- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
৩৩তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১২
- বিসিএস ২০১২
- বাংলাদেশ
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতি কতটি এবং কি কি? প্রধান তিনটি উপজাতি সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করুন।
উত্তর: বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জাতিসত্তা উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী। ৪৫টি উপজাতি জনগোষ্ঠী রয়েছে এই ভূখণ্ডে। পঞ্চম আদমশুমারি রিপোর্ট ২০১১-এর তথ্য মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার ১.১০% উপজাতি এবং দেশে মোট উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৮৬ হাজার। তাদের মূলত বসবাস রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, কক্সবাজার, বৃহত্তর ময়মনসিংহ, সিলেট, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী, পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায়। বাংলাদেশের প্রতিটি উপজাতি জনগোষ্ঠীর রয়েছে পৃথক ভাষা, সমাজ ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ও পোশাক-পরিচ্ছদ।
উপজাতির সংজ্ঞা ও ধারণা: উপজাতি বলতে এমন একটি জনসমষ্টি বা সামাজিক গোষ্ঠীভুক্ত দলকে বুঝায়, যাদের রয়েছে একটি নিজস্ব বিশেষ ভাষা এবং সংস্কৃতি, আর অন্যান্য জাতি থেকে একটু ভিন্নতর, যারা বাস করে একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে, যাদের মধ্যে আছে একটি বিশেষ ঐক্যবোধ, যা দ্বারা তাদেরকে একে অন্যের সাথে সম্পৃক্ত করে রাখে।
নৃবিজ্ঞানী কোহেন ও ইয়ামস বলেন, 'উপজাতি বলতে এমন এক জনগোষ্ঠীকে বুঝায়, যারা তাদের জীবিকার জন্য খাদ্য সংগ্রহ, উদ্যান, কৃষি ও পশুপালনের ওপর নির্ভরশীল' (A group of depending on foragine, hariticulture or pastorolism for subsistence)।
টেলর বলেন, 'উপজাতি বলতে বুঝায় এমন একটি জনগোষ্ঠী, যারা মোটামুটিভাবে একটি অঞ্চলে সংগঠিত এবং তাদের মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক ঐক্য এবং যার সদস্যরা মনে করে যে, তারা একই সাংস্কৃতিক এককের অন্তর্ভুক্ত।' উপরিউক্ত সংজ্ঞাগুলোর আলোকে বলা যায়, উপজাতীয় সম্প্রদায় আধুনিক জীবিকা পেশাসহ একধরনের নির্দিষ্ট জীবিকা পদ্ধতি অনুসরণ করে, তাদের নির্দিষ্ট সংস্কৃতি রয়েছে এবং তারা এমন একটি এলাকায় বাস করে যা প্রায়শ নির্দিষ্ট কাঠামোতে আবর্তিত। তাদের জীবনধারা পরিচালিত হয় একইরূপ সামাজিক আচার, প্রথা, বিশ্বাস, বিচারব্যবস্থা, অনুসরণীয় রীতি-নীতি এবং মূল্যবোধ দ্বারা। প্রতিটি উপজাতীয় সদস্য নিজেদের মধ্যে পরস্পর এমনভাবে বিশ্বাস পোষণ করে যে, তাদের মাঝে সংহতিভাব গড়ে ওঠে পারস্পরিক রক্ত সম্পর্কের বিশ্বাসের ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের প্রধান প্রধান উপজাতি: বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের তথ্য মতে, বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ৪৫টি। এগুলো হলো: ০১. খিয়াং ০২. খুমি ০৩. চাক ০৪, চাকমা ০৫. তঞ্চঙ্গ্যা ০৬. ত্রিপুরা/টিপরা ০৭. পাংখোয়া ০৮. বম ০৯. মারমা ১০. ম্রো ১১. রাখাইন ১২. লুসাই ১৩. ওরাওঁ ১৪. নুনিয়া ১৫. পলিয়া ১৬. পাহান ১৭. ভূঁইমালী ১৮. মাহাতো ১৯. মাহালী ২০ মুণ্ডা ২১. মুশহর ২২. রবিদাস ২৩. রাঁজোয়াড় ২৪. রাজবংশী ২৫. রানা কর্মকার ২৬. লহরা ২৭. সাঁওতাল ২৮. কন্দ ২৯. কুর্মি ৩০. কোচ ৩১. খাড়িয়া ৩২. খাসী/খাসিয়া ৩৩. গারো ৩৪, ডালু ৩৫. নায়েক ৩৬. পাঙন ৩৭. পাত্র ৩৮. বর্মণ ৩৯. বীন ৪০. বোনাজ ৪১. ভূমিজ ৪২. মণিপুরী ৪৩, শবর ৪৪. হাজং ৪৫. হালাম। এদের মধ্যে প্রধান প্রধান উপজাতি হলো চাকমা, সাঁওতাল, গারো, মারমা, মণিপুরী, তঞ্চঙ্গ্যা, রাখাইন, বম, ত্রিপুরা, খাসিয়া, পাঙন, হাজং প্রভৃতি।
প্রধান তিনটি উপজাতি: বাংলাদেশে বসবাসকারী ৪৫টি উপজাতির মধ্যে বৃহত্তম উপজাতি চাকমা, দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজাতি সাঁওতাল এবং অন্যতম বৃহত্তম উপজাতি গারো। নিচে বাংলাদেশের প্রধান এ তিনটি উপজাতি সম্পর্কে বর্ণনা করা হলো:
ক. চাকমা: বাংলাদেশে বসবাসকারী উপজাতিদের মধ্যে চাকমা উপজাতি শিক্ষাদীক্ষা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষিতে খুবই উন্নত উপজাতি। চাকমারা পার্বত্য জেলাসমূহের বৃহত্তম উপজাতি। রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কক্সবাজার-এ চার জেলাতেই চাকমাদের বসবাস। বর্তমানে দেশে আড়াই লক্ষের বেশি চাকমা জনগোষ্ঠী রয়েছে। নিচে চাকমা উপজাতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. দেহাকৃতি: নৃতত্ত্বের বিচারে চাকমারা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর অন্তর্গত তিব্বতী বার্মন বলে পরিচিত। তাদের মুখমণ্ডল গোলাকার, গোলাপী ওষ্ঠাধর, চোখের মণি কালো, দেহের রং হলদে, চুল সোজা, দাঁড়ি-গোঁফ কম। মেয়েদের গায়ে লোমের মাত্রা খুবই কম।
২. পরিবার ও সমাজ: চাকমাদের পারিবারিক কাঠামো মূলত পিতৃতান্ত্রিক। পরিবারে পিতার মতই চূড়ান্ত। আর চাকমাদের জাতীয় প্রধান হলেন রাজা। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে একটি মৌজা, আর মৌজার প্রধান হচ্ছেন হেডম্যান। তিনি জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত এবং রাজা কর্তৃক মনোনীত হন। হেডম্যানই চাকমাদের সমস্যা, ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দেন।
৩. ধর্ম ও উৎসব: চাকমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। তবে তাদের কিছু সংখ্যক এখনো প্রকৃতি পূজায় বিশ্বাসী। তারা থানমানা, কর্মকাম, ভাতদ্যা, গাং পূজা, জম মারা প্রভৃতি অনুষ্ঠান করে থাকে। চাকমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব হচ্ছে বিঝু উৎসব। তারা তিনদিন ধরে এই উৎসব পালন করে। প্রথম দিনের উৎসবকে বলে ফুল বিঝু, দ্বিতীয় দিনকে বলে মূল বিঝু আর তৃতীয় ও শেষ দিনের উৎসব গোজ্যাই পোজ্য। রথটানা উৎসবও চাকমা সমাজে প্রচলিত আছে। তারা এই উৎসবকে গাড়ি টানা বলে। এছাড়া বৈশাখী পূর্ণিমা ও মাঘি পূর্ণিমা পালন করে।
