- হোম
- চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি
২৯তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০০৯
- বিসিএস ২০০৮
- বাংলাদেশ
মানবসম্পদ বলতে কি বোঝায়? বাংলাদেশে মানবসম্পদ উন্নয়নে কি কি পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন? বর্তমানে বাংলাদেশের যে জনসংখ্যা তাকে আপনি সম্পদ নাকি বোঝা (Liability) হিসেবে দেখেন?
উত্তর: অতিরিক্ত জনসংখ্যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দিনের পর দিন আমাদের দেশে যে হারে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে আগামী দিনগুলো আমাদের জন্য আরো ভীতিকর ও আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যা কোনো দেশের জন্য অভিশাপ নয় বরং তা আশীর্বাদ। জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে পারলে জনসংখ্যার কল্যাণে ও অবদানে দেশ উন্নতির চরম শিখরে অবস্থান করতে সক্ষম হয়। কিন্তু আমাদের দেশে জনসংখ্যা মানবসম্পদে পরিণত হয়নি বলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা স্পষ্ট হয়েছে এবং জাতির সামনে ঘন অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণ: নানা কারণে কোনো একটি দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে পারে। যেসব গুরুত্বপূর্ণ কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়; সেসব বিষয় নিচে উল্লেখ ও আলোচনা করা হলো:
ক. জলবায়ু ও ভৌগোলিক পরিবেশ বাংলাদেশের জলবায়ু উষ্ণ। এ উষ্ণতা আমাদের দেশের যুবক-যুবতীদের দ্রুত যৌবনপ্রাপ্তিতে বিশেষ সাহায্য করে। অকালে বিয়ে ও অপরিকল্পিত সন্তান গ্রহণের ফলে জনসংখ্যা ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায়।
খ. শিক্ষার অভাব: আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত। জনসংখ্যার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। অশিক্ষিত বলেই দূরদর্শিতার বিষয়টি তাদের মধ্যে অনুপস্থিত। ফলে অপরিকল্পিত জীবনযাপনের ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে।
গ. ধর্মভীরুতা: জন্মনিয়ন্ত্রণ এদেশের ধর্মভীরু মানুষের কাছে অপরাধের বিষয়। তারা মনে করে, আল্লাহ মুখ দিয়েছেন খাবারের যোগানও তিনি দিবেন। ফলে তারা জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি মানতে চান না।।
ঘ. বাল্যবিবাহ: গ্রামাঞ্চলে যৌবনে পা দিতে না দিতেই তাদের বিয়ের ব্যবস্থা হয়। বাল্যবিবাহজনিত তাদের সৃষ্ট সমস্যায় গোটা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে।
ঙ. বহুবিবাহ: বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের একটু স্বচ্ছল কিংবা ধনাঢ্য জনগোষ্ঠীর অনেকেই একাধিক বিয়ে করেন। স্বাভাবিকভাবেই তখন জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি-প্রকৃতি: বাংলাদেশ বিশ্বের সর্বাধিক ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের ৩০০০ ভাগের এক ভাগ মাত্র বাংলাদেশ। কিন্তু জনসংখ্যার দিক থেকে পৃথিবীতে এর স্থান অষ্টম। ১৯০১ সালে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় পৌনে তিন কোটি, ১৯৫১ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২.২ মিলিয়ন, ১৯৮১ সালে ৮৯.৯ মিলিয়ন, ১৯৯১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ১০৯.৮৮ মিলিয়নে উন্নীত হয়। ২০১৪ সালের অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৫ কোটি ৫৮ লাখ। অন্যদিকে UNFPA প্রকাশিত বিশ্ব জনসংখ্যা রিপোর্ট ২০১৪-এ বাংলাদেশের জনসংখ্যা দেখানো হয়েছে ১৫ কোটি ৮৫ লাখ। জনসংখ্যার ক্রমাগত বৃদ্ধি বর্তমানেও অব্যাহত এবং এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের জনসংখ্যা দ্বিগুণ হবে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা: বহুবিধ সমস্যার কারণে বাংলাদেশ জর্জরিত। আর এ সমস্যাগুলোর মধ্যে এক নম্বর সমস্যা হলো জনসংখ্যা সমস্যা। ১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গ কিলোমিটারের এ দেশে জনসংখ্যা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। প্রতি মিনিটে জন্ম নিচ্ছে ৩ জনেরও বেশি শিশু। অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০১৪ অনুযায়ী বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১.৩৭%। জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০১৫ জন।
জনসংখ্যা সমস্যার প্রতিক্রিয়া জনসংখ্যা সমস্যার দরুন বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়নের অগ্রগতি পদে পদে বিঘ্নিত হচ্ছে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অপরাধ প্রবণতা, বেকার সমস্যা ক্রমাগত বাড়ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের এসব সমস্যা প্রধান সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এসব সমস্যার স্বরূপ পর্যালোচনা করা হলো:
ক. খাদ্য সমস্যা: জনসংখ্যার আধিক্যের জন্য আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছি না। প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমাদের খাদ্য আমদানি করতে হয়। জনসংখ্যা যে হারে বাড়ছে, খাদ্য উৎপাদন সে হারে বাড়ছে না বলে অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে।
খ. কৃষি সমস্যা: বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষিনির্ভর। মানুষ বাড়ছে, কিন্তু জমি বাড়ছে না। একই জমি বংশানুক্রমিকভাবে খণ্ড-বিখণ্ড হচ্ছে। খণ্ডিত ক্ষুদ্র কৃষি জোতগুলোতে আনুষ্ঠানিক চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যবহার সম্ভব হয়ে উঠছে না।
গ. শিল্পোন্নয়নে বাধা: শিল্পোন্নয়নে জনসংখ্যা জনশক্তিতে পরিণত হতে পারে সন্দেহ নেই। কিন্তু অধিক জনসংখ্যার জন্য খাদ্যাভাব প্রকট হয়েছে। এর অবশ্যম্ভাবী প্রতিক্রিয়ায় কাঁচামালের অভাব দেখা দিয়েছে। কাঁচামালের উৎপাদন আশানুরূপ না হওয়ায় শিল্পোন্নয়নে আঘাত হানছে।
ঘ. বেকার সমস্যা: ইচ্ছা এবং কাজের শক্তি থাকা সত্ত্বেও এ দেশের জনগণের বিপুল অংশ কোনো অর্থনৈতিক কাজ পাচ্ছে না। জনসংখ্যার মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি এর অন্যতম কারণ। বেকার সমস্যা থেকে সৃষ্টি হচ্ছে উৎপাদনের অভাব, দারিদ্র্য, সামাজিক অস্থিরতা, জীবনের অনিশ্চয়তা, রাজনৈতিক উত্তেজনা ইত্যাদি।
ঙ. স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সঙ্কট: খাদ্যাভাব ও বাসস্থান সঙ্কটে দেশের মানুষের সাধারণ কর্মক্ষমতা কমে যাচ্ছে। যক্ষ্মা, পেটের পীড়া, মা ও শিশুর অপুষ্টি দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে। অথচ সুচিকিৎসার উপায় নেই। সাধারণ মানুষের আয়ের সীমাবদ্ধতা, পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সে সঙ্কটকে তীব্র করেছে।
চ. মানসিক বিকাশের বাধাগ্রস্ততা: জনসংখ্যা সমস্যার দরুন মানসিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপে দেশে মানুষ নানা মানসিক দুশ্চিন্তায় নিমজ্জিত হচ্ছে বলে চিন্তন ও মননে নানা প্রতিবন্ধকতার চিত্র গ্রথিত হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের দ্বার ক্রমাগত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
মানবসম্পদ উন্নয়নে সহায়ক পদক্ষেপ: মানবসম্পদ হলো জনসম্পদের এমন এক গুণগত পরিবর্তন প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে তারা উৎপাদনক্ষম ও দক্ষ জনশক্তি হিসেবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় ক্রমবর্ধিষ্ণুভাবে বলিষ্ঠ অবদান রাখতে পারে এবং মানবীয় শক্তি সামর্থ্যের সর্বোত্তম বিকাশে সক্ষম হয়ে উঠতে পারে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) মানবসম্পদ বলতে ব্যক্তিকে কর্মে নিযুক্ত করার সম্ভাবনা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াকে বুঝিয়ে থাকে। সহজ কথায়, মানবসম্পদ হলো এমন এক প্রত্রিয়া যার মাধ্যমে জনসংখ্যার জ্ঞান, দক্ষতা বৃদ্ধি করে গুণগত পরিবর্তন করা হয়। মানবসম্পদ উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেসব উদ্যোগ জনসম্পদ সৃষ্টিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে তা নিম্নরূপ-
ক. মানবসম্পদ উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নের অর্থ হলো শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নত হওয়ার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ হওয়া। যাতে দক্ষ জনশক্তি সমাজে ও বিশ্বে তাদের অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারে এবং সমাজে তাদের চাহিদা সৃষ্টি হয়। মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য কারিগরি শিক্ষার বিকল্প নেই। সুদান, লিবিয়া, মিশর, কুয়েত, সৌদি আরব প্রভৃতি দেশে প্রাকৃতিক সম্পদ অফুরন্ত। অপরদিকে জাপান বলতে গেলে প্রাকৃতিক সম্পদহীন। তারপরও কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমে দেশটি উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছে।
খ. মানবসম্পদ ও বিজ্ঞান শিক্ষা: বর্তমান যুগ হচ্ছে বিজ্ঞানের যুগ। বিজ্ঞান শিক্ষা ব্যতীত কোনো দেশই কাঙ্ক্ষিত উন্নতি লাভ করতে পারে না। বাংলাদেশের ন্যায় একটি জনবহুল দরিদ্র দেশের সুষম উন্নয়নের চাবিকাঠি নিহিত রয়েছে তার মানবসম্পদ উন্নয়নের মধ্যে। আমাদের রয়েছে বিপুল জনসংখ্যার চাপ, অন্যদিকে বিক্রয়যোগ্য সম্পদের তীব্র সীমাবদ্ধতা। তাই আমাদের মানব উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত বিদ্যার ওপর দখল।
গ. শিক্ষার প্রসার ও সচেতনতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠী এখনো অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত। অথচ যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য শিক্ষার গুরুত্ব অপরিহার্য। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে যে ধস নেমে আসছে তাকে রোধ করতে না পারলে জাতির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাই সমস্যা হয়ে দেখা দিবে। সেজন্য জনসংখ্যার সমস্যাকে আশু মোকাবিলা করা খুবই জরুরি। এ সমস্যা সমাধানের প্রথম পদক্ষেপ হলো শিক্ষার প্রসার ও এ সম্পর্কে গণসচেতনতা বৃদ্ধি।
ঘ. মানবসম্পদ উন্নয়ন ও তথ্যপ্রযুক্তি: বাংলাদেশের মতো ব্যাপক জনসংখ্যা অধ্যুষিত ও সন্তা শ্রমের দেশে মানবসম্পদ উন্নয়নে তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পরিকল্পিতভাবে দেশের ব্যাপক শিক্ষিত বেকার জনশক্তিকে তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ ও শিক্ষিত করে গড়ে তোলা গেলে দেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এক নতুন জগতে প্রবেশ করতে পারে।
ঙ. শ্রমদক্ষতা বৃদ্ধি: বাংলাদেশের শ্রম পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ হয়ে থাকে। মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আমেরিকাসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ শ্রমিক নিয়োজিত রয়েছে। তাদেরকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে তোলা সম্ভব হলে দেশের অর্থনীতিতে তাদের ভূমিকা আরো জোরদার হবে।
চ. ধর্মান্ধতা পরিহার: ধর্মের নানা কুসংস্কারের কারণে আমাদের দেশের নারীরা ঘরের বাইরে কাজ করতে অনাগ্রহী। আজ দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগাতে না পারলে আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখা দুঃসাধ্য। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কাজে আত্মনিয়োগ করলেই দেশ সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে। এক্ষেত্রে কুসংস্কার ও ধর্মীয় গোড়ামির পরিহার একান্তভাবেই কাম্য।
এছাড়াও নিম্নলিখিত উদ্যোগ জনসংখ্যা জনসম্পদে রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনে সহায়ক হবে:
- জনগণের নৈতিক চেতনার মান বৃদ্ধি করতে হবে।
- আজকের শিশুরাই আগামী দিনের জাতির চালিকাশক্তি। তাই শিশুদের সঠিক উন্নয়ন জরুরি। জনসংখ্যার এই উল্লেখযোগ্য অংশকে সঠিক দিক নির্দেশনাভিত্তিক পরিচালনা করতে হবে।
- সর্বক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
- দেশের কারিগরি শিক্ষার সুযোগ খুব সীমিত। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।
- গ্যাস ও তেল সম্পদ উত্তোলনের জন্য আমরা এখনো বিদেশ নির্ভর। তাই সরকারি উদ্যোগে খনিজ বিদ্যা বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগানো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে হবে।
- দেশের জনসংখ্যার বিপরীতে ড. কুদরাত-ই-খুদা কমিশন বর্ণিত পর্যাপ্ত শিক্ষা ও অবকাঠামোগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
- স্বাস্থ্যখাতের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।
- পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় সরকার ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দেশের সব জনগণকে কাজ দিতে সক্ষম নয়। এমতাবস্থায় জনগণ, বিভিন্ন এনজিও এগিয়ে আসলে এবং উদ্যোক্তা তৈরি করলে দেশে মানবসম্পদ তৈরি হবে।
- বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন কৃষিব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। তাই বেকার জনগোষ্ঠীকে কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদনে উৎসাহী করতে হবে। এ সকল উৎপাদিত দ্রব্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কুটির শিল্প গড়ে ওঠবে এবং সেখানে অধিক সংখ্যক বেকার যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
- আমাদের দেশের শ্রমিক পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত আছে।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে টিকে থাকার পূর্বশর্ত হলো দক্ষ শ্রমিক তৈরি করা। আমাদের দেশে এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মানের অত্যাধুনিক টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও ফিলিপাইনে এ ধরনের আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রযুক্তি, বিদেশী ভাষা প্রশিক্ষণ, ক্যাটারিং ও কুকিং, হোটেল ম্যানেজমেন্ট, সিভিল, মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, ইলেক্ট্রনিক্স টেকনোলজি ও ড্রাইভিংয়ের মতো পেশায় জনগণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের লক্ষ লক্ষ অদক্ষ জনগণকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে শ্রমের অনুপ্রবেশ ঘটানো সম্ভব হবে।
জনসংখ্যা সমস্যা নয় সম্পদ/জনসংখ্যা বোঝা নয় সম্পদ: বাংলাদেশের মতো একটি দরিদ্র ও জনবহুল দেশে উন্নয়নের মূলমন্ত্র নিহিত আছে মূলত জনসংখ্যার সুষম বণ্টন ও জনশক্তিকে কাজে লাগানোর ওপর। শিক্ষার সকল পর্যায়ে প্রবেশাধিকার (access), সমতা (equity), গুণগত মান (quality), প্রাসঙ্গিকতা (relevance) এবং দক্ষতা (efficiency) ইত্যাদি বিষয়গুলোর সাথে সম্পৃক্ত রেখে জনগণকে দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ত করা গেলে তা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। মনে রাখতে হবে জনসংখ্যা উন্নয়নের সহায়ক উপাদান। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর থাকলেও মানবসম্পদহীন কোনো দেশ ন্নতির চরম শিখরে অবস্থান করতে পারে না। Datton-এর মতামতটি এখানে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণীয়-
Optimum population is that which gives the maximum income per head.'
বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সম্পদে পরিপূর্ণ একটি দেশ। কাজেই এ দেশের মানুষকে ঠিকমতো কর্মক্ষম করে গড়ে ভুলতে পারলে তা জনসম্পদে পরিণত হবে। বর্তমান যুগ বিশ্বায়নের যুগ। বিশ্বায়নের ফলে কর্মশক্তির অবাধ বিচরণ আজ দেশ থেকে দেশান্তরে। বাংলাদেশের বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠী বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন কাজে নিয়োজিত রয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রা পাঠাচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে এ বৈদেশিক মুদ্রার অবদান অসামান্য। কাজেই যদি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ দেশের লক্ষ লক্ষ জনগণকে প্রশিক্ষিত করা যায়, তাহলে আরো জনবল নিয়োগ করে আমাদের দেশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সমর্থ হবে। তাছাড়া দেশের অভ্যন্তরীণ কাজে নিয়োজিত শ্রমও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কৃষি, শিল্প, উৎপাদন, বণ্টন, এমনকি ভোগের জন্যও মানুষের প্রয়োজন রয়েছে। বাংলাদেশের জনগণকে যদি দেশের উন্নয়নে নিয়োজিত করা যায়, তাহলে দেশের সার্বিক উন্নতি দ্রুত সম্ভব হবে।
বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের দেশের শতকরা প্রায় ৪৮.৪% শ্রমিক কৃষি কাজে নিয়োজিত। কাজেই কৃষিব্যবস্থার উন্নয়ন ব্যতীত দেশকে উন্নয়নের দ্বার কোঠায় উন্নীত করা সম্ভব নয়। মৌসুমী বায়ু প্রভাবিত অঞ্চল ও পলি বিধৌত নদীমাতৃক এ দেশে কৃষির সম্ভাবনা খুবই উজ্জ্বল। কাজেই কৃষিব্যবস্থায় প্রযুক্তিগত উৎকর্ষসাধন করে উৎপাদনে ভিন্নতা আনয়ন, প্রয়োজনে ভর্তুকি প্রদান, ভূমির মালিকানা ও কাঠামোগত পরিবর্তন করার মাধ্যমে বিপুল জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগানো সম্ভব। বিশ্বব্যাংকের এক জরিপে দেখা গেছে বর্তমানে বাংলাদেশে ৫০ হাজার একর জমি বর্গা চাষে রয়েছে,
যাতে ২০ লক্ষ শ্রমিকের শ্রম কম প্রয়োজন হচ্ছে। বর্গাপ্রথার উচ্ছেদ ও মালিকানা পরিবর্তনের মাধ্যমে এ সমস্যার আশু সমাধান করা যেতে পারে। ফলে এ শ্রমিকগুলো শ্রম দিতে পারবে এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। শ্রীলঙ্কা, ভারত, চীনসহ অনেক দেশ জনশক্তি রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। বাংলাদেশও মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ ও অন্যান্য মহাদেশে অনেক জনশক্তি রপ্তানি করেছে। দেশের জনশক্তিকে যথার্থভাবে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব হলে জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে। এক্ষেত্রে নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ প্রসঙ্গে Report of the International Conference on Population and Development (New York: United Nations; 1995)-এর ২নং ধারাটি উল্লেখযোগ্য:
Human beings are at the center of concerns for sustainable development. They are entitled to a healthy and productive life in harmony with nature. People are the most important and valuable resource of any nation.'
উপর্যুক্ত আলোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, জনসংখ্যা কোনো দেশের অভিশাপ নয় বরং তা সম্পদ। মানবসম্পদ উন্নয়নে সরকারি প্রচেষ্টা: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মানবসম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। আমাদের দেশের সরকারও এ বিষয়ের সাথে একমত এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দেশের জনগণকে মানবসম্পদে পরিণত করা। এ লক্ষ্যে সরকার পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনার আশ্রয় নিয়েছে এবং এতে দেশের মানবসম্পদের উন্নয়নের জন্য নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যেমন-
ক. দেশে পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন।
খ. দেশে নতুন কারিগরি, প্রকৌশল ও কর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি।
গ. হাসপাতাল, ক্লিনিক ইত্যাদির অবাধ সম্প্রসারণ ও চার স্তরবিশিষ্ট কাঠামোর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ।
ঘ. স্বাস্থ্যসেবার সাথে ডাক্তার ও নার্সদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা।
ঙ. সরকারি, বেসরকারি, পিএসসির মাধ্যমে প্রচুর বেকার লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি ইত্যাদি।
উপসংহার: জাতীয় উন্নয়নে মানবসম্পদের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সুতরাং বাংলাদেশের মতো জনবহুল দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে আধুনিক যন্ত্রনির্ভর প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত জ্ঞান দিয়ে যথাযথ মানবসম্পদে পরিণত করতে পারলে স্বদেশে ও বিদেশে ব্যাপক কর্মসংস্থান এবং মানবসম্পদের সদ্ব্যবহার সম্ভব হবে। আজকের উন্নত বিশ্ব প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, দক্ষ মানবশক্তি ছাড়া রাষ্ট্রের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের দেশেও এ কথা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা যায়, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করার মধ্য দিয়েই দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতির প্রধান কৌশল হওয়া উচিত জনসংখ্যা সমস্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করা।

