- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
প্রাচীন বাংলার স্থাপত্য ও শিল্পকলা
বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন স্থাপনার বেশির ভাগই ধর্মীয় স্থাপত্য। এর মধ্যে রয়েছে স্তূপ, বিহার ও মন্দির। পরবর্তীকালে মধ্যযুগে এসে দেখা যায় স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে যা পাওয়া যায় তার সিংহভাগ মসজিদ কিংবা সমাধির জন্য ধর্মীয় স্থাপত্য। প্রাচীন বাংলার প্রত্নস্থান হিসেবে প্রাথমিক যুগের স্থাপত্য নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে চন্দ্রকেতুগড়, বানগড়, মঙ্গলকোট, তাম্রলিপ্তি, মহাস্থানগড় কিংবা উয়ারী-বটেশ্বর থেকে। তবে উপযুক্ত তথ্যের অভাবে সেখানে প্রাপ্ত নিদর্শনের স্থাপত্যিক-পরিকল্পনা, নির্মাণ-পদ্ধতি ও কাঁচামাল সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা মেলেনি।
সরাসরি বিভিন্ন রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে বিকাশ ঘটেছিল বৌদ্ধধর্মের। এই ধর্মের অনুসারীগণ সামাজিক-সাংস্কৃতিক শক্তি হিসেবে টিকে থাকে ১২ শতক পর্যন্ত। তাদের সমৃদ্ধ বিকাশের চিহ্ন হিসেবে কুমিল্লা জেলার লালমাই-ময়নামতি, নওগাঁ জেলার পাহাড়পুর, বগুড়া জেলার মহাস্থানগড় অঞ্চল, দিনাজপুর, রাজশাহী, যশোরের ভরত ভায়না, ঢাকার সাভার, পশ্চিমবঙ্গের জগজ্জীবনপুর, বিহারের নালন্দা প্রভৃতি অঞ্চলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধ-স্থাপত্য পাওয়া গিয়েছে। ধ্বংসপ্রাপ্ত ইটের স্তূপ কিংবা ঢিবি হিসেবে প্রাপ্ত এসব নিদর্শনের মধ্য থেকে খননকৃত স্থাপত্যের সংখ্যা খুব একটা বেশি নয়। প্রাথমিক দিকের নিদর্শন হিসেবে ময়নামতির কুটিলামুড়ার কথা বলা যায়। এখানে তিনটি স্তূপের সামনে পূর্ব দিকে কক্ষসহ তিনটি চৈত্য-হল পাওয়া গিয়েছে স্তূপস্থাপত্য: বৌদ্ধ-স্থাপত্যের সর্বপ্রাচীন নিদর্শন হিসেবে প্রাপ্ত স্তূপগুলোর উৎপত্তি-কাল অনির্ধারিত। এই স্তূপগুলোর বেশির ভাগ পাওয়া গিয়েছে বৌদ্ধ বিহার সন্নিহিত এলাকায়। প্রাথমিক দিকের নিদর্শন হিসেবে কুমিল্লার কুটিলামুড়া, ইটাখোলা মুড়া, ভোজবিহার, রূপবান মুড়ার পাশাপাশি নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানার পাহাড়পুর বিহারের পূর্বে অবস্থিত সত্যপীর ভিটার কথা বলা যায়। ওদিকে স্থানীয়ভাবে ডগরমুড়া নামে পরিচিত সাভারের হরিশ-রাজার বুরুজ স্তূপটির ধ্বংসাবশেষও বাংলাদেশের স্তূপ স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন।
বিহার: ধর্মীয় পরিব্রাজক তথা সংসারত্যাগী বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আবাসস্থল হিসেবে বিহার বিখ্যাত। বৌদ্ধগ্রন্থ বিনয় পিটক অনুযায়ী ভিক্ষুদের বসবাসের জন্য বৃহৎ স্থাপত্যিক অবকাঠামো এবং একটি সুসংগঠিত আশ্রমকে বিহার বলা হয়। বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে অনেকগুলো বিহার স্থাপত্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এক্ষেত্রে যশোর জেলার কেশবপুর থানার বুড়িভদ্রা নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত ভরত ভায়নার কথা বলা যায়।
