- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- নবম-দশম শ্রেণি
- ১৯৭১ (উপন্যাস)
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
উপন্যাসের আলোচনা: ১৯৭১
১৯৭১ উপন্যাস সম্পর্কে বাজারে এক গল্প প্রচলিত আছে। হুমায়ূন আহমেদ নিজেই এ গল্প প্রচার করেছেন। প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাককে তিনি দিয়েছিলেন বইটির এক কপি। রাজ্জাক নাকি বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, যে বইয়ের নাম ১৯৭১, তার পৃষ্ঠাসংখ্যা মাত্র সত্তুর? সপ্তাহখানেক পরে বাসায় ডেকে নিয়ে হুমায়ূনকে তিনি নাকি একপ্রস্ত উপদেশ দিয়েছিলেন। বলেছেন: নিজের মতো লিখবেন, কারো কথা শুনবেন না।
আহমদ ছফা অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে যদ্যপি আমার গুরু নামে যে বিখ্যাত বই লিখেছেন, তাতে শিল্পকলা ও সাহিত্য সম্পর্কে রাজ্জাকের দৃষ্টিভঙ্গির কতক পরিচয় পাওয়া যায়। জয়নুলের গরুর গাড়ি তিনি নাকি ভীষণ পছন্দ করতেন। বলেছেন, এই ছবিতে আকার আর দূরত্বের যে সমানুপাত ও সামঞ্জস্য রক্ষিত হয়েছে, তা রীতিমতো উল্লেখযোগ্য ব্যাপার। এ তথ্য থেকে প্রফেসর রাজ্জাকের শিল্পদৃষ্টি সম্পর্কে যে ধারণা হয়, তাতে নিশ্চিত করে বলা যায়, তাঁর ১৯৭১ পছন্দ হওয়ারই কথা। বস্তুত, বাস্তববাদী ভঙ্গিতে স্থান ও কালের নিপুণ সমবায়ে চরিত্র ও ঘটনাকে কব্জায় রেখে হুমায়ূন এ উপন্যাসের কাহিনিকে যেভাবে প্রায় অভাবনীয় পরিণতিতে নিয়ে গেছেন, তা মহৎ সাহিত্যেরই লক্ষণ।
তুলনামূলক ছোট পরিসরে কম কথায় ইশারার গভীরতা সৃজনে হুমায়ূনের নৈপুণ্য বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। ১৯৭১ সে ধরনের রচনার এক সফল উদাহরণ। ফলে উপন্যাসটি-যে রাজ্জাক পছন্দ করতে পারেন, তা অনুমান করা কঠিন নয়। অপেক্ষাকৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এই: এ রচনা প্রসঙ্গে তিনি অন্যের উপদেশ গ্রহণ না করার উপদেশ কেন দিলেন?
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসচর্চার সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে রাজ্জাকের উপদেশের গুরুত্ব বুঝতে হবে। একদিকে পার্টি রাজনীতির বিষ, অন্যদিকে সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের কপটতা এ দুইয়ের বিশৃঙ্খল সমাবেশে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধচর্চার ধারা বেশ কতকটা এলোমেলো। এ ধরনের পরিস্থিতি শিল্পসম্মত মনোযোগের অনুকূল নয়। এমতাবস্থায় ব্যক্তিত্ববান দৃষ্টিভঙ্গিই কেবল ব্যক্তিত্বসম্পন্ন উপন্যাসের পরিণতি পেতে পারে। অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, এ উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধের যে আবহ তৈরি হয়েছে, তা তিনি পছন্দ করেছেন। অন্যদিকে তিনি লেখকের দৃষ্টিভঙ্গির ব্যক্তিত্বও স্বীকার করেছেন।
