- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
৩৩তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১২
- বিসিএস ২০১২
- বাংলাদেশ
বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলা হয় কেন? সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক তথ্যসমূহ উল্লেখপূর্বক বর্ণনা করুন।
উত্তর: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নদীবিধৌত দেশ বাংলাদেশ। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক অসংখ্য নদ-নদী এ দেশে জালের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। যে সকল প্রাকৃতিক কারণে ভূমিরূপ পরিবর্তিত হয় এদের মধ্যে নদ-নদীর ভূমিকা অন্যতম। নদ-নদী ধীরগতিতে কোথাও ভূমির ক্ষয়সাধন করে আবার কোথাও শিলাচূর্ণ, পলিমাটি সঞ্চয়ের মাধ্যমে নতুন ভূমির সৃষ্টি করে। নদী সৃষ্ট এমনই এক ভূমিরূপ হলো ব-দ্বীপ। আর বাংলাদেশ হলো পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ।
ব-দ্বীপ: স্রোতের গতিবেগ হ্রাসের ফলে নদীর মোহনায় নদীবাহিত কাদা, পলি, বালি, কাঁকর, নুড়ি প্রভৃতি স্তরে স্তরে সঞ্চিত হয়ে যে ত্রিকোণাকৃতি ভূমিরূপ গঠিত হয় তাকে ব-দ্বীপ বলে। গ্রিক ঐতিহাসিক হেরোডোটাস নীল নদের মোহনায় তিন কোণাকৃতি নদীর সঞ্চয়জাত ভূমিকে গ্রিক অক্ষর ডেল্টার মতো কল্পনা করে একে ডেল্টা (△) নামে অভিহিত করেন। ব-দ্বীপ দেখতে মাত্রাহীন বাংলা 'ব'-এর মতো। তাই বাংলায় এর নাম ব-দ্বীপ নামকরণ করা হয়েছে।
ব-দ্বীপ সৃষ্টির কারণ: নদী যখন মোহনার কাছাকাছি আসে তখন স্রোতের বেগ এতই হ্রাস পায় যে, নদীবাহিত তলানি আর পরিবাহিত হতে না পেরে নদীর মোহনায় সঞ্চিত হয় এবং চর জেগে ওঠার ফলে নদীর স্রোত বাধাপ্রাপ্ত হয়ে চরের দুপাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। এতে চরের দুপ্রান্ত ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ত্রিকোণাকৃতি লাভ করে। ত্রিকোণাকৃতির এ নতুন সমতল ভূমিই ব-দ্বীপ। তবে সব নদীর মুখে ব-দ্বীপ সৃষ্টি হয় না। নদীর মোহনায় যদি প্রবল সামুদ্রিক স্রোত থাকে কিংবা প্রবল জোয়ার-ভাটা ঘটে, তবে পলি জমতে পারে না এবং ব-দ্বীপও সৃষ্টি হয় না। মোহনা শান্ত হলে শুধু ব-দ্বীপ তৈরি হয়। ব-দ্বীপ গঠনকালে প্রথমে মোটা পলিকণা ও পরে সূক্ষ্মকণাসমূহ সঞ্চিত হয়। এ জটিল প্রক্রিয়ায় ব-দ্বীপ গঠনকালে প্রধান নদীখাত একাধিক নদীখাত, শাখানদী, বিভিন্ন উপহ্রদ, জলাভূমি ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জলাধারার সমন্বয়ে গঠিত নেটওয়ার্কে বিভক্ত হয়। অধিকাংশ ব-দ্বীপই জটিল ও বহুমাত্রিক।
বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলার কারণ: দুটি হিমালয়ী নদী গঙ্গা (পদ্মা) ও ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) সম্মিলিত স্রোতধারায় বিশ্বের যে কোনো নদী-ব্যবস্থার তুলনায় সবচেয়ে বেশি অবক্ষেপ বঙ্গোপসাগরে এনে ফেলেছে। এই দুই নদী অপর অহিমালয়ী নদী মেঘনার সহযোগে যে ব-দ্বীপটির সৃষ্টি করেছে, সেটি গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা ব-দ্বীপ বা বঙ্গীয় ব-দ্বীপ নামে পরিচিত। আর এই বঙ্গীয় ব-দ্বীপটিই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ। তাই বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলা হয়। বাংলাদেশে অবস্থিত ব-দ্বীপের আয়তন প্রায় ৮০,০০০ বর্গকিমি। অন্যদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম ভিয়েতনামের মেকং নদীর মেকং ব-দ্বীপের আয়তন প্রায় ৩৯,০০০ বর্গকিমি এবং নাইজেরিয়ার নাইজার ব-দ্বীপের আয়তন প্রায় ৩৬,০০০ বর্গকিমি। নিচে সংশ্লিষ্ট ভৌগোলিক তথ্য উল্লেখপূর্বক বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলার কারণ আলোচনা করা হলো:
১. বঙ্গীয় ব-দ্বীপের অবস্থান: বঙ্গীয় ব-দ্বীপ বঙ্গীয় অববাহিকার এক বিরাট অঞ্চল জুড়ে রয়েছে, যা সমগ্র বাংলাদেশের প্রায় ৩৫%। পশ্চিমে ভারতীয় শিল্ড, উত্তরে বরেন্দ্র ভূমির দক্ষিণ প্রান্ত ও পূর্বে তিপারাপৃষ্ঠের সীমানা। ব-দ্বীপটির মূল বিকাশের মাত্রা দক্ষিণ দিকে বঙ্গোপসাগরে অব্যাহত আছে। ব-দ্বীপের এ ধরনের আয়তন ও অবস্থানের দরুন বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ বলা হয়।
২. উপকূল গঠন: জেমস রেনেলের মানচিত্রানুযায়ী, ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ ছিল পূর্বমুখী, যা ময়মনসিংহের কাছে আদি ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ গঠন করেছিল। বর্তমানে এর গতিপথ সোজা দক্ষিণমুখী। পূর্বে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র নদী আলাদা আলাদাভাবে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতো, বর্তমান গঠনে এরা পরিশেষে সম্মিলিতভাবে সাগর সঙ্গমে মিলিত হচ্ছে। নদীসমূহের এ ব-দ্বীপ গঠন কার্যক্রম বাংলাদেশের উপকূল রেখার প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ গঠনে অবদান রেখেছে। অন্য কোথাও ব-দ্বীপের সমন্বয়ে এত বিশাল উপকূল রেখা গঠিত হয়নি। সুতরাং এটাও বাংলাদেশকে পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ হিসেবে চিহ্নিত হবার কারণ।
৩. পশ্চিমাঞ্চলীয় নিষ্ক্রিয় ব-দ্বীপ: বাংলাদেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় নিষ্ক্রিয় ব-দ্বীপ (২১°১৫′ ও ২৪°৪০′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ৮৮°০′ ও ৯০০০' পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) প্রায় ৩১,৫০০ বর্গকিমি এলাকাজুড়ে বিরাজমান। সাধারণভাবে ভারতের মুর্শিদাবাদ (শুধু ভাগীরথীর পূর্ব দিকের অংশ), নদীয়া ও চব্বিশপরগনা এবং বাংলাদেশের মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট জেলা এর অন্তর্গত। পশ্চিমাঞ্চলীয় নিষ্ক্রিয় ব-দ্বীপকে সাধারণভাবে তিনভাগে ভাগ করা যায়। যথা-
ক. মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ: দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে গঙ্গা নদীর দক্ষিণে মৃতপ্রায় ব-দ্বীপের অবস্থান, যেখানে উপনদীসমূহ অত্যধিক পলিভরাটের শিকার এবং নদ-নদীর গতিপথ আবদ্ধ হয়ে অসংখ্য অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। যশোর, কুষ্টিয়া এবং ফরিদপুর মৃতপ্রায় ব-দ্বীপাঞ্চলে অবস্থিত।
খ. অপরিণত ব-দ্বীপ: মৃতপ্রায় ব-দ্বীপের দক্ষিণে অপরিণত ব-দ্বীপ অবস্থিত। এই এলাকা প্রধানত সমুদ্রতট এবং জোয়ার ভাটা প্রভাবিত ভূমি নিয়ে গঠিত। অপরিণত ব-দ্বীপজুড়ে রয়েছে সুন্দরবন। এই ব-দ্বীপের ভূ-অবনমনের মাত্রা অধিক।
গ. পরিণত ব-দ্বীপ: দক্ষিণবঙ্গের কেন্দ্রভাগ জুড়ে অবস্থিত পরিণত ব-দ্বীপ। পটুয়াখালী, বরগুনা প্রভৃতি এলাকা পরিণত ব-দ্বীপের অন্তর্গত, যেখানে এলাকাসমূহ ভূ-প্রকৃতিগতভাবে এবং জোয়ার-ভাটার প্রভাবের দিক থেকে পার্থক্য প্রদর্শন করে থাকে।