৪. বর্ণমালা: নৃতাত্ত্বিকভাবে তারা মঙ্গোলীয় লোক হলেও চাকমাদের নিজস্ব বর্ণমালা আছে। এ বর্ণমালার সাথে বর্মী ও অহম বর্ণমালার মিল রয়েছে।
৫. খাদ্যদ্রব্য: চাকমাদের প্রধান খাদ্য- ভাত, মাছ, মাংস ও শাকসবজি। এছাড়া অন্যান্য খাদ্যের মধ্যে আছে শূকর, কাঁকরা, ব্যাঙ, শামুক, মুরগি, বাঁশকোড়ল, ফুসি, সাবাং ইত্যাদি।
৬. পোশাক: পুরুষ চাকমারা খাটলুঙ্গি, ধূতি, পাঞ্জাবী, সাচ ও গামছা পরে। মাথায় খবং বাঁধে। মেয়েরা লুঙ্গি ও ব্লাউজ পরে। মেয়েদের নিচের অংশের পরনের কাপড়ের নাম পিনন আর উপরের অংশের নাম খাদি। তারা রূপার তৈরি বিভিন্ন ধরনের গহনা পরে। চাকমা মেয়েরা। তাঁতে কাপড় বুনে নিজেরা পরে এবং বিক্রিও করে।
৭. বাড়িঘর: চাকমারা বাঁশ দিয়ে মাচা করে ঘর তৈরি করে। আর গ্রামকে বলে আদম।
৮. বিবাহরীতি: চাকমাদের বিয়ের রীতি-নীতি বেশ চমৎকার। প্রাচীনকালের রীতি-নীতি বর্তমানে আর সেভাবে পালিত না হলেও তারা ঐতিহ্য রক্ষা করতে চেষ্টা করে। চাকমা বিয়ের নিয়মানুসারে পাত্রের বাবাকে পাত্রীর বাবার কাছে বিয়ের পূর্বে অন্তত তিনবার যেতে হয়। প্রতিবারে পাত্রীর বাবাকে সৌজন্যমূলক সুখাদ্য ও বস্ত্রাদি উপহার স্বরূপ নিতে হয়।
খ. সাঁওতাল: বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজাতি সাঁওতাল। তাদের বাসস্থান মূলত রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, নওগাঁ, নাটোর, জয়পুরহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। তাদের আদি নিবাস ছিল রাঢ়বঙ্গ, সংলগ্ন বিহার ও উড়িষ্যার অরণ্য অঞ্চল এবং ছোট নাগপুর। পরে সরকার নির্ধারিত সাঁওতাল পরগনায় তারা বসবাস শুরু করে। পাবনা, যশোর, খুলনা এমনকি চট্টগ্রাম জেলায়ও অল্পসংখ্যক সাঁওতালদের বসতি ছিল। নিচে সাঁওতাল উপজাতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. দেহাকৃতি: সাঁওতালরা অস্ট্রিক ভাষাভাষী আদি-অস্ট্রেলীয় জনগোষ্ঠীর বংশধর। তাদের গায়ের রং কালো, উচ্চতা মাঝারি, চুল কালো ও কোঁকড়ানো, ঠোঁট পুরু, দীর্ঘমুখ ও নাক প্রশস্ত।
২. ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি: সাঁওতালদের নিজস্ব ভাষা আছে, তবে বর্ণমালা নেই। সাঁওতালরা হিন্দ-নাগরী ভাষায় কথা বলে। সাঁওতালের রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, যা নানা কাহিনী, রূপকথা, উপকথা, লোকগীতি, নৃত্যগীতি ও সঙ্গীত সমৃদ্ধ।
৩. বাড়িঘর: সাঁওতালরা ছন বা খড় দিয়ে বাড়িঘর তৈরি করে। তাদের থাকার ঘরগুলো ছোট ছোট, একটি জানালা ও একটি দরজা থাকে। আবার কোনো কোনো ঘরে শুধু একটি দরজা থাকে। দরজাটি সুন্দর করে আল্পনা দিয়ে আঁকা থাকে। তারা ঘর ও মেঝে লেপেমুছে সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখে।
