- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
পরবর্তী ইলিয়াস শাহি বংশ শাসন
শামসুদ্দিন আহমদ শাহের মৃত্যুর পর তার অন্যতম হত্যাকারী ক্রীতদাস নাসির খান বাংলার সিংহাসনে বসেন। কিন্তু আহমদ শাহকে হত্যা করার ব্যাপারে যে অভিজাতবর্গ ইন্ধন দেয়, তারা নাসির খানের সিংহাসনে আরোহণকে খুশি মনে গ্রহণ করতে পারেনি। সম্ভবত ক্রীতদাসের আধিপত্যকে তারা অপমানজনক মনে করেছিল। তাই তারা ঐক্যবদ্ধ হয়ে নাসির খানকে হত্যা করে।
নাসির খান নিহত হওয়ার পর গৌড়ের সিংহাসন কিছু সময়ের জন্য শূন্য অবস্থায় পড়ে রইল। আহমদ শাহের কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। অতঃপর অভিজাতবর্গ মাহমুদ নামে ইলিয়াস শাহের এক বংশধরকে ১৪৫২ খ্রিষ্টাব্দে গৌড়ের সিংহাসনে বসায়। ইতিহাসে তিনি নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ নামে পরিচিত। ইলিয়াস শাহের বংশধরগণ এভাবে পুনরায় স্বাধীন রাজত্ব শুরু করেন। তাই এ যুগকে বলা হয় 'পরবর্তী ইলিয়াস শাহি যুগ'। নাসিরউদ্দিন একজন দক্ষ সেনাপতি ও ন্যায়পরায়ণ শাসক ছিলেন। যশোর ও খুলনা এলাকা নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল। পশ্চিম বঙ্গ, পূর্ব বঙ্গ, উত্তর বঙ্গ ও বিহারের কিছু অংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল। তিনি নিজ নামে মুদ্রাও প্রচলন করেছিলেন।
১৪৫৯ খ্রিষ্টাব্দে নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহ মৃত্যুবরণ করেন। এরপর তাঁর পুত্র রুকনউদ্দিন বরবক শাহ বাংলার সিংহাসনে বসেন। পিতার রাজত্বকাল থেকেই বরবক শাহ শাসক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তখন তিনি ছিলেন সাতগাঁওয়ের শাসনকর্তা। তাঁর রাজত্বকালে বাংলার রাজ্যসীমা অনেক বৃদ্ধি পায়। গঙ্গা নদীর উত্তরাংশ তাঁর সাম্রাজ্যভুক্ত ছিল।
ভাগলপুর বরবক শাহের সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। চট্টগ্রামের কর্তৃত্ব নিয়ে গোলযোগ ছিল। বরবক শাহের রাজত্বকালের প্রথম দিকে এটি আরাকান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। কিন্তু শেষ দিকে বরবক শাহ তা পুনরুদ্ধার করেন। যশোর ও খুলনা তাঁর অধিকারে ছিল। তিনি দক্ষিণ দিকেও তাঁর রাজ্য বিস্তৃত করেছিলেন।
বরবক শাহই প্রথম অসংখ্য আবিসিনীয় ক্রীতদাস (হাবসি ক্রীতদাস) সংগ্রহ করে সেনাবাহিনী ও রাজপ্রাসাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেন। নিয়োগকৃত এ হাবসি ক্রীতদাসের সংখ্যা ছিল আট হাজার। তিনি সম্ভবত রাজ্যে একটি নিজস্ব দল গঠনের উদ্দেশ্যে এই হাবসিদের নিয়ে বাহিনী গঠন করেছিলেন। কিন্তু তাঁর এ ব্যবস্থা ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যের জন্য বিপদ ডেকে আনে।
সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহ একজন পণ্ডিত ছিলেন। বিভিন্ন শিলালিপিতে তাঁর নামের পাশে নিজ নামে এবং বিভিন্ন রাজকীয় 'আল-ফাজিল' ও 'আল-কামিল' এ দুই উপাধির উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, বরবক শাহ শিক্ষাক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উপাধি লাভ করেছিলেন। তিনি শুধু পণ্ডিতই ছিলেন না, সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকও ছিলেন। হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মেরই বিদ্বান ও পণ্ডিত ব্যক্তি তাঁর পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেছিলেন। তিনি যে একজন উদার ও অসাম্প্রদায়িক মনের নরপতি ছিলেন তা হিন্দু কবি-পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বহু হিন্দুকে উচ্চ রাজপদে নিয়োগ করা থেকে বোঝা যায়। প্রাচীনকালে এই একইভাবে বৌদ্ধরা হিন্দুদের এবং হিন্দুরা বৌদ্ধদের রাজপদে নিয়োগ করতেন। যাহোক, বরবক শাহের মতো মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন শাসক শুধু বাংলার ইতিহাসে নয়, ভারতবর্ষের ইতিহাসে কমই দেখা গেছে।
বরবক শাহ একজন প্রকৃত সৌন্দর্যরসিক ছিলেন। গৌড়ের 'দাখিল দরওয়াজা' নামে পরিচিত বিরাট ও সুন্দর তোরণটি বরবক শাহই নির্মাণ করিয়েছিলেন। এ আমলে চট্টগ্রাম এবং পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জে দুইটি মসজিদ নির্মিত হয়েছিল। এ সমস্ত কার্যক্রম বিবেচনা করলে বঙ্গের সুলতানদের মধ্যে বরবক শাহকে অন্যতম বলা যায়।
১৪৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বরবক শাহ পরলোকগমন করেন। পরে তাঁর পুত্র সামসুদ্দিন আবু মুজাফফর ইউসুফ শাহ (১৪৭৪-১৪৮১ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার সুলতান হন। পিতা ও পিতামহের গড়া বিশাল সাম্রাজ্য তাঁর সময় অক্ষুণ্ণ ছিল। তাঁর রাজ্য পশ্চিমে উড়িষ্যা এবং পূর্বে সিলেট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।
ইউসুফ শাহের মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সিকান্দার শাহ সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে অপসারণ করা হয়। বরবক শাহের ছোট ভাই হুসাইন 'জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ' উপাধি ধারণ করে সিংহাসনে আরোহণ করেন (১৪৮১-১৪৮৭ খ্রিষ্টাব্দ)। তিনি নিজ নামে মুদ্রা প্রবর্তন করেন। কিন্তু এ সময় রাজদরবারে দুর্যোগ দেখা দেয়। হাবসি ক্রীতদাসরা এ সময় খুব ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে। তাদের প্রতিপত্তি কমানোর জন্য জালালউদ্দিন ফতেহ শাহ চেষ্টা করেন। এতে সমস্ত হাবসি ক্রীতদাস একজোট হয়ে সুলতানের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। সুলতান শাহজাদা ছিলেন প্রাসাদরক্ষী দলের প্রধান। ক্রীতদাসরা প্রলোভন দ্বারা সুলতান শাহজাদা ও তার অধীনস্থ পাইকদের নিজ দলভুক্ত করে। শাহজাদা রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে ফতেহ শাহকে হত্যা করেন। ফতেহ শাহ নিহত হলে বাংলার সিংহাসনে ইলিয়াস শাহি বংশের শাসনকালের পরিসমাপ্তি ঘটে। বাংলায় হাবসিদের রাজত্বের সূচনা হয়।
একক কাজ: সুলতান রুকনউদ্দিন বরবক শাহের কোন পদক্ষেপ মানুষের জন্য হিতকর ছিল তা অনুসন্ধান করো।
মধ্যযুগের বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাস (১২০৪-১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দ) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

