- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- অপরিচিতা [গদ্য]
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
উদ্দীপক ও প্রশ্নোত্তর
তাহারই আধিক্যে সে দুর্বল অসহায় পক্ষী মাতৃস্নেহের তুলনা নাই, কিন্তু অতিস্নেহ অনেক সময় অমঙ্গল আনয়ন করে। যে স্নেহের উত্তাপে সন্তানের পরিপুষ্টি, অসহায় হইয়া পড়ে। মাতৃহৃদয়ে মমতার প্রাবল্য, মানুষ আপনাকে হারাইয়া আপন শক্তির মর্যাদা বুঝিতে পারে না। শাবকের মতো চিরদিন স্নেহাতিশয্যে আপনাকে সে একান্ত নির্ভরশীল মনে করে। ক্রমে জননীর পরম সম্পদ সন্তান অলস, ভীরু, দুর্বল ও পরনির্ভরশীল হইয়া মনুষ্যত্ব বিকাশের পথ হইতে দূরে সরিয়া যায়। অন্ধ মাতৃস্নেহ সে কথা বুঝে না।
উদ্দীপকের তাৎপর্য অনুসারে অন্ধ মাতৃস্নেহের কবলে পড়ে যেরূপ চরিত্রধর্ম বিকশিত হওয়ার কথা তার অনেকখানিই 'অপরিচিতা' গল্পের অনুপম চরিত্রে দেখা যায়। মন্তব্যটি বিশ্লেষণ কর।
উদ্দীপকের তাৎপর্য অনুসারে অন্ধ মাতৃস্নেহের কবলে পড়ে যেরূপ চরিত্রধর্ম বিকশিত হওয়ার কথা তার অনেকখানিই 'অপরিচিতা' গল্পের অনুপম চরিত্রে দেখা যায়- মন্তব্যটি সর্বাংশে সত্য।
অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা বা নিজের মতামত প্রকাশ না করা অন্যায়ের স্বীকৃতিরই শামিল। গুরুজন, আত্মীয় বা সুহৃদ যে-ই হোক না কেন সে অন্যায় করলে তাকে বাধা দেওয়া উচিত। তার প্রতি শ্রদ্ধার আতিশয্যে নির্বাক থাকা নিজের স্বকীয়তাকে অস্বীকার করারই নামান্তর। এরূপ দোবেই দুষ্ট আলোচ্য গল্পের অনুপম চরিত্রটি।
'অপরিচিতা' গল্পের নায়ক অনুপম, যদিও গল্পের শুরুর দিকে তার মাঝে নায়কোচিত কোনো আচরণ খুঁজে পাওয়া যায় না। অনুপম গল্পের প্রথমাংশে যেন এক নির্জীব, নিষ্প্রাণ, নিস্তরঙ্গ ও ব্যক্তিত্বহীন চরিত্র। সে তার মা ও মামার একান্ত আদরের ধন। তাই তার সকল কিছুতেই তাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করলেও সে ব্যক্তিত্বরহিত; পরিবারতন্ত্রের কাছে অসহায় পুতুলমাত্র। তার আচরণে মনে হয় সে যেন মায়ের কোলে বসা এক সুবোধ বালক। তার জীবনঘুড়ির নাটাই যেন তার মা ও মামার হাতে। সে যেন এক কৃত্রিম যন্ত্র, যার চালক তার অভিভাবক। মূলত মা ও মামার স্নেহাধিক্যই তাকে পুতুল করে তুলেছে। তাদের প্রতি তার একান্ত নির্ভরশীলতা তাঁকে সিদ্ধান্তহীন করে তুলেছে। কারণ মাতৃস্নেহ বা অভিভাবকের আদর সোহাগ অমূল্য হলেও অতিস্নেহ বা অন্ধস্নেহ প্রায়শই অমঙ্গল আনয়ন করে। তার মানবীয় বৈশিষ্ট্য বা চরিত্রধর্ম বিকশিত হতে বাধা প্রদান করে। সে অভিভাবকের বলয়াবদ্ধ হয়ে পড়ে। বাইরের দুনিয়ায় নিজেকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে সে সংকোচ বোধ করে। আর আলোচ্য গল্পের প্রতিনিধি অনুপম চরিত্রটি এরূপ ব্যক্তিত্বহীনের মূর্ত প্রতীক। তাই বলা যায় যে, উদ্দীপকে নির্দেশিত অন্ধ মাতৃস্নেহের দিকটিই অনুপমের চরিত্রধর্ম বিকাশের প্রধান অন্তরায়।
মন্তব্য ও আলোচনা (০)
সম্পর্কিত প্রশ্ন ও উত্তর সমূহ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন স্থানে বসবাসের সময়টি 'ছোটগল্প রচনার স্বর্ণযুগ' হিসেবে বিবেচিত হয়?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুষ্টিয়া শিলাইদহে বসবাসের সময়টি 'ছোটগল্প রচনার স্বর্ণযুগ' হিসেবে বিবেচিত হয়।
