• হোম
  • চাকরি পরীক্ষার প্রস্তুতি

২০তম বিসিএস প্রিলিমিনারি ও লিখিত প্রশ্ন সমাধান ১৯৯৮

  • বিসিএস ১৯৯৮
  • বাংলাদেশ
Back

বাংলাদেশের জনাধিক্যের কারণ ও জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানের উপায় এবং সরকারি নীতিমালা ও পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করুন।

উত্তর: বর্তমান বিশ্বে বহুল আলোচিত ও আলোড়ন সৃষ্টিকারী সমস্যা হলো জনসংখ্যা বিস্ফোরণ ও পারমাণবিক অস্ত্রের প্রসার। ১৯৭৭ সালে বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রেসিডেন্ট রবার্ট ম্যাকনামারা বলেছেন, 'পারমাণবিক যুদ্ধ ব্যতীত বর্তমানে বিশ্ববাসীর সম্মুখে অন্যতম গুরুতর যে সমস্যা তা হলো জনসংখ্যা স্বীতিজনিত সমস্যা। একদিক দিয়ে এটি যুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ। কারণ যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করার উপায় আছে কিন্তু জনসংখ্যা স্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করার কোনো উপায় নেই।' বাংলাদেশ সরকার ১৯৭৬ সালে এ সমস্যাকে জনসংখ্যা বিস্ফোরণ হিসেবে আখ্যায়িত করে 'এক নম্বর সামাজিক সমস্যা' বলে ঘোষণা দিয়েছে। কাজেই এ সমস্যা সমাধান ও মোকাবিলা করার জন্য দ্রুত কার্যক্রম গ্রহণ করা আবশ্যক।

বাংলাদেশে জনাধিক্যের কারণ: জনাধিক্য বাংলাদেশের জন্য এক নম্বর সামাজিক সমস্যা, কিন্তু এ সমস্যার পেছনে কোনো একক কারণ দায়ী নয়। বরং বহুবিধ কারণেই জনসংখ্যা সমস্যা আমাদের দেশে জটিল সামাজিক সমস্যার আকার ধারণ করেছে। যে কোনো দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া দীর্ঘকালের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, ভৌগোলিক প্রভৃতি কারণে সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রধান প্রধান কারণগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ভৌগোলিক কারণ: ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ নাতিশীতোষ। মৌসুমী অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে এ দেশের আবহাওয়ায় অল্প বয়সেই ছেলে মেয়েরা যৌবনপ্রাপ্ত হয় এবং তাদের সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। এছাড়া বাংলাদেশের আবহাওয়া যৌনক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সহায়ক। কাজেই তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশের মানুষেরা অল্প বয়সেই সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা অর্জন করে। সুতরাং ভৌগোলিক অবস্থিতি বাংলাদেশে জনাধিক্যের একটি অন্যতম কারণ।

২. বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ: বাংলাদেশে বিশেষ করে গ্রাম এলাকায় বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের প্রচলন রয়েছে। একটি মহিলা বা মেয়ে ১২ বছর বয়সেই সন্তান ধারণ ক্ষমতা অর্জন করে এবং তা ৪৫ বছর বয়স পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই অল্প বয়সে বিয়ে দিলে সাধারণত সে সন্তান ধারণ করবেই। এভাবে বাল্য ও বহুবিবাহের ফলে পরিবার পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৩. খাদ্যাভ্যাস: বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণ সাধারণত যেসব খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করে থাকে সেগুলো জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী। বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণ অধিক মাত্রায় ভাত, আলু, গম, ডাল ইত্যাদি শ্বেতসার জাতীয় খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ এবং অল্পমাত্রায় আমিষ জাতীয় খাদ্যদ্রব্য গ্রহণ করায় অধিক সন্তান জন্মদানের ক্ষমতা অর্জন করে। সুতরাং খাদ্যাভ্যাসও বাংলাদেশে জনসংখ্যা সমস্যার জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী।

৪. অজ্ঞতা, অশিক্ষা ও অসচেতনতা: বাংলাদেশের বেশির ভাগ জনগণই অজ্ঞ, অশিক্ষিত ও অসচেতন। ফলে এসব জনগণের মধ্যে কুপ্রথা ও কুসংস্কার অতিমাত্রায় বিরাজ করে। তাদের অজ্ঞতার কারণে তারা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক তথা জাতীয় জীবনে অধিক জনসংখ্যার বিরূপ প্রভাব সম্পর্কে বলতে গেলে সম্পূর্ণ অসচেতন, যার ফলে তারা পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করে না। এ কারণে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৫. শিশু মৃত্যুহারের আধিক্য বাংলাদেশে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩৬ জন। এজন্য শিশু সন্তানের মৃত্যুর আশঙ্কায় পিতা-মাতারা দু-একটি সন্তান নিয়ে ভরসা পায় না এবং অধিক সন্তান জন্ম দিয়ে লালন-পালন করতে আগ্রহী হয়।