১৯৭১ উপন্যাস প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয়, এটি প্রাথমিকভাবে যুদ্ধের কাহিনি, মুক্তিযুদ্ধের নয়। মুক্তিযুদ্ধটা আবিষ্কৃত হয়েছে পরে, যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। হুমায়ূনের মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক লেখালেখির এটা অন্যতম প্রধান বিশিষ্টতা। একেবারে ছক কষে মাটি, মানুষ, প্রাকৃতিক ও মনুষ্যনির্মিত অবকাঠামো এঁকে হুমায়ূন বাংলার এক নিভৃত গ্রামকে বানিয়ে তুলেছেন যুদ্ধের ময়দান। কৌশলটা চলচ্চিত্রের। বিবরণের চিত্রধর্মিতা, চরিত্রের আগমন-তিরোভাব-ক্রিয়া, পটভূমির ফটোগ্রাফিক নির্মাণ সিনেমার কৌশলকেই স্মরণ করিয়ে দেয়। চোখ তো বটেই, কানের ব্যবহারেও পাই সে একই কৌশলের ছাপ।
অন্ধ মীর আলি যেভাবে শব্দ শুনে সাড়া দেয়, তার ভঙ্গি বর্ণনামূলক নয়, চলচ্চিত্রীয়। গুলির শব্দের বর্ণনাগুলোও তাই। লেখক নিজের জিম্মায় জানাচ্ছেন না যে, গুলি হয়েছে; বরং বলছেন, উপস্থিত লোকেরা এদিক থেকে বা ওদিক থেকে গুলির শব্দ শুনেছে। নিঃসন্দেহে সামরিক অভিযানের আবহ নির্মাণ এবং সিরিয়াসনেসের শৈল্পিক প্রয়োজনেই এই বাড়তি বাস্তববাদী নৈপুণ্য আমদানি করেছেন লেখক।
যুদ্ধটা অবশ্য একপক্ষীয়। অন্যপক্ষ মাঠে অনুপস্থিত। মাঠটা কিন্তু আছে; আর সে মাঠে আছে অন্যের ভূমি, ভূমিতে ক্রিয়াশীল ও বসবাসরত জনগোষ্ঠী। এ মাঠে যুদ্ধ মানেই নিরস্ত্র মানুষের উপর ঝাঁপিয়ে পড়া। ঝাঁপিয়ে পড়ার নানা কলা আর ছলা। পেছনের জঙ্গলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একদল সৈন্য লুকিয়ে ছিল কি না, তাদের সাথে বন্দি মেজর বখতিয়ার ছিল কি না, কিংবা তাদের আহত কয়েকজনকে কৈবর্তপাড়ার লোকেরা আশ্রয় দিয়েছিল কি না, সেসব কথা কোথাও পষ্ট করা হয়নি। প্রতিটি সম্ভাবনাই আছে। আবার এমনও হতে পারে যে, এ ধরনের কোনো ঘটনাই নীলগঞ্জে ঘটেনি। কিন্তু দখলদার বাহিনী গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এক পরিকল্পিত অভিযানে নেমেছে নীলগঞ্জের মতো প্রত্যন্ত অঞ্চলে। তাহলে অভিযান শেষ করে চলে গেলেই হয়।
কিন্তু না। তা হবার নয়। প্রতিটি যুদ্ধেরই সাধারণ বৈশিষ্ট্যের পাশাপাশি কিছু অসাধারণ বিশিষ্টতা থাকে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এক বিশিষ্টতা এই যে, এখানে দূর থেকে উড়ে এসে এক আগ্রাসী বাহিনী হামলা চালাবে এমন এক অঙ্গনে, যার উপর তার কোনো সমর্থনজনিত অধিকার নেই। সমর্থন না থাকা এবং সমর্থন আদায় করতে না চাওয়া অথবা সমর্থন আদায় করতে পারার সম্ভাবনা না থাকা এ যুদ্ধের অন্যতম প্রধান বিশিষ্টতা।
মেজর এজাজ আহমেদের ক্ষোভ ছিল। তার বন্ধু বন্দি হয়েছে বিরোধী জোয়ানদের হাতে। কিন্তু সে ক্ষোভ যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে সাধারণ মানুষের উপর অযৌক্তিকভাবে আছড়ে পড়তে পারে না। দ্বিপক্ষীয় যুদ্ধ হলে অন্তত প্রাথমিকভাবে এমনটা হতো না। একপক্ষীয় আরোপণমূলক যুদ্ধ বলেই হয়েছে। ওই ক্ষুদ্র বাহিনীর অধিনায়ক এজাজ আসলে নিশ্চিত হতে পারছিল না, গ্রামবাসীর সাথে লুকিয়ে থাকা সেনাদের কোনো যোগাযোগ আছে কি না। যদি নাও থাকে, তাহলেও খুবই সম্ভব যে, কোনো লড়াই শুরু হওয়া মাত্রই নীলগঞ্জের পুরো প্রাঙ্গণ জনমানুষসহ দাঁড়িয়ে যাবে তার বিরুদ্ধে।
