প্রযুক্তির যুগে মানুষের শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

উড্ডয়ন

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রযুক্তির যুগে মানুষের শারীরিক ও আচরণগত পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা

ছবি : সংগৃহিত

গত দুই দশকে মানুষের জীবনযাপনের ধরন যতটা বদলেছে, তার আগের কয়েক শতাব্দীতেও ততটা বদলায়নি। স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এমন এক অংশ হয়ে উঠেছে যে এগুলো ছাড়া একদিন কাটানোর কথা কল্পনা করাও কঠিন। কিন্তু এই দ্রুত পরিবর্তনের একটা মূল্য আছে। আমাদের শরীর আর মস্তিষ্ক যেভাবে গঠিত হয়েছিল, প্রযুক্তির এই নতুন জগতের সাথে তার পুরোপুরি খাপ খাওয়া এখনো সম্ভব হয়নি। ফলে শারীরিক গঠন থেকে শুরু করে আচরণ, চিন্তার ধরন, এমনকি সম্পর্কের ধরনেও এমন কিছু পরিবর্তন ঘটছে যা বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই লেখায় আমরা দেখব প্রযুক্তি ঠিক কীভাবে আমাদের মস্তিষ্ক, শরীর, ঘুম, মনোযোগ, সম্পর্ক আর মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে, এবং এর পেছনের বৈজ্ঞানিক কারণগুলো কী।

প্রযুক্তি ও মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেম

মানুষের মস্তিষ্কে একটি রাসায়নিক পদার্থ আছে যার নাম ডোপামিন। এটি মূলত আনন্দ আর পুরস্কারের অনুভূতির সাথে জড়িত। যখন আমরা কোনো ভালো খাবার খাই, প্রিয় মানুষের সাথে সময় কাটাই বা কোনো লক্ষ্য অর্জন করি, তখন মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয় এবং আমরা তৃপ্তি অনুভব করি।

সমস্যা হলো, স্মার্টফোন অ্যাপ আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো ঠিক এই সিস্টেমকে কাজে লাগিয়ে তৈরি হয়েছে। প্রতিটি নোটিফিকেশন, লাইক, কমেন্ট বা নতুন মেসেজ মস্তিষ্কে ছোট একটি ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়। কিন্তু এই নিঃসরণ অনিশ্চিত সময়ে ঘটে, অর্থাৎ আমরা জানি না পরবর্তী নোটিফিকেশন কখন আসবে। মনোবিজ্ঞানে এই ধরনের অনিশ্চিত পুরস্কারকে বলা হয় ভ্যারিয়েবল রিওয়ার্ড, যা জুয়া খেলার মেশিনেও একই নীতিতে কাজ করে। ফলাফল হলো, মানুষ বারবার ফোন চেক করার এক ধরনের অভ্যাসে আটকে পড়ে, যা অনেকটা আসক্তির মতো আচরণ তৈরি করে।

এই প্রক্রিয়া দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্কের পুরস্কার সিস্টেমকে সংবেদনশীল করে তোলে। ফলে সাধারণ, কম উত্তেজনাপূর্ণ কাজ যেমন বই পড়া বা ধীরগতির কোনো কাজ করা তুলনামূলক কম আনন্দদায়ক মনে হতে শুরু করে। এটাই মূলত কারণ, যে কারণে অনেকে দীর্ঘ সময় ধরে মনোযোগ ধরে রাখতে কষ্ট পান।

ঘুম ও সার্কাডিয়ান রিদমের ওপর প্রভাব

মানুষের শরীরে একটি অভ্যন্তরীণ জৈবিক ঘড়ি আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই ঘড়ি নিয়ন্ত্রণ করে কখন আমাদের ঘুম পাবে, কখন সজাগ থাকব। প্রাকৃতিকভাবে এই ঘড়ি সূর্যের আলোর ওঠানামার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সন্ধ্যার পর আলো কমে গেলে মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামক হরমোন নিঃসৃত হয়, যা ঘুম আসতে সাহায্য করে।

স্মার্টফোন ও ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে যে নীল আলো নির্গত হয়, তা মস্তিষ্ককে এমন সংকেত দেয় যেন এখনো দিনের বেলা চলছে। ফলে মেলাটোনিন নিঃসরণ বিলম্বিত হয় এবং ঘুম আসতে দেরি হয়। রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার ফলে অনেকের ঘুমের সময় কমে যাচ্ছে এবং ঘুমের গুণগত মানও খারাপ হচ্ছে।

শুধু নীল আলো নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ক্রলিং করার সময় মস্তিষ্ক যে তথ্য প্রক্রিয়া করে, তাও একধরনের সক্রিয়তা তৈরি করে যা ঘুমের প্রস্তুতির বিপরীত। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে ঘুমের অভাব শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল করে এবং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