৬. বৃদ্ধকালীন নিরাপত্তার আশা: বাংলাদেশে বৃদ্ধদের জন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। ফলে পিতা-মাতারা বৃদ্ধকালে সন্তান-সন্ততির ওপর নির্ভর করতে চায়। এভাবে বৃদ্ধকালীন নিরাপত্তার অভাবে বাংলাদেশের অধিকাংশ লোক অধিক সন্তান জন্ম দিয়ে থাকে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।

৭. পুত্রসন্তান কামনা: বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অজ্ঞ ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠী সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণের ক্ষেত্রে পিতা-মাতার ক্রোমোজমজনিত বৈজ্ঞানিক কারণ সম্পর্কে অবহিত নন। সে কারণে সন্তান হওয়া সত্ত্বেও পুত্রসন্তান কামনায় অধিক সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকে।

৮. কৃষিভিত্তিক সমাজ কাঠামো: বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা প্রধানত কৃষিভিত্তিক। গ্রাম এলাকার শ্রমজীবী জনগণের শতকরা ৮০ জনই কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। অধিক সন্তান কৃষি কাজের জন্য খুবই সহায়ক। এজন্য কৃষি কাজের সুবিধার্থে অধিক সন্তান জন্মদানের প্রবণতা আমাদের দেশের অনেক পরিবারে লক্ষ্য করা যায়। ফলে গ্রামাঞ্চলে জনসংখ্যা দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পায়।

৯. ধর্মীয় কারণ: বাংলাদেশে জনাধিক্যের অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কার। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ ও অশিক্ষিত হওয়ায় তারা মাত্রাতিরিক্ত ধর্মভীরু এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের বেড়াজালে আবদ্ধ। তাছাড়া স্বল্প জ্ঞানসম্পন্ন মৌলভী সাহেবরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে থাকেন। তারা বলেন, 'মুখ দিয়েছেন যিনি আহার দিবেন তিনি।' ফলে জনগণ বিয়ে ও সন্তান জন্মদান, লালন-পালনকে পবিত্র কাজ বলে মনে করে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণকে পাপ বলে মনে করেন। এ ধরনের ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির কারণে জনসংখ্যা সমস্যার ব্যাপকতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১০. অর্থনৈতিক কাজে মহিলাদের কম অংশগ্রহণ: বাংলাদেশে নারীশিক্ষার স্বল্পতার কারণে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় অর্থনৈতিক কাজে মহিলাদের অংশগ্রহণ খুবই কম। তারা শুধু গৃহস্থালী কাজেই নিজেদের শ্রম নিয়োগ করে থাকে। ফলে তারা সন্তান প্রতিপালনের জন্য অধিক সময় ব্যয় করতে পারে। এ কারণেও তারা অধিক সন্তানের জন্ম দিয়ে থাকে। পক্ষান্তরে কর্মজীবী মহিলারা অধিক সন্তান জন্ম দিতে উৎসাহিত হয় না। সুতরাং অর্থনৈতিক কাজে মহিলাদের কম অংশগ্রহণও বাংলাদেশে জনাধিক্যের জন্য দায়ী।

১১. অর্থনৈতিক কারণ: বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য অর্থনৈতিক বিভিন্ন কারণও ব্যাপকভাবে দায়ী। বাংলাদেশে বিশেষ করে পুত্র সন্তান অর্থনৈতিক আয়ের জন্য খুবই সহায়ক। কারণ তারা একটু বড় হলেই অর্থকরী উপার্জন করতে সক্ষম হয়। এছাড়া পুত্রসন্তান যৌতুক লাভের জন্য সহায়ক। তাই পুত্রসন্তান লাভের জন্য অর্থনৈতিক কারণে অনেকে জন্মনিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে না।

১২. রাজনৈতিক কারণ: উন্নয়নশীল দেশসমূহে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ দরিদ্র ও অভাবগ্রস্ত লোকদের সহজেই নির্বাচনের প্রচারণা, সভা-সমাবেশ ও আন্দোলনে প্রভাবিত করা সহজ হয়। পাশাপাশি ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে তাদেরকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা সহজ হয়। সুতরাং পরোক্ষভাবে জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়ে রাজনীতির ভূমিকা রয়েছে।

জনাধিক্য সমস্যা সমাধানের উপায়: জনসংখ্যা স্ফীতি বাংলাদেশের জন্য একটি জটিল সামাজিক সমস্যা। এ সমস্যা একক কোনো প্রচেষ্টায় মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, বরং বহুমুখী প্রচেষ্টার মাধ্যমে মোকাবিলা করতে হবে। সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে জনসংখ্যা সমস্যা মোকাবিলা করার উপায়গুলো পরবর্তী আলোচনা করা হলো:

১. জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন জনাধিক্য সমস্যা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যা নীতির মাধ্যমে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে সুশৃঙ্খল ও যথাযথভাবে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। তবেই জনসংখ্যা সমস্যার মতো জটিল সমস্যাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সহজ হবে।

২. শিক্ষার প্রসার: শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটিয়েও জনসংখ্যা সমস্যার মোকাবিলা সম্ভব। জনগণ যাতে অধিক জনসংখ্যার কুফল এবং সীমিত জনসংখ্যার সুফল সম্পর্কে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে সেজন্য জনগণের মাঝে শিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটাতে হবে।

৩. কৃষির আধুনিকীকরণ: বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থা এখনো অনুন্নত এবং সনাতন পন্থায় প্রবাহিত হচ্ছে। এ পন্থায় চাষাবাদ করতে অধিক সংখ্যক শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ফলে গ্রাম্য কৃষকেরা কৃষি কাজের সুবিধার্থে অধিক সন্তান জন্ম দেয়। কাজেই জনসংখ্যাকে কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে হলে কৃষিব্যবস্থাকে আধুনিকীকরণ করতে হবে, যাতে কৃষক সমাজে সন্তান জন্মদানের প্রবণতা হ্রাস পায়।

৪. বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ রোধ: জনাধিক্য সমস্যা প্রতিরোধকল্পে দেশে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহ প্রথা প্রতিরোধ করতে হবে। প্রয়োজনবোধে বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিবাহের বয়স আইনের মাধ্যমে ছেলেদের জন্য সর্বনিম্ন ২৫ এবং মেয়েদের জন্য সর্বনিম্ন ২২ বছর নির্ধারণ করতে হবে।

৫. ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষই প্রচণ্ড ধর্মভীরু। অধিকাংশ মুসলমান বিবাহ ও সন্তান জন্মদানকে পবিত্র কাজ বলে মনে করে এবং পরিবার পরিকল্পনার পদ্ধতি গ্রহণকে নাজায়েজ কাজ বলে মনে করে। তাই সহজ ও বোধগম্য ভাষায় ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্যাদি প্রচারের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে এসব ধর্মভীরু জনগণের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আসে।

৬. গঠনমূলক চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ: চিত্তবিনোদনের অভাব বাংলাদেশে, বিশেষ করে গ্রামবাংলার জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। তাই গ্রামীণ পর্যায়ে গঠনমূলক চিত্তবিনোদনের ব্যবস্থা পরিকল্পিত উপায়ে সম্প্রসারণ করতে হবে, যাতে গ্রামবাংলার দরিদ্র জনগণ শুধু স্ত্রীসহবাসকে চিত্তবিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে।

৭. চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা: বাংলাদেশে অধিক শিশু মৃত্যুর কারণে দম্পতিরা অধিক শিশুর জন্ম দিয়ে থাকে। তাই শিশুমৃত্যু রোধকল্পে পর্যাপ্ত পরিমাণে চিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। জনসংখ্যানীতি অনুযায়ী দুটি সন্তানের জন্মদান এবং তাদের বাঁচিয়ে রাখার নিশ্চয়তা যাতে জনগণ লাভ করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. পুরস্কার প্রদান: ব্যক্তিগত, দলগত ও সমষ্টিগতভাবে জনসংখ্যা নীতির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে অবদান রাখার জন্য পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণকারীদের পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অন্যরাও পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহিত হবে। ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার অনেকটা হ্রাস পাবে।

৯. সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সম্প্রসারণ: ভবিষ্যৎ ও বৃদ্ধ বয়সে নিরাপত্তাহীনতার কারণে যাতে জনগণ অধিক সন্তানের জন্ম না দেয়, তার জন্য দেশে ব্যাপক সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু ও সম্প্রসারণ করতে হবে।

১০. পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির সম্প্রসারণ: দেশে আরো ব্যাপক হারে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচির তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। আরো অধিক সংখ্যক ক্লিনিক সৃষ্টি, মাঠকর্মী ও বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং উন্নত যন্ত্রপাতি ও ওষুধপত্রের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি জনগণের কাছে সহজসাধ্য হবে এবং তারা অধিক হারে এ পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবে। এর মাধ্যমে জনসংখ্যা সমস্যা অনেকাংশেই সমাধান করা সম্ভব হবে।

জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারি নীতিমালা ও পদ্ধতিসমূহ: বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সর্বোত্তম পন্থা হচ্ছে পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণ করা। বাংলাদেশে জনসংখ্যা সমস্যা সমাধানকল্পে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। নিচে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত নীতিমালা ও পদ্ধতিসমূহ আলোচনা করা হলো:

ক. নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন: বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির উচ্চহার কমিয়ে আনার জন্য সরকারি পর্যায়ে নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। সরকারের এ নীতিমালার দুটি দিক রয়েছে। যেমন:

১. গর্ভরোধ পদ্ধতির বর্ধিত চাহিদা পূরণে পর্যাপ্ত ও সহজ গর্ভনিরোধ পদ্ধতির ব্যবস্থা করা এবং

২. স্বাস্থ্য, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও আইনগত ব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণের নতুন চাহিদা সৃষ্টি করা

খ. বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন বাংলাদেশে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য ও নীতিমালার সফল বাস্তবায়নের কৌশল হিসেবে নিচের উপায়গুলো সরকারিভাবে গ্রহণের ব্যবস্থা করা হয়েছে:

১. গর্ভনিরোধ সেবাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন সাধন;

২. মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের প্রতি সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া;

৩. বহুমুখী শিক্ষা কার্যক্রমের মাধ্যমে অক্ষরজ্ঞানের পর্যায় বৃদ্ধি করা;

৪. শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক কার্যক্রমের সকল স্তরে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ও বৃদ্ধি করা;

৫. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জনগণের সর্বাত্মক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা;

৬. ছোট পরিবার গঠনে উৎসাহ ও বড় পরিবার গঠনে নিরুৎসাহ প্রদান করা এবং

৭. সরকারি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণবিষয়ক কর্মসূচির সমর্থনে সহযোগিতা প্রদানে বেসরকারি সংস্থাগুলোর ভূমিকা জোরদার করা।

গ. পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করা: পরিবার পরিকল্পনা ও মাতৃ-শিশু স্বাস্থ্য কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ইউনিয়ন পর্যায়ে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। বর্তমানে ডিসপেনসারি ও উপকেন্দ্রগুলোকে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে উন্নীত করার কাজ চলছে।

ঘ. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম: বাংলাদেশ সরকারের গৃহীত জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমগুলোকে নিচের দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করা যায়:

১. মাঠ পর্যায়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা;

২. জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকল্পে প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা;

৩. সেবা প্রদান কার্যক্রম পরিচালনা করা;

৪. পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা।

৫. গবেষণা কার্যক্রম: বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নতুন নতুন পন্থা বা পদ্ধতি উদ্ভাবনের জন্য গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়ে থাকে।

গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে:

১. প্রজনন ক্ষমতার পর্যায়, গতি নির্ধারক ও ফলাফল সম্পর্কিত সামাজিক ও জনসংখ্যাবিষয়ক গবেষণা;

২. কার্যক্রম পরিচালনা ও নির্দিষ্ট কর্মসূচিবিষয়ক গবেষণা;

৩. প্রজনন ও গর্ভনিরোধ গবেষণা এবং

৪. জনসংখ্যা প্রকল্পগুলোর সফলতা ও ব্যর্থতা মূল্যায়ন গবেষণা।

চ. বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গৃহীত কার্যক্রম: জনসংখ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম বাস্তবায়নে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় স্ব স্ব কার্যক্রমের মাধ্যমে বিশেষভাবে সহায়তা করে থাকে। যেমন:

১. স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় স্বাস্থ্য ও জনসংখ্যার সমন্বিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক স্বাস্থ্য সুবিধাদি প্রদান করে।

২. পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় জনসংখ্যা পরিকল্পনা, দলিল প্রণয়ন, উন্নয়ন, পরিকল্পনায় জনসংখ্যা বিষয়ক উপাদানগুলোর একীভূতকরণ, জনসংখ্যা কর্মসূচি মূল্যায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ উপায় সংক্রান্ত জনসংখ্যা শিক্ষার দায়িত্ব পালন করে থাকে।

৩. পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নের জন্য উপজেলা ও গ্রাম পর্যায়ে নিয়োজিত বিভিন্ন জাতি গঠনমূলক ও কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে সমন্বয় সাধন করে থাকে।

সরকারের উপরিউক্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ব্যতীত অন্যান্য মন্ত্রণালয়, United Nations Population Fund (UNFPA) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে সহায়তা করে থাকে।

উপসংহার: জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে অন্যতম সামাজিক সমস্যা। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের এক দীর্ঘমেয়াদি প্রেক্ষিত সমীক্ষা রিপোর্টে বাংলাদেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্যে নামিয়ে আনার প্রতি গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে, এক্ষেত্রে এক দশক বিলম্বে ৪ থেকে ৫ কোটি অতিরিক্ত জনসংখ্যা যোগ হবার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এ সমস্যা সমাধানকল্পে সরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কর্মসূচির পাশাপাশি দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সমাজকর্মী এবং সর্বস্তরের বিবাহিত দম্পতিদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা উচিত।

সম্পর্কিত প্রশ্ন সমূহ