- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
৩৩তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১২
- বিসিএস ২০১২
- বাংলাদেশ
আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম কেন আওয়ামী লীগ করা হয়? কত সালে আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয়?
উত্তর: ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের অবসান হলে জন্ম নেয় ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র। পূর্ববাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এ অংশের নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান। মূল পাকিস্তান পশ্চিম পাকিস্তান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। তবে শুরু থেকেই পাকিস্তানের শাসনভার পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিক গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রিভূত হওয়ায় পূর্ব বাংলার সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজ ব্যবস্থাকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের করায়ত্ত করতে শুরু করে। এর বিরুদ্ধে পূর্ব বাংলার জনগণ প্রতিবাদ ও আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলে। মাতৃভাষা বাংলাকে রক্ষা করার জন্য ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। এর মাধ্যমে পূর্ব বাংলার বাংলা ভাষাভাষী বাঙালি জনগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ হয়। মাতৃভাষা রক্ষার চেতনা থেকে পূর্ব বাংলার জনগণ ক্রমান্বয়ে পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ব্যবস্থার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রাম ও গণঅভ্যুত্থান গড়ে তোলে। পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হওয়ার পরও রাষ্ট্র পরিচালনা, প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অধিকার ভোগসহ সর্বক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃত্ব শুরু করে। বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ সর্বক্ষেত্রে বঞ্চিত হতে থাকে।
আন্দোলনের পটভূমি, পাকিস্তান সরকারের অগণতান্ত্রিক মনোভাব, পক্ষপাতমূলক সরকারি নীতি ও মুসলিম লীগের ভ্রান্ত নীতির প্রতিবাদে ১৯৪৯ সালের জুনে ঢাকায় গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ।
আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের প্রেক্ষাপট: আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাবৃন্দ প্রায় সকলেই ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের সদস্য। মুসলিম লীগ সুনির্দিষ্ট আর্থ-সামাজিক কর্মসূচিভিত্তিক সল ছিল না। বরং দলটি ছিল পাকিস্তান আন্দোলনের রাজনৈতিক বাহন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর রাষ্ট্র পরিচালনার ভার মুসলিম লীগের ওপর ন্যস্ত হয়। একটি নতুন রাষ্ট্রকে গড়ে তোলার উপযোগী কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পরিবর্তে অল্পকালের মধ্যেই মুসলিম লীগ নেতৃবৃন্দ ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্ব মুসলিম লীগকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সমর্থ হয়। কিন্তু তার মৃত্যুর পর পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশের কিছুসংখ্যক প্রভাবশালী নেতা মুসলিম লীগ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এ অবস্থার প্রেক্ষিতে মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণা থেকে বের হয়ে অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজগার্ডেনে প্রায় ৩০০ জন প্রতিনিধির উপস্থিতিতে এক সম্মেলনের মাধ্যমে 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ' গঠন করে। সম্মেলনে ৪০ সদস্যবিশিষ্ট আওয়ামী মুসলিম লীগের সাংগঠনিক কমিটিও গঠিত হয়। এ কমিটির সভাপতি ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক টাঙ্গাইলের