- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- ১৯৭১ (উপন্যাস)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
বাংলা উপন্যাসের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
আগেই বলেছি, উপন্যাস আধুনিক কালের সৃষ্টি। বাংলা সাহিত্যে মাত্র দেড়শত বছর আগে ইংরেজি উপন্যাসের আদলে উপন্যাস রচনার সূত্রপাত ঘটে। তবে অনেকেই এর বীজ খুঁজে পেয়েছেন প্রাচীন সংস্কৃত কাহিনি-কাব্য, পঞ্চতন্ত্র ও বৌদ্ধ জাতকের গল্প, মধ্যযুগের রূপকথা, ময়মনসিংহ গীতিকা, রোমান্টিক কাহিনি-কাব্য, নাথ সাহিত্য মঙ্গলকাব্য, আরব্য উপন্যাস, লোকগাথা প্রভৃতি রচনায়। যাই হোক, আধুনিক কালের পূর্বে বাংলা উপন্যাসের কোনো নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সূত্রপাত ঘটলে কলকাতাকে কেন্দ্র করে একদিকে ব্যাপক নগরায়ণ, অন্যদিকে মধ্যবিত্ত শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। ইউরোপীয় শিক্ষার প্রভাবে মানবিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, শিক্ষা ও সাময়িক পত্রের প্রসার, সমাজ সচেতনতা ইত্যাদি বৃদ্ধি পায়। নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দ্বারা সমাজ ক্রমশ জটিল হয়ে পড়ে। নতুন কালের মানুষ নতুন সমাজের কথা প্রকাশের গরজ অনুভব করতে থাকে। এরই প্রভাবে উদ্ভব ঘটে উপন্যাসের।
অনেকে মনে করেন, হানা ক্যাথারিন মুলেন্সের (১৮২৬-৬১) লেখা ফুলমনি ও করুণার বিবরণ (১৮৫২) হচ্ছে বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস। কেউ কেউ আবার প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল (১৮৫৮)-এর মধ্যে উপন্যাসের লক্ষণ খুঁজে পেয়েছেন। তবে সবাই মেনে নিয়েছেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৩৮-৯৪) দুর্গেশনন্দিনী (১৮৬৫) বাংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক উপন্যাস। বঙ্কিমচন্দ্রই প্রকৃতপক্ষে আধুনিক বাংলা উপন্যাসের স্রষ্টা। উপন্যাসের সমস্ত লক্ষণ তাঁর উপন্যাসে দেখা যাবে। তিনি ঐতিহাসিক উপন্যাস লিখেছেন। লিখেছেন সামাজিক উপন্যাস। সমাজের নানা অসংগতি, ব্যক্তির কামনা, বাসনা, বেদনা ও দ্বন্দ্বের কথা চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে তাঁর উপন্যাসে। কাহিনি বর্ণনা, চরিত্রচিত্রণ, ভাষা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও তিনি সাফল্য দেখিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস কপালকুণ্ডলা, বিষবৃক্ষ, কৃষ্ণকান্তের উইল ইত্যাদি।
বাংলা উপন্যাসের আরেক কীর্তিমান লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। উপন্যাস রচনাতেও তাঁর সাফল্য ঈর্ষণীয়। ব্যক্তির মন ও মননের অপূর্ব সমন্বয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর উপন্যাসগুলো রচনা করেছেন। বঙ্কিমের উপন্যাসে আমরা দেখেছি সমাজের চাপে ব্যক্তি আত্মপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে নি। তাঁর চরিত্রগুলো সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসে পাওয়া গেল নতুন কালের নারী ও পুরুষকে। মানবিকতার দ্বারা দীক্ষিত হয়ে তারা সামাজিক সংস্কারকে অস্বীকার করছে। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের ভিত্তিতে অর্জন করতে চাইছে আত্মপ্রতিষ্ঠা। দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে চাইছে ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান। কাহিনি নির্মাণ, চরিত্র চিত্রণ, ভাষার নিরীক্ষা, যুগের প্রতিফলন, মনোবিশ্লেষণ ইত্যাদি দিক থেকে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসগুলো উল্লেখযোগ্য। তাঁর লেখা বহুল আলোচিত উপন্যাস চোখের বালি, গোরা, ঘরে বাইরে, চার অধ্যায় ও যোগাযোগ।
রবীন্দ্রনাথের পরে বাঙালির গৃহকাতরতা এবং আবহমান পারিবারিক আবেগের ওপর ভর করে উপন্যাস লিখেছেন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৮৭৬-১৯৩৮)। অর্জন করেছিলেন ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তা। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস চরিত্রহীন, গৃহদাহ, দেবদাস, দেনা-পাওনা, শ্রীকান্ত ইত্যাদি।
বাংলা উপন্যাসের জগতে এরপর আবির্ভাব ঘটে তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের- তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৮-১৯৭১), বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় (১৮৯৪-১৯৫০) এবং মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের (১৯০৮-১৯৫৬)। আবহমান বাংলার প্রাকৃতিক মাধুর্য পল্লির স্নিগ্ধশান্ত রূপ, অরণ্য, পাহাড় যে এখনো আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, বিভূতিভূষণের লেখা পথের পাঁচালী, অপরাজিতা, আরণ্যক ইত্যাদি উপন্যাস পড়লেই তা বোঝা যায়। তারাশঙ্করের উপন্যাসে পাই অতীতের গৌরব, ঐশ্বর্য হারানো জমিদার আর নিম্নশ্রেণির বিচিত্র পেশার সাধারণ মানুষের কথা। এই মানুষজন আমাদের চিরচেনা বৈষ্ণবী, কবিয়াল, যাত্রাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, বেদে, সাপুড়ে, বাজিকর, ঝুমুর দলের নাচিয়ে ইত্যাদি। উঠতি শিল্পমালিক আর শ্রমিকদের জীবনের ছবিও পাওয়া যাবে তাঁর উপন্যাসে। তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, ধাত্রীদেবতা, হাসুলী বাঁকের উপকথা, কবি প্রভৃতি। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাসের প্রধান দুটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে: (১) মার্কসবাদের পটভূমিতে ধনী-দরিদ্রের দ্বন্দ্ব এবং (২) ফ্রয়েডীয় মনোবিশ্লেষণের আলোকে নর-নারীর জটিল সম্পর্কের বিন্যাস। ঔপনিবেশিক শাসনের দ্বারা জর্জরিত মানুষের জীবনের ছবি তাঁর উপন্যাসে উজ্জ্বল। সেই সঙ্গে পাওয়া যাবে গ্রামীণ বাস্তবতার চিত্র। দিবারাত্রির কাব্য, পদ্মানদীর মাঝি, পুতুল নাচের ইতিকথা, চিহ্ন, শহরতলী প্রভৃতি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। বাংলা উপন্যাস আরও যাঁরা লিখে খ্যাতিমান হয়েছেন তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন: জগদীশ গুপ্ত, সতীনাথ ভাদুড়ী, কমলকুমার মজুমদার, দেবেশ রায়, অমিয়ভূষণ মজুমদার, মহাশ্বেতা দেবী প্রমুখ।
১৯৭১ (উপন্যাস) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