কল্যাণীর 'মাতৃআজ্ঞা'র ধরন আলোচনা কর।
নারীশিক্ষার মতো মহতী উদ্যোগকে ব্রত হিসেবে নেয়াই কল্যাণীর মাতৃআজ্ঞার ধরন।
কল্যাণীর 'মাতৃআজ্ঞা' মূলত দেশমাতারই আজ্ঞা। দেশের প্রতি আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু কর্তব্য থাকে। কল্যাণী এই কর্তব্যকেই আজ্ঞা হিসেবে পালন করেছে। বরপক্ষের শঠতার কারণে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর সে নারীশিক্ষায় ব্রতী হয়। সমাজে নারীর প্রতি অবহেলা, নারীকে পণ্য করে তোলা, নারীর যৌতুক নামক ঘৃণ্যপ্রথার বলি হওয়া প্রভৃতি দেখে তার মন বিষিয়ে ওঠে। আর নারী সমাজকে এ দুর্বিষহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে কল্যাণী সবকিছু ভুলে নিজেকে অবহেলিত নারীদের শিক্ষাদানে নিয়োজিত করে। আর এসবকেই সে তার 'মাতৃআজ্ঞা' হিসেবে মাথা পেতে নিয়েছিল।
"উদ্দীপকের ভাবার্থের মতো সীমাবদ্ধতাই অনুপম চরিত্রের একমাত্র দিক নয়, বৃত্তভাঙার আনন্দও তার আছে"-'অপরিচিতা' গল্পের আলোকে তোমার মতামতসহ মন্তব্যটি যাচাই কর।
অনুপম তার মা-মামার ক্ষুদ্র বলয়ে চিরকাল আটকে থাকেনি; শেষ পর্যন্ত সে উন্মুক্ত আকাশে ডানা মেলেছে।
অন্ধ অপত্যস্নেহ সন্তানকে বৃত্তাবদ্ধ করে ফেলে, সংসার সমুদ্রে সাঁতরানোর যে অনাবিল আনন্দ তা থেকে সে বঞ্চিত হয়। তখন তার ব্যক্তিত্বরূপী শিকড় মাটি না পেয়ে পরগাছার রূপ ধারণ করে। ব্যক্তিজীবনের চূড়ান্ত সময়ে এসেও যদি তাদের বোধোদয় না হয় তবে তাদের জীবন হয়ে ওঠে পুতুলসম। আর যারা এ সত্য উপলব্ধি করতে পেরে সঠিক পন্থা অবলম্বন করে তারা দেরিতে হলেও জীবনের সঞ্জীবনী সুধা পান করার সুযোগ পায়। 'অপরিচিতা' গল্পের অনুপম এরূপ অমৃত পানকারীদেরই একজন।
'অপরিচিতা' গল্পের নায়ক অনুপম উচ্চশিক্ষিত হয়েও গল্পের শুরুতে ব্যক্তিত্বহীনের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। স্নেহের আতিশয্য তাকে মুক করে তুলেছে। পাত্রীর প্রতি অফুরান নিষ্পাপ ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও তার চরম অবমাননাকালে সে চুপ থেকেছে। নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা কিংবা অন্যায়ের প্রতিবাদ জানানোর মতো মানসিক শক্তি তার ছিল না। নিষ্ঠুর পরিবারতন্ত্রের বলয় থেকে বেরিয়ে আসা ছিল তার পক্ষে কঠিন। গল্পের প্রথমাংশ জুড়েই আমরা তাকে তার মামার ছায়া হিসেবে দেখি। প্রথমদিকে তার স্বকীয়তা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। এমনকি শম্ভুনাথ সেনের প্রত্যাখ্যানের সময় তার মননে আঘাত পড়লেও তখন বুদ্ধিদীপ্ত কোনো আচরণ দৃশ্যমান হয় না। কিন্তু ট্রেন যাত্রার সময় কল্যাণীর মধুবর্ষী সুর আর তেজোদীপ্ত বক্তব্য তার চেতনালোকে নাড়া দিয়ে যায়; তার মনোজগতকে সমৃদ্ধ করে। সে আবার কল্যাণীকে প্রস্তাব দেয় এবং প্রত্যাখ্যাত হয়। কিন্তু সে আশা ছাড়েনি। এ থেকে বোঝা যায়, অনুপম গণ্ডিবদ্ধ জীবনের বেড়াজাল থেকে নিজেকে মুক্ত করেছিল। উদ্দীপকের স্নেহাতিশয্যপূর্ণ শিশুর মতো সে আলালের ঘরের দুলাল হয়ে বসে থাকেনি।
আলোচনার শেষাংশে প্রতিভাত হয় যে, কালক্ষেপণ করে হলেও 'অপরিচিতা' গল্পের নায়ক অনুপম শিকল ভাঙার গৌরব অর্জন করেছে। বৃত্তভাঙার আনন্দরসও সে পান করেছে প্রাণভরে।

