মানবদেহে অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি জমা হয় কীভাবে
— উড্ডয়ন
ছবি | সংগৃহিত
আজকের ব্যস্ত জীবনে অতিরিক্ত ওজন কিংবা শরীরে অস্বাভাবিক চর্বি জমে যাওয়া একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যায় পরিণত হয়েছে। শহর কিংবা গ্রাম, ধনী কিংবা মধ্যবিত্ত, প্রায় সব শ্রেণির মানুষের মধ্যেই এই সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। অনেকেই মনে করেন কেবল বেশি খাওয়াই এর একমাত্র কারণ, কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি অনেক বেশি জটিল। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, হরমোনের ভারসাম্য, জিনগত প্রবণতা, ঘুম, মানসিক চাপ এবং জীবনযাপনের ধরন, এই সবকিছু মিলেই শরীরে চর্বি জমার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রিত হয়। এই আর্টিকেলে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হবে মানবদেহে অতিরিক্ত ফ্যাট জমার প্রকৃত কারণগুলো কী কী, কীভাবে এই প্রক্রিয়া কাজ করে এবং এর থেকে সুরক্ষিত থাকার উপায় কী হতে পারে।
চর্বি বা ফ্যাট কী এবং শরীরে এর প্রকৃত ভূমিকা
চর্বি শব্দটি শুনলেই অনেকে নেতিবাচক কিছু ভাবেন, কিন্তু বাস্তবে শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রম চালানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ চর্বি অপরিহার্য। চর্বি মূলত শরীরের সংরক্ষিত শক্তির উৎস। যখন আমরা খাবার গ্রহণ করি তখন তার একটি অংশ তাৎক্ষণিক শক্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং অবশিষ্ট অংশ ভবিষ্যতের প্রয়োজনের জন্য চর্বি কোষে জমা হয়ে থাকে। এছাড়া চর্বি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বাহ্যিক আঘাত থেকে রক্ষা করে, নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিন যেমন এ, ডি, ই এবং কে শোষণে সহায়তা করে এবং হরমোন উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সমস্যা তখনই তৈরি হয় যখন এই চর্বি জমার পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি হয়ে যায় এবং তা শরীরের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে, জমতে শুরু করে।
মানবদেহে মূলত দুই ধরনের চর্বি দেখা যায়। একটি হলো ত্বকের নিচে জমা হওয়া চর্বি, যা শরীরের বাইরের অংশে দৃশ্যমান হয়। অন্যটি হলো পেটের ভেতরের অঙ্গগুলোর চারপাশে জমা হওয়া চর্বি, যা স্বাস্থ্যের জন্য অপেক্ষাকৃত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। এই দ্বিতীয় ধরনের চর্বি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং অন্যান্য জটিল রোগের ঝুঁকি অনেকাংশে বাড়িয়ে দেয়।
ক্যালরি ভারসাম্যহীনতা এবং অতিরিক্ত চর্বি জমার মূল নীতি
শরীরে চর্বি জমার সবচেয়ে মৌলিক এবং সহজবোধ্য কারণ হলো ক্যালরির ভারসাম্যহীনতা। আমরা প্রতিদিন যে পরিমাণ ক্যালরি খাবারের মাধ্যমে গ্রহণ করি এবং শরীর যে পরিমাণ ক্যালরি বিভিন্ন কাজে ব্যয় করে, এই দুইয়ের মধ্যে যদি ভারসাম্য বজায় না থাকে তাহলে শরীরে চর্বি জমতে শুরু করে। যখন গ্রহণকৃত ক্যালরির পরিমাণ ব্যয়িত ক্যালরির তুলনায় বেশি হয়, তখন উদ্বৃত্ত শক্তি শরীর চর্বি আকারে সঞ্চয় করে রাখে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রবণতা চলতে থাকলে ধীরে ধীরে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমে যায় এবং ওজন বাড়তে থাকে।
শরীরের মোট শক্তি ব্যয় নির্ভর করে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, শরীরের বিশ্রামকালীন বিপাক হার, অর্থাৎ শরীর কোনো কাজ না করেও শুধু বেঁচে থাকার জন্য যে শক্তি খরচ করে তার পরিমাণ। দ্বিতীয়ত, খাবার হজম প্রক্রিয়ায় ব্যয়িত শক্তি। তৃতীয়ত, দৈনন্দিন শারীরিক কার্যক্রম এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে ব্যয়িত শক্তি। এই তিনটি বিষয়ের মধ্যে যেকোনো একটিতে পরিবর্তন এলে সামগ্রিক শক্তি ব্যয়ের হিসাবও পরিবর্তিত হয়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত চর্বি জমার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে।
অতিরিক্ত এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের প্রভাব
