• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

৩১তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০১১

  • বিসিএস ২০১১
  • বাংলাদেশ
Back

বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের প্রধান সমস্যাসমূহ কি কি এবং কিভাবে ঐ এলাকার অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি দ্রুততর করা যায়?

ভূমিকা: বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চলে ৮৮০০১ থেকে ৯২°৪১ পূর্ব দ্রাঘিমা এবং ২০৭৩৪ থেকে ২৬৭৩৮ উত্তর অক্ষাংশের ভেতরে। হিমালয় পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন এবং এর দক্ষিণে অবস্থিত বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম দুটি নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানি এই দেশটির উপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে। এছাড়াও লুসাই পাহাড় থেকে উৎপন্ন বরাক নদীর পানিও বাংলাদেশের উপর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে বহমান। বরাক নদী বাংলাদেশে প্রবেশের মুহূর্তে সিলেটের অমলশিদের কাছে সুরমা ও কুশিয়ারা নামে দুটি শাখায় ভাগ হয়েছে। এই সুরমা ও কুশিয়ারা নদী দুটির অববাহিকাতেই বাংলাদেশের বিখ্যাত হাওরগুলোর অবস্থান। উত্তর পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত হাওরগুলো দেশের প্রধান নিম্নাঞ্চল এলাকা। ব্রহ্মপুত্র নদ ১৭৮৭ সালের বন্যা ও ভূমিকম্পের পর মধুপুর গড়ের পূর্বদিক থেকে পশ্চিমে তার প্রবাহপথ পরিবর্তন করলে সেই পরিত্যক্ত অঞ্চলে হাওর সৃষ্টি হয়।

হাওর: 'হাওর' শব্দের অর্থ বিস্তীর্ণ জলমগ্ন প্রান্তর। প্রধানত বিল অঞ্চল। মানুষের তৈরি অথবা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি বিস্তীর্ণ যে জলাশয় যাতে বছরের বেশির ভাগ সময় পানি থাকে তাকে হাওর বলে। দেশের মোট আয়তনের ৬ ভাগের ১ ভাগ জুড়ে (২৫ হাজার বর্গ কিমি) অবস্থিত হাওরাঞ্চল ৭টি জেলার ৪৮টি উপজেলায় বিস্তৃত। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, বাংলাদেশে ছোট-বড় মিলিয়ে হাওর রয়েছে ৪২৩টি। অন্যদিকে বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট হাওরের সংখ্যা ৪১৪টি। এ হাওর এলাকায় রয়েছে অসংখ্য খাল-নদী এবং প্রায় ৬,৩০০টি বিল, যার মধ্যে ৩,৫০০ টি স্থায়ী। বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য হাওরগুলো হলো হাকালুকি, হাইল, টাঙ্গুয়ার, বড় হাওর, মুড়িয়া ইত্যাদি।

নিচে অঞ্চলভিত্তিক হাওরের পরিসংখ্যান ছকে দেখানো হলো:

জেলা
হাওরের সংখ্যা
আয়তন (হেক্টর)
সুনামগঞ্জ
১৩২
২,৪৯,৪১০
সিলেট
৪৩
১,১৫,১৮৩
মৌলভীবাজার
০৩
৩৭,৪১৪
হবিগঞ্জ
৩০
৩৯,১৩২
ব্রাহ্মণবাড়িয়া
০৩
১০,৫৮১
কিশোরগঞ্জ
১২২
১,৮২,১০৩
নেত্রকোনা
৮১
১,৫০,১১৬
মোট
৪১৪
৭,৮৩,৯৩৯

[তথ্যসূত্র: হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডী

বাংলাদেশে হাওর অঞ্চলের প্রধান সমস্যাসমূহ: সরকারিভাবে স্বীকৃত এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলগুলো ভীষণভাবে উপেক্ষিত ও বিশৃঙ্খলাপূর্ণ এবং সমস্যা জর্জরিত। নিচে বাংলাদেশে হাওর অঞ্চলের প্রধান সমস্যাসমূহ আলোচনা করা হলো:

১. অগ্রিম বন্যা: বাংলাদেশের হাওর এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধিকাংশ বাঁধ অগ্রিম স্বাভাবিক বন্যা ঠেকানোর জন্য তৈরি, যেগুলো বর্ষাকালে ডুবে যায়। আগে এসব এলাকায় সনাতনী বোরো চাষ হতো যার জন্য বীজতলা থেকে ধান পাকা পর্যন্ত সময় লাগতো ১২০ দিন এবং ওই ধান চৈত্র মাসের মাঝামাঝি উঠে যেতো। কিন্তু সুনামগঞ্জ ও সিলেট এলাকার নিম্নাঞ্চলে সম্প্রতি হাইব্রিড উচ্চ ফলনশীল বোরো ধানের চাষ শুরু হয়েছে। এই ধান বীজতলা থেকে পাকা পর্যন্ত সময় লেগে যায় ১৪০ দিন থেকে ১৫০ দিন। তাই হাওর এলাকায় এসব ফসল তোলার সময় বৈশাখ মাস পর্যন্ত গড়িয়ে যায়। আগাম বন্যার কারণে এই সময়টা ঝুঁকিপূর্ণ। ২০০৪ সালের এপ্রিল মাসে যখন বন্যা হয় তখনও ক্ষেতের ধান পেকে ওঠেনি। তাই হাওর এলাকার সমস্যা প্রধানত অগ্রিম বন্যা।

২. মৎস্যজীবী মানুষের জীবনধারণ বিপন্ন: নিম্নাঞ্চলগুলো ক্রমশ নিষ্কাশিত হয়ে চাষযোগ্য ভূমিতে পরিণত হওয়ায় স্থানীয় মৎস্যজীবী মানুষের জীবনধারণ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। নিম্নাঞ্চলের জলমহাল দুর্নীতিপূর্ণ সরকারি ব্যবস্থার সহায়তায় লিজের নামে আঞ্চলিক প্রভুদের হাতে চলে যাচ্ছে। ফলে তার বাড়ির কাছের মৎস্যসম্পদ থাকে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এভাবে মৎস্যজীবী সম্প্রদায় তথা হাওর অঞ্চলের সাধারণ মানুষ তাদের ঐতিহ্যগত ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়ে পড়েছে।

৩. নিম্নমানের জনস্বাস্থ্য: হাওর অঞ্চলের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতি, অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জনস্বাস্থ্য অপেক্ষাকৃত নিম্নমানের। বর্তমানে তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে বিশুদ্ধ পানির অভাব, নদী ভাঙ্গন এবং স্যানিটেশনের তীব্র সংকট। বাড়ির পাশে, নদীতে, খোলা ও ঝুলন্ত টয়লেটের ফলে পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ বালাই লেগেই থাকে হাওর অঞ্চলে। সারা বছর কলেরা, টাইফয়েড, আমাশয়, কৃমি ও জন্ডিস ইত্যাদি রোগের পেছনে প্রায়ই তাদের মোটা অংকের অর্থ ব্যয় করতে হয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠী এসব রোগে সময়মত চিকিৎসা অর্থ ব্যয় করতে না পারায় প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু মারা যায়।

৪. পশ্চাৎপদ জীবনযাপন হাওর এলাকার মানুষ পশ্চাৎপদ জীবযাপন করে। একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে তার যে ন্যূন্যতম পাওনা সেটিও সে পায় না। প্রধানত কৃষিভিত্তিক এ অঞ্চলের মানুষের জীবনের সব ক্ষেত্রেই সংকট রয়েছে। যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি ইত্যাদির কোনোটাই এমনকি দেশের অনুন্নত অঞ্চলের সঙ্গেও তুলনীয় নয়। কৃষি উপকরণ বা সহায়তা এখানকার মানুষের কাছে দুর্লভ। খাল-নদ-নদী-বিলগুলো শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এখানকার পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য ও জীবন বিপন্ন। দেশের অন্য এলাকার চেয়ে এ এলাকার মানুষ সবচেয়ে বড় যে বিপদটির মুখোমুখি হয় সেটি হচ্ছে প্রচণ্ড ঢেউয়ের আঘাত থেকে নিজের বাড়িটা রক্ষা করা। এখানে চোরের উপদ্রব, সরকারি কর্মকর্তাদের অনুপস্থিতি, সরকারি সেবার অভাব- এসব তো আছেই।