শারীরিক ভঙ্গি ও পেশীর পরিবর্তন

প্রযুক্তির প্রভাব শুধু মস্তিষ্কে সীমাবদ্ধ নয়, শরীরের গঠনেও এর ছাপ পড়ছে। দীর্ঘ সময় ফোন বা কম্পিউটারের দিকে ঝুঁকে বসে থাকার অভ্যাস থেকে তৈরি হয়েছে একটি নতুন সমস্যা, যাকে বলা হয় টেক নেক। মাথা নিচু করে ফোন দেখার সময় ঘাড়ের ওপর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি চাপ পড়ে। মাথা যত বেশি নিচু হয়, ঘাড়ের কশেরুকার ওপর ততই বেশি ওজনের চাপ পড়ে, যা দীর্ঘমেয়াদে ঘাড় ও কাঁধের ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

একইভাবে দীর্ঘ সময় বসে থাকার ফলে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন প্রভাবিত হচ্ছে। পিঠের নিচের দিকের পেশী দুর্বল হয়ে পড়ে, কাঁধ সামনের দিকে ঝুঁকে যায় এবং সামগ্রিক শারীরিক ভঙ্গিতে পরিবর্তন আসে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একে বলা হয় ফরওয়ার্ড হেড পশ্চার। এটি শুধু চেহারার দিক থেকে নয়, শ্বাসপ্রশ্বাসের কার্যক্ষমতা ও রক্ত সঞ্চালনের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এছাড়া বারবার একই ধরনের আঙুলের নড়াচড়া, যেমন টাইপিং বা স্ক্রলিং, কারো কারো ক্ষেত্রে হাতের পেশি ও স্নায়ুর সমস্যা তৈরি করছে, যাকে বলা হয় রিপিটিটিভ স্ট্রেইন ইনজুরি। এই ধরনের সমস্যাগুলো দশ বা বিশ বছর আগে এত ব্যাপকভাবে দেখা যেত না।

মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির পরিবর্তন

মানুষের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক কমে গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এর একটি বড় কারণ হলো মাল্টিটাস্কিং এবং ঘনঘন মনোযোগ পরিবর্তনের অভ্যাস। যখন আমরা একটি কাজ করার সময় বারবার ফোন চেক করি বা একাধিক ট্যাবের মধ্যে সুইচ করি, তখন মস্তিষ্ককে প্রতিবারই নতুন করে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে বলা হয় কগনিটিভ সুইচিং কস্ট, অর্থাৎ প্রতিটি পরিবর্তনের একটি মানসিক মূল্য আছে।

দীর্ঘদিন ধরে এই অভ্যাস চর্চা করার ফলে মস্তিষ্ক একটানা মনোযোগ ধরে রাখার চর্চা কমিয়ে দেয়। ফলে জটিল বা দীর্ঘ সময়ের কাজে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, ইন্টারনেটে তথ্য সহজলভ্য হওয়ায় মস্তিষ্ক অনেক সময় তথ্য মনে রাখার বদলে কোথায় তথ্য পাওয়া যাবে সেটা মনে রাখার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। একে বলা হয় ডিজিটাল অ্যামনেসিয়া বা গুগল ইফেক্ট। এটি সরাসরি স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয় না, তবে মস্তিষ্ক কীভাবে তথ্য সংরক্ষণ করে তার ধরন বদলে দেয়।

সামাজিক আচরণ ও সম্পর্কের পরিবর্তন

মানুষ সামাজিক প্রাণী, এবং সামনাসামনি যোগাযোগের একটি নির্দিষ্ট গুরুত্ব মস্তিষ্কের গঠনের মধ্যেই আছে। চোখের যোগাযোগ, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বরের ওঠানামা এসব থেকে মস্তিষ্ক প্রচুর সামাজিক তথ্য সংগ্রহ করে। কিন্তু ডিজিটাল যোগাযোগে এই তথ্যগুলোর বেশিরভাগই অনুপস্থিত থাকে।

দীর্ঘ সময় ধরে টেক্সট মেসেজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে যোগাযোগ করার অভ্যাসের কারণে অনেকের ক্ষেত্রে সামনাসামনি কথা বলার সময় সহজাত সামাজিক দক্ষতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে বলে গবেষকরা মনে করেন। বিশেষ করে কিশোর বয়সে যাদের সামাজিক দক্ষতা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে, তাদের ক্ষেত্রে এই প্রভাব তুলনামূলক বেশি লক্ষণীয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক তুলনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত তাদের জীবনের সবচেয়ে ভালো মুহূর্তগুলো প্রদর্শন করে। এর ফলে অন্যদের জীবনের সাথে নিজের জীবনের তুলনা করার প্রবণতা বেড়ে যায়, যা মানসিক অস্বস্তি এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। মস্তিষ্কের যে অংশ সামাজিক অবস্থান বিচার করে, তা এই তুলনার প্রক্রিয়ায় বারবার সক্রিয় হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়ায়।

