এসএসসি পরীক্ষা ২০২৭ এর জন্য পড়াশোনার সঠিক পরিকল্পনা
— উড্ডয়ন
ছবি : সংগৃহিত
২০২৭ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হবে ১৪ মার্চ, আর শেষ হবে ১৫ এপ্রিল। আগে ঠিক ছিল ৭ জানুয়ারি, পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে সময়সূচি বদলানো হয়েছে। হাতে সময় আছে প্রায় ২০ সপ্তাহ। এটা কম নয়, আবার বসে থাকার মতোও নয়। সঠিক পরিকল্পনা থাকলে এই সময়ে পুরো সিলেবাস দুইবার ঘুরে আসা সম্ভব।
পরীক্ষা কবে, হাতে সময় কত এবং কোন তথ্য কোথায় দেখবেন
পরীক্ষার তারিখ একবার বদলেছে, তাই আবারও বদলাতে পারে, এই সম্ভাবনা মাথায় রাখুন। তবে সেই আশায় পড়া পিছিয়ে দেবেন না। ধরে নিন ১৪ মার্চেই পরীক্ষা, আর সেই হিসাবেই এগোন। বোর্ডের চূড়ান্ত রুটিন, ফরম পূরণের নিয়ম আর টেস্ট পরীক্ষার তারিখ স্কুল ও শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে মিলিয়ে নেবেন। ফেসবুক পেজ বা কোচিং সেন্টারের পোস্টের ওপর পুরো ভরসা করবেন না।
সিলেবাসের জন্যও একই কথা। আপনার বিভাগের (বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা) জন্য এনসিটিবির সর্বশেষ সিলেবাস স্কুল থেকে নিন, অথবা এনসিটিবির ওয়েবসাইটে দেখুন। কোন অধ্যায় থাকছে আর কোনটা বাদ, এটা না জেনে পড়া শুরু করলে সময় নষ্ট হবে।
পড়া শুরুর আগে তিনটি কাজ সেরে ফেলুন
প্রথম কাজ হলো প্রতিটি বিষয়ের সিলেবাস নিয়ে একটা তালিকা বানানো। খাতায় বা ফোনের নোটে অধ্যায়ের নাম লিখুন, পাশে লিখুন আপনি সেটা কতটা পারেন: ভালো, মোটামুটি বা দুর্বল। এই তালিকাই আপনার পুরো পরিকল্পনার ভিত্তি।
দ্বিতীয় কাজ হলো গত কয়েক বছরের বোর্ড প্রশ্ন জোগাড় করা। প্রশ্ন দেখলেই বোঝা যাবে কোন অধ্যায় থেকে কেমন প্রশ্ন আসে, সৃজনশীল অংশে কীভাবে উত্তর লিখতে হয়, আর নৈর্ব্যক্তিক অংশে কত সময় লাগে। অনেকে এটা সবার শেষে করেন, কিন্তু শুরুতে করলে পড়ার দিকটা ঠিক থাকে।
তৃতীয় কাজ হলো পড়ার জায়গা ঠিক করা। একটা নির্দিষ্ট টেবিল, ভালো আলো আর ফোন দূরে রাখার ব্যবস্থা। শুনতে ছোট মনে হলেও এই অভ্যাস দিনে এক-দুই ঘণ্টার মনোযোগ বাঁচিয়ে দেয়।
২০ সপ্তাহের পরিকল্পনা তিন ধাপে সাজান
পুরো সময়টাকে তিন ভাগে ভাগ করে নিন।
প্রথম ধাপ চলবে আজ থেকে নভেম্বরের শেষ পর্যন্ত, প্রায় পাঁচ সপ্তাহ। এই সময়ে কাজ হলো পুরো সিলেবাস শেষ করা। যেসব অধ্যায় এখনো পড়া হয়নি বা দুর্বল, সেগুলো আগে ধরুন। গণিত, ইংরেজি আর আপনার গ্রুপের কঠিন বিষয়গুলোকে এখানে বেশি সময় দিন, কারণ এগুলোর ভিত্তি দুর্বল থাকলে পরে ধরা কঠিন। এই ধাপে নম্বরের চিন্তা বাদ দিয়ে বোঝার দিকে জোর দিন।
দ্বিতীয় ধাপ ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত, প্রায় সাত সপ্তাহ। এটা প্রথম রিভিশনের সময়। প্রতিটি অধ্যায় থেকে নিজের ভাষায় ছোট নোট বানান, সূত্র আর সংজ্ঞা আলাদা করে লিখে রাখুন। আপনার স্কুলের টেস্ট পরীক্ষাও এই সময়ের মধ্যে পড়তে পারে। শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী সিলেবাস শেষ করে টেস্ট পরীক্ষা নেওয়ার কথা, তাই টেস্টকে পুরো সিলেবাসের একটা পরীক্ষা হিসেবে নিন। টেস্টে যেসব জায়গায় ভুল হবে, সেগুলোর তালিকা করে পরের ধাপে আগে সেগুলো ঠিক করুন।
তৃতীয় ধাপ জানুয়ারির শেষ থেকে ১৩ মার্চ পর্যন্ত, প্রায় সাত সপ্তাহ। এখানে মূল কাজ মডেল টেস্ট আর আগের বছরের প্রশ্ন সমাধান। সপ্তাহে অন্তত দুটি পরীক্ষা দিন, পুরো সময় ধরে, পরীক্ষার হলের মতো করে। তারপর নিজের খাতা নিজে দেখুন, কোথায় নম্বর কাটা যেত খুঁজে বের করুন। শেষ দুই সপ্তাহে নতুন কিছু পড়বেন না। শুধু নোট আর আগের ভুলগুলো দেখুন।
প্রতিদিনের রুটিন কেমন হবে
স্কুল চলার দিনে স্কুলের সময় বাদ দিয়ে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা পড়া যথেষ্ট, ছুটির দিনে ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা। এটা একটা গড় ধারণা। কেউ কম সময়ে বেশি পড়েন, কেউ বেশি সময়েও কম, তাই ঘণ্টার চেয়ে কতটা কাজ হলো সেটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একদিনে তিন থেকে চারটি বিষয় রাখুন, তার মধ্যে একটা কঠিন, একটা মাঝারি আর একটা হালকা। কঠিন বিষয়টা পড়ুন সকালে বা এমন সময়ে যখন মাথা সবচেয়ে ফ্রেশ থাকে। প্রতি ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট পড়ার পর ১০ মিনিট বিরতি নিন। রাতে ঘুমানোর আগে দিনের পড়া ১৫ মিনিট চোখ বুলিয়ে নিলে মনে থাকে অনেক বেশি।
ঘুম নিয়ে একটা কথা। রাত জেগে পড়া পরীক্ষার আগের কয়েক দিনে লোভনীয় মনে হয়, কিন্তু প্রতিদিন ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমালে পড়া মাথায় বসে ভালো, আর পরীক্ষার দিন শরীরও সাথ দেয়। সাথে হালকা হাঁটা বা খেলাধুলার জন্য দিনে আধঘণ্টা রাখুন।
বিষয় অনুযায়ী কীভাবে পড়বেন
গণিতে প্রতিদিন কিছু অঙ্ক করতেই হবে, একদিন বাদ গেলে ছন্দ নষ্ট হয়। পাঠ্যবইয়ের উদাহরণ আর অনুশীলনীর অঙ্ক আগে শেষ করুন, তারপর অতিরিক্ত বই বা বোর্ড প্রশ্নে যান। যেসব অঙ্কে আটকে যান, সেগুলোর পাশে চিহ্ন দিয়ে রাখুন এবং সপ্তাহে একদিন শুধু সেগুলো আবার করুন।
ইংরেজিতে প্রতিদিন আধঘণ্টা গ্রামার আর আধঘণ্টা পাঠ্যবইয়ের গল্প বা প্যাসেজ পড়ার অভ্যাস করুন। লেখার অংশ যেমন পত্র, অনুচ্ছেদ ও আবেদন নিজে লিখে অভ্যাস করুন, মুখস্থ করলে প্রশ্ন একটু ঘুরে এলেই সমস্যা হয়।
বাংলায় ব্যাকরণ আর সাহিত্য আলাদা করে সাজান। কবিতা ও গদ্যের লেখক পরিচিতি, সারমর্ম ও মূলভাব নোট করে রাখুন। রচনা ও ভাবসম্প্রসারণ সপ্তাহে একটা করে লিখলে লেখার গতি আর গুছিয়ে লেখার দক্ষতা দুটোই বাড়ে।
বিজ্ঞান গ্রুপে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিতে আগে ধারণা পরিষ্কার করুন, তারপর অঙ্ক ও সূত্র। রসায়নে বিক্রিয়া আর পর্যায় সারণি, জীববিজ্ঞানে চিত্র আঁকা বারবার অভ্যাস করুন। যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা আছে, সেগুলোর খাতা ও পরীক্ষণ আগে থেকেই গুছিয়ে রাখুন, শেষ সময়ের চাপ এড়াতে এটা কাজে লাগবে।
ব্যবসায় শিক্ষা গ্রুপে হিসাববিজ্ঞানে হাতে-কলমে অনুশীলন সবচেয়ে বেশি কাজ করে, শুধু পড়লে হয় না। মানবিক গ্রুপে ইতিহাস, ভূগোল ও অর্থনীতির জন্য সময়রেখা, মানচিত্র আর মূল পয়েন্টের নোট বানালে রিভিশন দ্রুত হয়। বাকি সাধারণ বিষয় যেমন আইসিটি ও ধর্ম শিক্ষা শেষ দিকে ফেলে রাখবেন না, সপ্তাহে দুই-তিন দিন অল্প করে সময় দিন।
পরীক্ষার ঠিক আগের সময় আর পরীক্ষার হলে করণীয়
পরীক্ষা শুরুর আগের দুই সপ্তাহে রুটিন দেখে প্রতিটি বিষয়ের মাঝের ছুটির দিনগুলো কীভাবে কাজে লাগাবেন, তার একটা ছক বানান। একটা বিষয়ের পরীক্ষা শেষ হলে সেটা নিয়ে আর ভাববেন না, পরের বিষয়ে মন দিন। পরীক্ষার আগের রাতে নতুন অধ্যায় ধরবেন না, শুধু নোট দেখুন আর তাড়াতাড়ি ঘুমান।
হলে ঢুকে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে প্রথমে ৫ মিনিট সময় নিয়ে পুরোটা পড়ে নিন। যে প্রশ্ন সবচেয়ে ভালো পারেন সেটা দিয়ে শুরু করুন, তাতে আত্মবিশ্বাস আসে। সৃজনশীল প্রশ্নে চারটি অংশের নম্বর অনুযায়ী উত্তরের দৈর্ঘ্য ঠিক করুন, ছোট প্রশ্নের উত্তর অকারণে বড় করবেন না। নৈর্ব্যক্তিক অংশে সময় মেপে এগোন, আর শেষে অন্তত ১০ মিনিট রাখুন উত্তরপত্র মিলিয়ে দেখার জন্য।
যে ভুলগুলো অনেকেই করেন
সবচেয়ে বড় ভুল হলো শুধু পড়ে যাওয়া, নিজেকে যাচাই না করা। বই বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন, আর লিখে দেখুন কতটা মনে আছে। দ্বিতীয় ভুল হলো প্রিয় বিষয়ে বেশি সময় দেওয়া আর দুর্বল বিষয় এড়িয়ে যাওয়া। নম্বর বাড়ে দুর্বল জায়গা ঠিক করলে।
তৃতীয় ভুল হলো সবকিছু বন্ধুর মতো করে করতে চাওয়া। অন্যের রুটিন নকল করার আগে ভাবুন, আপনার সময় ও গতি কেমন। আর শেষ কথা, ফোন আর সোশ্যাল মিডিয়া। পড়ার সময় ফোন অন্য ঘরে রাখলে একই সময়ে অনেক বেশি কাজ হয়।
শুরুটা আজ থেকেই করুন। প্রথম সপ্তাহে শুধু তালিকা বানানো আর রুটিন মেনে চলাটা ঠিকমতো করতে পারলেই বাকিটা সহজ হয়ে যাবে।
সম্পর্কিত ব্লগ
স্ট্রেস কীভাবে শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে প্রভাবিত করে
যেকোনো ভাষা সাবলীলভাবে বলতে চাইলে যে ৫টি অভ্যাস গড়া জরুরি