শামসুল হক এবং যুগ্ম সম্পাদক হন শেখ মুজিবুর রহমান। পশ্চিম পাকিস্তানেও এ দলের শাখা গঠিত হয় এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের আহ্বায়ক নিযুক্ত হন। তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ দলের নেতৃত্ব দান করেন। যদিও পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে আওয়ামী মুসলিম লীগের শাখা ছিল, দলটি সেখানে কোনো দিনই জনপ্রিয় সংগঠনরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। আওয়ামী মুসলিম লীগ ছিল মূলত পূর্ব-বাংলাভিত্তিক রাজনৈতিক দল।
আওয়ামী মুসলিম লীগের ঘোষণাপত্র ও ৪২ দফা কর্মসূচি শুরুতেই দলটি বাঙালিদের স্বার্থে একটি বিস্তৃত কর্মসূচি গ্রহণ করে। এ সব দাবি উত্থাপনের কারণে দলটি দ্রুত পূর্ব বাংলার জনগণের কাছে প্রিয় হয়ে উঠতে শুরু করে। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম ঘোষণাপত্রে যে ৪২ দফা কর্মসূচি প্রকাশ করা হয়, তার মধ্যে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব-বাংলাকে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দানের দাবি ছিল প্রধান। কেবল প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র বিষয় ও মুদ্রা কেন্দ্রের হাতে রেখে অন্য সকল বিষয় প্রাদেশিক সরকারের হাতে অর্পণ করার দাবি জানানো হয়। অন্য দাবিগুলোর মধ্যে ছিল বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দান, বিনা খেসারতে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ, উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বণ্টন, পাট ও চা শিল্প ও ব্যবসা জাতীয়করণ, যৌথ ও সমবায় পদ্ধতির কৃষি-ব্যবস্থা প্রবর্তন, শ্রমিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকারের নিশ্চয়তা দান, অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষাব্যবস্থার প্রবর্তন ইত্যাদি।
মওলানা ভাসানী, শেখ মুজিব ও শামসুল হকের ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রম: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর অপরিসীম ত্যাগ ও কঠোর পরিশ্রমই আওয়ামী লীগকে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির ক্ষেত্রে শীর্ষস্থান দখলে সক্ষম করে। মুসলিম লীগ সরকারের আমলে এ. কে. ফজলুল হক এডভোকেট জেনারেলের সরকারি পদ গ্রহণ করেন। আতাউর রহমান খান ওকালতি পেশায় অধিক মনোযোগী হন। ফলে সরকারি নিপীড়ন, নির্যাতন, জেল-জুলুম ও আর্থিক কষ্ট সহ্য করতে হয় মওলানা ভাসানী, তার যোগ্য পার্শ্বচর আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক ও যুগ্ম সম্পাদক শেখ মুজিবর রহমানকে। শেখ মুজিবকে ১৯৪৯ সালে কারাগারে প্রেরণ করা হয়। তিনি ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘকাল যাবৎ বন্দি জীবন কাটান। ১৯৫২ সালে ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলে আটকাবস্থায় শামসুল হক মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেললে ১৯৫৩ সালে মাওলানা ভাসানীর অনুরোধেই শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক করা হয়। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের মূল উদ্যোগ ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগের।
আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম আওয়ামী লীগ করার কারণ: প্রতিষ্ঠা লাভের পর থেকেই দলটি পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিকসহ সকল স্বার্থ রক্ষায় এক দিকে আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখে, অন্যদিকে সংসদ ও প্রাদেশিক সরকারের সদস্যগণ সর্বত্র সোচ্চার হতে থাকেন। অবশ্য মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আওয়ামী মুসলিম লীগের দুই নেতা মওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মধ্যে মতবিরোধ শুরু হয়। পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং পাকিস্তানের জোট নিরপেক্ষ স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রশ্নে মওলানা ভাসানী ছিলেন আপোশহীন। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদী নীতির ঘোর বিরোধী। অন্যদিকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নীতি ছিল কিছু নমনীয়, অনেকটা ডানপন্থী। তাই আওয়ামী লীগের মধ্যে মওলানা ভাসানীর বামঘেঁষা নীতি এবং সোহরাওয়ার্দীর ডানপন্থার মধ্যে দেখা দেয় সংঘাত। এ প্রেক্ষাপটে ১৯৫৫ সালের ২১-২৩ অক্টোবর ঢাকার সদরঘাটে অবস্থিত 'রূপমহল' সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের তিন দিনব্যাপী দ্বিবার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনের সুদূরপ্রসারী গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো সংগঠনের দ্বার জাতিধর্ম নির্বিশেষে সকলের জন্য উন্মুক্ত করা। পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রধান হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী অসাম্প্রদায়িকীকরণের ঘোর বিরোধী ছিলেন। পক্ষান্তরে সংগঠনের সাম্প্রদায়িক চরিত্র পরিবর্তনের প্রবক্তা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ২২ অক্টোবর ১৯৫৫ রাত প্রায় ৪টার দিকে হোসেন সোহরাওয়ার্দী তার আপত্তি প্রত্যাহার করলে সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্ম নিরপেক্ষ করার সিদ্ধান্ত স্থির হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃত্ব সুদূরপ্রসারী যেসব কারণে আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে 'আওয়ামী লীগ' নামকরণ করেন তা নিচে আলোচনা করা হলো:
১. পূর্ব পাকিস্তানে পালিত ধর্ম: পূর্ব পাকিস্তান তথা পাক-ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস অনেক প্রাচীন। দীর্ঘদিনের ইতিহাসের ধারায় এখানে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী যেমন শাসন করেছে, তেমনি বিকাশ লাভ করেছে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি আর বিশ্বাস। এ দেশের ৯০% লোক ছিল মুসলমান। দ্বিতীয় বৃহত্তম জনগোষ্ঠী হিসেবে ছিল হিন্দু। অন্যদিকে ব্রিটিশ শাসনামল এবং পরবর্তীতে এনজিও কার্যক্রমের নামে খ্রিস্টান মিশনারিদের ব্যাপক তৎপরতায় এ দেশে খ্রিস্টানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ ও পটুয়াখালীসহ বিভিন্ন স্থানে যে সকল উপজাতি রয়েছে তাদের অধিকাংশই বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান। তবে তাদের অনেকেরই আবার নিজস্ব ধর্ম ছিল। তাই জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে এক রাজনৈতিক ধারায় পরিচালিত হওয়ার জন্য আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম আওয়ামী লীগ করা হয়।
২. পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্ম ঐতিহাসিক পথপরিক্রমায় পূর্ব পাকিস্তানে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী মানুষ পাশাপাশি অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক গীতিময় ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের বাস হলেও স্বীয় অস্তিত্ব আর মান-সম্মান নিয়ে হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধসহ অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষও এখানে স্ব স্ব ধর্ম পালন করছে। সামাজিক সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ধর্মীয় বাতাবরণকে পাশ কাটিয়ে জাতীয় চেতনায় এবং শান্তির প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রত্যেকেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে জীবনযাপন করছে। এ সৌহার্দ্যে কখনো ফাটল দেখা দিলেই ঐতিহ্যগত সহমর্মিতা আর শান্তির স্বর্গীয় শিক্ষা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সব সময়ই বাড়াবাড়ির পথে থেকে ফিরিয়ে রেখেছে। ধর্মীয় আচার-আনুষ্ঠানিকতা এবং নিয়মতান্ত্রিক উপাসনার ধর্মীয় রীতি এ দেশের প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষের মাঝে থাকলেও ধর্মান্ধতার বিষাক্ত ছোবল কখনও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাঝে বাধার সৃষ্টি করতে পারেনি। ফলে ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে সকল বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ জাতীয়তাবাদের ধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ লাভের জন্যই বাঙালি রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে আওয়ামী লীগ নামকরণ করেন।