বর্তমান সময়ে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন শরীরে চর্বি জমার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়, ফাস্টফুড এবং তেলে ভাজা খাবারের প্রতি মানুষের আসক্তি দিন দিন বাড়ছে। এই ধরনের খাবারে সাধারণত ক্যালরির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে অথচ পুষ্টিগুণ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। ফলে অল্প পরিমাণ খাবার খেয়েও শরীরে প্রচুর পরিমাণ ক্যালরি প্রবেশ করে যায়, যা সহজেই চর্বি হিসেবে জমা হয়ে যেতে পারে।
বিশেষ করে অতিরিক্ত পরিমাণে পরিশোধিত শর্করা এবং চিনি গ্রহণ শরীরে দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। শরীর তখন ইনসুলিন হরমোন নিঃসরণ করে এই গ্লুকোজকে কোষে প্রবেশ করানোর চেষ্টা করে। ইনসুলিন মূলত শরীরে চর্বি সঞ্চয়কারী একটি হরমোন হিসেবেও কাজ করে। যখন বারবার এবং অতিরিক্ত পরিমাণে চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণ করা হয়, তখন ইনসুলিনের মাত্রা ঘন ঘন বেড়ে যায়, যা দীর্ঘমেয়াদে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করে।
এছাড়া অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস, যেমন সকালের নাস্তা না করা, রাতে দেরিতে ভারী খাবার খাওয়া, অথবা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থেকে হঠাৎ অতিরিক্ত খাবার খাওয়া, এই সবকিছুই শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে এবং চর্বি জমার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। খাদ্যের পরিমাণ ঠিক থাকলেও যদি খাওয়ার সময় ও ধরন অনিয়মিত হয়, তাহলেও শরীরে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে।
শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ও বসে থাকার জীবনযাপন
আধুনিক জীবনযাত্রায় শারীরিক পরিশ্রম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অফিসে দীর্ঘ সময় বসে কাজ করা, যানবাহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, স্ক্রিনের সামনে বসে অবসর সময় কাটানো, এই সবকিছু মিলে মানুষের দৈনন্দিন শক্তি ব্যয়ের পরিমাণ অনেকাংশে কমিয়ে দিয়েছে। যখন শরীর পর্যাপ্ত পরিমাণে শক্তি ব্যয় করে না, তখন খাদ্য থেকে গৃহীত অতিরিক্ত শক্তি চর্বি হিসেবে জমা হওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম শুধু ক্যালরি পোড়ানোর মাধ্যমেই নয়, বরং শরীরের পেশির পরিমাণ বজায় রাখার মাধ্যমেও চর্বি জমা প্রতিরোধ করে। পেশি শরীরের এমন একটি অংশ যা বিশ্রামের সময়েও তুলনামূলক বেশি ক্যালরি খরচ করে। যখন শারীরিক পরিশ্রমের অভাবে পেশির পরিমাণ কমে যেতে থাকে, তখন শরীরের সামগ্রিক বিপাক হারও কমে যায়, ফলে একই পরিমাণ খাবার খেলেও শরীরে চর্বি জমার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। দীর্ঘ সময় বসে থাকার অভ্যাস, যা প্রায়শই ডেস্ক জব বা প্রযুক্তিনির্ভর কাজের সঙ্গে যুক্ত, বর্তমান সময়ে চর্বি জমার একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হরমোনজনিত কারণ ও শরীরের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য
শরীরে চর্বি জমার প্রক্রিয়ায় হরমোনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্যহীনতা শরীরে অস্বাভাবিক হারে চর্বি জমার কারণ হতে পারে। থাইরয়েড গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হরমোন শরীরের বিপাক হার নিয়ন্ত্রণ করে। থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি দেখা দিলে বিপাক হার কমে যায়, যার ফলে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। এই অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে হাইপোথাইরয়েডিজম বলা হয়।
ইনসুলিন হরমোনের প্রতি শরীরের কোষগুলোর সংবেদনশীলতা কমে গেলে, যাকে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বলা হয়, তখনও শরীরে চর্বি জমার হার বেড়ে যায়। এছাড়া কর্টিসল নামক একটি হরমোন, যা মূলত মানসিক চাপের সময় নিঃসৃত হয়, দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ মাত্রায় থাকলে বিশেষত পেটের চারপাশে চর্বি জমার প্রবণতা তৈরি করে। নারীদের ক্ষেত্রে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন, বিশেষত মেনোপজের সময়, শরীরে চর্বি বণ্টনের ধরন পরিবর্তন করে দিতে পারে, যার ফলে পেটের অংশে চর্বি জমার প্রবণতা বেড়ে যায়।
জিনগত ও পারিবারিক প্রভাব