৫. নাজুক স্যানিটেশন ব্যবস্থা: হাওরাঞ্চলে স্যানিটেশন ব্যবস্থা খুবই নাজুক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে খোলা ল্যাট্রিনসহ ঝুলন্ত ল্যাট্রিন ব্যবহার করতে দেখা যায়। এমনও দেখা যায় পানির মধ্যে ঝুলন্ত ল্যাট্রিনে মলমূত্র ত্যাগ করে এবং একই ল্যাট্রিনের নিচে অজু গোসলসহ থালা-বাসন ও প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী ধৌত করে। মাঝে মাঝে দুই একটি পাকা ল্যাট্রিন থাকলেও তার মলমূত্র বাইরে খোলা অবস্থায় চারপাশের পরিবেশ দূষিত করে। বলা যায়, এটি এমনই এক নাজুক নোংরা পরিবেশ যা রোগব্যাধি সংক্রমণের একটি ভয়ংকর কারখানা বললেও চলে।

৬. অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ: অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে হাওরগুলো হুমকির সম্মুখীন। মাটিভরাট করে হাওরে গড়ে উঠছে বসতবাড়ি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে হাওরের প্রান্তিকভূমিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে বোরো চাষ, কেটে ফেলা হচ্ছে হাওরের বৃক্ষরাজি। তাছাড়া ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা মেটানোর অজুহাত দেখিয়ে হাওরকে অতিনিষ্কাশন করে শুকিয়ে ফেলে ক্রমশ চাষযোগ্য ভূমিতে পরিণত করা হচ্ছে। ফলে আমরা প্রাকৃতিক জলসম্পদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি এবং নষ্ট হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। একই সাথে এসব এলাকায় বসবাসকারী পাখি ও উভচর প্রাণিসম্পদ ক্রমশ নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে।

৭. শিক্ষার বেহাল দশা বৈরী আবহওয়া ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে প্রায়ই শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। ফলে অনেক শিক্ষার্থী শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পরে। শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা না থাকায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিদ্যালয় থেকে ক্ষুধার তাড়নায় পালিয়ে যায়। অনেক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে খেলার মাঠ না থাকায় শিক্ষার্থীরা পড়াশুনায় নিরুৎসাহিত হয়। এ এলাকার মানুষ দরিদ্র থাকায় শিশুদেরকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে চায় না। অনেক পিতা-মাতা সন্তানদেরকে গৃহস্থালি কিংবা সংসারের অন্যান্য কাজে লাগিয়ে দেয়। এমন কি ফসলের মৌসুমে ছাত্র-ছাত্রী সকলেই ফসল তোলার কাজে জড়িয়ে পরে। এই অনিয়মিত অবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষা থেকে পিছিয়ে পরে এবং ঝরে পরে অনেকেই। শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষের স্বল্পতার কারণে উন্নত পরিবেশে শিক্ষাদান সম্ভব হয় না।

৮. ভাসমান জীবন চিত্র: নানা সমস্যায় জর্জরিত হাওরবাসী। দৃষ্টিসীমার একেবারে কিনারে বক্ররেখার মতো কালো আঁকাবাঁকা, ছড়ানো-ছিটানো অগোছালো গ্রামগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয় অথৈ সাগরের মাঝে কি যেন ভেলার ওপর ভাসছে। বাস্তবিক অর্থে তাদের জীবনটা ভাসমান ভেলার মতোই নড়বড়ে। প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে তাদের টিকে থাকতে হয়। বর্ষাকালে বাড়ির চারপাশে তৈরি করতে হয় আড়া (বাঁশের বেড়া)। এর ভেতর খড়কুটা, কচুরিপানা ভরে স্পঞ্জের মতো করা হয়। যার মাধ্যমে দানব আকৃতির ঢেউ থেকে নিজেদের রক্ষা করে হাওরবাসী। আর বর্ষা মৌসুমে পর্যটকরা এসব এলাকায় ভিড় জমান বিনোদনের জন্য।

৯. জ্বালানি ও গো-খাদ্যের সংকট: বর্ষাকালে হাওর এলাকায় সবচেয়ে বড় সংকট হয় জ্বালানি ও গো-খাদ্যের। জ্বালানির অভাবে এ সময়ে অনেক পরিবারে দিনে একবার রান্না করারও উপায় থাকে না। নিরুপায় লোকজন ৫-১০ ফুট হাওরের পানিতে ডুব দিয়ে এক ধরণের দুর্বা ঘাস তুলে। রোদে শুকিয়ে তা রান্নার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