৪. পরিবার: সাঁওতাল সমাজে পরিবারের প্রধান পিতা। পরিবারের পুরুষদের প্রভাবই বেশি। পিতার মৃত্যুর পর পুত্ররা সম্পত্তির মালিক হয়।
৫. পোশাক-পরিচ্ছদ: সাঁওতাল পুরুষেরা আগে নেংটি পরতো। তবে ধনী পরিবারের পুরুষরা ধূতি, লুঙ্গি ও সার্ট পরে। মেয়েরা পরে মোটা শাড়ি। ধনী ঘরের মেয়েরা শাড়ি, ব্লাউজ ও সায়া পরে। মেয়েরা রূপার অলঙ্কার, যেমন- কানের দুল, নথ, হাঁসুলি, মালা ও তাবিজ পরে। সাঁওতাল যুবতীরা খোঁপায় জবা ও শিমুল ফুল পরতে খুবই ভালোবাসে।
৬. বিবাহ: সাঁওতাল সমাজে একই গোত্রে বিয়ে করা যায় না। তাদের বিয়ের চার ধরনের রীতি প্রচলিত। বিয়ের অনুষ্ঠানে তারা নাচ, গান, পানাহার এবং খুবই আনন্দ-ফূর্তি করে থাকে।
৭. ধর্ম ও উৎসব: সাঁওতালরা জড়বস্তুর পূজা করে। তাদের প্রধান দেবতা হলো সূর্য। তারা সূর্যকে বলে 'সিংবোঙ্গা'। তাদের গ্রাম দেবতা 'মারাংরুরু'। তাদের সকল কাজকর্মের দেবতা 'বোঙ্গা'। সাঁওতালরা সারা বছর নানা পূজা-পার্বণ করে। 'মোহরাই' পূজা তাদের শ্রেষ্ঠ উৎসব। এই উৎসবের সময় সাঁওতালরা আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে উঠে। মোহরাই উৎসব চলে তিনদিন পর্যন্ত।
৮. জীবনধারণ পদ্ধতি: সাঁওতালদের জীবিকা কৃষিকাজ। তারা ধানসহ নানা রকমের ফসল ফলায়। তারা চা বাগানে, মাটি কাটা ও কুলি কাজও করে থাকে।
৯. খাদ্যদ্রব্য: সাঁওতালদের খাদ্য ভাত, মাছ, গরু, মহিষ, শূকর, ভেড়া, হাঁস-মুরগির মাংস। তারা কাছিম ও পাখির ডিম এবং মণ্ডা, বাতাসা, খাজা, গজাও খেয়ে থাকে। তারা ভাত পচানো মদ অর্থাৎ হাড়িয়া নিজেরা তৈরি করে খায়।
গ. গারো: বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম উপজাতি গারো। গারোদের আদি সমাজ মান্দাই। গারোরা তিব্বতের বার্মান জাতি। তাদের আদি ভূমি ছিল চীন দেশের উত্তর-পশ্চিমে, যেখান থেকে তারা ব্রহ্মপুত্র নদী হয়ে এসে গারো পাহাড়ে প্রবেশ করে। বর্তমানে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় গারোদের বসবাস। নিচে গারো উপজাতি সম্পর্কে আলোচনা করা হলো:
১. ধর্ম: গারোদের দেবদেবীর মধ্যে আছে সূর্য, চন্দ্র, তারা, বৃষ্টি ইত্যাদি। এছাড়া তারা পাহাড়-পর্বত, নদ-নদীকেও দেবতা জ্ঞানে পূজা করে থাকে। আবার অনেক গারো হিন্দু আচার-পদ্ধতি ও পূজা-পার্বণ করে থাকে। বেশির ভাগ গারো খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছে। তারা পূর্বজন্ম বিশ্বাস করে। তাদের বিশ্বাস, অসৎ জীবন যাপন করলে পরজন্মে পশুপক্ষী বা জীবজন্তুরূপে জন্মগ্রহণ করতে হয়।
২. জীবনধারণ পদ্ধতি: পাহাড়ি গারোরা জুম চাষের উপর নির্ভরশীল। আর লামদানী গারোরা বাঙালিদের মতো লাঙ্গল-গরু দিয়ে চাষাবাষ করে। তারা মেয়ে-পুরুষ এক সাথে মাঠে কাজ করে। গারোরা প্রাকৃতিক পরিবেশে পাহাড়ি অঞ্চলে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমাজ গঠন করে জীবন যাপন করে।
৩. দেহাকৃতি: গারোদের চেহারা অনেকটাই আসামের নাগা ও মণিপুরীদের মতো। তাদের লোম কম, তাই গোঁফ-দাঁড়িও বিশেষ গজায় না। তাদের নাক চেপ্টা, ঠোঁট কিছুটা পুরু, গায়ের রঙ শ্যামলা ও ফর্সা।
