- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ
১৩৪২ খ্রিষ্টাব্দে ফিরোজাবাদের সিংহাসন অধিকারের মাধ্যমে ইলিয়াস শাহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম বাংলার অধিপতি হন। সোনারগাঁ ও সাতগাঁও তখনও তাঁর শাসনের বাইরে ছিল। ইলিয়াস শাহের স্বপ্ন ছিল সমগ্র বাংলার অধিপতি হওয়া। তিনি প্রথম দৃষ্টি দেন বাংলার পশ্চিম দিকে। ১৩৪৬ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বে সাতগাঁও তাঁর অধিকারে আসে। ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে নেপাল আক্রমণ করে বহু ধনরত্ন হস্তগত করেন। এ সময় তিনি ত্রিহুত বা উত্তর বিহারের কিছু অংশ জয় করে বহু ধনরত্ন হস্তগত করেন। উড়িষ্যাও তাঁর অধিকারে আসে। তবে ইলিয়াস শাহের সাফল্য ছিল বাংলার পূর্ব দিকের কিছু অংশ দখল করা।
ইখতিয়ার উদ্দিন গাজি শাহ ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে সোনারগাঁয়ে ইলিয়াস শাহের হাতে পরাজিত হন। সোনারগাঁ দখলের মাধ্যমে সমগ্র বাংলার অধিকার সম্পন্ন হয়। তাই বলা হয়, ১৩৩৮ খ্রিষ্টাব্দে ফখরুদ্দিন মুবারক শাহ বাংলার স্বাধীনতার সূচনা করলেও প্রকৃত স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠা করেন ইলিয়াস শাহ ১৩৫২ খ্রিষ্টাব্দে। বাংলার বাইরেও বিহারের কিছু অংশ- চম্পারণ, গোরক্ষপুর এবং কাশী ইলিয়াস শাহ জয় করেছিলেন। কামরূপের কিছু অংশও তিনি জয় করেন। মোটকথা, তাঁর রাজ্যসীমা আসাম থেকে বারাণসী পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে ইলিয়াস শাহ দিল্লির মুসলমান শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিজ নামে খুতবা পাঠ ও মুদ্রা জারি করায় সুলতান ফিরুজ শাহ তুঘলক অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন।
প্রথম দিকে দিল্লির সুলতান বাংলার এ স্বাধীনতা মেনে নেননি। সুলতান ফিরুজ শাহ তুঘলক ১৩৫৩ থেকে ১৩৫৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইলিয়াস শাহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। তাঁর চেষ্টা ছিল বাংলাকে দিল্লির মুসলিম অধিকারে নিয়ে আসা। কিন্তু তিনি সফল হননি। ইলিয়াস শাহ দুর্ভেদ্য একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এদিকে বর্ষা এলে জয়ের কোনো সম্ভাবনা না থাকায়, ফিরোজ শাহ সন্ধির মাধ্যমে বাংলার স্বাধীনতাকে মেনে নিয়ে ইলিয়াস শাহের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে দিল্লি ফিরে যান।
শাসক হিসেবে ইলিয়াস শাহ ছিলেন বিচক্ষণ ও জনপ্রিয়। তাঁর শাসনামলে রাজ্যে শান্তি ও শৃঙ্খলা বিরাজিত ছিল। হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। হাজিপুর নামক একটি শহর তিনি নির্মাণ করেছিলেন। ফিরোজাবাদের বিরাট হাম্বামখানা তিনিই নির্মাণ করেন। এ আমলে স্থাপত্য শিল্প ও সংস্কৃতি যথেষ্ট পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিল। তিনি ফকির-দরবেশদের খুব শ্রদ্ধা করতেন।
ইলিয়াস শাহ লখনৌতির শাসক হিসেবে বঙ্গ অধিকার করলেও গোটা ভূখণ্ডকে একত্রিত করে আঞ্চলিক বৃহত্তর বাংলা সৃষ্টি করেছিলেন। এ সময় থেকেই বাংলার সকল অংশের অধিবাসী 'বাঙালি' বলে পরিচিত হয়। ইলিয়াস শাহ 'শাহ-ই বাঙ্গালা' ও 'শাহ-ই-বাঙালিয়ান' উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তখন থেকেই বাংলাদেশ একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রসত্তা হিসেবে বিকশিত হতে শুরু করে। রাষ্ট্রসত্তা এবং অখন্ড ভৌগলিক অঞ্চলকে কেন্দ্র করে জাতিসত্তা রূপ লাভ করে।
একক কাজ: সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহ এর জীবন ও কর্ম মূল্যায়ন করো।
শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ (১৩৫৮-১৩৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার সিংহাসনে বসেন। পিতার মতো তিনিও দক্ষ এবং শক্তিশালী শাসক ছিলেন। দিল্লির সুলতান ফিরোজ শাহ তুঘলক ১৩৫৮ থেকে ১৩৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত পুনরায় বাংলা আক্রমণ করেন। কিন্তু এবারও ফিরোজ শাহ তুঘলককে ব্যর্থ হতে হয়। পিতার মতো সিকান্দার শাহও একডালা দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধির মাধ্যমে দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। সন্ধির শর্ত অনুযায়ী জাফর খানকে সোনারগাঁয়ের শাসন ক্ষমতা গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয়।
কিন্তু জাফর খান এ পদ গ্রহণে রাজী হলেন না। ফিরোজ শাহ তুঘলকের সঙ্গে তিনিও দিল্লিতে ফিরে গেলেন। সোনারগাঁ এবং লখনৌতিতে আবার আগের মতোই সিকান্দার শাহের কর্তৃত্ব অক্ষুণ্ণ রইল। ইলিয়াস শাহ যে স্বাধীন সুলতানি শাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সিকান্দার শাহ সেভাবেই একে আরও শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করতে সক্ষম হন। তাঁর ৩৫ বছরের রাজত্বকাল নানা দিক থেকে বাংলার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য। পাণ্ডুয়ার আদিনা মসজিদ তাঁর স্থাপত্যকীর্তির একটি নিদর্শন।
সুলতান সিকান্দার শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র গিয়াসউদ্দিন 'আজম শাহ' (১৩৯৩-১৪১১ খ্রিষ্টাব্দ) উপাধি গ্রহণ করে বাংলার সিংহাসনে বসেন। ইলিয়াস শাহ ও সিকান্দার শাহ যুদ্ধবিগ্রহ ও স্বাধীনতা রক্ষায় নিজেদের দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের কৃতিত্ব ছিল অন্যত্র। তিনি তাঁর প্রজারঞ্জক ব্যক্তিত্বের জন্য খ্যাতি অর্জন করেছেন। তিনি তাঁর রাজত্বকালে আসামে বিফল অভিযান প্রেরণ করেন। জৌনপুরের রাজা খান জাহানের সঙ্গে তিনি বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। চীনা সম্রাট ইয়াংলো তাঁর দরবারে প্রতিনিধি দল প্রেরণ করেন। এ প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য ছিলেন মাহুয়ান। তিনি য়িং-য়াই-শেন-লান, নামে চীনা ভাষায় বাংলার ভ্রমণ বৃত্তান্ত রচনা করেন। তিনিও শুভেচ্ছার নিদর্শন হিসেবে চীনা সম্রাটের নিকট মূল্যবান উপঢৌকন প্রেরণ করেন। মোটকথা, আজম শাহ কোনো যুদ্ধে না জড়ালেও পিতা এবং পিতামহের গড়া বিশাল রাজত্বকে অটুট রাখতে পেরেছিলেন। সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ একজন ন্যায়বিচারক ছিলেন। রিয়াজ-উস-সালাতিন গ্রন্থে তাঁর ন্যায় বিচারের কাহিনির বর্ণনা আছে।
শিক্ষা ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের যথেষ্ট সুখ্যাতি ছিল। কবি-সাহিত্যিকগণকে তিনি সমাদর ও শ্রদ্ধা করতেন। তিনি কাব্যরসিক ছিলেন এবং বাংলার সুলতান হলেও নিজে ফার্সি ভাষায় কবিতা রচনা করতেন। পারস্যের প্রখ্যাত কবি হাফিজের সঙ্গে তাঁর পত্রালাপ হতো।
মুসলমান শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ এবং বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার জন্য গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ বঙ্গের ইতিহাসে এক বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। তাঁর রাজত্বকালেই শাহ্ মুহম্মদ সগীর 'ইউসুফ-জুলেখা' কাব্য রচনা করেন। আজম শাহের রাজত্বকালেই বিখ্যাত সুফি সাধক নূর কুতুব-উল-আলম পাণ্ডুয়ায় আস্তানা গড়ে তোলেন। ফলে পাণ্ডুয়া ইসলাম শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিল। সুলতান মক্কা ও মদিনাতেও মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণের জন্য অর্থ ব্যয় করতেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ব্যর্থতা সত্ত্বেও গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ ছিলেন বঙ্গের সুলতানদের অন্যতম এবং ইলিয়াস শাহি বংশের শেষ প্রভাবশালী সুলতান। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই এ বংশের পতন শুরু হয়। সোনারগাঁয়ে তার সমাধি রয়েছে।
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

