SSC ও HSC পরীক্ষার হলে সময় ভাগ করার সহজ নিয়ম

— উড্ডয়ন

২ দিন আগে

SSC ও HSC পরীক্ষার হলে সময় ভাগ করার সহজ নিয়ম

ছবি : সংগৃহিত | এআই

পরীক্ষা শেষে হল থেকে বেরিয়ে অনেককেই একই কথা বলতে শোনা যায়: “সবই তো জানতাম, শুধু সময়টা পেলাম না।” কথাটা অজুহাতের মতো শোনালেও অনেক ক্ষেত্রে সত্যি। শেষ প্রশ্নের ঘ-অংশ অর্ধেক লেখা থেকে যায়। বহুনির্বাচনীর শেষ চার-পাঁচটা প্রশ্ন ভালো করে পড়ারই সুযোগ মেলে না। বাড়ি ফিরে মনে হয়, ওই নম্বরগুলো তো আমার হাতেই ছিল।

এখানে সমস্যাটা অনেক সময় পড়াশোনায় না, হিসাবে। পরীক্ষার হলে ঘড়ি সবাই দেখে, কিন্তু ঘড়ি দেখে কী করতে হবে সেই পরিকল্পনা থাকে না। যারা আগে থেকেই ঠিক করে নেয় কোন প্রশ্নে কত মিনিট যাবে, তারা একই প্রস্তুতি নিয়েও বেশি নম্বর তুলে আনে।

এই লেখায় একটা সহজ হিসাব দাঁড় করাব, যেটা আপনি নিজের বিষয় অনুযায়ী বদলে নিতে পারবেন। প্রথমে দেখব সময় কেন ফুরায়। তারপর বহুনির্বাচনী ও সৃজনশীলের জন্য আলাদা সময়ের ছক, আটকে গেলে কী করতে হবে, শেষ দশ মিনিটে কী দেখতে হবে, আর কীভাবে বাড়িতে এই অভ্যাস তৈরি করবেন।

একটা কথা আগেই বলে রাখি। এখানে দেওয়া সময়ের তথ্য ২০২৬ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার বোর্ড নির্দেশনা অনুযায়ী। প্রশ্নের কাঠামো বিষয়ভেদে আলাদা হতে পারে, নিয়মও বদলাতে পারে। তাই নিজের প্রবেশপত্র আর বোর্ডের সর্বশেষ নির্দেশনাটা একবার দেখে নেবেন।

সময় শেষ হয়ে যায় কেন

কঠিন প্রশ্ন বা কম পড়া অধ্যায়ের কথা বাদ দিলেও সময় ফুরানোর পেছনে তিনটা অভ্যাস বারবার দেখা যায়। নিজেকে মিলিয়ে দেখুন, এর মধ্যে কোনটা আপনার।

১. একটা প্রশ্নে আটকে থাকা

প্রশ্নটা চেনা চেনা লাগছে, কিন্তু উত্তরটা মাথায় আসছে না। আপনি ভাবছেন, একটু পরেই মনে পড়বে। এভাবে পাঁচ মিনিট চলে যায়, তারপর দশ মিনিট। ততক্ষণে ঘড়ি এমন জায়গায় চলে এসেছে যে বাকি প্রশ্নগুলোতে তাড়াহুড়া করতেই হবে।

হিসাবটা একটু খুলে দেখি। ৭০ নম্বরের সৃজনশীলে আপনার হাতে ১৫০ মিনিট। মানে প্রতি নম্বরের জন্য গড়ে দুই মিনিটেরও কম। চার নম্বরের একটা অংশের জন্য তাই সাত-আট মিনিট বরাদ্দ রাখাই যুক্তিসংগত। সেখানে আপনি যদি পনেরো মিনিট আটকে থাকেন, বাড়তি সাত-আট মিনিট আসলে আপনি বাকি ছয়টা প্রশ্নের সময় থেকে কেটে নিচ্ছেন। প্রতিটি প্রশ্নে এক মিনিটের বেশি কম পড়ছে। এক মিনিট কম মানে প্রায়ই গ বা ঘ-এর শেষ লাইনটা লেখা হলো না, আর এভাবে প্রতি প্রশ্নে এক-দুই নম্বর খোয়া যায়। চার নম্বরের জন্য এত কিছু হারানো লাভের হিসাব না।

