাণীর অনেকটাই আজ বিলুপ্তির ও হুমকির মুখে। বিগত সময়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও জনসচেতনতার অভাবে, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন না হওয়াতে অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকায় কিংবা ধরা পড়লেও সহজেই ছাড় পেয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী রক্ষার এসব আইন ও উদ্যোগের সাফল্য কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে অর্জিত হয়নি।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী: বাংলাদেশে বর্তমানে মোট বনভূমির পরিমাণ হলো ১.৬০ মিলিয়ন হেক্টর বা ১৬ হাজার বর্গ কিলোমিটার (প্রায়)। কিন্তু বন্যপ্রাণী কেবল বনভূমিতেই বাস করে না। আমাদের বাড়িঘরে বসবাসরত টিকটিকি, বাড়ির আশেপাশের চূড়ই, কবুতর, শালিক, কাক সবই বন্যপ্রাণী। অর্থাৎ বন্যপ্রাণীর সংজ্ঞায় বলা হয়েছে মানুষ, গৃহপালিত পশুপাখি এবং মাছ ব্যতীত প্রাকৃতিক পরিবেশে বসবাসকারী মেরুন্দী প্রাণী, উভচর, সরীসৃপ, পাখি এবং স্তন্যপায়ীর সদস্য, তাদের ডিম ও শাবক বন্যপ্রাণীদের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীদের মধ্যে রয়েছে প্রায় ২২ প্রজাতির উভচর, ১০৯ প্রজাতির অভ্যন্তরীণ ও ১৭ প্রজাতির সামুদ্রিক সরীসৃপ, ৩৮৮ প্রজাতির আবাসিক ও ২৪০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি এবং ১১০ প্রজাতির অন্তর্দেশীয় ও ৩ প্রজাতির সামুদ্রিক স্তন্যপায়ী প্রাণী।
বন্যপ্রাণী রক্ষায় বাংলাদেশের সাফল্য বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় ইতোমধ্যেই দেশের অনেক এলাকায় সংরক্ষিত বনাঞ্চল, অভয়ারণ্য ও অভয়াশ্রম গড়ে তোলা হয়েছে। প্রণয়ন করা হয়েছে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন। এছাড়াও নানা পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণে এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থার জোর ভূমিকায় বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার আন্দোলন ও কর্মসূচি বন্যপ্রাণীর হুমকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ক. বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য: বন্যপ্রাণী রক্ষায় বাংলাদেশের অন্যতম সাফল্য হলো বন্য প্রাণীদের অবাধ বিচরণের জন্য অভয়ারণ্য ও অভরাশ্রম গড়ে তোলা। এসব অভয়ারণ্যের মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলো:
- রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য, হবিগঞ্জ,
- চর কুকরি-মুকরি অভয়ারণ্য, ভোলা;
- সুন্দরবন (পূর্ব) অভয়ারণ্য, বাগের হাট:
- সুন্দরবন (পশ্চিম) অভয়ারণ্য, সাতক্ষীরা:
- সুন্দরবন (দক্ষিণ) অভয়ারণ্য, খুলনা,
- পাবলাখালী অভয়ারণ্য, খাগড়াছড়ি;
- চুনতি অভয়ারণ্য, চট্টগ্রাম;
- ফাসিয়াখালী বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, চকোরিয়া;
- দুধু পুকুরিয়া ধোপছড়ি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, চট্টগ্রাম;
- হাজরাখিল বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, সীতাকুণ্ড,
- সাঙ্গু অভয়ারণ্য, বান্দরবান;
- টেকনাফ গেম রিজার্ভ, কক্সবাজার;
- টেংরাগিরি অভয়ারণ্য;
- দুধমুখী অভয়ারণ্য, বাগেরহাট;
- চাঁদপাই অভয়ারণ্য, বাগেরহাট;
- ঢাংমারী অভয়ারণ্য, বাগেরহাট;
- সোনারচর অভয়ারণ্য, পটুয়াখালী;
উল্লিখিত অভয়ারণ্য ও অভয়াশ্রমে বন্যপ্রাণী শিকার, বন্য প্রাণীদের বিরক্ত করা আইনত নিষিদ্ধ। অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র হিসেবে বন্যপ্রাণী রক্ষায় ও সম্প্রসারণে এসব অভয়ারণ্যের গুরুত্ব অপরিসীম।