ফলে তাকে ছক কষতে হয়েছে পুরো পরিস্থিতিটাকেই বিরোধীপক্ষ ধরে নিয়ে। তার মানেই হল, এই যুদ্ধে ময়দানের যুদ্ধের চেয়ে ময়দানের বাইরের যুদ্ধ মোটেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না; আর মেজর এজাজকে সে লড়াইটাও লড়তে হয়েছে। কিন্তু প্রতিপক্ষ যেখানে যুদ্ধ-পরিস্থিতিতে নাই, সেখানে যুদ্ধের যে কোনো পদক্ষেপই অন্যায্য হতে বাধ্য। ফলে এজাজ যতই এগিয়েছে ততই জড়িয়েছে অন্যায় যুদ্ধে।
মেজর এজাজ এ উপন্যাসের সবচেয়ে সুচিত্রিত চরিত্রগুলোর একটি। হুমায়ূন আহমেদের নিরাসক্তি এবং সুমিতি এতটাই প্রত্যয়ী যে, হানাদার বাহিনীর অন্যায় যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী একটি চরিত্রকে তিনি কোনো প্রকার বিদ্বেষ ছাড়াই অঙ্কন করে যান, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত। এটা আসলে ঔপন্যাসিকের প্রাথমিক গুণ। উপন্যাসের দিক থেকে বরং দেখা দরকার, এরকম সুঅঙ্কিত একটা চরিত্র শেষ পর্যন্ত কী ধরনের জরুরি দায়িত্ব পালন করে। উপন্যাসের মেজর এজাজ কাকুল মিলিটারি একাডেমির কৃতী ক্যাডেট। বাড়ি পেশোয়ারের এক অখ্যাত গ্রামে। তার গাঁয়ের নাম রেশোবা। এসব কথাবার্তা খানিকটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই হুমায়ূন বলে নেন উপন্যাসের শুরুর পরিচ্ছেদেই। উপন্যাস-পাঠকরা হয়তো বেশ খানিকটা অস্বস্তি বোধ করবেন প্রথম পরিচ্ছেদের মীর আলির পরিচয়জ্ঞাপক অংশেও। উপন্যাসের 'মূল ঘটনা'র বেশ বাইরের জিনিস মনে হতে পারে ওই অংশকে, এমনকি মীর আলি সম্পর্কিত অন্য অংশগুলোকেও। কিন্তু উপন্যাসটির ছোট্ট আয়তনের কথা মাথায় রাখলে ধারণা করা সম্ভব, এ অংশগুলো মূলের মধ্যেই পড়ে; আর তাতে হয়তো আমাদের আরেকবার নতুন করে ভেবে দেখতে হয়, আদৌ মুক্তিযুদ্ধের মূল অংশ কী কী।
মেজর এজাজের কথাই ধরা যাক। এজাজ যদি বেশ রূপবান তরুণই হয়, যদি সে অখ্যাত এক গ্রাম থেকে উঠে আসা জোয়ানই হয়, আর তার নিজের কথামতো ওই রেশোবা গ্রামে তার অন্ধ পিতা নীলগঞ্জের মীর আলির মতোই বাড়ির দরোজায় বসে থেকে থাকে, তাহলে একথাও বলা যাবে, এ ব্যক্তি জন্মসূত্রে খারাপ স্বভাবের নয়। তার অবস্থান ও কর্মকাণ্ডকে ব্যক্তিগত স্বভাব হিসেবে না দেখে কাঠামোগত সন্ত্রাস হিসেবে দেখার এক জোর তাগিদ অনুভূত হবে। তাতে উপরিকাঠামোর বেশ কিছু উপাদান মুক্তিযুদ্ধের কাঠামোগত সন্ত্রাসের অন্যতম উৎস হিসাবে আবিষ্কৃত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়বে। এর প্রধানটি নিশ্চয়ই জাতিগত ঘৃণা। এজাজ তার সহচর রফিককে কোনো রাখঢাক না রেখেই বাঙালির জাতিগত ঊনতা বিষয়ে তার এবং তাদের নিশ্চয়তার কথা বলেছে। বাঙালি মুসলমানের মুসলমানত্ব যে মোটেই ধর্তব্যের মধ্যে নয়, বরং তারা যে প্রায় হিন্দুর কাছাকাছি, এ বিষয়েও মেজর এজাজ কোনো অনিশ্চয়তা রাখেনি। আর, এগুলো যে যুদ্ধকালীন আগ্রাসী পক্ষের প্রধান আদর্শিক অস্ত্র, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তাহলে ওই পক্ষের একজন সেনাপতি হিসেবে এজাজের কর্মকাণ্ড এবং যুদ্ধকৌশলও এসব ধারণার বহিঃপ্রকাশ হওয়ার কথা। প্রশ্ন হল, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিজাত তৎপরতার ফল কী হতে পারে?