১০. মা ও শিশুর নাজুক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি: জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের মধ্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্য একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম। হাওর অঞ্চলের মানুষের দারিদ্র্য, অশিক্ষা ও নানা প্রকার কুসংস্কারের জন্য মা ও শিশু স্বাস্থ্য পরিস্থিতি খুবই নাজুক। বন্যার সময় এ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। বিশাল জলরাশি অতিক্রম করে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ-প্রদান দুটিই কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে মানুষ স্থানীয়ভাবে ঝাঁড়-ফোঁক ও পানি পড়া, তাবিজ-কবজ ব্যবহার করে রোগ মুক্তির প্রচেষ্টা চালায়। বিশেষ করে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী প্রত্যাশিত স্বাস্থ্যসেবা পায় না।

১১. নারীর স্বাস্থ্য ও পুষ্টির অভাব: হাওরাঞ্চলের নারীদের খাদ্য সংস্কৃতি আর দশটি গ্রাম অঞ্চলের মতই ঐতিহ্যবাহী অর্থাৎ নারীরা খাওয়া দাওয়া শেষে যা-ই অবশিষ্ট থাকুক না কেন তা খেয়েই সন্তুষ্ট থাকে। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নারীদের যেন এটা নিয়তি নির্ধারিত। অভাবের সময় হাওরের দরিদ্র নারীদের এ অবস্থা আরো তীব্র আকার ধারণ করে। পুরুষদের যখন কোনো কাজ থাকে না তখন খাদ্যাভাব দেখা দেয়। হাওর অঞ্চলে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সন্তানসম্ভবা মায়েরা মারাত্মক পুষ্টিহীনতার শিকার হয়। এ কারণে মাতৃমৃত্যু, শিশু মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।

১২. অন্যান্য: উপরিউক্ত কারণগুলো ছাড়াও হাওরাঞ্চলে নানাবিধ সমস্যা বিদ্যমান। যেমন-
ক. যাতায়াত সংকট;
খ. বর্ষাকালে বেকারত্ব ও তীব্র খাদ্যাভাব;
গ. দুর্যোগ, খরা এবং নদী ভাঙ্গন
ঘ. প্রকট দারিদ্রদ্র্য;
ঙ. জনগণের কৃষির উপর নির্ভলশীলতা;
চ. স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া;
ছ. বিদ্যুতের অভাব;
জ. স্থায়ী কর্মসংস্থানের অভাব;
ঝ. জলমহালের অবৈধ দখল;
এঞ, আর্থিক দুরাবস্থা ইত্যাদি।

হাওরাঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি দ্রুততর করার উপায়: হাওরাঞ্চলের অধিবাসীদের জীবনযাত্রার মানের উন্নতি দ্রুততর করার উপায় হিসেবে নানাবিধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন-

১. যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি দেশের হাওর এলাকায় অগ্রিম বন্যাই শুধু নয় যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবও একটি সমস্যা। অতএব হাওর এলাকাগুলোতে সুষ্ঠু বন্যা-ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন এবং এর সাথে সমন্বিতভাবে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটাতে হবে। বন্যা-নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পের বাঁধগুলো এমন হওয়া চাই যা স্থানীয় জনগণকে সরাবছর যোগাযোগ সুবিধা দেবে, কিন্তু বন্যার পানি প্রবেশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। হাওর এলাকার জনগণ শুকনো মৌসুম ব্যতীত বছরের অধিকাংশ সময় যাতে নদীপথে যাতায়াত করতে পারে তার ব্যবস্থাপনা অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমানে যেসব থানা সদর সারা বছর সড়ক নেটওয়ার্কের সাথে সংযুক্ত, ওইসব সড়ক ব্যতীত এমন কোনো নতুন সড়ক নির্মাণ করা যাবে না যার ফলে হাওর এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে।

২. পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও জলজ পাখির জীববৈচিত্র্য অক্ষুন্ন পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও জলজ পাখির জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়োজনে হাওরগুলোকে অভয়াশ্রম হিসেবে এবং সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর এলাকাকে জাতীয় সংরক্ষিত সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। হাওর এলাকার ফসল বিন্যাস পরিবর্তন করে ফসল যাতে চৈত্র মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে উঠে আসে, পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তেমন উৎপাদনের পরিকল্পনা নিতে হবে।

৩. আইনশৃঙ্খলার উন্নতি ও অভয়াশ্রম ঘোষণা: দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের হাওরগুলোর পরিবেশ, মৎস্যসম্পদ ও জলজ পাখির জীববৈচিত্র্য অক্ষুন্ন রাখার জন্য আইনশৃঙ্খলার উন্নতি করে এদেরকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করতে হবে। পর্যটন শিল্পের উন্নতির জন্য দেশের হাওর এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং হাওর এলাকাকে জাতীয় সম্পদ ঘোষণা করতে হবে।