মানসিক স্বাস্থ্য ও উদ্বেগ-বিষণ্নতা

প্রযুক্তির সাথে মানসিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক জটিল এবং এখনো গবেষণাধীন একটি বিষয়। তবে বেশ কিছু বিষয় স্পষ্টভাবে লক্ষ করা গেছে। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম, বিশেষ করে ঘুমানোর আগে এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার সাথে সাথে ফোন ব্যবহার, মানসিক চাপের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে।

ফোমো, অর্থাৎ কিছু মিস করে ফেলার ভয়, এখন একটি স্বীকৃত মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা হিসেবে বিবেচিত হয়। ক্রমাগত অন্যদের আপডেট দেখতে থাকা এবং নিজের জীবনের সাথে তুলনা করার প্রবণতা উদ্বেগ বাড়িয়ে দিতে পারে। এছাড়া নোটিফিকেশনের কারণে সবসময় সজাগ থাকার একটি মানসিক চাপ তৈরি হয়, যাকে অনেক গবেষক টেকনোস্ট্রেস বলে অভিহিত করেন।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। প্রযুক্তি নিজে থেকে সরাসরি মানসিক অসুস্থতা তৈরি করে না, বরং এর ব্যবহারের ধরন এবং পরিমাণের ওপর প্রভাব নির্ভর করে। পরিমিত এবং সচেতন ব্যবহার মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তেমন নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না, বরং অতিরিক্ত এবং অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারই মূল সমস্যা।

চোখ ও দৃষ্টিশক্তির ওপর প্রভাব

দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার একটি সরাসরি শারীরিক প্রভাব হলো চোখের ক্লান্তি। এই অবস্থাকে বলা হয় ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বা কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম। এর লক্ষণের মধ্যে আছে চোখ শুকিয়ে যাওয়া, মাথাব্যথা, ঝাপসা দেখা এবং চোখে জ্বালাপোড়া।

এর একটি বড় কারণ হলো স্ক্রিনের দিকে তাকানোর সময় মানুষ স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কম পলক ফেলে। সাধারণত মানুষ মিনিটে প্রায় পনেরো থেকে বিশ বার পলক ফেলে, কিন্তু স্ক্রিনে তাকানোর সময় এই সংখ্যা অর্ধেকেরও কমে যেতে পারে। কম পলক ফেলার কারণে চোখের পৃষ্ঠ শুকিয়ে যায় এবং অস্বস্তি তৈরি হয়।

এছাড়া শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া বা কাছের দৃষ্টি সমস্যা বৃদ্ধির সাথে স্ক্রিন টাইমের সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন গবেষণা চলছে। ধারণা করা হয়, বাইরে কম সময় কাটানো এবং কাছের বস্তুর দিকে দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থাকার অভ্যাস চোখের গঠনগত পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে।

শিশু-কিশোরদের মস্তিষ্ক বিকাশে প্রভাব

শিশু ও কিশোর বয়সে মস্তিষ্ক দ্রুত বিকশিত হতে থাকে এবং এই সময়টা পরিবেশের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি সংবেদনশীল। মস্তিষ্কের যে অংশ সিদ্ধান্ত নেওয়া, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সাথে জড়িত, তার নাম প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স। এই অংশটি সাধারণত পঁচিশ বছর বয়স পর্যন্ত পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে থাকে।

কিশোর বয়সে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এই বিকাশমান মস্তিষ্কের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারে। এই বয়সে দ্রুত পুরস্কার পাওয়ার অভ্যাস তৈরি হলে ভবিষ্যতে ধৈর্য ধরে কাজ করার এবং বিলম্বিত পুরস্কারের জন্য অপেক্ষা করার ক্ষমতা দুর্বল হতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন। একে বলা হয় ডিলেইড গ্র্যাটিফিকেশনের ঘাটতি।

তবে এখানেও ভারসাম্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামূলক ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রযুক্তি মস্তিষ্কের বিকাশে ইতিবাচক ভূমিকাও রাখতে পারে, বিশেষ করে যখন তা তত্ত্বাবধানে এবং সীমিত সময়ের মধ্যে ব্যবহার করা হয়।