ছোট্ট গ্রাম নীলগঞ্জের ছোট্ট জনবসতির উপর এসবের পরিণতি নিপুণভাবে উপস্থাপিত হয়েছে ১৯৭১ উপন্যাসে লেখক প্রথমেই শ্রেণি, পেশা, শিক্ষা ও ক্ষমতাসম্পর্কের ভিত্তিতে ওই অঞ্চলের মানুষদের বিন্যাসটা উপস্থাপন করেছেন। এই ভিত্তিকাঠামো বেশ কিছু সময় ভালোভাবেই কাজ করেছে। পাকিস্তানি পক্ষ এবং তার সহচর হিসেবে রাজাকার দল ওই ভিত্তিকাঠামোর ভিত্তিতেই আচরণ করেছে। ইমাম, শিক্ষক, জয়নাল মিয়া প্রমুখ। শিক্ষিত, ক্ষমতাবান, রেডিও আছে কি নেই, জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা বিদ্রোহীদের খাবার সরবরাহের ক্ষমতা আছে কি নেই ইত্যাদি হিসেব-নিকেশ কিছুক্ষণ কার্যকর থাকে। কিন্তু শীঘ্রই ভিত্তিকাঠামো ভিত্তিক এসব বর্গ হুড়মুড় করে ভেঙে পড়তে শুরু করে।
তার জায়গা দখল করতে থাকে বর্ণবাদী আচরণ, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার সুভাষণ, আর পরিকল্পিত সন্ত্রাস তৈরির যুদ্ধনীতি। নিজেদের ঘোষিত যুদ্ধকে সর্বাত্মক যুদ্ধ হিসেবে নিয়ে দখলদার বাহিনী অগ্রসর হয় ধর্ষণ-লুণ্ঠনে। এ স্তরেও শ্রেণি বা অন্য অনেক বর্গ অকার্যকর হয়ে যায়। আর কে না জানে, আগুন কোনো বাধ মানে না। পাকিস্তানি এবং তাদের দোসররা যে অগ্নিসংযোগে ভীষণ রকমের উৎসাহী ছিল, তার পরিচয় নীলগঞ্জবাসী ভালোভাবেই পেয়েছে।
মেজর এজাজ একজন বুদ্ধিমান মানুষ। সে নিজেও এ দাবি করেছে, আর তার কর্মকাণ্ডেও তার প্রমাণ মিলেছে। পাকিস্তানি মিলিটারির শ্রেষ্ঠত্বের মিথ, দেখা যাচ্ছে, নীলগঞ্জেও যথেষ্ট চালু ছিল। তাহলে এজাজের তো বোঝার কথা, নিপীড়ন শেষ পর্যন্ত যুদ্ধকৌশলের দিক থেকে তার বা তাদের জন্য বিপর্যয়কর হয়ে উঠবে। দুনিয়ার নিপীড়নের ইতিহাস সে কথাই বলে। এজাজরা যে একথা বুঝতে চায়নি, তার প্রাথমিক কারণ, একটা জনগোষ্ঠীকে অস্তিত্বের পরীক্ষায় ফেলে দেয়া যে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, জাতিগত ঘৃণার কারণে তারা তা অনুমান করতে পারেনি। মূল কারণ আসলে তাদের অনন্যোপায় অবস্থা। দুটি মুখোমুখি পক্ষ সামরিক কেতায় পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হলে তার আদব হয় একরকম। আর কাউকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিপক্ষ বানিয়ে লড়াই করলে তার চরিত্র হবে অন্যরকম। আগ্রাসী নিপীড়নের মুখে তখন বিপক্ষের অসামরিক-সামাজিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বাধ্য।
ভেঙে পড়াটা সবার জন্যই বিপজ্জনক। ক্ষমতার স্বাভাবিক ক্রম ও স্তর লঙ্ঘিত হলে ওই সম্পর্কের ভিত্তিতে যে আদব ও শৃঙ্খলা বিদ্যমান থাকে, তাও ভেঙে পড়তে বাধ্য। তখন বুদ্ধিমান সামরিক কর্তা এজাজের ছক বা হিসেব-নিকেশও আর কাজ করবে না। মীর আলিকে সালাম জানিয়ে দশের মন ভজানোর চেষ্টা সাময়িকভাবে কাজ করতে পারে; কৈবর্তপাড়ার চিত্রা বুড়ির ছেলের খুনের বিচারের নামে মনা কৈবর্তকে মেরে ন্যায়বিচারের একটা বিভ্রম তৈরি হতে পারে; কিংবা মনার এগার বছর বয়সী ভাইকে অকারণে হত্যার মধ্য দিয়ে কায়েম করতে পারে ভীতির রাজত্ব। কিন্তু ন্যায়বিচারের গল্প, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মিথ, বিশেষ মতাদর্শ বা ধর্মের প্রতি পাকিস্তানি বাহিনীর ক্ষোভের অনুমান এসবই কাজ করেছে অস্তিত্বের ভয়ে ভীত লোকজনের মধ্যে। চূড়ান্ত পর্যায়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়ার প্রেক্ষাপটে অস্তিত্বের ভয় কেটে গেলে এগুলোর কোনোটাই আর কার্যকর থাকবে না।
তখন ন্যাংটো মাস্টার উপুড় হয়ে তার পাজামা তুলতে শুরু করবে; জয়নাল মিয়া সবজান্তা গোয়েন্দার মতো তথ্য আওড়াতে থাকবে; সবদারউল্লাহ দা হাতে ঘুরে বেড়াবে অনির্দিষ্ট শত্রুর সন্ধানে; আর রফিক দৃপ্ত ভঙ্গিতে নামতে থাকবে বিলের পানিতে।
এখানে বাংলাদেশের নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর কর্তাসত্তার প্রশ্নটি সামনে আসে, যে কর্তাসত্তার অভূতপূর্ব জাগরণ তাদের নিরীহ আলস্যের বিপরীত চিত্র ধরে আবির্ভূত হয়েছিল 'মুক্তি'র বেশে। প্রশ্ন হল, মেজর এজাজের বহুমাত্রিক নিপীড়নই কি অবদমিত জনতার বিপরীত মূর্তিতে আবির্ভূত হওয়ার একমাত্র কারণ? ১৯৭১-এ হুমায়ূন এ মর্মে সচেতন ছিলেন বলেই মনে হয়। মেজর এজাজের সাথে প্রশ্নোত্তর পর্বে ইমাম, মাস্টার, জয়নালসহ অন্যরা যেভাবে উন্মোচিত হয়েছে, তা যে এক মেধাবী নির্মাণ তা নিশ্চয় করে বলা যায়। এ মানুষগুলো আসলে ভূগোল, উৎপাদন-ব্যবস্থা, জাতিসত্তা, সংস্কৃতি ইত্যাদির চেতন-অচেতন মিশেলে অতি বাস্তবের অতি সাধারণ জীবনই যাপন করছিল। ইকবাল-জিন্নাকে নিয়ে তৎপর হওয়া তার এই জীবনের জন্য জরুরি নয়।
পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতি ওদের সবার হয়ত বিরাগ ছিল না। কিন্তু তাই বলে জিন্নাকে বিশেষভাবে স্মরণে রাখা বা ইকবালের কবিতা চর্চা করার কথাও তাদের মনে হয়নি। ঠিক তেমনি নিজের অস্তিত্বের পক্ষে আওয়ামী লীগ বা শেখ মুজিব বা স্বাধীন বাংলা বেতারের তৎপরতা তাদের চাপা উল্লাসের কারণ হয়েছিল নিশ্চয়ই। কিন্তু সেটাই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। 'পাকিস্তান' নামের রাষ্ট্রটির প্রতি তখনো তাদের কারো আবেগ বা নিরপেক্ষ অবস্থান যদি থেকেও থাকে, এজাজের নিপীড়ন সে ব্যাপারে তাদের মায়া কাটানোর জন্য যথেষ্ট ছিল। পরিস্থিতিই অস্তিত্বের শেষ সীমানায় ফেলে দিয়ে তাদের নামিয়ে এনেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। এই-ই তো বাংলাদেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। এটাই একমাত্র ভিত্তি, যার জোরে মুক্তিযুদ্ধকে জনযুদ্ধ বা গণযুদ্ধ বলা যায়।