৪. ড্রেজিং বা পলি অপসারণের নামে অতিনিষ্কাশন বন্ধ: সারাদেশের জলাভূমিগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য ড্রেজিং বা পলি অপসারণের নামে অতিনিষ্কাশন বন্ধ করা চাই। মৎস্যসম্পদ, জলজ পাখির জীববৈচিত্র সংরক্ষণ করার জন্য দেশের প্রতিটি ইউনিয়নের অন্ততপক্ষে একটি জলাধার চিহ্নিত করে তাতে বছরব্যাপী সকল প্রকার মাছধরা নিষিদ্ধ করা দরকার।

৫. অবৈধ দখল মুক্ত: লীজের নামে জলমহালগুলোকে প্রভাবশালী ও সুবিধাভোগী মহলের অবৈধ দখল থেকে মুক্ত করা অত্যাবশক। প্রতিটি ইউনিয়নের নির্দিষ্ট জলাভূমি ব্যতীত সকল জলাভূমিকে সারা বছর উন্মুক্ত মৎসজীবী তথা আপামর জনগণের সম্পত্তি হিসেবে ফিরিয়ে দিতে হবে।

৬. হাওর এলাকার শিল্পকারখানা নির্মাণ না করা: পরিবেশ অক্ষুন্ন রাখার জন্য হাওর, বাঁওড় ও জলাভূমি এলাকায় শিল্প কারখানা নির্মাণ নিষিদ্ধ করা দরকার। কয়েকটি নির্দিষ্ট পথ ব্যতীত সকল পথে ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা যান চলাচল নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। তীরবর্তী ভূমিতে বিদেশি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক গাছপালার পরিবর্তে দেশি এবং পরিবেশবান্ধব গাছ লাগান দরকার।

৭. প্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী এবং আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখা: বন্যার সময় জনগণের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষা এবং ত্বরিত সহায়তা প্রদানের জন্য হাওর এলাকায় প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী, চিকিৎসার সরঞ্জাম এবং আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা রাখা জরুরি।

৮. সচেতনতা বৃদ্ধি: হাওর এলাকার জনজীবন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের শিশু-কিশোর তথা জনগণকে অবহিত এবং এই সম্পদের বিষয়ে সচেতন করার জন্য প্রতিটি উপজেলায় একটি করে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা দরকার। এই পর্যটন কেন্দ্র কেবলমাত্র সরকারি ব্যবস্থাপনায় চলবে এবং ব্যবসামূলক না হয়ে শিক্ষামূলক হবে।

উপসংহার: হাওরাঞ্চলকে ভাত ও মাছের ভাণ্ডার বলা হয়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রায় ২৫% এলাকা জুড়ে হাওর। বিস্তৃত। ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, খালিয়াজুরি এলাকা জুড়ে 'বড় হাওর', অষ্টগ্রামের 'সুমাই হাওর', বাজিতপুরের 'হুমাই, মিঠামইনের 'বাড়ির হাওর', বাজিতপুর, নিকলী, মিঠামইন এলাকা জুড়ে 'তল্লার হাওর', নিকলীর 'মাহমুদপুর হাওরা নিকলীর 'সুরমা বাউলার হাওর', সুনামগঞ্জের 'শনির হাওর', সিলেট ও মৌলভীবাজারের 'হাকালুকি হাওর', নেত্রকোনার 'জারিয়া হাওর', ছিলনীর 'শাপলা ও পাতলা বোড়া হাওর', নূরপুর ও কাতিয়ার কোনা হাওর, জুরির 'চিমনীর হাওর', ইটনার 'বনপুর হাওর'সহ এ দেশে ছোট বড় মিলে প্রায় ৪৫০টি হাওর রয়েছে, যা প্রায় ৮ হাজার বর্গ কিমি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎবিহীন জ্যোৎস্না মাখা হাওর এলাকাও অনুপম। হাওর-ভাটি বাংলায় প্রতিবছর এভাবেই আতন্ত, কর্মহীনতা, হতাশা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের বারতা নিয়ে বর্ষা আসছে, যাচ্ছে। প্রকৃতির বিরুদ্ধে জীবনের চলছে নিরন্তর যুদ্ধ। হাওরবাসীর জীবনে সুখ-শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সমন্বিত প্রয়াস চালানো এখন অত্যাবশকীয় বিষয়।