গবেষণায় দেখা গেছে যে শরীরে চর্বি জমার প্রবণতার ওপর জিনগত বিষয়ও যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। কোনো ব্যক্তির পরিবারে যদি স্থূলতার ইতিহাস থাকে, তাহলে সেই ব্যক্তির নিজেরও অতিরিক্ত ওজন বা চর্বি জমার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে। জিন শরীরের বিপাক হার, ক্ষুধার অনুভূতি নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের কার্যকারিতা এবং চর্বি সঞ্চয়ের ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার যে জিনগত প্রবণতা থাকা মানেই এই নয় যে চর্বি জমা অনিবার্য। জিনগত প্রবণতা থাকলেও সঠিক খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। জিন শুধু সম্ভাবনা তৈরি করে, তবে জীবনযাপনের ধরনই মূলত নির্ধারণ করে সেই সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না।
পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং মানসিক চাপের প্রভাব
ঘুম এবং শরীরে চর্বি জমার মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, যা অনেকেই অবহেলা করে থাকেন। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী দুটি গুরুত্বপূর্ণ হরমোন, ঘ্রেলিন এবং লেপটিনের ভারসাম্যকে ব্যাহত করে। ঘ্রেলিন হরমোন ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়, আর লেপটিন হরমোন পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি করে। ঘুম কম হলে ঘ্রেলিনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং লেপটিনের মাত্রা কমে যায়, ফলে ব্যক্তি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত অনুভব করেন এবং অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করার প্রবণতা তৈরি হয়।
একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী মানসিক চাপও শরীরে চর্বি জমার একটি উল্লেখযোগ্য কারণ। মানসিক চাপের সময় শরীরে কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যায়, যা আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে পেটের অংশে চর্বি জমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। এছাড়া অনেকেই মানসিক চাপে থাকা অবস্থায় খাবারের মাধ্যমে মানসিক স্বস্তি খোঁজার চেষ্টা করেন, যাকে সাধারণভাবে মানসিক খাওয়া বলা হয়ে থাকে। এই অভ্যাস দীর্ঘদিন চলতে থাকলে তা অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণের মাধ্যমে শরীরে চর্বি জমার পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে পারে।
বয়সজনিত পরিবর্তন এবং বিপাক হারের পরিবর্তন
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক বিপাক হার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। এর একটি প্রধান কারণ হলো বয়সের সঙ্গে সঙ্গে শরীরের পেশির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই কমে যায় এবং চর্বির পরিমাণ আপেক্ষিকভাবে বেড়ে যায়। যেহেতু পেশি বিশ্রামের সময়েও চর্বির তুলনায় বেশি ক্যালরি খরচ করে, তাই পেশির পরিমাণ কমে গেলে সামগ্রিক ক্যালরি ব্যয়ও কমে যায়। ফলে অনেক সময় দেখা যায় যে কোনো ব্যক্তি তরুণ বয়সে যে পরিমাণ খাবার খেয়ে সুস্থ ওজন বজায় রাখতে পারতেন, বয়স বাড়ার পর একই পরিমাণ খাবার খেলে তার ওজন বাড়তে শুরু করে।
এছাড়া বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হরমোনের মাত্রায়ও পরিবর্তন আসে, যা শরীরে চর্বি জমার ধরনকেও প্রভাবিত করে। এই কারণেই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক কার্যক্রমের ধরনে পরিবর্তন আনা প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, যাতে শরীরের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে।
ওষুধ এবং অন্যান্য চিকিৎসাজনিত কারণ
কিছু নির্দিষ্ট ধরনের ওষুধ দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করলে তা শরীরে চর্বি জমার প্রবণতা বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে কিছু মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ওষুধ, স্টেরয়েড জাতীয় ওষুধ এবং কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ শরীরের ওজন বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে চিহ্নিত হয়েছে। এই ধরনের ওষুধ শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া, ক্ষুধার অনুভূতি অথবা শরীরে পানি ও চর্বি সঞ্চয়ের প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।