১৯৭১ উপন্যাসে লেখক তাদেরই উচ্চকিত করতে চেয়েছেন, যাদের যুদ্ধের সাথে সংশ্লিষ্ট কোনো বর্গেই ফেলা যায় না। আগ্রাসী বাহিনীর পক্ষেও তাদের নির্বিচারে 'শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করা আদৌ সহজ ছিল না। কিন্তু তারা তা করতে বাধ্য হয়েছে। কারণ তারা রাজনৈতিক অবস্থানকে সামরিক কায়দায় মোকাবিলা করেছে। সামরিক কায়দায় মোকাবিলার পন্থা গ্রহণ করায় পুরো বাংলাদেশটাই তার ভূমি, মানুষ ও অপরাপর উপাদানসহ এক অতিকায় শত্রুপক্ষ হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষকে শত্রু-কোঠায় সক্রিয় হতে বাধ্য করে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে আসার এই প্রক্রিয়াকে হুমায়ূন আহমেদ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে গভীর বিশিষ্টতা বলে সাব্যস্ত করেন। এদিক থেকে দেখলে উপন্যাসের পটভূমিকায় মীর আলিকে নিয়ে তুলনামূলক দীর্ঘ বয়ান, এবং এজাজের উল্লেখসূত্রে রেশোবা গ্রামে তার অন্ধ পিতার উল্লেখের অন্য তাৎপর্য উন্মোচিত হয়।
রেশোবা গ্রামের জনৈক অন্ধ পিতার সন্তান নীলগঞ্জের আরেক অন্ধ পিতার সন্তানের জন্য যে বিপর্যয় তৈরি করেছে, যুদ্ধের ঘটনা হিসেবে তার পরিচয় দেওয়া সম্ভবপর নয়। আগেই বলা হয়েছে, এজাজের পক্ষে এ কাঠামোগত সন্ত্রাস এড়ানো কিছুতেই সম্ভব ছিল না, যেমন সম্ভব ছিল না ব্যক্তিগত জীবনসমূহের বিপর্যয় রোধ করা। ফলে, মীর আলি, যে কিনা ছেলের সম্ভাব্য মৃত্যু আর গ্রামে বিচরণশীল মিলিটারির তাণ্ডবকে উপেক্ষা করে তার ভাতের ক্ষুধাকে বেশ প্রত্যক্ষ ভূমিকায় দেখতে পাচ্ছিল, তার ব্যক্তিগত বিপর্যয় ঠেকানোর কোনো উপায়ই আসলে এজাজের ছিল না, যতই সে নিজের বাবার সাথে এই প্রান্তীয় মানুষটার মিল খুঁজে পাক। একটা মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয়ের মধ্যে মানুষের ওই বিশ্বজনীন সাযুজ্যের বোধ মুলতুবি হয়ে যায়। আর হুমায়ূন হয়তো তুলনাসূত্রেই আমদানি করেন এক কালবৈশাখির চিত্র। ১৯৭১-এ ওই কালবৈশাখি নানারকম দায়িত্ব পালন করেছে।
এজাজের সাহসিকতা ও বোধবুদ্ধির অন্যতম প্রমাণ দাখিল করা থেকে শুরু করে মুক্তিসেনাদের নিরাপদে বেরিয়ে যাওয়ার কল্পিত বা সত্য ঘটনা ঘটতে দেয়া পর্যন্ত। একটা গুরুতর ব্যাপার এই যে, ঝড়ে মীর আলির ঘরের চালাটি উড়ে যায় মানুষ এবং অপরাপর বস্তুসামগ্রী যথাস্থানে রেখেই; আর আমাদের জানানো হয় মীর আলির ভাগ্যে আগেও একবার এ ঘটনা ঘটেছিল। সেবার পরিবারটি সামলে ওঠে দ্রুত। কিন্তু এখন, প্রাকৃতিক পীড়নের পাশাপাশি এজাজদের প্রযোজনায় অধিকতর