অন্যদিকে ন্যাশনাল পার্ক, সংরক্ষিত বন ও ইকোপার্ক নির্মাণও বন্যপ্রাণী রক্ষায় অনবদ্য ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ১৫টির বেশি ন্যাশনাল পার্ক এবং ১০টিরও বেশি ইকোপার্ক রয়েছে, যা বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষার পাশাপাশি বন্য প্রাণীর আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
খ. বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত আইন: বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন পাস হয় ১৯৭৩ সালে। আইনটি সংশোধন হয় ১৯৭৪ সালে। সর্বশেষ আইনটি সংশোধিত হয়ে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপঞ্জ বিল-২০১২ নামে জাতীয় সংসদে ২০১২ সালে পাস হয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের এই আইনটি সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে। কেননা এই আইন প্রণয়নের মাধ্যমে লাইসেন্স বা পারমিয় গ্রহণ ছাড়া কোনো ব্যক্তির পক্ষে কোনো বন্যপ্রাণী শিকার বা ইচ্ছাকৃত ধ্বংস বা সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বিপন্ন, বিপদাপন্ন প্রজাতি নির্ধারণ, বন্যপ্রাণী অপসারণ, বন্যপ্রাণী অবমুক্তকরণ, পারমিট প্রদান, অভরারণ্য ঘোষণা ও ব্যবস্থাপা, অভয়ারণ্যে প্রবেশ, জাতীয় উদ্যান ঘোষণা, সাফারি পার্ক, ইকো পার্ক, উদ্ভিদ উদ্যান, বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র, করিডোর, বাফারজোন ও কোরজোন ইতাদি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান করা হয়েছে। এছাড়া জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা নির্ধারণ, আবদ্ধ প্রাণী, বন্যপ্রাণী আমদানি ও রপ্তানি, বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্র, বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট, অনুসন্ধান ও জব্দকরণসহ প্রভৃতি বিষয়ে বিধান করা হয়েছে। বাঘ ও হাতিহত্যা জনিত অপরাধে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। এছান অভয়ারণ্যের বিধিনিষেধ লঙ্ঘনজনিত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদন্ড এবং ১ সাজ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান এবং এই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে ৫ বলে কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ৪ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে। চিতাবাদ লামচিতা, উল্লক, সাম্বার হরিণ, কুমির, ঘড়িয়াল, তিমি বা ডলফিন, পাখি বা পরিযায়ী পাি হত্যাজনিত অপরাধের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট দন্ড প্রদানের বিধান রয়েছে।
গ. বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বিশেষ সংস্থা: বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশে বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হলো বনবিভাগ এবং বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়। বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার এই প্রতিষ্ঠানদ্বয়কে বিশেষ কর্তৃত্ব প্রদান করেছে। এদের অনুরোধে বাংলাদেশ পুলিশ, বিজিবি, আবগারী ও শুল্ক বিভাগ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে এগিয়ে আসে। এছাড়া বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশের সুরক্ষায় বিশ্বের নানা সংস্থার সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়ায় বন্য প্রাণীর ক্ষতিসাধন দিনদিন হ্রাস পাচ্ছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশের ব্যর্থতা: দেশে মোট