- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজি
তেরো শতকের শুরুতে তুর্কি সেনাপতি ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বখতিয়ার খলজি বাংলার উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাংশে সেন শাসনের অবসান ঘটিয়ে মুসলমান শাসনের সূচনা করেন। তাঁর বাল্য পরিচয় সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। উত্তর আফগানিস্তানের গরমশির (আধুনিক দাসত-ই মার্গ) এর বাসিন্দা মুহাম্মদ বখতিয়ার ছিলেন জাতিতে তুর্কি, বংশে খলজি এবং পেশায় সৈনিক।
বখতিয়ার খলজি ১১৯৫ খ্রিষ্টাব্দে আফগানিস্তানের গজনিতে আসেন। সেখানে তিনি শিহাবউদ্দিন ঘুরির সৈন্য বিভাগে চাকরিপ্রার্থী হয়ে ব্যর্থ হন। গজনিতে ব্যর্থ হয়ে বখতিয়ার দিল্লিতে সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবেকের নিকটে উপস্থিত হন। এবারও তিনি চাকরি পেতে ব্যর্থ হন। এরপর তিনি বদাউনে যান। সেখানকার শাসনকর্তা মালিক হিজবরউদ্দিন তাকে মাসিক বেতনে সৈন্য বিভাগে নিযুক্ত করেন। কিন্তু মেধাবী বখতিয়ার এ ধরনের সামান্য বেতনভোগী সৈনিকের পদে সন্তুষ্ট থাকতে পারেননি। অল্পকাল পর তিনি বদাউন ত্যাগ করে অযোধ্যা যান। সেখানকার শাসনকর্তা হুসামউদ্দিনের অধীনে তিনি পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। বখতিয়ারের সাহস ও বুদ্ধিমত্তায় সন্তুষ্ট হয়ে হুসামউদ্দিন তাকে বর্তমান ভারতের মির্জাপুর জেলার দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ভাগবত ও ভিউলি নামক দুটি পরগনার জায়গির দান করেন।
সেখানে বখতিয়ার খলজি তাঁর ভবিষ্যৎ উন্নতির উৎস খুঁজে পান। ভাগবত ও ভিউলি তার শক্তিকেন্দ্র হয়ে ওঠে। বখতিয়ার খলজি অল্পসংখ্যক সৈন্য সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য আক্রমণ করতে শুরু করেন। এ সময়ে তার বীরত্বের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসলমান তার সৈন্যদলে যোগদান করে। ফলে বখতিয়ারের সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। এভাবে পার্শ্ববর্তী এলাকায় অভিযান চালিয়ে তিনি দক্ষিণ বিহারে এক প্রাচীরঘেরা দুর্গের মতো স্থানে আসেন এবং দখল করেন। প্রতিপক্ষ কোনো বাধাই দিল না। দুর্গ দখলের পর তিনি দেখলেন যে, দুর্গের অধিবাসীরা সকলেই মুণ্ডিত মস্তক এবং দুর্গটি বইপত্রে ভরা। জিজ্ঞাসা করে তিনি জানতে পারলেন যে, তিনি এক বৌদ্ধ বিহার জয় করেছেন। এটি ছিল ওদন্দ বিহার বা ওদন্তপুরী বিহার। প্রাচীনকালে এগুলিই ছিল শিক্ষা-দীক্ষা ও ধর্মচর্চার স্থান। অনেক ঐতিহাসিক এগুলিকে প্রাচীনকালের বিশ্ববিদ্যালয় মনে করেন। এ সময় থেকেই মুসলমানেরা এ স্থানের নাম দেন বিহার। আজ পর্যন্ত তা বিহার নামে পরিচিত।
বিহার দখলের পর বখতিয়ার অনেক ধনরত্নসহ দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন আইবকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সুলতান কর্তৃক সম্মানিত হয়ে তিনি বিহারে ফিরে যান। অধিক সৈন্য সংগ্রহ করে তিনি পরের বছর নবদ্বীপ বা নদীয়া আক্রমণ করেন। এ সময় বাংলার রাজা লক্ষণ সেন নদীয়ায় অবস্থান করছিলেন। নদীয়া ছিল তাঁর অবকাশকালীন রাজধানী। বখতিয়ার কর্তৃক ওদন্তপুরী বিহার দখলের পর সেন সাম্রাজ্যে গভীর ভীতি বিদ্যমান ছিল। দৈবজ্ঞ, পণ্ডিত ও ব্রাহ্মণগণ রাজা লক্ষণ সেনকে রাজধানী ত্যাগ করতে পরামর্শ দেন। তাদের শাস্ত্রে তুর্কি সেনা কর্তৃক বঙ্গ আক্রমণের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। এছাড়া আক্রমণকারীর যে বর্ণনা শাস্ত্রে আছে, তার সঙ্গে বখতিয়ারের দেহের বর্ণনা একেবারে মিলে যায়।