বিপর্যয়কর যে ঘটনা ঘটছে, যেখানে তার একমাত্র জোয়ান ছেলের ঘরে ফেরার সম্ভাবনা বেশ পরিমাণে তিরোহিত, তা সামলে ওঠার কোনো আশা আর থাকে না। ঝড়-কবলিত মীর আলিকে তাই একাত্তরের অন্যায় সমরে সংঘটিত মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক হিসেবে পড়াই সঙ্গত। এ ধরনের অসংখ্য বহুমাত্রিক নিপীড়ন ও বিপর্যয়ের ফলে ধীরে ধীরে বদলে যায় হানাদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে কর্মরত চৌকস তরুণ রফিক; মেজর এজাজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, একটুও ভীত না হয়ে, নবলব্ধ মনোবল নিয়ে, এজাজের আশু ধ্বংসবার্তা প্রচার করে, রফিক যখন নামতে থাকে বিলের মৃত্যুর দিকে, তখনই আসলে জন্ম নিতে থাকে বদলে যাওয়া এক নতুন বাংলাদেশ।
রফিক এ উপন্যাসের সম্ভবত সবচেয়ে জটিল চরিত্র। তাকে বাস্তব হিসেবে না পড়ে প্রতীকী চরিত্র হিসেবে পড়ার নিগূঢ় আমন্ত্রণ আছে উপন্যাসটিতে। পরিষ্কার বলা হয়েছে, রফিক কখনো এ গ্রামে আসেনি। অথচ সে এমনভাবে কাজ করেছে, যেন শুধু নীলগঞ্জের রাস্তাঘাট নয়, মানুষজন এবং প্রাকৃতিক অবকাঠামোও তার খুবই চেনা। উপন্যাসের বর্ণনাধারার বাইরে গিয়ে তথ্যটি দিয়ে দিচ্ছেন স্বয়ং লেখক। সে কোন এলাকার মানুষ তা জানতে চেয়েছিল ইমাম। রফিক জবাব দেয়নি। মেজর এজাজের সহযোগী হিসেবে গ্রামে প্রবেশ করলেও 'আমরা' হিসাবে বাংলাদেশের মানুষের প্রতিনিধি হয়েই সে কথা বলেছে। আর এভাবেই হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামের যে কোনো রফিক।
যুদ্ধই করতে চেয়েছে সে। তাই প্রথম থেকে নিজের অনাস্থা জানিয়ে এসেছে অন্যায্য নিপীড়নের ব্যাপারে। অবশেষে যখন সে নিশ্চিত হয়েছে, এটা যুদ্ধ নয়, অন্যায় যুদ্ধ মাত্র, তখন প্রতিবাদ ছাড়া তার হাতে আর কোনো উপায় ছিল না। প্রতিবাদটি সে করেছে জীবন দিয়ে। যুদ্ধের শুরুর পর্বে বাংলাদেশের আপামর জনতা যখন বুঝতে শুরু করে, তাদের সামষ্টিক বেঁচে থাকা কেবল ব্যক্তিক জীবনদানের মধ্য দিয়েই সম্ভবপর, তখনি আসলে বাংলাদেশ প্রবেশ করতে থাকে যুদ্ধে। যুদ্ধ রূপান্তরিত হতে থাকে এক সর্বব্যাপী মুক্তিযুদ্ধে। হুমায়ূনের সাহিত্যিকজীবনের অন্যতম মেধাবী নির্মাণ রফিক এভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিশেষ ধরনের প্রতীক হয়ে ওঠে। বিলের পানিতে সে যখন নামছিল, ততক্ষণে কৈবর্তপাড়ায় রাজাকাররা আগুন বেশ জমিয়ে তুলতে পেরেছে। আগুনের আলো পড়েছে রফিকের মুখে। আগুনের আঁচে বিলের পানিতে মেজর এজাজের কাছে অচেনা হয়ে ওঠা যে রফিক দাঁড়িয়ে আছে, সে রফিকই আসলে এ উপন্যাসের একাত্তর, এ উপন্যাসের মুক্তিযুদ্ধ।
১৯৭১ (উপন্যাস) - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

