- হোম
- একাডেমি
- সাধারণ
- একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
- খুলাফায়ে রাশেদিন
পাঠ্যবিষয় ও অধ্যায়ভিত্তিক একাডেমিক প্রস্তুতির জন্য আমাদের উন্মুক্ত শিক্ষায় অংশগ্রহণ করুন।
খুলাফায়ে রাশেদিন-এর নির্বাচন নীতি
খিলাফত হচ্ছে একটি ধর্মীয় রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ধর্ম ও ইহলৌকিক নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত এক ধরনের কর্মপ্রতিষ্ঠানই খিলাফত। ইবনে খালদুনের মতে, খিলাফত হচ্ছে এমন একটি প্রতিষ্ঠান যা মহানবি (স.)-এর মিশনের প্রতিনিধিত্ব করে। মহানবি (স.)-এর ইন্তেকালের পর হতে খিলাফতের কার্যক্রম শুরু হয়। যাঁরা এই বিরাট মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হলেন, ইসলামের পরিভাষায় তাদেরকে খুলাফায়ে রাশেদিন বলা হয়। খুলাফায়ে রাশেদিনের মধ্যে যাদেরকে গণ্য করা হয় তারা হলেন-
খুলাফায়ে রাশেদীনের সময়কাল:
খলিফাগণের নাম | সময়কাল |
|---|---|
হযরত আবু বকর (রা.) | (৬৩২ - ৬৩৪ খ্রি.) ১৩ রবিউল আউয়াল ১১ হিজরি হতে ২২ জমাদিউল আউয়াল ১৩ হিজরি= ২ বছর ৩ মাস ৯ দিন |
হযরত ওমর ফারুক (রা.) | (৬৩৪- ৬৪৪ খ্রি.) ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৩ হিজরি হতে ২৬ জিলকদ ২৩ হিজরি = ১০ বছর ৬ মাস ৩ দিন |
হযরত উসমান (রা.) | (৬৪৪- ৬৫৬ খ্রি.) ১ মুহাররম ২৪ হিজরি হতে ১৮ জিলহাজ ৩৫ হিজরি = ১১ বছর ১১ মাস ১৭ দিন। |
হযরত আলী (রা.) | (৬৫৬-৬৬১ খ্রি.) ২৪ জিলহজ ৩৫ হিজরি হতে ১৭ রমজান ৪০ হিজরি = ৪ বছর ৮ মাস ২৩ দিন |
এ চারজন খলিফা হযরত (স.) এর নিত্য সহচর ছিলেন এবং তাঁরা সবাই হযরতের (স.) ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনও ছিলেন। তাঁরা মোট ত্রিশ বছর কাল (৬৩২-৬৬১ খ্রি.) মুসলিম জাহানের খিলাফতের পদ অলংকৃত করেন। ঐতিহাসিক ফিলিপ-কে হিট্টি বলেন, "This was a period in which the lustre of the prophet's life had not ceased to shed its light and influence over the thoughts and acts of the caliphs" অর্থাৎ ইহা এমন এক যুগ ছিল যে যুগ হযরত (স.)-এর জীবনাদর্শ, খলিফাদের চিন্তাধারা ও কর্মের উপর আলো ও প্রভাব বিস্তার করা হতে বিরত হয়নি। আরব রাষ্ট্রের সর্বাধিনায়ক হয়েও তাঁরা কখনো ত্যাগ, ন্যায়নিষ্ঠা, সরলতা, সততা এবং জনসেবা ও জনকল্যাণের আদর্শ ও লক্ষ্য হতে বিচ্যুত হননি। তাঁদের প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক শাসনাদর্শ আজও ধ্রুব জ্যোতির মতো সবাইকে দিকনির্দেশ করছে।
খলিফা নির্বাচনের ক্ষেত্রে কোনো বিধিবদ্ধ নিয়ম ছিল না। তবে খলিফা হিসেবে মনোনীত কিংবা নির্বাচিত হবার ক্ষেত্রে কতিপয় বিযয়ের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া হতো। যেমন- তাঁকে কুরায়েশ বংশোদ্ভূত, মুসলমান, পুরুষ, প্রাপ্তবয়স্ক, চরিত্রবান, শারীরিক ও মানসিক ব্যাধিমুক্ত এবং বেসামরিক শাসনের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযোগী কুরআন ও হাদিসভিত্তিক জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে।
উপরন্তু মুসলিম এলাকার নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সাহসের অধিকারী হতে হবে। তদুপরি খুলাফায়ে রাশেদিনের ক্ষেত্রে ইসলামের বিস্তারে অবদান ও বয়োজ্যেষ্ঠতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, বিজ্ঞজনোচিত সূক্ষ্মদৃষ্টি, ব্যক্তিগত প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং সামাজিক কার্যাবলি এ বিষয়গুলো বিবেচনার জন্য রাখা হতো। হযরত আবু বকর (রা.), হযরত উসমান (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সাহাবিদের অভিমতের আলোকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। এ নীতির ব্যতিক্রম লক্ষ করা যায় হযরত ওমর (রা.)-এর নির্বাচনের ক্ষেত্রে। হযরত আবু বকর (রা.) তাঁর অবর্তমানে হযরত ওমর (রা.)-কে খলিফা মনোনয়ন দিয়ে যান। তবে বিশিষ্ট সাহাবা ও গণ্যমান্য ব্যক্তির সমর্থন লাভ করত।