ইতিবাচক দিক ও মস্তিষ্কের অভিযোজন ক্ষমতা

এতক্ষণ যা আলোচনা করা হলো তা মূলত সতর্কতামূলক দিক, কিন্তু এর পাশাপাশি একটি ইতিবাচক বিষয়ও মনে রাখা দরকার। মানুষের মস্তিষ্কের একটি অসাধারণ ক্ষমতা হলো নিউরোপ্লাস্টিসিটি, অর্থাৎ পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিজের গঠন বদলানোর ক্ষমতা। এই একই ক্ষমতা যেমন কিছু নেতিবাচক অভ্যাস তৈরি করছে, তেমনি সচেতনভাবে ব্যবহার করলে তা নতুন দক্ষতা অর্জনেও সাহায্য করতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভিডিও গেম খেলার অভ্যাস কিছু ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এবং হাত-চোখের সমন্বয় বাড়াতে পারে। অনলাইন শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্মগুলো জ্ঞান অর্জনের সুযোগ অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। ভিডিও কলের মাধ্যমে দূরে থাকা প্রিয়জনদের সাথে যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে, যা সামাজিক সংযোগ বজায় রাখতে সাহায্য করে।

অর্থাৎ প্রযুক্তি নিজে ভালো বা খারাপ নয়, বরং এর ব্যবহারের ধরনই নির্ধারণ করে দেয় এটি আমাদের জন্য কতটা উপকারী বা ক্ষতিকর হবে।

ভারসাম্য বজায় রাখার বৈজ্ঞানিক উপায়

উপরের আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে প্রযুক্তি সম্পূর্ণ পরিহার করা বাস্তবসম্মত নয়, বরং সচেতন এবং পরিমিত ব্যবহারই সমাধান। কিছু কার্যকর পদ্ধতি নিচে উল্লেখ করা হলো।

ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে স্ক্রিন ব্যবহার বন্ধ রাখলে মেলাটোনিন নিঃসরণ স্বাভাবিক থাকে এবং ঘুমের মান উন্নত হয়। কাজের সময় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখলে মস্তিষ্কের কগনিটিভ সুইচিং কমে যায় এবং মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয়। প্রতি বিশ মিনিট পরপর কুড়ি সেকেন্ড দূরের কোনো বস্তুর দিকে তাকানোর অভ্যাস চোখের ক্লান্তি কমাতে সাহায্য করে, যা চক্ষু বিশেষজ্ঞরা বিশ-বিশ-বিশ নিয়ম নামে পরিচিত করেছেন।

শারীরিক ভঙ্গি ঠিক রাখতে স্ক্রিনের উচ্চতা চোখের সমান্তরালে রাখা এবং নিয়মিত বিরতিতে দাঁড়িয়ে হাঁটাচলা করা কার্যকর। এছাড়া প্রতিদিন কিছু সময় সম্পূর্ণভাবে ডিজিটাল ডিভাইস থেকে দূরে থেকে সামনাসামনি যোগাযোগ বা প্রকৃতির মধ্যে সময় কাটানো মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, যাতে আমরা প্রযুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত না হয়ে বরং প্রযুক্তিকে নিজেদের প্রয়োজনে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি।

উপসংহার

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে যেভাবে বদলে দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। এর সুবিধাগুলো যেমন বিশাল, তেমনি এর প্রভাবে শরীর ও মনে যে পরিবর্তনগুলো ঘটছে, তাও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। মস্তিষ্কের ডোপামিন সিস্টেম থেকে শুরু করে ঘুমের চক্র, শারীরিক ভঙ্গি, মনোযোগ ক্ষমতা, সামাজিক আচরণ এবং মানসিক স্বাস্থ্য, প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রযুক্তির প্রভাব লক্ষণীয়।

তবে এই পরিবর্তনগুলো অনিবার্য কোনো ভবিষ্যৎ নয়। মানুষের মস্তিষ্কের অভিযোজন ক্ষমতা এতটাই শক্তিশালী যে সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমরা এই নেতিবাচক প্রভাবগুলো অনেকাংশে কমিয়ে আনতে পারি এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকগুলো পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারি। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি দাঁড়ায় ভারসাম্যের ওপর, প্রযুক্তিকে জীবনের একটি সহায়ক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা, এর দাস হয়ে না পড়া।

বিষয় : নৃবিজ্ঞান

সম্পর্কিত ব্লগ

গ্রামীণ ও শহরের সংস্কৃতি গঠনে নৃবিজ্ঞানের বাস্তব প্রভাব

গ্রামীণ ও শহরের সংস্কৃতি গঠনে নৃবিজ্ঞানের বাস্তব প্রভাব

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে আধুনিক আর্ট পর্যন্ত শিল্পচর্চার বিবর্তন

প্রাচীন গুহাচিত্র থেকে আধুনিক আর্ট পর্যন্ত শিল্পচর্চার বিবর্তন

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধুনিক আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধুনিক আচার-অনুষ্ঠানের পেছনে নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কঙ্কাল ও জীবাশ্ম গবেষণায় জানা প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাসের রহস্য

কঙ্কাল ও জীবাশ্ম গবেষণায় জানা প্রাচীন মানুষের খাদ্যাভ্যাসের রহস্য

১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