৪. পোশাক পরিচ্ছদ: গারো পুরুষেরা ধৃতি এবং মেয়েরা সেলাই ছাড়া এক ধরনের লুঙ্গি ও ব্লাউজ পরে। গারোদের পূর্ব পুরুষেরা এমনকি ১০০ বছর আগেও নেংটি পরতো। গারোরা সুতা ও রং তৈরি, কাপড় বুনা, বাঁশ বেত ও কাজ কাঠের কাজ নিজেরাই করে থাকে।
৫. বিবাহরীতি: গারো ছেলে-মেয়েরা বয়োপ্রাপ্ত হলেই তাদের বিয়ে দেয়া হয়। এ ব্যাপারে ছেলে-মেয়েদের পিতা-মাতা বা গুরুজনরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। একই গোত্রে বিয়ে দেয়া গারোদের রীতিবিরুদ্ধ। তাদের মধ্যে বংশ পরিচয় মায়ের সূত্রে, সম্পত্তিতে ছেলেদের কোনো অধিকার নেই। বিয়ের পর ছেলে চলে যায় শ্বশুরবাড়ি। মেয়েরাই হচ্ছে সংসারের হর্তাকর্তা।
৬. সন্তান পালন: গারো মেয়েরা সন্তানকে খুবই যত্ন করে, সন্তান লালন-পালনে সব সময় ব্যস্ত থাকে। মেয়েরা ক্ষেতে রোপা বোনা, জঙ্গলে কাঠ কাটা ও রান্নাবান্নার করা সময় শিশুদের কাপড় দিয়ে পিঠে বেঁধে নেয়। কারণ, শিশু সন্তানকে গারোরা দেবদেবী মনে করে।
৭. সংস্কৃতি ও উৎসব: নৃত্য-গীতি গারো সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। যে কোনো পূজা-পার্বণ, আনন্দ-অনুষ্ঠানে নাচ-গানের আয়োজন অপরিহার্য। গারোদের ধারণা নাচ ও গানের মাধ্যমে দেবদেবীদের তুষ্ট করা যায়। গারোদের শ্রেষ্ঠ উৎসবের নাম ওয়ানগালা। বাংলা তারিখের আশ্বিন মাসে তিন থেকে সাতদিন ধরে ওই উৎসব উদযাপিত হয়। তখন গারোরা মদ পান করে। নাচ, গানে গারো জনপদগুলো আনন্দে উৎসবে উদ্বেলিত ও মুখরিত হয়ে উঠে।
উপসংহার: উপজাতি বা ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী বা ক্ষুদ্র জাতিসত্তা কিংবা আদিবাসী জনগোষ্ঠী যে নামেই ডাকা হোক না কেন বাংলাদেশের একটি বৃহৎ অংশ জুড়ে রয়েছে উপজাতিদের বসবাস। ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের বাংলাদেশে সারা দেশ জুড়েই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আকারে উপজাতিরা যুগ যুগ ধরে বংশ পরম্পরায় বসবাস করে আসছে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত এবং ভৌগোলিক অবস্থার প্রেক্ষাপটে এরা ভিন্ন ভাষাভাষী। এদের জীবনধারা, সংস্কৃতি, আচার-আচরণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও মনোভাবের দিক থেকে এরা সহজ-সরল জীবন যাপন করে। ঐতিহাসিক কাল থেকে বহু ভাষা-ভাষী জনগোষ্ঠী ভিন্ন ভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারায় উদ্ভাসিত হয়েও অভিন্ন উৎপাদন ব্যবস্থা (জুম চাষ) এবং আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা উপজাতীয় নৃগোষ্ঠীগুলোকে প্রোথিত করেছে মালার মত অভিন্ন সাংস্কৃতিক বন্ধনে। এখানকার উপজাতীয় নৃগোষ্ঠীর ভাষা, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, সর্বক্ষেত্রে ব্যাপক বৈসাদৃশ্য লক্ষণীয়। এই বৈচিত্র্য রূপই আবহমান বাংলার জাতীয় জীবনে এক অনুপম সংযোজন বলা যায়।