ফকীহদের অভিমত একজন ক্ষমতাসীন খলিফা কর্তৃক তাঁর উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করা সিদ্ধ ও আইনসঙ্গত। বস্তুত খলিফা হচ্ছেন অভিভাবক ও রক্ষক। তিনি যতদিন জীবিত থাকবেন ততদিন তাদের পরিচালনা করবেন। মৃত্যুর পরও তাদের প্রতি লক্ষ রাখা তার কর্তব্য এবং সে কারণেই তার অসমাপ্ত কার্যভার গ্রহণের জন্য কোনো ব্যক্তিকে মনোনয়ন করা অবশ্য কর্তব্য। হযরত আবু বকর (রা.) সম্ভবত মনস্তাত্ত্বিকভাবে উল্লিখিত বিষয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে হযরত ওমর (রা.)-কে খলিফা হিসেবে মনোনয়ন দেন। এক্ষেত্রে হযরত ওমর (রা.) সকল জনগণের নিকট থেকে বাইয়াৎ গ্রহণ করে খলিফা পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিলেন।
হযরত আবু বকর (রা.)-এর খলিফা নির্বাচন [Election of Khalifa Hazrat Abu Baker (R)]
খলিফা নির্বাচন নিয়ে মহানবি হযরত মুহম্মদ (স.)-এর মৃত্যুর পর ইসলামি রাষ্ট্র ও মুসলিম জাহান এক চ্যালেঞ্জ-এর সম্মুখীন হন। কারণ মহানবি (স.) মৃত্যুর পূর্বে কাউকে খলিফা বা প্রতিনিধি নির্বাচন করে যান নি। তাঁর দাফন প্রক্রিয়া চলছিল এমন অবস্থায় আনসার ও মুহাজেরিনদের পক্ষ হতে "সাকিফায়ে বানি-সায়িদা" নামক মিলনায়তনে সমবেত হয়ে খলিফা নির্বাচন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছিলেন। সভাস্থল হতে খাযরাজ গোত্রপতি সাদ-বিন আবু উবায়দুল্লাহকে খলিফা নির্বাচনের জন্য কিছু লোক দাবি জানান। আনসার ও মুহাজেরিনগণ তাদের ইসলামে অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রত্যেকের প্রাধান্য বজায় রাখার জন্য নিজ নিজ গোত্র থেকে খলিফা নির্বাচন নিয়ে আলোচনা চলছিল। অভিজ্ঞ কুরাইশগণ তাদের বংশ ছাড়া অন্য কোনো বংশ বা গোত্রের লোক খলিফা নির্বাচনের প্রস্তাবের বিরোধিতা করে এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই আনসার ও মুহাজেরিনদের মধ্য হতে দু'জন খলিফা নির্বাচনের প্রস্তাব করেন। কেউ কেউ হযরত মুহম্মদ (স.)-এর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ হযরত আলী (রা.)-কে খলিফা নির্বাচনের দাবি জানান। ইতিমধ্যে হযরত আবুবকর (রা.) এবং হযরত ওমর (রা.) হল ঘরে প্রবেশ করেন। হযরত ওমর (রা.)-এ সকল প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবাদ করেন। অচল অবস্থা দূর করার জন্য হযরত আবু বকর (রা.) সাদ-বিন আবু ওবায়দা অথবা হযরত ওমর (রা.)-কে খলিফার দায়িত্ব গ্রহণে অনুরোধ করেন। এমন সময় হযরত ওমর (রা.) হযরত আবু বকর (রা.)-কে খলিফা ঘোষণা করে তাঁর হস্তে চুমুখেয়ে আনুগত্য স্বীকার করলে তাঁকে অনুসরণ করে উপস্থিত সকলে হযরত আবু বকর (রা.)-এর আনুগত্য স্বীকার করে। এরপর বায়াত পাঠের মধ্য দিয়ে হযরত আবু বকর (রা.)-কে ইসলামের প্রধান খলিফা নির্বাচন করে খিলাফত ব্যবস্থার প্রবর্তন করেও ইসলামকে মহাবিপদ হতে রক্ষা করেন। :
হযরত ওমর (রা.)-এর খলিফা নির্বাচন [Election of Khalifa Hazrat Omar (R)]
খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য বিশিষ্ট সাহাবিদের আহ্বান জানান। সাহাবিদের মধ্য হতে আব্দুর রহমান ইবন আউফ, হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), তালহ্ (রা.)-কে ডেকে হযরত ওমর (রা.)-কে খলিফা মনোনিত করার জন্য তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেন। হযরত ওমর (রা.)-এর কঠোর মনোভাবের জন্য আব্দুর রহমান ও তালহা আপত্তি করেন। পরবর্তীতে ওমর (রা.)-কেই দ্বিতীয় খলিফা মনোনয়ন দানে সকলে সম্মত হন এবং উপস্থিত আনসার ও মুহাজেরিনসহ সকল জনতা হযরত আবু বকর (রা.)-এর অন্তিম ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ওমর (রা.)-কে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা নির্বাচিত বলে ঘোষণা করে।
হযরত উসমান (রা.)-এর খলিফা নির্বাচন [Election of Khalifa Hazrat Osman (R)]
হযরত ওমর (রা.)-এর মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য বিশিষ্ট সাহাবা ও গণ্যমান্য লোক নিয়ে "নির্বাচনি পরিষদ" গঠন করেন। নির্বাচন পরিষদকে নির্দেশ দেন তাঁর মৃত্যুর তিন দিনের মধ্যে পরবর্তী খলিফা নির্বাচন সম্পন্ন হতে হবে। এ নির্বাচনি বোর্ডের সদস্য ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবা আব্দুর রহমান ইবনে আউফ (রা.), হযরত উসমান (রা.), হযরত আলী (রা.), হযরত তালহা (রা.), হযরত জুবায়ের (রা.) এবং সাদ-বিন-আবি ওয়াক্কাস (রা.)। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আউফ সকল জনগণের কাছে খলিফা হিসেবে গ্রহণযোগ্য হলেও তিনি উক্ত পদের গুরু দায়িত্ব গ্রহণে রাজি না হওয়ায় সকলের শ্রদ্ধাভাজন এবং বয়োজ্যেষ্ঠ হযরত মুহম্মদ (স.)-এর দু'কন্যার জামাতা উসমান (রা.)-কে সাদ-বিন-আবি ওয়াক্কাস সমর্থন দান করেন। মদিনার সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ তাকে সমর্থন দান করলে তার পক্ষে বেশি সমর্থন পড়ায় তাকে খলিফা বলে ঘোষণা করেন। হযরত তালহা (রা.) মদিনাতে ফিরে এলে তিনিও হযরত উসমান (রা.)-কে সমর্থন জানান।
হযরত আলী (রা.)-এর খলিফা পদে নির্বাচন [Election of Khalifa Hazrat Ali (R)]
তৃতীয় খলিফা হযরত উসমান (রা.)-এর মৃত্যুর পর ইসলামি সাম্রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয় ফলে বিশিষ্ট সাহাবাবর্গ কেউই খলিফার দায়িত্ব নিতে রাজি হয়নি। উসমান (রা.)-এর হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে মুসলিম সমাজ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। তাদের মধ্যে মিশরীয় গোষ্ঠির ইবনে সাবাহ গ্রুপ শক্তিশালী ছিল। তারা হযরত আলী (রা.)-কে খলিফা হিসেবে সমর্থন দান করলে অপর গ্রুপ কেউ তালহা (রা.)-কে কেউ আবার হযরত যুবাইর (রা.)-কে সমর্থন জানায়। তখন হযরত আলী (রা.), তালহা (রা.) ও যুবাইর (রা.)-কে খলিফার দায়িত্ব নিতে অনুরোধ করেন। তারা উভয়ই দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে হযরত আলী (রা.)-এর পক্ষে সমর্থন দান করেন। এরপর অন্যান্য সাহাবারাও আলী (রা.)-কে সমর্থন দিলে আলী (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন।
পরিশেষে বলা যায়, খলিফা নির্বাচন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় নির্বাচকমণ্ডলী (বাঁধাধরা নয়) নানাদিক চুলচেরা বিশ্লেষণ করতেন। জ্যেষ্ঠতা, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং তুলনামূলকভাবে অধিকতর সমর্থনকারীদের অভিমতকে প্রাধান্য দেওয়া হতো। হযরত ওমর (রা.)-এর মনোনয়ন ছাড়া অবশিষ্ট তিনজন খলিফা ঐ নীতির আলোকে নির্বাচিত হয়েছিলেন।
খুলাফায়ে রাশেদিন - অন্যান্য প্রশ্ন
সম্পর্কিত বহুনির্বচনী প্রশ্ন সমূহ