২. বেশি লিখে ফেলা

যে প্রশ্ন ভালো পারেন, সেখানে মন চায় সবকিছু লিখে ফেলতে। বইয়ে ছয়টা পয়েন্ট আছে, প্রশ্ন চার নম্বরের, আপনি ছয়টাই লিখলেন। পরীক্ষক কিন্তু চার নম্বরের বেশি দেবেন না। বাড়তি লেখা নম্বর বাড়ায় না, শুধু সময় খায়।

নম্বর দেখে উত্তরের দৈর্ঘ্য ঠিক করার অভ্যাস করুন। মোটামুটি একটা আন্দাজ দিই: এক নম্বরের উত্তর এক-দুই বাক্যে শেষ হয়। দুই নম্বরে তিন-চার লাইন। তিন নম্বরে ছয়-সাত লাইনের একটা ছোট অনুচ্ছেদ। চার নম্বরে আট থেকে বারো লাইন, যুক্তিসহ। এগুলো বোর্ডের বেঁধে দেওয়া সংখ্যা না, আপনার হাতের লেখা আর বিষয় অনুযায়ী কমবেশি হবে। নিয়ম একটাই: প্রশ্ন যা চেয়েছে, ঠিক তাই লিখুন। তার বেশি না।

৩. শুরুতে ধীরে চলা

প্রথম প্রশ্নটা অনেকেই খুব যত্ন করে লেখে। হাতের লেখা সুন্দর করতে গিয়ে, উদ্দীপক দুবার পড়তে গিয়ে, প্রথম প্রশ্নেই পঁচিশ-ত্রিশ মিনিট চলে যায়। মনে হয়, শুরুটা ভালো হোক, পরে গতি তুলে নেব। কিন্তু পরে গতি তোলা কঠিন। তখন সময়ের চাপে হাত কাঁপে, মাথা এলোমেলো হয়ে যায়। হিসাব ধরে চলতে চাইলে প্রথম প্রশ্ন থেকেই সেটা শুরু করতে হবে।

পরীক্ষার কাঠামো আর সময়ের ছক

আগে পুরো কাঠামোটা পরিষ্কার করে নেওয়া যাক। ২০২৬ সালের নির্দেশনায় প্রথমে বহুনির্বাচনী, তারপর সৃজনশীল অংশ হয়েছে। দুটোর মাঝে আলাদা কোনো বিরতি ছিল না। পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে কক্ষে বসতে হয়েছে।

অংশ

নম্বর

সময়

বহুনির্বাচনী (সাধারণ বিষয়)

৩০

৩০ মিনিট

সৃজনশীল (সাধারণ বিষয়)

৭০

২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট

বহুনির্বাচনী (ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়)

২৫

২৫ মিনিট

সৃজনশীল (ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়)

৫০

২ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট

দুই ধরনেই মোট সময় তিন ঘণ্টা, অর্থাৎ ১৮০ মিনিট। এই লেখার মূল হিসাবটা ৩০ আর ৭০ নম্বরের কাঠামো ধরে করা। ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়ের জন্য আলাদা অংশ নিচে আছে।

হিসাবের সবচেয়ে দরকারি জিনিসটা হলো একটা জরুরি সময়, যেটাকে আমি বাফার বলছি। পুরো সময়টা প্রশ্নে ভাগ করে দিলে একটা প্রশ্নে দুই মিনিট বেশি লাগলেই পুরো পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে। তাই কিছু মিনিট আগে থেকেই আলাদা করে রাখতে হয়। কোথাও দেরি হলে এই সময় থেকে মিটিয়ে নেবেন, বাকি প্রশ্নের সময় থেকে না।