৩. আন্দোলন-সংগ্রামে ধর্মনিরপেক্ষতা: ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করলেও দেখা যায়, এ দেশের বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলেছে। ইংরেজবিরোধী আন্দোলন থেকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আন্দোলনে এ দেশের মানুষ ধর্মীয় বাদ-বিচারের ঊর্ধ্বে ওঠে জাতীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে লড়েছে। পাকিস্তানি শাসকরা যখন ধর্মের দোহাই দিয়ে বাঙালি জাতিকে শোষণ করছিল, তখন এ দেশের মানুষ সে শুভংকরের ফাঁকি ঠিকই বুঝতে পেরেছে। এ দেশের মানুষ জেনেছে ধর্মের দোহাই দিয়ে শোষণ করা কোনো শাসকের কাজ নয়।
৪. '৫২ এর ভাষা আন্দোলন: ইসলামী ঐক্যের নামে পাকিস্তানি শাসকবৃন্দ নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঙালিদের ওপর চাপিয়ে দেবার উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর ফলে পূর্ব-বাংলার শিক্ষিত সম্প্রদায় মনস্তাত্ত্বিকভাবে পাকিস্তান হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নটি সুপ্ত বাঙালি স্বাতন্ত্র্যবোধকে পুনর্জাগরিত করে এবং মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলে। ভাষা আন্দোলন পূর্ব-বাংলায় বিরোধী দল তথা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ প্রশস্ত করে। এর প্রভাবে ১৯৫১-৫৩ সালের মধ্যে গণতন্ত্রী দল, ছাত্র ইউনিয়ন প্রভৃতি অসাম্প্রদায়িক ছাত্র ও রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে ওঠে এবং পূর্ব-বাংলার 'মুসলিম ছাত্র লীগ' তার নাম থেকে 'মুসলিম' কথাটি বর্জন করে। ১৯৫২ সালের পূর্বে বিরোধী দল 'আওয়ামী মুসলিম লীগ'-এর সমর্থনভিত্তি ছিল খুবই সংকীর্ণ। কিন্তু ভাষা-আন্দোলনের ফলে সে দল দ্রুত শক্তি ও জনপ্রিয়তা অর্জন করতে থাকে। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি ছিল একটি প্রধান ইস্যু এবং সরকারের ভাষানীতিই ছিল বিরোধী যুক্তফ্রন্টের নিকট শাসক দল মুসলিম লীগের পরাজয়ের অন্যতম কারণ। এ বিষয়টিও আওয়ামী মুসলিম লীগের নাম আওয়ামী লীগ করার একটি অন্যতম কারণ।
৫. ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের ফলাফল: পাকিস্তানের শাসকদল মুসলিম লীগ যুক্তফ্রন্টের স্বায়ত্তশাসন দাবিকে বিচ্ছিন্নতাবাদ বলে আখ্যায়িত করে এবং ইসলাম ও ইসলামী রাষ্ট্রকে প্রধান নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করে। তাদের নির্বাচনী প্রচারের মূল সুর ছিল নিম্নরূপ: "একমাত্র মুসলিম লীগ মুসলমান ও পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারে। মুসলিম লীগ ধ্বংস হলে পাকিস্তান এবং মুসলমানও ধ্বংস হয়ে যাবে। পাকিস্তান একটি ইসলামী রাষ্ট্র হবে কিনা তা এ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। কারণ একদিকে রয়েছে মুসলিম লীগ এবং অপরদিকে রয়েছে এমন সব দল যারা ইসলামী রাষ্ট্র চায় না। এ নির্বাচন একটি গণভোট, যার দ্বারা নির্ধারিত হবে পূর্ব-বাংলা পাকিস্তানের অংশ থাকবে, না ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে।" বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য আসন সংরক্ষণসহ পৃথক নির্বাচনের ভিত্তিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায় মোট ২২৮টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২০৬টি, মুসলিম লীগ ৯টি, খেলাফতে রব্বানী পার্টি ১টি এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১২টি আসন লাভ করেন। মুসলিম মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসনই পায় যুক্তফ্রন্ট। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে আরও প্রতীয়মান হয় যে, পূর্ব-বাংলার জনগণ তাদের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন এবং শুধু ধর্মের নামে তাদেরকে প্রতারণা করা যাবে না।
