• হোম
  • একাডেমি
  • সাধারণ
  • নবম-দশম শ্রেণি
  • ১৯৭১ (উপন্যাস)
১৯৭১ (উপন্যাস)

পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।

Back

উপন্যাস কী?

'উপন্যাস' সাহিত্যের একটি সংজ্ঞা বা পরিভাষা। সাহিত্যের অনেকগুলো রূপ। তার মধ্যে কবিতা, নাটক, প্রবন্ধ, উপন্যাস ও গল্প এ পাঁচটি প্রধান। জনপ্রিয়তার দিক থেকে এবং জীবনের বৃহত্তর পটভূমিকে কার্যকরভাবে উপস্থাপনার সক্ষমতায় উপন্যাসকে অনেকে আধুনিক যুগের সবচেয়ে সফল সাহিত্যরূপ বলে মনে করেন।

উপন্যাসে কাহিনি থাকে। কাহিনি ঘটনার সমষ্টি। নির্দিষ্ট স্থান ও কালের মিলনবিন্দুতে এক-একটি ঘটনা ঘটে। এ ধরনের অনেকগুলো ঘটনার সমবায়ে কাহিনি গড়ে ওঠে। তবে কাহিনিমাত্রই উপন্যাস নয়। উপন্যাসে কাহিনিকে বিভিন্নভাবে সাজানো হয়। পরের ঘটনা আগে আসে, আগেরটা পরে। বিভিন্ন উপকাহিনি বা সমান্তরাল কাহিনি যুক্ত হয়। কাহিনির এ বিন্যাস বা সজ্জাকে বলা হয় প্লট। কাহিনিতে যখন একের পর এক ঘটনা ঘটে, তখন আমরা একটি ঘটনাকে আরেকটি ঘটনার সাপেক্ষে পাঠ করি। আমাদের মনে এ উপলব্ধি হয় যে, একটি ঘটনা আরেকটি ঘটনার সাথে কার্যকারণসূত্রে যুক্ত। অর্থাৎ, একটির কারণেই ফল হিসেবে অন্য একটি ঘটনা ঘটছে। এ কথা বিবেচনায় রাখলে কাহিনিসজ্জা বদলে ফেলার তাৎপর্য উপলব্ধি করা যাবে। যদি লেখক তুলনামূলক পরে সংঘটিত একটি ঘটনা আগে বর্ণনা করেন, তাহলে ঘটনাগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক যাবে বদলে। সেক্ষেত্রে তৈরি হবে ভিন্ন ধরনের উপলব্ধি। কাহিনিবিন্যাসের এ ধরনের কৌশল ব্যবহার করে ঔপন্যাসিক কোনো ঘটনা বা মুহূর্তকে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলেন। এর মধ্য দিয়ে পাঠকের মনের প্রতিক্রিয়াকে বিশেষভাবে পরিচালিত করেন। এ কারণেই উপন্যাসে কাহিনির তুলনায় প্লটকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ঘটনার অবলম্বন চরিত্র। সাহিত্য মানুষের জীবনেরই বিচিত্র প্রকাশ। নিখিল মানবসমাজের অভিজ্ঞতা ও বৃহত্তর জীবনসত্য উন্মোচিত হয় সাহিত্যে। কিন্তু তার প্রধান অবলম্বন ব্যক্তি। ব্যক্তি-মানুষের সূত্র ধরেই সাধারণভাবে সমষ্টির কথা উঠে আসে। উপন্যাসের ক্ষেত্রে কথাটা বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এখানে সমগ্র কাঠামোর মধ্যে ক্রিয়াশীল ব্যক্তি-মানুষের ছবি অঙ্কিত হয়। ব্যক্তিকে অবলম্বন করেই ঘটনা সংঘটিত হয়। আবার ঘটনার মধ্য দিয়ে বা ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় ব্যক্তির রূপান্তর ঘটে। ফলে ব্যক্তির মধ্যে মানুষের অন্তর্নিহিত স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের সূক্ষ্ম দিকগুলো প্রকাশিত হয়। উপন্যাসে সাধারণভাবে এ ব্যক্তিই 'চরিত্র' হিসেবে অভিহিত হয়।