এছাড়া কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্য সমস্যা, যেমন পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম, কুশিং সিনড্রোম এবং অন্যান্য হরমোনজনিত রোগও শরীরে অস্বাভাবিক হারে চর্বি জমার কারণ হতে পারে। যদি কারো ক্ষেত্রে খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমে বড় কোনো পরিবর্তন না থাকা সত্ত্বেও হঠাৎ করে ওজন বাড়তে শুরু করে, তাহলে এই ধরনের সম্ভাব্য চিকিৎসাগত কারণ সম্পর্কে একজন যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে।
অতিরিক্ত চর্বি জমার স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা হওয়া কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়, বরং এটি দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিশেষত পেটের চারপাশে জমে থাকা চর্বি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ এবং টাইপ টু ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দেয়। অতিরিক্ত চর্বি শরীরের ইনসুলিন সংবেদনশীলতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এছাড়া অতিরিক্ত ওজন হাড় ও জয়েন্টের ওপরও বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে হাঁটু এবং কোমরের ব্যথার সমস্যা দেখা দিতে পারে। শ্বাসকষ্ট, ঘুমের সমস্যা, বিশেষত স্লিপ অ্যাপনিয়া, এবং লিভারে চর্বি জমার সমস্যাও অতিরিক্ত শরীরিক চর্বির সঙ্গে সম্পর্কিত। মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব উল্লেখযোগ্য, কারণ অতিরিক্ত ওজন অনেক সময় আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং সামাজিক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অতিরিক্ত চর্বি জমা প্রতিরোধে করণীয়
শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা প্রতিরোধ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো একটি সুষম এবং পরিমিত খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা। প্রক্রিয়াজাত খাবার এবং অতিরিক্ত চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিমাণ কমিয়ে শাকসবজি, ফলমূল, আঁশযুক্ত খাবার এবং প্রয়োজনীয় প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণের অভ্যাস তৈরি করা উপকারী। নিয়মিত এবং সময়মতো খাবার গ্রহণের অভ্যাসও শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া বজায় রাখতে সহায়তা করে।
নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম, যেমন হাঁটা, দৌড়ানো, সাঁতার কাটা বা যেকোনো ধরনের ব্যায়াম, শরীরের ক্যালরি ব্যয় বাড়ানোর পাশাপাশি পেশির পরিমাণ বজায় রাখতেও সহায়তা করে। প্রতিদিন অন্তত মাঝারি মাত্রার শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। এছাড়া পর্যাপ্ত এবং মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা, দৈনন্দিন মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল অবলম্বন করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে হরমোনজনিত বা অন্যান্য চিকিৎসাগত সমস্যা থাকলে তা প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
যদি কারো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করার পরও শরীরে অস্বাভাবিক হারে চর্বি জমতে থাকে অথবা ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা দেয়, তাহলে অবশ্যই একজন যোগ্য চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত, যাতে সঠিক কারণ নির্ণয় করে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়।
উপসংহার
মানবদেহে অতিরিক্ত ফ্যাট বা চর্বি জমা হওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ কাজ করে না, বরং এটি বহু বিষয়ের সম্মিলিত ফলাফল। খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ, হরমোনের ভারসাম্য, জিনগত প্রবণতা, ঘুমের গুণগত মান, মানসিক চাপ এবং বয়সজনিত পরিবর্তন, এই সবকিছু মিলেই শরীরে চর্বি জমার প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়। এই কারণগুলো সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান থাকলে একজন ব্যক্তি নিজের জীবনযাপনে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে পারেন এবং সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ শরীর বজায় রাখতে পারেন। মনে রাখা প্রয়োজন যে সুস্থ শরীর গড়ে তোলা একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, যেখানে ধৈর্য, নিয়মানুবর্তিতা এবং সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