বিহার থেকে বাংলায় প্রবেশ করতে হলে তেলিয়াগড় ও শিকড়িগড়-এই দুই গিরিপথ দিয়ে আসতে হতো। এ গিরিপথ দুটো ছিল সুরক্ষিত। বিচক্ষণ ও কৌশলী বখতিয়ার খলজি প্রচলিত পথে অগ্রসর না হয়ে অরণ্যময় এলাকার মধ্য দিয়ে সৈন্যদল নিয়ে খন্ড খন্ড ভাবে অগ্রসর হয়।
এভাবে বখতিয়ার খলজি যখন নদীয়ার দ্বারপ্রান্তে উপস্থিত হলেন, তখন তাঁর সঙ্গে ছিল মাত্র ১৭ কিংবা ১৮ জন অশ্বারোহী সৈনিক। কথিত আছে, তিনি এত ক্ষিপ্রগতিতে পথ অতিক্রম করেছিলেন যে, মাত্র ১৭/১৮ জন সৈনিক তাকে অনুসরণ করতে পেরেছিল। আর মূল সেনাবাহিনীর বাকি অংশ তাঁর পশ্চাতেই ছিল।
অকস্মাৎ আক্রমণে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়। প্রাসাদ অরক্ষিত রেখে সকলে প্রাণভয়ে পালিয়ে যায়। ইতোমধ্যে বখতিয়ারের দ্বিতীয় দল নগরের মধ্যে এবং তৃতীয় দল তোরণ-দ্বারে এসে উপস্থিত হয়। সমস্ত নগরী তখন প্রায় অবরুদ্ধ। জনগণ ভীত-সন্ত্রস্ত। এ অবস্থায় রাজা লক্ষণ সেন বখতিয়ারের আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার কোনো উপায় নেই দেখে নৌকাযোগে পালিয়ে পূর্ববঙ্গের বিক্রমপুরে (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ জেলা) আশ্রয় গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের মধ্যে বখতিয়ার খলজির পশ্চাদ্গামী অবশিষ্ট সৈন্যদলও এসে উপস্থিত হলে বিনা বাধায় নদীয়া ও পার্শ্ববর্তী এলাকা মুসলমানদের দখলে আসে। বখতিয়ার খলজির নদীয়া জয়ের সঠিক তারিখ সম্বন্ধে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে। তবে বর্তমানে ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দই নদীয়া জয়ের সময় হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
এরপর বখতিয়ার নদীয়া ত্যাগ করে লক্ষণাবতীর (গৌড়) দিকে অগ্রসর হন। তিনি লক্ষণাবতী জয় করে সেখানেই রাজধানী স্থাপন করেন। লক্ষণাবতীই মুসলমান আমলে লখনৌতি নামে পরিচিত হয়। গৌড়ের পর বখতিয়ার আরও পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে বরেন্দ্র বা উত্তর বাংলায় নিজ অধিকার বিস্তার করেন। লক্ষণ সেনের মৃত্যুর পর তাঁর বংশধররা আরও কিছুদিন পূর্ববঙ্গ শাসন করেছিলেন।
গৌড় বা লখনৌতি বিজয়ের দুই বছর পর বখতিয়ার খলজি তিব্বত অভিযানে বের হন। তিব্বত অভিযানই ছিল তাঁর জীবনের শেষ সমর অভিযান। কিন্তু তাঁর এ অভিযান ব্যর্থ হলে তিনি দেবকোটে ফিরে আসেন। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুমুখে পতিত হন। অনুমান করা হয় আলি মর্দান নামে একজন আমির তাঁকে হত্যা করেছিল।
বাংলায় মুসলমান শাসনের ইতিহাসে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজির নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর প্রচেষ্টার ফলেই ভারতের পূর্বাংশে প্রথম মুসলমানদের রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এ শাসন প্রায় সাড়ে পাঁচ'শ বছরের অধিক স্থায়ী হয়েছিল (১২০৪-১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দ)। রাজ্য জয় করেই বখতিয়ার খলজি ক্ষান্ত হননি, বিজিত অঞ্চলে তাঁর শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্যও তিনি যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এতঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সংস্কৃতি বিকাশের জন্য তিনি ভূমিকা রাখেন। তাঁর শাসনকালে মাদ্রাসা, মক্তব, মসজিদ নির্মিত হয়েছিল বলে জানা যায়।
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