তবে চরিত্র কথাটার অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে। একজন মানুষকে আমরা কতগুলো বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত করি। আমরা ব্যক্তির মূল্যায়ন করি, এবং তার কোনো বৈশিষ্ট্য মানুষের বৃহত্তর ভালো-মন্দের ধারণার সাথে কীভাবে সম্পৃক্ত, তা বিবেচনা করি। উপন্যাসে ব্যক্তি কিন্তু অনেক মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। উপন্যাসের ব্যক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের বৃহত্তর মানবসমাজের বৈশিষ্ট্য বা মানুষের গভীরতর প্রকৃতির বোধ জন্মে। এদিক থেকে একজন লেখক মানুষের কোন স্বভাব বা বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে চরিত্র তৈরি করছেন, তা বিশেষভাবে বিবেচনার বিষয় হয়ে ওঠে। যেমন, কোনো মানুষ হয়ত কোনো আদর্শের প্রতি খুবই অনুগত, কেউ হয়ত ভীষণ পারিবারিক, অন্য কেউ খুব বস্তুবাদী কিংবা প্রবৃত্তিপরায়ণ। একজন লেখক এ ধরনের কোন বৈশিষ্ট্যগুলোকে প্রাধান্য দিয়ে তাঁর চরিত্র সৃজন করেন, তার ভিত্তিতে আমরা লেখকের মনোভাব বা দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারি। বিপরীত দিক থেকে বলা যায়, লেখক তাঁর জীবনদৃষ্টি অনুযায়ীই আসলে চরিত্র সৃষ্টি করেন। কাজেই চরিত্র কেবল ঘটনার অবলম্বন নয়; কেবল উপন্যাসের একটি উপকরণ নয়; লেখকের জীবনদৃষ্টিরও যথার্থ বাহন।

শিল্পকলা বা আর্টের যে কোনো শাখাতেই জীবন সম্পর্কে শিল্পীর মূল্যায়ন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং গভীর অন্তর্দৃষ্টির প্রকাশ ঘটে। বস্তুত, প্রধানত এ নিরিখেই কাউকে আমরা বড় শিল্পী বলে থাকি। উপন্যাসও এর ব্যতিক্রম নয়। ঔপন্যাসিক কাহিনি বুননের জন্য যেসব ঘটনার সন্নিবেশ ঘটান, যেভাবে চরিত্র সাজিয়ে তোলেন, কিংবা ঘটনাপরম্পরার মধ্য দিয়ে যে পরিণতিকে পৌঁছান, তার ভিতর দিয়ে লেখকের জীবনদৃষ্টির প্রকাশ ঘটে। অন্যভাবে বলা যায়, লেখকের জীবনদৃষ্টির ভিত্তিতেই আসলে কাহিনি, চরিত্র বা পরিণতি গড়ে ওঠে। শুধু তাই নয়। উপন্যাসের ভাষা ও অলঙ্কারের ব্যবহার কেমন হবে, কোন ভঙ্গি বা স্বরে লেখক একটি ছোট ঘটনা বা সংলাপ রচনা করবেন, কিংবা ভালো-মন্দের বোধগুলো তিনি কীভাবে নির্ণয় করবেন, তার সবকিছুই নির্ধারিত হয় ওই জীবনদৃষ্টির নিরিখেই। কাজেই বিশিষ্ট জীবনবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি উপন্যাসের অনিবার্য অঙ্গ।