৬. সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি: ঐতিহাসিক কাল থেকেই এখানে হিন্দু-মুসলমান পাশাপাশি বসবাস করে আসছে। বাংলার আনাচে-কানাচে পাশাপাশি বাড়ি, পাশাপাশি ঘরে হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান বসবাস করছে, প্রতিনিয়ত পারস্পরিক লেনদেন হচ্ছে। সমমর্যাদা আর অধিকার নিয়ে এখানে সকল ধর্মের মানুষ তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবন পরিচালনা করছে। ব্রাহ্মণ্যবাদের মিথ্যা আভিজাত্য একসময় বাঙালি সমাজে জাতিভেদ আর বর্ণভেদের দুষ্ট ক্ষত সৃষ্টি করলেও কালক্রমে তা বিলুপ্ত হয়। বিশেষ মুসলিম ভ্রাতৃত্ব ও মানসিক শিক্ষার প্রচ্ছন্ন ছায়া এবং বাঙালির ঐতিহ্যগত সৌহার্দ্য এ ক্ষতকে বিস্তৃত হতে দেয়নি। এখানে প্রতিটি ধর্মের মানুষ তাদের স্ব স্ব ধর্ম স্বাধীনভাবে পালন করে এবং একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির প্রতি যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল। এমনকি একে অপরকে নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ জানানোর যে ঐতিহ্যিক রীতি তা সত্যিই প্রশংসনীয়। পরধর্মের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এবং উপভোগ করার অনুপম রীতি এখানে বিদ্যমান। তা ছাড়া পহেলা বৈশাখ, পৌষসংক্রান্তি ও পিঠা পুলির উৎসবসহ এমন কিছু উৎসব আছে যেখানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে প্রতিটি বাঙালি এক অভিন্ন অস্তিত্বের সন্ধান খোঁজে। পরধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং প্রত্যেককে তাদের ধর্ম-কর্ম পালনের সুযোগদানের ব্যাপারে এ দেশের প্রতিটি মানুষ সজাগ। প্রতিটি মসজিদে আজানের পবিত্র ধ্বনির আবহ যেমন মানব মনকে আলোড়িত করে, তেমনি মন্দির, চার্চ কিংবা প্যাগোডায় বিনীত প্রার্থনার আকুলতাও তেমনি পবিত্র আবহ ছড়ায়।
আওয়ামী লীগ নামকরণ করা হয় যে সালে ১৯৫৫ সালের ২৩ অক্টোবর অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে দলের নাম 'পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ' নামকরণ করা হয়। ফলে ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে সকল বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ জাতীয়তাবাদের ধারায় অংশগ্রহণের সুযোগ পায়। উক্ত সুদুরপ্রসারী ও গভীর সম্ভাবনাময় সিদ্ধান্তের ফলে অনাগত ভবিষ্যতের রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে এক শুভ মৌলিক গণতান্ত্রিক সৌভ্রাতৃমূলক পরিবেশ সৃষ্টির গোড়াপত্তন ঘটে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ঐতিহ্যবাহী এ দলটির নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।
উপসংহার: আমাদের রাজনীতিতে ধর্মের উপস্থিতি নিয়ে অনেক কথা চালু থাকলেও এ দেশের মানুষ ধর্মের নামে রাজনৈতিক সহিংসতাকে ঘৃণা করে। বিশেষ করে রাজনৈতিকভাবে ধর্মকে হেয় প্রতিপন্ন করা বা ধর্মবিরোধী কার্যক্রমকে তারা কখনোই সমর্থন করেনি। পুরোপুরি ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠার যে আদর্শিক আন্দোলন তার প্রতিও জনসাধারণের সমর্থন তেমন লক্ষ্য করা যায় না। ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে যে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সূত্রপাত ঘটে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর তা আরও জোরদার হয়। তৎকালীন বৃহত্তম বিরোধী দল আওয়ামী মুসলিম লীগ নিজেকে অসাম্প্রদায়িক দল হিসেবে পুনর্গঠিত করে এবং যুক্ত নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে দ্বিজাতি তত্ত্বের মূলে কুঠারাঘাত করে।

