- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- ইংরেজ শাসন আমলে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
স্বদেশি আন্দোলন
ব্রিটিশ সরকারের বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ব্যর্থ হবার পর বিপ্লবী তৎপরতার মাধ্যমে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, তাকেই স্বদেশি আন্দোলন বলা হয়। এ আন্দোলনের মূল কর্মসূচি ছিল দুইটি-বয়কট ও স্বদেশি।
'বয়কট' আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বিলেতি পণ্য বর্জন। ক্রমে ক্রমে 'বয়কট' শব্দটি ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হতে থাকে। বয়কট শুধু বিলেতি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বিলেতি শিক্ষা বর্জনও কর্মসূচিতে যুক্ত হয়। ফলে স্বদেশি আন্দোলন শিক্ষাক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলনে রূপ নেয়। বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন করার অপরাধে সরকারি স্কুল-কলেজ থেকে বহু শিক্ষার্থীকে বের করে দেওয়া হয়। যে কারণে জাতীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়।
স্বদেশি আন্দোলন ক্রমশ বাংলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। বিলেতি শিক্ষা বর্জনের মতো পণ্য বর্জনের জন্যও বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। স্থানে স্থানে সমিতির মাধ্যমে বিলেতি পণ্য বর্জন এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারে শপথ নেওয়া হয়। কংগ্রেস নেতারা গ্রামে-গঞ্জে-শহরে প্রকাশ্য সভায় বিলেতি পণ্য পুড়িয়ে ফেলা এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের জন্য জনগণকে উৎসাহিত করতে থাকেন। ফলে বিলেতি পণ্যের চাহিদা কমে যেতে থাকে। একই সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন স্থানে এ সময় দেশি তাঁতবস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি ও চামড়ার দ্রব্য তৈরির কারখানা গড়ে ওঠে।
স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যুক্ত হতে থাকে। আন্দোলনের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ানোর জন্য বাংলার জেলায় জেলায় বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেমন-ঢাকায় অনুশীলন সমিতি, কোলকাতায় যুগান্তর সমিতি, বরিশালে স্বদেশবান্ধব, ফরিদপুরে ব্রতী, ময়মনসিংহে সাধনা ইত্যাদি সংগঠনের নাম এক্ষেত্রে উল্লেখ করার মতো। বরিশালের চারণ কবি মুকুন্দ দাস গ্রামে গ্রামে গান গেয়ে আন্দোলনের পক্ষে মানুষের মনে দেশপ্রেম জাগাতে সক্ষম হন। বিভিন্ন পত্রপত্রিকাও বঙ্গভঙ্গবিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে বেঙ্গলি, সঞ্জীবনী, যুগান্তর, অমৃতবাজার, সন্ধ্যা হিতবাদীসহ বিভিন্ন বাংলা-ইংরেজি পত্রিকা স্বদেশপ্রেম ও বাঙালি জাতীয় চেতনায় সমৃদ্ধ লেখা ছাপতে থাকে। বাংলার নারীসমাজ স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশ নিতে শুরু করে।
দলীয় কাজ: স্বদেশি আন্দোলনের ফলে গড়ে ওঠা বিপ্লবী সমিতিগুলোর নামের পাশে স্থানের নাম সাজাও।
স্বদেশি আন্দোলনে তাৎক্ষণিক সফলতা না এলেও এর ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গণসচেতনতার জন্ম হয়। এ আন্দোলন উপমহাদেশে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করে। আন্দোলনের সঙ্গে ছাত্রসমাজ যুক্ত হওয়ার কারণে গুরুত্ব যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনই জনগণ রাজনীতি সচেতন হয়ে ওঠে।
ভারতের পরবর্তী আন্দোলনগুলোতে তাদের উপস্থিতির শুরু এখান থেকেই। এই আন্দোলনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি। এর ফলে দেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কলকারখানা স্থাপনের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়। বাংলার ধনী ব্যক্তিরা কলকারখানা স্থাপন করতে থাকেন। যেমন: স্বদেশি তাঁত বস্ত্র, সাবান, লবণ, চিনি, কাগজ, চামড়াজাত দ্রব্য ইত্যাদি উৎপাদনের জন্য বিভিন্ন স্থানে কলকারখানা স্থাপিত হয়। ঐ সময় আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান যেমন বেঙ্গল কেমিক্যাল প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯০৮ সালে কুষ্টিয়াতে বিখ্যাত মোহিনী মিল স্থাপিত হয়। তাছাড়া আরো ছোটখাটো দেশি শিল্পকারখানা এই সময় প্রতিষ্ঠিত হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞান, শিক্ষা, ভাষা-সাহিত্য, সংস্কৃতি চর্চার প্রতি আগ্রহ উৎসাহ বৃদ্ধি পায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত, মুকুন্দ দাসের বাংলা ভূ-খণ্ড এবং এ ভূ-খণ্ডের সকল মানুষের উদ্দেশে দেশাত্মবোধক গানগুলো ঐ সময় রচিত। বঙ্গভঙ্গবিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের অংশ হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর 'আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি' গানটি রচনা করেন।
স্বদেশি আন্দোলনের নেতিবাচক দিক হচ্ছে, এই আন্দোলনের কারণে হিন্দু-মুসলমানের হাজার বছরের সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নানা ঘটনার মাধ্যমে এই তিক্ততা ক্রমশ বাড়তে থাকে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে ভাঙন শুরু হয় স্বদেশি আন্দোলনের মাধ্যমে তা আরো তিক্ত হয়। ফলে সম্পর্কের এই ভাঙন এতদঞ্চলের রাজনীতি, সমাজ ও জাতীয় কর্মকাণ্ডের সকল ক্ষেত্রে সর্বাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে থাকে, যা শেষ হয় ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের মধ্য দিয়ে।
ইংরেজ শাসন আমলে বাংলার স্বাধিকার আন্দোলন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