উপরের আলোচনার প্রেক্ষাপটে এবার আমরা উপন্যাসের সংজ্ঞায়ন করতে পারি। সংজ্ঞায়ন বলতে বোঝায় কোনো কিছুকে চিহ্নিত করা। এর দুটি দিক। একদিকে সংজ্ঞায়নে জিনিসটি কী তা বলা হয়, অন্যদিকে কী নয় তাও বলা থাকে। যেমন আমরা যদি বলি, উপন্যাস সাহিত্যের একটা রূপ, তাহলে একই সাথে বলা হল যে, উপন্যাস সাহিত্যের বাইরের কিছু নয়। এখন সাহিত্যেরও নানা রূপভেদ আছে। কাজেই উপন্যাসের সংজ্ঞায়ন করতে গেলে অন্য রূপগুলোর সাথে এর ফারাক কোথায়, তাও স্পষ্ট করতে হবে। কবিতার সাথে অন্য সাহিত্যরূপগুলোর প্রধান পার্থক্য শব্দের অর্থ-নির্ণয়ের পদ্ধতিতে কবিতায় সাধারণভাবে প্রচলিত অর্থের বিচ্যুতি ঘটে এবং নতুন অর্থ তৈরি হয়। তাছাড়া সাধারণ ভাষার সাথে কাব্যিক ভাষার সুর ও স্বরগত পার্থক্যও ঘটে। উপন্যাসে যেখানে ঘটনা বর্ণনা করা হয়, নাটকে সেখানে ঘটনা ক্রিয়ামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়। ছোটগল্পের সাথে উপন্যাসের বেশ মিল আছে। তবে প্রধান পার্থক্য এই যে, ছোটগল্পে প্রকাশিত হয় জীবনের কোনো একটি দিক বা কোনো বিশেষ মুহূর্ত, আর উপন্যাস প্রকাশ করতে চায় জীবনের সামগ্রিকতা। জীবনদৃষ্টি অবশ্য সবগুলো সাহিত্যরূপেরই সাধারণ উপাদান। এসব বিবেচনায় উপন্যাসের সংজ্ঞার্থ হতে পারে এরকম: উপন্যাস প্রধানত গদ্যে লেখা বর্ণনামূলক সাহিত্যরূপ, যেখানে ঘটনা ও কাহিনির বিশেষ বিন্যাসের মধ্য দিয়ে ব্যক্তি-চরিত্র অবলম্বনে জীবনের সামগ্রিকতা প্রকাশের আয়োজন করা হয়, এবং সবকিছু মিলে লেখকের বিশিষ্ট জীবনদৃষ্টির প্রকাশ ঘটে।

উপন্যাসের বিষয় হতে পারে ইতিহাস, বিজ্ঞান, সমাজ, রাজনীতি, মনস্তত্ত্ব, ধর্ম এক কথায় মানুষের সাথে সম্পর্কিত যে কোনো কিছু। বিষয়ের সাথে সাথে ভাষা এবং ভঙ্গিরও যথেষ্ট বদল ঘটে। যেমন, ঐতিহাসিক উপন্যাসে অনেকসময় ইতিহাসের সত্য রক্ষার দায় থাকে; আবার আঞ্চলিক জীবন নিয়ে লেখা উপন্যাসে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাস্তব পরিস্থিতির প্রতি অনুগত থাকতে হয়। কিন্তু ভাষা-ভঙ্গি যতই আলাদা হোক, উপন্যাসের মূল উপাদান ও স্বভাব অক্ষুণ্ণ থাকে।