৪. পূর্বাঞ্চলীয় সক্রিয় ব-দ্বীপ: পূর্বে মেঘনা নদীর মোহনা থেকে পশ্চিমে গড়াই-মধুমতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ব-দ্বীপ সমভূমির পূর্বাংশকে সক্রিয় ব-দ্বীপ বলে। পূর্বাঞ্চলীয় সক্রিয় ব-দ্বীপ ২৩°৫০′ উত্তর অক্ষাংশ থেকে ২১°৫৫′ উত্তর অক্ষাংশ পর্যন্ত এবং ৮৯°১০′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ থেকে ৯০°৫০′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। এর আওতাধীন এলাকার পরিমাণ প্রায় ১৫,০০০ বর্গকিমি। এ পূর্বাংশীয় অঞ্চল প্রতি বছর বর্ষাকালে প্লাবিত হয়। রাজবাড়ী, ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, লক্ষ্মীপুর, গোপালগঞ্জ, পিরোজপুর, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলা জেলা এ ব-দ্বীপের অন্তর্গত। ব-দ্বীপের এই অংশ উত্তর-দক্ষিণ মুখে প্রায় ৩০০ কিমি লম্বা এবং ব-দ্বীপটির ঊর্ধ্ব ও মধ্যমুখ যথাক্রমে প্রায় ১০০ কিমি ও ১৩০ কিমি চওড়া।
৫. ব-দ্বীপের ভূ-প্রাকৃতিক বিভাগ ও বৈশিষ্ট্য: গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র ব-দ্বীপ বাংলাদেশের অন্যতম ভূ প্রাকৃতিক বিভাগ। এলাকাটি প্রধানত একটি সমভূমি, যার উচ্চতার মাত্রা উত্তরে ১৫ মিটার থেকে দক্ষিণে প্রায় এক মিটার। ব-দ্বীপটির পৃষ্ঠদেশের নতিমাত্রা প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ০.০১৬ মিটার। ব-দ্বীপের গড় উচ্চতা খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুরের দক্ষিণাঞ্চল ও নোয়াখালী জেলার পূর্বাঞ্চলে ২ মিটারেরও কম। ব-দ্বীপটির দক্ষিণাঞ্চলে এ উচ্চতা আরো কম, মাত্র কয়েক সেন্টিমিটার।
৬. জনবসতি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিন্যাসে ব-দ্বীপের প্রভাব: বাংলাদেশে ব-দ্বীপীয় মাটির উচ্চ ঊর্বরতার কারণে কৃষি কার্যক্রমের প্রাধান্য অঞ্চলটিকে ঘন বসতিপূর্ণ করে তুলেছে। অধিকাংশ লোকের জীবিকা জমি চাষ, মাছ ধরা, নৌ-পরিবহন, সাধারণ সম্পদের সদ্ব্যবহার (যেমন-সুন্দরবনের গরান বনভূমি) ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের নিরিখে ব-দ্বীপের পরিবেশগত অবস্থার ওপর নির্ভর করে। এই সুবৃহৎ ও সদা বিবর্তিত ব-দ্বীপে অব্যাহত ভূমি পরিবৃদ্ধি ও ভূমিক্ষয় বাংলাদেশের জনবসতির ধরন ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিন্যাসকে প্রভাবিত করছে।
উপসংহার: বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। গঙ্গা (পদ্মা), ব্রহ্মপুত্র (যমুনা) ও মেঘনা নদী পশ্চিম, উত্তর ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একযোগে বিশ্বের বৃহত্তম ব-দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। তবে, জলবায়ুগত পরিবর্তনের কারণে এ ব-দ্বীপের আধা মিটার সমুদ্রগর্ভে তলিয়ে যেতে পারে বলে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন এবং এ কারণে লাখ লাখ লোক ক্ষতির সম্মুখীন হবে। তাই বিশ্বের বৃহত্তম এ ব-দ্বীপের পলি সঞ্চয়ন, ভূমি পুনরুদ্ধার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নৌচলাচল এবং ব-দ্বীপ এলাকায় প্রাপ্য প্রাকৃতিক সম্পদ সম্পর্কিত বিষয়াদি ও সমস্যাবলির ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক গবেষণা চালু, প্রসার ও সংগঠিতকরণের জন্য আমাদের সকলেরই সচেষ্ট হওয়া উচিত।