বহুনির্বাচনীর ৩০ মিনিট

৩০টা প্রশ্নের জন্য ৩০ মিনিট শুনে মনে হয়, প্রতিটিতে এক মিনিট করে পাওয়া যাবে। আসলে তা না। উত্তরপত্রের তথ্য ভরাট, বৃত্ত গাঢ় করে ভরাট করা আর দু-একটা কঠিন প্রশ্নে আটকে যাওয়া, সব মিলিয়ে হাতে থাকে ২২ মিনিটের মতো। হিসাবটা এভাবে ভাগ করতে পারেন:

  • প্রথম ২ মিনিট: রোল, বিষয় কোড আর সেট কোড ঠিকঠাক ভরাট করুন। এখানকার ভুল শোধরানো যায় না, আর পুরো পরীক্ষার ফল এর ওপর নির্ভর করে।
  • পরের ২২ মিনিট: প্রথম দফায় সব প্রশ্ন। গড়ে প্রতি প্রশ্নে ৪৫ সেকেন্ডের কম।
  • শেষ ৬ মিনিট: ফেলে আসা প্রশ্নগুলো আর উত্তরপত্র মিলিয়ে দেখা।

প্রথম দফায় যে প্রশ্নের উত্তর দেখেই জানেন, সঙ্গে সঙ্গে ভরাট করে এগিয়ে যান। দশ সেকেন্ড ভেবেও না পেলে প্রশ্নের পাশে একটা দাগ দিন আর পরের প্রশ্নে চলে যান। গাণিতিক প্রশ্নে এক মিনিটের বেশি দেবেন না। আটকে থাকা প্রশ্ন দ্বিতীয় দফায় অনেক সময় সহজ মনে হয়, কারণ তখন মাথা শান্ত থাকে।

একটা ভুল অনেকেই করে, আর সেটা সবচেয়ে ক্ষতিকর: কোনো প্রশ্ন ফাঁকা রেখে পরের প্রশ্নের উত্তর ভুল সারিতে ভরাট করা। একবার সারি সরে গেলে পরের সব উত্তর ভুল জায়গায় যায়। এটা ঠেকানোর সহজ উপায় হলো প্রতি পাঁচটা প্রশ্ন পর পর প্রশ্নের নম্বরের সঙ্গে উত্তরপত্রের সারির নম্বর মিলিয়ে নেওয়া। পাঁচ সেকেন্ডের কাজ, কিন্তু বাঁচিয়ে দিতে পারে অনেক নম্বর।

বৃত্ত ভরাটের সময় নির্দেশনায় যে কলমের কথা বলা আছে সেটাই ব্যবহার করুন আর বৃত্ত পুরোপুরি ভরাট করুন। আধা-ভরাট বৃত্ত মেশিন ধরতে না-ও পারে। শেষ ৩০ সেকেন্ডে যদি দেখেন কিছু প্রশ্ন ফাঁকা, সবগুলোতে একটা করে আন্দাজ ভরাট করে দিন। বোর্ড পরীক্ষার বহুনির্বাচনীতে ভুল উত্তরের জন্য নম্বর কাটা যায় না, তাই ফাঁকা রাখার কোনো লাভ নেই।

আরেকটা কথা। বহুনির্বাচনীর সময় শেষ হলে সৃজনশীলের সময় শুরু হয়, মাঝে বিরতি নেই। তাই বহুনির্বাচনীর শেষ মিনিটে হাত কাঁপলে বা মন খারাপ হলেও সেটা সঙ্গে নিয়ে সৃজনশীলে ঢুকবেন না। একটা লম্বা শ্বাস নিন, প্রশ্নপত্র হাতে আসার আগেই মাথা ঠান্ডা করে ফেলুন।

সৃজনশীলের প্রথম পাঁচ মিনিট

প্রশ্নপত্র হাতে পেয়েই লিখতে শুরু করার তাড়া সবারই থাকে। কিন্তু প্রথম পাঁচ মিনিট পড়া আর বাছাইয়ে খরচ করলে পরে অনেক বেশি সময় বাঁচে। এই পাঁচ মিনিটে চারটা কাজ করুন।

  •  উত্তরপত্রে রোল, বিষয় কোড আর সেট ঠিকঠাক লেখা হয়েছে কি না দেখে নিন।
  •  প্রশ্নপত্রের নির্দেশনা পড়ুন। কয়টা প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, কোনো বিভাগ থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রশ্ন বাছতে হবে কি না, এসব এখানেই লেখা থাকে। না দেখে লিখে ফেললে ঠিকঠাক লেখা উত্তরেও নম্বর হারানোর ঝুঁকি থাকে।
  •  সব প্রশ্নের উদ্দীপক আর ক থেকে ঘ পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে নিন। প্রতিটির পাশে ছোট করে চিহ্ন দিন: ভালো পারি, মাঝারি, পারি না।
  •  এবার বাছাই করুন। ভালো আর মাঝারি প্রশ্ন থেকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশ্ন নিন। বাছার সময় শুধু ক আর খ দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন না। গ আর ঘ-এর দিকে বেশি নজর দিন, কারণ দশ নম্বরের মধ্যে সাত নম্বরই ওই দুই অংশে।

এই লেখায় আমি ধরে নিচ্ছি আপনার বিষয়ে ১০টি প্রশ্নের মধ্যে ৭টির উত্তর দিতে হয়, প্রতিটি ১০ নম্বরের, আর ক, খ, গ, ঘ অংশে নম্বর যথাক্রমে ১, ২, ৩ ও ৪। বেশিরভাগ বিষয়ে এই কাঠামোই চলে, তবে সব বিষয়ে নয়। আপনার বিষয়ে কাঠামো আলাদা হলে একই নিয়মে হিসাব করে নিন: মোট ১৫০ মিনিট থেকে বাছাই আর রিভিউয়ের ১৫ মিনিট এবং বাফারের ৯ মিনিট বাদ দিন, বাকি ১২৬ মিনিট নম্বর অনুযায়ী ভাগ করুন। তাতে প্রতি নম্বরে মোটামুটি ১.৮ মিনিট পড়ে।

ধাপ

সময়

নির্দেশনা পড়া ও প্রশ্ন বাছাই

৫ মিনিট

৭টি প্রশ্ন, প্রতিটি ১৮ মিনিট

১২৬ মিনিট

শেষ রিভিউ

১০ মিনিট

বাফার (জরুরি সময়)

৯ মিনিট

মোট

১৫০ মিনিট

একটা প্রশ্নের ১৮ মিনিটকে আবার ভেঙে নিন: উদ্দীপক পড়া ১ মিনিট, ক-অংশ ১ মিনিট, খ-অংশ ৩ মিনিট, গ-অংশ ৫ মিনিট আর ঘ-অংশ ৮ মিনিট। ক আর খ দ্রুত সেরে ফেলে গ ও ঘ-তে বেশি সময় দিন, কারণ ওখানে ভাবতে হয়, আর নম্বরও ওখানেই বেশি।

এবার প্রতিটি প্রশ্নের জন্য একটা চেকপয়েন্ট ঠিক করুন। সৃজনশীল শুরুর পর ২৩, ৪১, ৫৯, ৭৭, ৯৫, ১১৩ আর ১৩১ মিনিটের মধ্যে একটা করে প্রশ্ন শেষ হওয়ার কথা। উদাহরণের জন্য ধরুন সৃজনশীল শুরু হলো ১১টায়। তাহলে চেকপয়েন্টগুলো হবে ১১:২৩, ১১:৪১, ১১:৫৯, ১২:১৭, ১২:৩৫, ১২:৫৩ আর ১:১১। এই সময়গুলো হিসাব করে প্রশ্নপত্রের মার্জিনে লিখে রাখুন। প্রতিটি প্রশ্ন শেষ করে ঘড়ির সঙ্গে মিলিয়ে নিন। আগে থাকলে ভালো, পিছিয়ে থাকলে কী করবেন তা পরের অংশে বলছি।

আটকে গেলে কী করবেন

আটকে যাওয়া সবারই হয়। ফারাকটা হয় আটকে গিয়ে কী করছেন তাতে। এর জন্য একটা সহজ নিয়ম আছে: দুই মিনিট ভেবেও যদি লেখার মতো একটা শুরু না পান, থামুন এবং এগিয়ে যান।

থামার আগে নিজেকে তিনটা প্রশ্ন করে দেখুন।

  • উদ্দীপকে আমাকে কী কী তথ্য দেওয়া হয়েছে?
  • প্রশ্নটা আসলে কী চাইছে?
  • এই তথ্য পাঠ্যবইয়ের কোন অধ্যায় বা সূত্রের সঙ্গে মেলে?

এই তিনটার উত্তর খুঁজতে আধা মিনিটের বেশি লাগে না, আর অনেক সময় আটকে থাকার জটটা এখানেই খুলে যায়। তবু না খুললে যা পারেন ততটুকু লিখে ফেলুন। চার নম্বরের প্রশ্নে অর্ধেক পারলেও দুই নম্বর আসে। তারপর ওই অংশের নম্বর স্পষ্ট করে লিখে চার-পাঁচ লাইন ফাঁকা রাখুন, প্রশ্নের পাশে একটা তারা চিহ্ন দিন, আর পরের অংশে চলে যান। অন্য প্রশ্ন শেষ করে ফিরে এলে অনেক সময় সেই উত্তর হঠাৎ মনে পড়ে যায়, কারণ তখন মাথাটা একই জায়গায় ঘুরছে না।

ধরুন তৃতীয় প্রশ্ন শেষ করতে ৫৯ মিনিটের বদলে ৬৫ মিনিট লাগল। আপনি ছয় মিনিট পিছিয়ে। বাফারের ৯ মিনিট থেকে ছয় মিনিট খরচ হলো, তিন মিনিট হাতে আছে। এখানে ঘাবড়ানোর কিছু নেই, হিসাবটা ঠিকই চলছে। বাফার তো এই কাজের জন্যই রাখা।

কিন্তু আরও পিছিয়ে পড়লে বাকি প্রশ্নগুলোর ঘ-অংশে এক-দুই মিনিট কমিয়ে নিন। ক, খ আর গ পুরো রাখুন, কারণ ওখানে নম্বর তোলা তুলনামূলক সহজ। সময় একেবারে কম পড়লে একটা প্রশ্ন পুরো ফাঁকা রেখে বাকিগুলো নিখুঁত করার চেষ্টা না করে প্রতিটিতে অন্তত ক, খ আর গ লিখুন। এই তিন অংশে মিলে ছয় নম্বর, আর সাধারণত সেটাই বেশি লাভজনক।

হঠাৎ মাথা ফাঁকা লাগলে কলম নামিয়ে দশ সেকেন্ড লম্বা শ্বাস নিন। দশ সেকেন্ড নষ্ট হলো ভেবে ভয় পাবেন না। এলোমেলো মাথা গুছিয়ে নিতে এইটুকু সময়ই যথেষ্ট, আর এতে হারানো সময়ের চেয়ে বাঁচানো সময় বেশি।

শেষ দশ মিনিটে যা দেখবেন

রিভিউয়ের সময় সবচেয়ে বড় ভুল হলো প্রথম থেকে সব উত্তর আবার পড়তে বসা। দশ মিনিটে তা সম্ভব না, আর শেষে অর্ধেক পড়া হয়ে অস্বস্তি বাড়ে। তার বদলে একটা ছোট তালিকা ধরে এগোন।

  • রোল, বিষয় কোড আর সেট ঠিক আছে কি না
  •  প্রতিটি উত্তরের প্রশ্ন নম্বর আর অংশ (ক, খ, গ, ঘ) ঠিকঠাক লেখা কি না
  • কোনো অংশ বাদ পড়েছে কি না, বিশেষ করে যেসব জায়গা ফাঁকা রেখে এসেছিলেন
  • গণিত বা বিজ্ঞানে একক, চিহ্ন আর শেষ ধাপের উত্তর
  • চিত্র, ছক বা গ্রাফে নাম আর লেবেল দেওয়া হয়েছে কি না
  • কাটাকুটি পরিষ্কার কি না, আর যেটা কেটেছেন তার জায়গায় নতুন উত্তর লেখা আছে কি না
  • নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংখ্যক প্রশ্নের উত্তর হয়েছে কি না

এই সাতটা দেখতে সাত-আট মিনিটের বেশি লাগে না। বাকি সময়ে ফাঁকা রেখে আসা অংশগুলো ভরাট করুন। রিভিউয়ের সময় ধরা পড়া ফাঁকা জায়গা ভরাট করাই সবচেয়ে বেশি নম্বর এনে দেয়।

বাড়িতে ঘড়ি ধরে অনুশীলন

পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রথমবার ঘড়ি ধরে লিখতে বসলে হিসাব মিলবে না। এই নিয়ম হাতে বসাতে হলে অন্তত চার সপ্তাহ আগে থেকে অনুশীলন দরকার। পরীক্ষার তারিখ কাছে থাকলে সপ্তাহগুলো ছোট করে নিন, কিন্তু ক্রমটা একই রাখুন।

সপ্তাহ ১, শুধু মাপুন: প্রতি বিষয়ে একটা সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে ১৮ মিনিটের টাইমার চালান। বই দেখবেন না। শেষে দেখুন কোন অংশে কত সময় গেল। এই সপ্তাহে নিখুঁত হওয়ার দরকার নেই, শুধু নিজের গতিটা জানা দরকার।

সপ্তাহ ২, ক-খ দ্রুত, গ-ঘ গোছানো: ক এক মিনিটে আর খ তিন মিনিটে শেষ করার চেষ্টা করুন। ঘ-এর জন্য আট মিনিটে উত্তর সাজানোর অভ্যাস করুন: কী দিয়ে শুরু, কোন যুক্তি, কোথায় শেষ।

সপ্তাহ ৩, বহুনির্বাচনী: ৩০ মিনিটে ৩০টা প্রশ্ন, সঙ্গে ছাপানো একটা OMR শিট ভরাট করুন। সারি মেলানোর অভ্যাসটা এখান থেকেই তৈরি হবে। উড্ডয়নের মডেল টেস্ট পাতা থেকেও সময় ধরে MCQ দিয়ে দেখতে পারেন।

সপ্তাহ ৪, পুরো মহড়া: আসল পরীক্ষার সময়ে বসুন। আগে ৩০ মিনিট বহুনির্বাচনী, তারপর বিরতি ছাড়াই ১৫০ মিনিট সৃজনশীল। চেকপয়েন্ট, বাফার, রিভিউ, সব আসল নিয়মে।

প্রতিটি অনুশীলনের পর খাতার এক কোণে তিন লাইন লিখে রাখুন: কোথায় সময় বেশি গেল, কেন গেল, পরের বার কী বদলাবেন। দুই সপ্তাহ পর দেখবেন একই জায়গায় বারবার আটকাচ্ছেন। তখন বুঝবেন সমস্যাটা সময়ের না, ওই অধ্যায়ের দুর্বলতার। সেটা আলাদা করে পড়ে নিন।

হাতের গতিও আলাদা করে অনুশীলন করার মতো। রোজ দশ মিনিট ঘড়ি ধরে বই থেকে লিখুন। লক্ষ্য সুন্দর হাতের লেখা না, লক্ষ্য হলো পরিষ্কার আর চলনসই গতিতে লেখা, যাতে পরীক্ষক পড়তে পারেন আর আপনার হাত ক্লান্ত না হয়।

ব্যবহারিক আছে এমন বিষয়ে কীভাবে ভাগ করবেন

পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন বা জীববিজ্ঞানের মতো বিষয়ে হিসাব একটু বদলায়, তবে মোট সময় সেই তিন ঘণ্টাই থাকে। বহুনির্বাচনী ২৫ নম্বরের জন্য ২৫ মিনিট। এখানে প্রথম দুই মিনিট তথ্য ভরাট, পরের ১৮ মিনিট প্রথম দফা, আর শেষ পাঁচ মিনিট ফেলে আসা প্রশ্ন ও OMR মিলিয়ে দেখা।

সৃজনশীল ৫০ নম্বরের জন্য ১৫৫ মিনিট। এর পাঁচ মিনিট বাছাই, ১২৫ মিনিট লেখা, ১০ মিনিট রিভিউ আর ১৫ মিনিট বাফার। ১২৫ মিনিট মানে প্রতি নম্বরে আড়াই মিনিট। এখানে প্রতি নম্বরে বেশি সময় পাওয়া যায়, কারণ প্রশ্নসংখ্যা কম। তাই উত্তর একটু বিস্তারিত লিখতে পারবেন। তবে নিয়ম একই থাকবে: ক-খ দ্রুত, গ-ঘ-তে বেশি সময়, আর বাফারটা হাতে রাখা।

বিষয়ভেদে ছোট কিছু কথা

মূল নিয়ম সব বিষয়ে এক হলেও কয়েকটা বিষয়ে ছোট কিছু কৌশল কাজে লাগে।

গণিত: অনেক ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে লেখার জন্যও নম্বর থাকে। তাই কোনো অঙ্কে আটকে গেলে অন্তত সূত্র আর প্রথম ধাপটা লিখে রাখুন। শেষ উত্তর না মিললেও ওই লেখা পুরো ফাঁকা রাখার চেয়ে ভালো।

বিজ্ঞান: চিত্র আঁকতে সময় যায়। দরকারি লেবেলসহ পরিষ্কার একটা সাধারণ চিত্র আঁকুন, সাজাতে বসবেন না। একক আর চিহ্ন শেষ রিভিউতে একবার দেখে নিন।

ইংরেজি: ব্যাকরণের ছোট অংশগুলো দ্রুত সেরে ফেলুন, তাহলে বড় লেখার অংশে বেশি সময় পাবেন। লেখা শুরুর আগে দুই মিনিটে মূল পয়েন্টগুলো ভেবে নিলে মাঝপথে থেমে যেতে হয় না।

বাংলা, ইতিহাস ও সমাজবিষয়ক বিষয়: এসব বিষয়ে লেখা সহজেই লম্বা হয়ে যায়। উত্তর শুরুর আগে মনে মনে তিনটা পয়েন্ট ঠিক করে নিন, তারপর সেই তিনটা নিয়েই লিখুন। তাহলে নম্বর অনুযায়ী লেখা থামাতে পারবেন।

আপনার বিষয়ের প্রশ্ন যেমনই হোক, একটা কাজ সব জায়গায় চলে: আগের বছরের বোর্ড প্রশ্ন ঘড়ি ধরে লিখে দেখা। কাগজে হিসাব কষা এক জিনিস, হাতে-কলমে মেলানো আরেক জিনিস।

কয়েকটা সাধারণ প্রশ্ন

সময় কম পড়লে একটা প্রশ্ন পুরো বাদ দিয়ে বাকিগুলো ভালো করে লেখা কি ঠিক?

সাধারণত না। প্রতিটি প্রশ্নের শুরুর অংশগুলোতে নম্বর তোলা সহজ। একটা পুরো প্রশ্ন ফাঁকা রাখলে দশ নম্বর যায়, অথচ ক, খ আর গ লিখেই ছয় নম্বর পাওয়া সম্ভব ছিল।

বহুনির্বাচনী আগে শেষ হয়ে গেলে বাকি সময়ে সৃজনশীল শুরু করা যাবে?

সাধারণত না। বহুনির্বাচনীর সময় শেষ হলে OMR শিট নেওয়া হয়, তারপর সৃজনশীলের প্রশ্নপত্র দেওয়া হয়। তাই আগে শেষ হলে বাকি সময়টা উত্তর মিলিয়ে দেখতে কাজে লাগান।

আমার হাতের লেখা ধীর। কী করব?

রোজ ঘড়ি ধরে দশ মিনিট লেখার অভ্যাস করুন। আর উত্তরে অপ্রয়োজনীয় ভূমিকা বাদ দিন। যেটা জিজ্ঞেস করা হয়েছে সরাসরি সেটা দিয়ে শুরু করলে লাইনও কমে, সময়ও বাঁচে।

হলে ঘড়ি নিয়ে যেতে পারব?

প্রবেশপত্র আর বোর্ডের নির্দেশনা দেখে নিন, কারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে নিষেধাজ্ঞা থাকে। স্মার্টওয়াচ না নেওয়াই নিরাপদ। হলে দেয়ালঘড়ি থাকবেই, এমন ধরে নেবেন না। এজন্য সাধারণ একটা হাতঘড়ি নিয়ে যাওয়ার অভ্যাস করুন এবং আগে থেকেই সেটা পরে অনুশীলন করুন।

পরীক্ষার আগের রাত ও হলে ঢোকার আগে

সময়ের পরিকল্পনা শুধু হলের ভেতরে শুরু হয় না। আগের রাতে আর হলে ঢোকার আগে ছোট কয়েকটা কাজ সেরে রাখলে সকালটা শান্ত যায়।

আগের রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে ফেলুন। প্রবেশপত্র, বাড়তি কয়েকটা কলম, পেনসিল, রাবার আর বোর্ডের নির্দেশনায় যা যা আনার কথা, সব মিলিয়ে নিন। সকালে তাড়াহুড়ো করে কিছু খুঁজতে গেলে মাথা গরম হয়, আর সেই গরম মাথা নিয়েই হলে ঢুকতে হয়।

ঘুম কমাবেন না। রাত জেগে নতুন কিছু পড়ার চেয়ে ঠিকমতো ঘুমিয়ে নেওয়া বেশি কাজের, কারণ পরদিন আপনার লেখার গতি আর মনোযোগ অনেকটাই ঘুমের ওপর নির্ভর করে।

কেন্দ্রে একটু আগে পৌঁছান। বোর্ডের নির্দেশনায় পরীক্ষা শুরুর অন্তত ৩০ মিনিট আগে আসন গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। আগে পৌঁছালে ভিড়, রাস্তার জ্যাম আর আসন খোঁজার তাড়াহুড়ো এড়ানো যায়।

আসনে বসে সময়টা কাজে লাগান। নিজের হিসাবটা একবার মাথায় বুলিয়ে নিন: বহুনির্বাচনীতে ২২ মিনিটে প্রথম দফা, সৃজনশীলে প্রশ্নপ্রতি ১৮ মিনিট, আটকে গেলে দুই মিনিটের নিয়ম। এই ছোট মানসিক মহড়া পরীক্ষার ভয়টা অনেকটা কমিয়ে দেয়, কারণ হাতে একটা পরিকল্পনা আছে জেনে মন শান্ত থাকে।

শেষ কথা

সময়ের হিসাব মুখস্থ করার জিনিস না, অভ্যাসের জিনিস। হিসাবটা সংক্ষেপে এই: বহুনির্বাচনীতে ২২ মিনিটে প্রথম দফা আর বাকি সময়ে মিলিয়ে দেখা। সৃজনশীলে পাঁচ মিনিট বাছাই, প্রতি প্রশ্নে ১৮ মিনিট, শেষে ১০ মিনিট রিভিউ আর ৯ মিনিটের বাফার। আটকে গেলে দুই মিনিটের বেশি নয়।

এই সপ্তাহেই একটা সৃজনশীল প্রশ্ন নিয়ে ১৮ মিনিটের টাইমার চালিয়ে দেখুন কোথায় আটকাচ্ছেন। ওই একটা অনুশীলনই আপনাকে বলে দেবে আপনার সময় আসলে কোথায় যাচ্ছে। শুভকামনা রইল।

বিষয় : পড়াশোনার টিপস

সম্পর্কিত ব্লগ

যেকোনো ভাষা সাবলীলভাবে বলতে চাইলে যে ৫টি অভ্যাস গড়া জরুরি

যেকোনো ভাষা সাবলীলভাবে বলতে চাইলে যে ৫টি অভ্যাস গড়া জরুরি

৮ ঘণ্টা আগে
গ্রামীণ ও শহরের সংস্কৃতি গঠনে নৃবিজ্ঞানের বাস্তব প্রভাব

গ্রামীণ ও শহরের সংস্কৃতি গঠনে নৃবিজ্ঞানের বাস্তব প্রভাব

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে আধুনিক আর্ট পর্যন্ত শিল্পচর্চার বিবর্তন

প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে আধুনিক আর্ট পর্যন্ত শিল্পচর্চার বিবর্তন

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রযুক্তির যুগে মানুষের শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

প্রযুক্তির যুগে মানুষের শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