উপন্যাসকে প্রায়ই আধুনিক জীবনের সাহিত্যরূপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। মানুষের যাপিত জীবনের সামগ্রিকতা উপস্থাপনের সক্ষমতার জন্য উপন্যাসের এই খ্যাতি। ষোল শতকে ইউরোপে আধুনিকতার সূত্রপাত হওয়ার সময়েই উপন্যাসচর্চা শুরু হয়েছে বলে বেশিরভাগ পণ্ডিত মনে করেন। পুরনো দুনিয়ায় জীবনের সমগ্রতা ধারণের এ কাজ করত মহাকাব্য। মহাকাব্যের বিষয় ছিল সুদূর অতীতের কল্পিত জীবন। বিপরীতে, উপন্যাসের জগৎ 'বর্তমানময়'। মানুষ যেমন বহুবিচিত্র, তেমনি বিচিত্র তার ভাষা, স্বভাব ও আচরণ। এ বৈচিত্র্যকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে জীবনের বিচিত্র রূপ ও সামগ্রিকতা প্রকাশের আশ্চর্য সক্ষমতা আছে উপন্যাসের। এ দিক থেকে বিশ শতকের শিল্পমাধ্যম সিনেমার সাথে উপন্যাসের তুলনা করা চলে। এ জন্যই হয়ত প্রচুর উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ণ হয়। উনিশ শতকেই উপন্যাস শিল্পরূপগত দিক থেকে সিদ্ধির চূড়ায় পৌঁছেছিল। বিশ শতকে সে ধারা অব্যাহত থেকেছে। বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রেও কথাটা অংশত সত্য। একুশ শতকেও সম্ভবত সিনেমার সমান্তরালে উপন্যাসের এ জয়যাত্রা অব্যাহত থাকবে।

পূর্ববর্তী

১৯৭১ (উপন্যাস) - অন্যান্য প্রশ্ন

উপন্যাস কী?বাংলা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিবাংলাদেশের উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতিহুমায়ূন আহমেদ (ঔপন্যাসিক পরিচিতি) উপন্যাসের আলোচনা: ১৯৭১১৯৭১ (হুমায়ূন আহমেদ)শব্দার্থ ও টীকা (১৯৭১)সৃজনশীল প্রশ্ন (১৯৭১)বর্ণনামূলক প্রশ্ন (১৯৭১)সফদরউল্লাহর মানসিক পরিবর্তনের প্রধান কারণ ব্যাখ্যা কর।'১৯৭১' উপন্যাসে প্রতিফলিত নীলগঞ্জের জনজীবনের পরিচয় দাও।"মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়ালে অনেকেই এরকম করবে।"- এ উক্তিটি কার? উক্তিটি করার কারণ কী ছিল? বুঝিয়ে লেখ।রফিক ও মেজরের সম্পর্কের টানাপড়েন কীভাবে কাহিনির গতিপথকে প্রভাবিত করেছে? তাদের মধ্যকার সংঘাতের কারণ ব্যাখ্যা কর।আজিজ মাস্টারের শেষ পরিণতি কী হয়েছিল? ব্যাখ্যা কর।রফিক চরিত্রটি তোমার কাছে কি দ্বিমুখী চরিত্র মনে হয়? তোমার উত্তরের পক্ষে কারণ দেখাও। মীর আলিকে মেজর এজাজ কেন সালাম দিলেন? ব্যাখ্যা কর।নিস্তরঙ্গ গ্রামীণ জীবনে যুদ্ধের বর্বরতা '১৯৭১' উপন্যাসে কীভাবে রূপায়িত হয়েছে তা বিশ্লেষণ কর। খুনের বিচার করতে মেজর এজাজ এতটা আগ্রহী হয়েছিল কেন?"নীলগঞ্জ আসলে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি।"-ব্যাখ্যা কর।বদিউজ্জামান কাদের ভয়ে এবং কোথায় লুকিয়েছিল? তার অবস্থা সংক্ষেপে বর্ণনা কর।"অপমানের চেয়ে মানুষ মৃত্যুকেই শ্রেয় মনে করে।"-আজিজ মাস্টারের উদাহরণ ব্যবহার করে বাক্যটির সত্যতা যাচাই কর।অনুফা কে? সে কেন মীর আলির উপর বিরক্ত হয়?"অকারণ নিপীড়নই একটি যুদ্ধকে জনগণের মুক্তিযুদ্ধে উপনীত করেছিল।"- '১৯৭১' উপন্যাস থেকে অন্তত তিনটি চরিত্রের উদাহরণ দিয়ে প্রক্রিয়াটি ব্যাখ্যা কর।

সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