কুমিল্লার কোটবাড়ি-সংলগ্ন লালমাই পাহাড়ের মধ্যবর্তী এলাকায় অবস্থিত শালবন বিহার বাংলাদেশের বিহার স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। রাজা ভবদেব আনুমানিক সাত শতকের শেষভাগে ১১৫টি কক্ষবিশিষ্ট এই বিহার নির্মাণ করেছিলেন। অন্যদিকে আনন্দবিহারের অবস্থান কুমিল্লার শালবন বিহার থেকে দুই মাইল উত্তরে। আট শতকের প্রথমদিকে বাংলাদেশে আবিষ্কৃত দ্বিতীয় বৃহত্তম এ বিহার নির্মাণ করেছিলেন আনন্দ দেব। এখানেও বিহারের খোলা আঙিনার মাঝখানে একটি বিরাট ক্রুশাকার মন্দির রয়েছে।
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত পাহাড়পুর বিহার তথা সোমপুর মহাবিহার নওগাঁ জেলার বদলগাছি থানার পাহাড়পুর গ্রামে অবস্থিত। আট শতকে পাল সম্রাট ধর্মপাল প্রায় বর্গাকার এ বিহারটি নির্মাণ করেছিলেন। এখানকার ১৭৭টি কক্ষের মধ্যে উত্তর বাহুতে ৪৫টি কক্ষ এবং অপর তিন বাহুর প্রতিটিতে ৪৪টি কক্ষ রয়েছে। বিহারের ক্রুশ আকৃতির কেন্দ্রীয় মন্দিরটি ঊর্ধ্বগামী তিনটি ধাপে নির্মাণ করা হয়েছে। এখান থেকে বিভিন্ন আকার ও আয়তনের বেশ কিছু নিবেদন-স্তূপ, কেন্দ্রীয় মন্দিরের প্রতিকৃতি, পঞ্চ-মন্দির, রান্নাঘর ও খাওয়ার ঘর, পাকা নর্দমা ও কূপ আবিষ্কৃত হয়েছে। পাশাপাশি পাওয়া গিয়েছে অনেকগুলো টেরাকোটা নিদর্শন। পাহাড়পুর বিহারের পাশাপাশি নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলায় অবস্থিত জগদল মহাবিহারের কথা বলা যেতে পারে। এগুলো প্রাচীন বাংলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন।
বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে আবিষ্কৃত অন্য বিহারের মধ্যে ভাসুবিহার বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ থানায় অবস্থিত। মহাস্থানগড়ের পশ্চিমে অবস্থিত এ বিহারে প্রায় ২৬টি ভিক্ষুকক্ষ রয়েছে যার নির্মাণ-উপাদান হিসেবে ইট ও মর্টার হিসেবে কাদা-মাটি ব্যবহৃত হয়েছে। এর বাইরে দিনাজপুর জেলার নওয়াবগঞ্জ থানায় অবস্থিত সীতাকোট বিহার, বিহার ধাপ তথা তোতারাম পণ্ডিতের বাড়ি, লোহানীপাড়া গ্রামের চাপড়াকোট বিহার, বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার আড়োলা গ্রামের শালিবাহন রাজার বাড়ি, ঢাকা জেলার সাভার থানায় অবস্থিত হরিশচন্দ্র রাজার প্রাসাদের কথা বলা যেতে পারে।
শিল্পকলা: প্রাচীন বাংলার শিল্পকলার নিদর্শন হিসেবে বিভিন্ন মৃৎপাত্রের অলংকরণ, টেরাকোটা নিদর্শন ও ভাস্কর্যের কথা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থান খননে এই ধরণের নানাবিধ প্রত্ননিদর্শন আবিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। অনেক সময় বিভিন্ন এলাকার পুকুর খুঁড়তে গিয়েও এমন উপকরণের দেখা মিলেছে। এগুলো থেকে প্রাচীন বাংলার শিল্পকলা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পাশাপাশি বাংলাদেশের উয়ারী-বটেশ্বর, মহাস্থান-গড়, সোমপুর বিহার, শালবন বিহার, আনন্দ বিহার, ইটাখোলা মুড়া এবং বিহার ধাপ থেকে শিল্পকলার প্রাচীন-তম নিদর্শন হিসেবে পাওয়া গিয়েছে প্রচুর স্বল্প মূল্যবান পাথরের তৈরি পুঁতি, তাবিজ-কবজ ও লকেট। ধারণা করা হয় অ্যাগেট, কার্নেলিয়ান, কোয়ার্টজ, অ্যামেথিষ্ট জাতীয় স্বল্প-মূল্যবান পাথর পুঁতি তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে।
বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত মুদ্রার প্রাথমিক নিদর্শন হিসেবে উয়ারী-বটেশ্বর ও মহাস্থানগড় থেকে পাওয়া গিয়েছে অনেক ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা। এই মুদ্রায় উৎকীর্ণ প্রতীকগুলোকেও শিল্পকলার উপাদান হিসেবে ধরা যেতে পারে। উয়ারী বটেশ্বর থেকে পাওয়া গিয়েছে বিশেষ ধরণের যক্ষমূর্তি। মৃৎপাত্রের প্রারম্ভিক কালের নিদর্শন হিসেবে আবিষ্কৃত কৃষ্ণ-এবং-রক্তিম মৃৎপাত্র কিংবা উত্তরাঞ্চলীয় কালো মসৃণ মৃৎপাত্র নানাভাবে অলংকৃত। এখানে বৃত্তাকার কিংবা সরলরৈখিক নানা আঁচড়ের পাশাপাশি খিলানাকৃতির নকশাও দেখা যায়।
বাংলাদেশের শিল্পকলার অনন্য নিদর্শন পোড়ামাটির তৈরি মূর্তি ও ফলক-চিত্র। এখানে উপস্থাপিত দেব-দেবীর প্রতিকৃতিগুলো পাথরের ভাস্কর্যের মতোই অনেকটা ত্রিমাত্রিক। এখানে হিন্দু দেব-দেবীর মধ্যে রয়েছে ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, সূর্য, গণেশ প্রভৃতি। পাশাপাশি নানা স্থান থেকে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির তৈরি বিভিন্ন ধরনের শিবলিঙ্গ। ওদিকে পাহাড়পুর বিহার, মহাস্থানগড়, ময়নামতি, রূপবানমুড়া বিহার প্রভৃতি প্রত্নস্থল থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রচুর টেরাকোটা নিদর্শন। গাজীপুরের শ্রীপুর থেকে পাওয়া গিয়েছে পোড়ামাটির তৈরি ৮ম শতকের একটি হর-পার্বতী মূর্তি যা বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় যাদুঘরে রক্ষিত।
বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তির বাইরে অনেক সাধারণ শিল্পকলার নিদর্শনও রয়েছে এখানে। তার মধ্যে বিভিন্ন প্রাণি, পাখি ও উদ্ভিদের প্রতিকৃতির দেখা মেলে। চারটি ধারাবাহিক কালপর্ব হিসেবে গুপ্ত-পূর্ব, গুপ্ত, গুপ্তোত্তর এবং পাল-সেন যুগের প্রচুর পাথরের তৈরি ভাস্কর্য পাওয়া গিয়েছে বাংলাদেশের নানা স্থান থেকে। এগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ ছিল হিন্দু দেবী ও মহামতি বুদ্ধের বিভিন্ন মুদ্রার মূর্তি। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বোধিস্বত্ব মূর্তিও পাওয়া গিয়েছে বাংলার নানা স্থান থেকে।
প্রাচীন বাংলার ভাষা ও সাহিত্য
অস্ট্রিক ছিল বাংলার আদি অধিবাসীদের ভাষা। এ ভাষা আর্যদের আগমনের পর ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। আর্যদের ভাষার নাম প্রাচীন বৈদিক ভাষা। পরবর্তীকালে এ ভাষাকে সংস্কার করা হয়। পুরনো ভাষাকে সংস্কার করা হয়েছে বলে এ ভাষার নাম হয় সংস্কৃত ভাষা। অনেকে বলেন, সংস্কৃত ভাষা থেকেই বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু আধুনিক পণ্ডিতগণ তা মেনে নেননি। প্রাচীন যুগে আর্যদের যে ভাষায় বৈদিক গ্রন্থ রচিত হয়েছিল স্থানভেদে এবং সময়ের বিবর্তনে তার অনেক পরিবর্তন ঘটে। সংস্কৃত থেকে প্রাকৃত এবং প্রাকৃত থেকে অপভ্রংশ ভাষার উৎপত্তি হয়। অপভ্রংশ ভাষা থেকে অষ্টম বা নবম শতকে বাংলা ভাষার সৃষ্টি হয়। যেমন: কৃষ্ণ > কানু > কানাই।
বাংলা ভাষার এরূপ প্রাচীনতম নিদর্শন পাওয়া যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী কর্তৃক নেপাল থেকে সংগৃহীত চর্যাপদে। এ চর্যাপদগুলোর মধ্যেই বাংলা সাহিত্যের জন্ম হয়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চর্যাপদগুলোর মূল্য অপরিসীম।
প্রাচীন বাংলার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