বন্যপ্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ১ হাজারের বেশি। এদের মধ্যে বন ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধধ্বংস, বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা এবং পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে হুমকির মুখে রয়েছে ২১৯ প্রজাতির প্রাণী। অপরদিকে মহাবিপন্ন ৬৫টি প্রজাতি, বিপন্ন ৯৫, সংকটাপন্ন ৫৯ এবং বিলুপ্ত প্রাণীর সংখ্যা ১৩টি। বিলুপ্ত প্রাণীদের মধ্যে গোলাপি শির হাঁস, বাদি হাঁস, একশিঙ্গা গন্ডার, খারশিদা, প্যারা হরিণ, রাজশকুন, মিঠা পানির কুমির এবং হকস বিল্ড টারটল অন্যতম। দেশের হাট-বাজারে এমনটি শহরের রাস্তাঘাটেও বিভিন্ন বন্য পশু-পাখি ও এদের মাংস বিক্রি বন্যপ্রাণীর অস্তিত্বের হুমকিস্বরূপ। সময়মতো প্রয়োজনীয় উদ্যোগ না নেওয়া, আইনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া, চোরাকারবারী ও শিকারিদের দমন না করতে পারা এবং জনসচেতনতার অভাবই বন্যপ্রাণীর বিলুপ্তি ও হুমকির কারণ। অন্যদিকে বিশ্বখ্যাত রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস বাংলাদেশের সুন্দরবনে। এই বাঘের কারণেই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এখন পর্যন্ত টিকে রয়েছে। না হয় আরো আগেই সুন্দরবন কাঠ চোরদের দ্বারা ধ্বংস হয়ে যেত। অথচ বিগত কয়েক দশক ধরে শিকারি ও কাঠ চোরদের কারণে সুন্দরবনের বাঘের সংখ্যা বাড়ছে না। বরং প্রায় সময়ই শিকারিদের হাতে বাঘ মারা যাওয়ার সংবাদ পাওয়া যায়। সুন্দরবনের অবস্থান বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে হলেও বাঘ রক্ষায় এখন পর্যন্ত কোনো যৌথ উদ্যোগ কিংবা বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়নি, যা বাঘ রক্ষায় উভয় দেশেরই ব্যর্থতার প্রমাণ করে।
এছাড়া বন্য প্রাণী রক্ষায় বাংলাদেশের আরো যে ব্যর্থতা রয়েছে তা নিচে উল্লেখ করা হলো।
- বন্যপ্রাণী রক্ষা ও সংরক্ষণ আইনটির বাস্তবায়নে অনগ্রসরতা।
- পরিবেশ, বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষার আন্দোলন জোরদার না হওয়া।
- অবৈধভাবে পাহাড় কাটা ও নদীর বালু উত্তোলন বন্ধ করতে না পারা।
- অতিথি পাখি রক্ষায় উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ না নেওয়া।
- বন্য পশুপাখির মাংস এমনকি জীবিত পাখি প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য বিক্রি বন্ধ না করতে পারা।
- সর্বস্তরের মানুষ বিশেষ করে গ্রাম এলাকার জনসাধারণের জন্য বন্যপ্রাণী রক্ষায় সচেতনতামূলক বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে না পারা।
- অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী পাচার রোধ করতে না পারা।
- বন্যপ্রাণীর আবাস্থল রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা না রাখা।
উপসংহার: বাংলাদেশে বণ্যপ্রাণী রক্ষায় নানা উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনো মানুষের হাতে নির্বিচারে বন্যপ্রাণী মারা যাচ্ছে। অবিলম্বে বন্যপ্রাণী রক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন না হলে অচিরেই হয়তো আমরা বন্যপ্রাণীর অনেক প্রজাতিকেই দেখতে পারব না। যে কোনো মূল্যে বাংলাদেশের ফুসফুস সুন্দরবনের জীববৈচিত্রকে রক্ষা করতে হবে। বিদেশ থেকে বিশেষ করে সাইবেরিয়া থেকে আগত অতিথি পাখিকে কোনোভাবেই বিরক্ত করা যাবে না। আমাদের দেশের সকল স্তরের মানুষকে নিজ নিজ জায়গা থেকে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যাতে এসব বন্যপ্রাণীর জন্য অভয়াশ্রম হয় সমগ্র বাংলাদেশ।
সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ

