• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

২৮তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ২০০৮

  • বিসিএস ২০০৮
  • বাংলাদেশ
Back

বাংলাদেশের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহ আলোচনা করুন। আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে এদের গুরুত্ব আলোচনা করুন।

উত্তর: বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এ স্বাধীনতা অর্জনের জন্য অনেক প্রাণ বিসর্জন দিতে হয়েছে। তাছাড়া এ দেশের সীমানা নিয়েও কম বিরোধ ছিল না। এ বিরোধের মীমাংসা শেষে বাংলাদেশের আয়তন নির্ধারিত হয়েছে ১,৪৭,৫৭০ বর্গ কিলোমিটার। এ দেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। এ দেশের ভূপ্রকৃতিও অনেক বৈচিত্র্য বহন করে চলেছে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র প্রভৃতি অসংখ্য নদ-নদী এ দেশের উপর দিয়ে বয়ে গেছে। সীমিত উচ্চভূমি ছাড়া সমগ্র দেশ নদ-নদীর পলল দ্বারা গঠিত এক বিস্তীর্ণ সমভূমি।

অবস্থান: বাংলাদেশ এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণে অবস্থিত। ২০°৩৪′ থেকে ২৬°৩৮′ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮°০১′ থেকে ৯২°৪১′ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিস্তৃতি। এ দেশের প্রায় মধ্যভাগ দিয়ে কর্কটক্রান্তি রেখা অতিক্রম করেছে। বাংলাদেশের উত্তরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয় ও আসাম; পূর্বে ভারতের আসাম, ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং মিয়ানমার; দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ।

বাংলাদেশের সর্বমোট সীমারেখা ৫,১৩৮ কিমি। এর মধ্যে বাংলাদেশ-ভারত সীমারেখার দৈর্ঘ্য ৪,১৫৬ কিলোমিটার। বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমারেখার দৈর্ঘ্য ২৭১ কিলোমিটার এবং বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বা তটরেখার দৈর্ঘ্য ৭১১ কিমি।

বাংলাদেশের মোট আয়তনের মধ্যে নদ-নদী অঞ্চলের আয়তন প্রায় ৯,৩৮০ বর্গকিলোমিটার এবং বনাঞ্চলের আয়তন ২২.৫৮৪ বর্গ কিলোমিটার। নদী ও বনাঞ্চল বাদে বাংলাদেশের আয়তন প্রায় ১,১৫,৬০৬ বর্গ কিলোমিটার। এ দেশের রাজনৈতিক সমুদ্রসীমা ১২ নটিক্যাল মাইল এবং অর্থনৈতিক সমুদ্রসীমা ২০০ নটিক্যাল মাইল। বাংলাদেশের অবস্থান প্রান্তীয় অর্থাৎ এর একদিক সমুদ্রবেষ্টিত। এরূপ অবস্থানের জন্য এর দক্ষিণের ভগ্ন উপকূলে সমুদ্রবন্দর গড়ে উঠেছে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে সুলভ জলপথে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্য গড়ে উঠেছে। এর ফলস্বরূপ বাংলাদেশ কৃষি, ব্যবসায়, শিল্প ইত্যাদি ক্ষেত্রে উন্নতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে।

ভূপ্রকৃতি : বাংলাদেশ পৃথিবীর বৃহত্তম ব-দ্বীপ। পদ্মা, যমুনা ও মেঘনা নদী পশ্চিম, উত্তর ও উত্তরপূর্ব দিক থেকে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে একযোগে এ সুবিশাল ব-দ্বীপের সৃষ্টি করেছে। সীমিত উচ্চভূমি ছাড়া সমগ্র দেশ এক বিস্তীর্ণ বৈচিত্র্যহীন সমভূমি। এ দেশের ভূখণ্ড উত্তর-পশ্চিম থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে ক্রমশ ঢালু। ভূমির বন্ধুরতার পার্থক্য ও গঠনের সময়ানুক্রমিক দিক থেকে বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতিকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

১. টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ: রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের পাহাড়ি এলাকাগুলো নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এ পাহাড়গুলো বেলে পাথর, প্লেট জাতীয় প্রস্তর এবং কর্দমের সংমিশ্রণে গঠিত। পাহাড়গুলোর গায়ে ক্ষুদ্র বৃহৎ বৃক্ষরাজির বন এবং অসংখ্য ঝোপজঙ্গল রয়েছে। সংক্ষেপে বলা যায় যে, টারশিয়ারি যুগের হিমালয় পর্বত গঠনের সময় এসব পাহাড় সৃষ্টি হয়েছিল বলে এগুলোকে টারশিয়ারি পাহাড় বলে। এ পাহাড়ি অঞ্চলকে দুভাগে ভাগ করা যায়। যথা:

ক. উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার উত্তরাংশ, সিলেট জেলার উত্তর ও উত্তরপূর্বাংশ এবং মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের দক্ষিণাংশের ছোট-বড় বিচ্ছিন্ন পাহাড়গুলো এ অঞ্চলের অন্তর্গত। মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের দক্ষিণের পাহাড়গুলোর উচ্চতা ২৪৪ মিটারের বেশি নয়। শেরপুর ও ময়মনসিংহের উত্তর সীমানায় কিছু কিছু পাহাড় আছে। উত্তরের পাহাড়গুলোর মধ্যে চিকনাগুল, খাসিয়া ও জয়ন্তিয়া উল্লেখযোগ্য।

সিলেট জেলার পাহাড়ি অঞ্চল সিলেট শহরের উত্তরপূর্ব দিকে ১৮৬ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত। এ পার্বত্যভূমির উচ্চতা ৬০ থেকে ৯০ মিটারের বেশি নয়। সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক শহরের উত্তরে প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার স্থান নিয়ে একটি টিলা পাহাড় অবস্থিত। এটি ছাতক পাহাড় নামে পরিচিত। এ পার্বত্যভূমির গড় উচ্চতা ৪০ থেকে ৬০ মিটার।
মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সীমানায় অবস্থিত পাহাড়গুলো কোনোরূপ গিরিশ্রেণী গঠন করেনি। এসব পাহাড়ের ঢালগুলো খাড়া এবং উপরিভাগ অসমান। এদেরকে ত্রিপুরার পাহাড় বলা হয়। শেরপুর ও ময়মনসিংহ জেলার উত্তর সীমানায় ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো পাহাড়ের সামান্য বিচ্ছিন্ন অংশ দেখা যায়।

এ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। তাই এখানকার পাহাড়ের ঢালে প্রচুর চা উৎপন্ন হয়। বাংলাদেশের অধিকাংশ চা বাগান এ অঞ্চলেই অবস্থিত। এ অঞ্চলে আনারসও উৎপন্ন হয়। এছাড়া এ পার্বত্য অঞ্চলে প্রচুর বাঁশ ও বেত পাওয়া যায়। এ অঞ্চল প্রাকৃতিক গ্যাস, খনিজ তেল, চুনাপাথর, কয়লা প্রভৃতি খনিজসম্পদে সমৃদ্ধ।

খ. দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়সমূহ: খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা এবং চট্টগ্রামের অংশবিশেষ এ অঞ্চলের অন্তর্গত- এ পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা ৬১০ মিটার। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ তাজিং ডং (বিজয়), যার উচ্চতা ১২৩১ মিটার। এটা বান্দরবানে অবস্থিত এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ শৃঙ্গ কিওক্রাডং বান্দরবানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত। এ অঞ্চলের অপর দুটি উচ্চতর পাহাড় চূড়া হচ্ছে মোদকমুয়াল (১০০০ মিটার) ও পিরামিড (৯১৫ মিটার)। এসব পাহাড় বেলে পাথর, শেল ও কর্দম শিলা দ্বারা গঠিত। এ অঞ্চলের পাহাড়গুলোর মধ্যবর্তী উপত্যকা দিয়ে কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, হালদা প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়েছে।

২. প্লাইস্টোসিনকালের সোপানসমূহ বা চত্বরভূমি: ২৫,০০০ বছর পূর্বে প্লাইস্টোসিনকালে আন্তঃবরফগলা পানিতে প্লাবনের সৃষ্টি হয়ে এসব চত্বরভূমি গঠিত হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। এ অঞ্চলের মাটির রং লাল ও ধূসর। নিচে এ উচ্চভূমিগুলোর বর্ণনা দেয়া হলো:

ক. বরেন্দ্রভূমি: বরেন্দ্রভূমি রাজশাহী বিভাগের প্রায় ৯৩২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে আছে। প্লাবন সমভূমি থেকে এর উচ্চতা ৬ থেকে ১২ মিটার। বঙ্গ অববাহিকায় এটি সর্ববৃহৎ প্লাইস্টোসিন যুগের উচ্চভূমি। এ এলাকার ভূমি অসমতল এবং মাটি লাল ও কাঁকরময়। এটি পশ্চিমে মহানন্দা ও পূর্বে করতোয়া নদী দ্বারা বেষ্টিত। সমগ্র অঞ্চলটি পুনর্ভবা, আত্রাই ও যমুনা নদী দ্বারা চারটি অংশে বিভক্ত। এর পূর্বদিকের তিনটি অংশ বাংলাদেশের অন্তর্গত। মহানন্দা ও পুনর্ভবা মধ্যবর্তী অপর অংশটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত। বরেন্দ্র অঞ্চল কৃষিকার্যের জন্য বিশেষ উপযোগী। ধান এখানকার প্রধান কৃষিজ ফসল। এছাড়া পাট, ভুট্টা, পান প্রভৃতিও এ অঞ্চলে কিছু কিছু উৎপন্ন হয়।

খ. মধুপুর ও ভাওয়ালের গড়: উত্তরের ব্রহ্মপুত্র নদী থেকে দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদী পর্যন্ত অর্থাৎ ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও গাজীপুর অঞ্চল জুড়ে এর বিস্তৃতি। এর মোট আয়তন প্রায় ৪,১০৩ বর্গ কিলোমিটার। মাটি কংকর মিশ্রিত ও লাল। বরেন্দ্রভূমির মতো এখানকার মাটির রঙ দেখতে লাল এবং কঙ্করময় বলে কৃষিকাজের পক্ষে বিশেষ উপযোগী নয়। এখনও ভূভাগ বনজঙ্গলে পরিপূর্ণ এবং বাংলাদেশের গজারি বৃক্ষের কেন্দ্র। মধুপুর এলাকায় আনারস ও নানা ধরনের সবজি উৎপন্ন হয়। পানি সেচের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কিছু ধানের চাষ হয়।

গ. লালমাই পাহাড়: কুমিল্লা শহর থেকে ৮ কিমি দক্ষিণে লালমাই থেকে ময়নামতি পর্যন্ত এটি বিস্তৃত। এর আয়তন প্রায় ৩৪ বর্গ কিলোমিটার এবং গড় উচ্চতা ২১ মিটার। এর মাটি লালচে নুড়ি এবং বালি ও কংকর দ্বারা গঠিত। এ পাহাড়ের পাদদেশে আলু, তরমুজ ইত্যাদির চাষ হয়।

৩. সাম্প্রতিককালের প্লাবন সমভূমি: টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহ এবং প্লাইস্টোসিনকালের সোপানসমূহ ছাড়া সমগ্র বাংলাদেশ নদীবিধৌত এক বিস্তীর্ণ সমভূমি। এর আয়তন প্রায় ১,২৪,২৬৬ বর্গ কিলোমিটার। সমগ্র সমভূমি অঞ্চলের মৃত্তিকার স্তর খুঝ গভীর এবং ভূমি অতি উর্বর এবং মনুষ্য বাসের উপযোগী। এ অঞ্চলটি সর্বত্র একই রূপ নয় বলে, একে আবার কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। যথা:

ক. কুমিল্লার সমভূমি: চাঁদপুর-কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অধিকাংশ এবং লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী ও হবিগঞ্জ জেলার কিছু অংশ জুড়ে এ সমভূমি অবস্থিত। এর মোট আয়তন ৭৪০৪ বর্গ কিলোমিটার এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে উচ্চতা ৩.৬ মিটার, অন্য মতে ৬ মিটার। এ সমভূমির বন্ধুরতা অনুচ্চ এবং বর্ষাকালে এটি প্রায়ই ডুবে থাকে। এ অঞ্চলের ভূমি উর্বর বলে প্রচুর ধান, পাট ও অন্যান্য ফসল জন্মে থাকে।

