- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৩২৬-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
সেন বংশ (১০৬১-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ)
ভাগে বাংলায় সেন রাজবংশের সূচনা হয়। এ বংশের পাল বংশের পর এগারো শতকের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ তিনজন রাজা ছিলেন বিজয়সেন, বল্লাল সেন ও লক্ষণ সেন। তাদের আদি নিবাস ছিল দাক্ষিণাত্যের কর্ণাটক। বাংলার সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন সামন্ত সেন। কিন্তু তিনি কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা না করায় সেন বংশের প্রথম রাজার মর্যাদা দেওয়া হয় সামন্ত সেনের পুত্র হেমন্ত সেনকে। তিনি পাল রাজা রামপালের অধীনে একজন সামন্ত রাজা ছিলেন।
হেমন্ত সেনের মৃত্যুর পর তার পুত্র বিজয় সেন (১০৯৮-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ) সিংহাসনে আরোহণ করেন। তার এই সুদীর্ঘ রাজত্বকালেই সেন বংশের শাসন স্বাধীন ও শক্তিশালী ভিত্তির উপর সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কৈবর্ত্য বিদ্রোহের সময় তিনি রামপালকে সাহায্য করেন। একাদশ শতকে দক্ষিণ রাঢ় শূর বংশের অধিকারে ছিল। এ বংশের রাজকন্যা বিলাসদেবীকে তিনি বিয়ে করেন। বরেন্দ্র উদ্ধারে রামপালকে সাহায্য করার বিনিময়ে বিজয় সেন স্বাধীনতার স্বীকৃতি পান। আবার দক্ষিণ রাঢ়ের শূর বংশের সঙ্গে বৈবাহিক আত্মীয়তার সূত্র ধরে রাঢ় বিজয় সেনের অধিকারে আসে। এরপর বিজয় সেন বর্ম রাজাকে পরাজিত করে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা সেন অধিকারে নিয়ে আসেন। শেষ পাল রাজাদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিজয় সেন মদনপালকে পরাজিত করে উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা থেকে পালদের বিতাড়িত করে নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। এরপর তিনি কামরূপ, কলিঙ্গ ও মিথিলা আক্রমণ করেন। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার ত্রিবেণীতে অবস্থিত বিজয়পুর ছিল বিজয় সেনের প্রথম রাজধানী। দ্বিতীয় রাজধানী স্থাপন করা হয় বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে। শিব অনুরাগী বিজয় সেন পরম মহেশ্বর, পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ অরিরাজ-বৃষভ-শঙ্কর প্রভৃতি উপাধি গ্রহণ করেন। সেন বংশের অধীনেই সর্বপ্রথম সমগ্র বাংলা দীর্ঘকালব্যাপী একক রাজার অধীনে ছিল।
বিজয় সেনের পর সিংহাসনে আরোহণ করেন তার পুত্র বল্লাল সেন (১১৬০-১১৭৮ খ্রিষ্টাব্দ)। রাজ্য রক্ষার পাশাপাশি তিনি মগধ ও মিথিলাও অধিকার করে সেন শাসন শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন। চালুক্য রাজকন্যা রমা দেবীকে তিনি বিয়ে করেন। অন্যান্য উপাধির সাথে বল্লাল সেন নিজের নামের সাথে 'অরিরাজ নিঃশঙ্ক শঙ্কর' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
বল্লাল সেন বেদ, স্মৃতি, পুরাণ প্রভৃতি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছিলেন। তার একটি বিরাট গ্রন্থাগার ছিল। কবি বা লেখক হিসেবে সংস্কৃত সাহিত্যে তার অবদান অপরিসীম। তিনি 'দানসাগর'ও 'অদ্ভুতসাগর' নামে দুটি সংস্কৃত গ্রন্থ রচনা করেন। অবশ্য 'অদ্ভুতসাগর' গ্রন্থের অসমাপ্ত অংশ তার পুত্র লক্ষণ সেন সম্পূর্ণ করেছিলেন। গ্রন্থদ্বয় তার সময়ের ইতিহাসের মূল্যবান উপকরণ। তিনি রামপালে নতুন রাজধানী স্থাপন করেছিলেন। তান্ত্রিক হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক বল্লাল সেনের রাজত্বকালে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতিপত্তি বৃদ্ধি পায় এবং বৌদ্ধ ধর্ম দুর্বল হয়ে পড়ে। এসময় তার প্রবর্তিত 'কৌলীন্য প্রথা' অনুসারে সামাজিক আচার-ব্যবহার, বিবাহ অনুষ্ঠান প্রভৃতি বিষয়ে কুলীন শ্রেণির লোকদের কতকগুলো বিশেষ রীতিনীতি মেনে চলতে হতো।
বল্লাল সেনের পর তার পুত্র লক্ষণ সেন (১১৭৮-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ) প্রায় ৬০ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহণ করেন। পিতা ও পিতামহের ন্যায় লক্ষণ সেনও দক্ষ যোদ্ধা ছিলেন এবং রণক্ষেত্রে নৈপুণ্যের পরিচয় দেন। তিনি প্রাগ-জ্যোতিষ (আসাম), গৌড়, কলিঙ্গ কাশী, মগধ প্রভৃতি স্থান সেন সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধবিগ্রহ পরিচালনা, রাজার বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে গৌড় হয়ে ওঠে বিদ্রোহ ও অন্তর্বিরোধের কেন্দ্র। এরপর ১১৯৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান সুন্দরবন এলাকায় ডোম্মন পাল বিদ্রোহী হয়ে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
সেন রাজা লক্ষণ সেন পিতার অসমাপ্ত গ্রন্থ 'অদ্ভুতসাগর' সমাপ্ত করেছিলেন। লক্ষণ সেন রচিত কয়েকটি শ্লোকও পাওয়া গেছে। তার রাজসভায় ধোয়ী, শরণ, উমাপতি ধর, জয়দেব প্রমুখ পণ্ডিত ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের সমাবেশ ঘটেছিল।
পিতা ও পিতামহের শৈব ধর্মের প্রতি অনুরাগ ত্যাগ করে বৈষ্ণব ধর্ম গ্রহণ করা লক্ষণ সেনের উপাধি ছিলো 'পরম বৈষ্ণব'।
তেরো শতকের প্রথম দিকে তুর্কি সেনাপতি বস্তিয়ার খঞ্জ নদীয়া আক্রমণ করেন। লক্ষণ সেন পালিয়ে নদীপথে পূর্ববঙ্গের রাজধানী বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলার বিক্রমপুরে অবস্থান গ্রহণ করেন। এরপর বস্তিয়ার খঞ্জি উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলা সহজেই দখল করে নেন। লক্ষণাবতীকে (গৌড়) কেন্দ্র করে বাংলায় তুর্কিদের মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
খুব সম্ভবত ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে (মতান্তরে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দে) তিনি মৃত্যুবরণ করেন। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশব সেন কিছুকাল পূর্ব বাংলা শাসন করলেও লক্ষণ সেনের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বাংলায় সেন শাসনের অবসান ঘটেছিল। সেন রাজত্বকালে বাংলায় হিন্দুধর্ম বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতা পায় এবং সমাজে উচ্চবর্ণের হিন্দু ও সংস্কৃত ভাষার প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
প্রাচীন বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (খ্রিষ্টপূর্বাব্দ ৩২৬-১২০৪ খ্রিষ্টাব্দ) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