খ. সিলেট অববাহিকা সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এবং কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার পূর্বদিকের সামান্য অংশ নিয়ে এ অঞ্চল গঠিত। এটি সংলগ্ন প্লাবন সমভূমি হতে অপেক্ষাকৃত নিচু। সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে এ অববাহিকার উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার। এ অঞ্চল বর্ষাকালে পানিতে ডুবে যায় এবং শীতকালে পানি নেমে গেলে এখানে বোরো ও ইরি ধানের চাষ হয়। সর্বনিম্ন স্থানগুলোতে প্রকাণ্ড জলাশয়ের মতো পানি জমে থাকে। এগুলো হাওর নামে পরিচিত। এ অঞ্চলে বড় ধরনের পাঁচটি হাওর রয়েছে।

গ. পাদদেশীয় পলল সমভূমি দেশের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর জেলার অধিকাংশ স্থান জুড়ে এ সমভূমি বিস্তৃত। হিমালয় পর্বত থেকে আনিত পলল দ্বারাই এ অঞ্চল গঠিত। তিস্তা, আত্রাই, করতোয়া প্রভৃতি নদীবাহিত পলি জমা হয়ে এ ঢালু ভূমির সৃষ্টি হয়েছে। এ সমভূমি পাদদেশীয় পলল সমভূমি নামে পরিচিত। বর্ষাকালে এর সামান্য অংশ পানিতে প্লাবিত হয়। ধান, পাট, ইক্ষু, তামাক প্রভৃতি এ অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে জন্মে।

ঘ. গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা প্লাবন সমভূমি: এটিই বাংলাদেশের মূল প্লাবন সমভূমি। পদ্মা নদীর উত্তরে প্লাবন সমভূমির বাকি অংশই গঙ্গা (পদ্মা)-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনার প্লাবন সমভূমি নামে পরিচিত। এ প্লাবন সমভূমি বৃহত্তর ঢাকা, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, পাবনা ও রাজশাহী অঞ্চলের অংশবিশেষ নিয়ে বিস্তৃত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানই বর্ষার পানিতে প্রতি বছরই ডুবে যায়। নদীর দু পাড় বরাবর অনুচ্চ নদী পাড়ের প্রাকৃতিক বাঁধ, পশ্চাৎ ঢাল, অগভীর জলাভূমি বা বিল, অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ, চর ইত্যাদি হচ্ছে প্লাবন সমভূমির উল্লেখযোগ্য ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।

৫. ব-দ্বীপ অঞ্চলীয় সমভূমি: বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমের সমভূমিকে সাধারণত ব-দ্বীপ বলা হয়। এ ব-দ্বীপ অঞ্চলটি বৃহত্তর কুষ্টিয়া, যশোর, ফরিদপুর, বরিশাল, পটুয়াখালী অঞ্চলের সমুদয় অংশ এবং রাজশাহী, পাবনা ও ঢাকা অঞ্চলের কিছু অংশ জুড়ে বিস্তৃত। এ ব-দ্বীপ অঞ্চলটি পদ্মা এবং এর শাখানদীগুলো দ্বারা বিধৌত। নদী, বিল এবং দ্বীপগুলো এ অঞ্চলের প্রধান প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। এছাড়া খুলনা থেকে ফরিদপুর ও বরিশাল পর্যন্ত বৃহৎ অথচ অগভীর একসারি গহ্বর রয়েছে। এরা 'ঝিল' নামে পরিচিত। ব-দ্বীপ অঞ্চলীয় সমভূমিকে আবার তিনটি ভাগে পৃথক করা যায়। যথা:

i. সক্রিয় ব-দ্বীপ: পূর্বে মেঘনা নদীর মোহনা থেকে পশ্চিমে গড়াই-মধুমতি নদী পর্যন্ত বিস্তৃত ব-দ্বীপ সমভূমির পূর্বাংশকে সক্রিয় ব-দ্বীপ বলে। এর পূর্বাংশীয় অঞ্চল প্রতি বছর বর্ষাকালে প্লাবিত হয়। ধান, পাট, ইক্ষু প্রভৃতি ফসল প্রচুর পরিমাণে উৎপাদিত হয়। এ অঞ্চলের বরিশাল, পটুয়াখালী, গোপালগঞ্জ, মাদারীপুরের বিল বা হাওরগুলোতে প্রচুর মাছ পাওয়া যায় এবং শীতকালে বোরো ও ইরি ধানের চাষ হয়।

ii. মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ: বাংলাদেশের ব-দ্বীপ সমভূমির মধ্যে গড়াই-মধুমতি নদীর পশ্চিমাংশকে মৃতপ্রায় ব-দ্বীপ বলা হয়। এটা বৃহত্তর কুষ্টিয়া ও যশোর অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানব্যাপী বিস্তৃত। এ অঞ্চলের অধিকাংশ নদী ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় রয়েছে। শুল্ক ঋতুতে নদীগুলো প্রায় শুকিয়ে যায়। বর্ষাকালেও এসব নদীর পানি প্রবাহের পরিমাণ খুব বেশি বৃদ্ধি পায় না।

iii. স্রোতজ সমভূমি: বাংলাদেশের ব-দ্বীপ অঞ্চলীয় সমভূমির দক্ষিণ ভাগের যে অংশে বঙ্গোপসাগরের জোয়ার-ভাটার প্রভাব পরিলক্ষিত হয় সে অংশকে স্রোতজ সমভূমি বলে। এ অঞ্চলে ছোট ছোট বহু নদীনালা আছে। এরা অসংখ্য শাখা-প্রশাখা ও খাঁড়িতে বিভক্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। এ সমভূমি অঞ্চলের অধিকাংশ অঞ্চল জুড়ে ম্যানগ্রোভ বা গড়ান বৃক্ষের বনভূমি রয়েছে। এ বনভূমি সুন্দরবন নামে সুপ্রসিদ্ধ। এ অঞ্চলের নদীতে প্লাবন খুব কম কিন্তু নিয়মিত জোয়ার-ভাটা হয়।

৬. চট্টগ্রামের উপকূলীয় সমভূমি: এ সমভূমি ফেনী নদী হতে কক্সবাজারের কিছু দক্ষিণ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি গড়ে প্রায় ৯.৬ কিলোমিটার প্রশস্ত। কিন্তু কর্ণফুলী নদীর মোহনায় এর দৈর্ঘ্য ২৫.৬ কিলোমিটার। এ সমভূমি কর্ণফুলী, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, বাঁশখালি প্রভৃতি নদীবাহিত পলল দ্বারা গঠিত। এছাড়া সমুদ্রতট, বালুসৈকত, বালিয়াড়ী, কর্দমভূমি ইত্যাদি উপকূলীয় প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসমূহও এখানে পরিলক্ষিত হয়। এর কোনো কোনো স্থানে সমুদ্রের পানি থেকে লবণ তৈরি হয়। এ অঞ্চলে প্রচুর কৃষিজ ফসলও হয়।

অর্থনৈতিক কার্যাবলীর ওপর ভূপ্রকৃতির প্রভাব: বাংলাদেশের ভূপ্রকৃতি এ দেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে নানাভাবে প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রিত করে থাকে। গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে বঙ্গোপসাগর থেকে আগত দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু এসব পাহাড়ে বাধা পেয়ে ব্যাপক বৃষ্টিপাত ঘটায়। এ বৃষ্টির ফলে বাংলাদেশ কৃষিকার্যে যথেষ্ট উন্নতি লাভ করেছে। শীতকালের উত্তর-পূর্ব মৌসুমী বায়ু এসব পাহাড়ে বাধা পেয়ে সামান্য বৃষ্টিপাত ঘটায়, যার ফলে শীতকালে বাংলাদেশে প্রচুর রবিশস্য জন্মে। এছাড়া অধিক বৃষ্টিবহুল পাহাড়ি অঞ্চলে বনভূমির সৃষ্টি হয়েছে। এসব বনভূমি থেকে প্রচুর মূল্যবান কাঠ ও অন্যান্য বনজসম্পদ সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া পাহাড়ের ঢালে চা, রবার, আনারস ইত্যাদির চাষ হয়। মধুপুর অঞ্চলের গজারি বৃক্ষ বিখ্যাত। অন্যদিকে নদীবাহিত উর্বর পলল মৃত্তিকা ও অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য এ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানেই কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, পরিবহন, জনবসতি ইত্যাদির বিশেষ উন্নতি হয়েছে। এখানে সমতল ভূমি ও বহু নদ-নদী থাকায় সড়ক, রেল ও জলপথে পরিবহনের বিশেষ উন্নতি হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় সমভূমির লবণাক্ত ভূমির প্রভাবে বিশাল স্রোতজ বনভূমির সৃষ্টি হয়েছে। এ বনভূমির অর্থনৈতিক গুরুত্ব খুবই বেশি। কারণ দেশের মোট উৎপাদিত কাঠের ৬০% এ বনভূমি থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়া ভগ্ন উপকূলের প্রভাবে এ দেশে দুটি স্বাভাবিক সামুদ্রিক বন্দর গড়ে উঠেছে, যা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প ও ব্যবসায়-বাণিজ্যে সহায়তা করছে।

মানুষের জীবনধারা, সাংস্কৃতিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ওপর ভূপ্রকৃতির প্রভাব: পার্বত্য অঞ্চলের অধিবাসীগণ সাধারণত বলিষ্ঠ, স্বাস্থ্যবান, সাহসী, পরিশ্রমী, উৎসাহী ও কষ্টসহিষ্ণু হয়ে থাকে। পার্বত্য পরিবেশ তাদের দেহ, মন ও চরিত্রের ওপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে। পার্বত্য অঞ্চলে সমভূমির ন্যায় সুন্দর যাতায়াত ব্যবস্থা না থাকায় উঁচু-নিচু স্থান দিয়ে কায়িক পরিশ্রম করে যাতায়াত করতে হয় বলে অধিবাসীগণ বলিষ্ঠ। পার্বত্য কর্মীদের প্রায় বন্যজন্তুর সম্মুখীন হতে হয় বলে তারা খুবই সাহসী। এ কারণে বাংলাদেশের পাহাড়ি অধিবাসীরা অপেক্ষাকৃত বলিষ্ঠ, পরিশ্রমী ও সাহসী। খাদ্যাভাব তাদের দারিদ্য করেছে বটে কিন্তু তারা সৎ। আবার সমভূমি অঞ্চলগুলো সবদিক দিয়ে মানুষের বসবাসের উপযোগী বলে এখানকার জনবসতি ঘন হয়েছে, তেমনি অল্প পরিশ্রমে জীবিকা নির্বাহ করা যায় বলে এ অঞ্চলের অধিবাসীরা অলস প্রকৃতির এবং শ্রমবিমুখ হয়ে থাকে। তবে জীবিকা নির্বাহের জন্য অধিক সময় ব্যয় করতে হয় না বলে এখানকার অধিবাসীরা সাহিত্য, কলা, বিজ্ঞান ইত্যাদি চর্চা করার অধিক সময় পায়।

উপসংহার: ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান দেশটির অস্তিত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। যেমন, এ দেশের সীমানা নিয়ে সামান্য উত্তেজনা বিরাজ করলেও তা অনেক সহজেই মীমাংসা করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে এ দেশের ভূপ্রকৃতি খুবই চমৎকার, যার ওপর নির্ভর করে এ দেশের মানুষের সামগ্রিক জীবনধারা, এর সামান্য একটু ভূপ্রকৃতির বিপর্যয় হলে তা সমগ্র মানুষের জীবনে এক বিপর্যস্ত প্রভাব বিস্তার করে থাকে। অর্থাৎ জাতীয় জীবনের সমগ্র স্তরে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দেয় এবং জীবন ধারণের স্বাভাবিক মাত্রা বিনষ্ট হয়। তাই আমাদের সকলের উচিত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ভূমির ওপর চাপ কমিয়ে প্রকৃতিকে রক্ষা করার জন্য সচেষ্ট হওয়া।